📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলার বিধান

📄 কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলার বিধান


কারও ব্যাপারে জান্নাত-জাহান্নামের সাক্ষ্য দেওয়ার বিধান কী? বিষয়টি ব্যাখ্যার সাপেক্ষ। অর্থাৎ, জান্নাত-জাহান্নামের সাক্ষ্য দেওয়ার বিধান একাধিক প্রেক্ষিতে বিচার্য—কিছু ক্ষেত্রে জান্নাত ও জাহান্নামের সাক্ষ্য দিতে হবে, কিছু ক্ষেত্রে সাক্ষ্য দেওয়া যাবে না।

সাধারণ কাফের-মুশরিকদের ব্যাপারে জাহান্নামের সাক্ষ্য দিতে হবে। কারণ, কুরআন-সুন্নাহতে তাদের জাহান্নামি বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ۞ إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَظَلَمُوا لَمْ يَكُنِ اللَّهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيَهُمْ طَرِيقًا إِلَّا طَرِيقَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ وَكَانَ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا ۞ অর্থ : 'যারা কুফরি ও সীমালঙ্ঘন করেছে, আল্লাহ তাদের কখনো ক্ষমা করবেন না এবং তাদের কোনো পথও দেখাবেন না, জাহান্নামের পথ ব্যতীত। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে এবং এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।' [নিসা : ১৬৮-১৬৯] রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! এই উম্মতের মধ্য থেকে কোনো ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টান যদি আমার ব্যাপারে শোনে, অতঃপর আমার আনীত দ্বীনের উপর ঈমান আনা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করে, তবে সে জাহান্নামি হবে।'¹⁶²¹

বিপরীতে সাধারণভাবে মুমিনদের জান্নাতি বলে সাক্ষ্য দেওয়া যাবে। কারণ, কুরআন-সুন্নাহতে তাদের ব্যাপারে জান্নাতের সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ إِنَّ الَّذِينَ ءَامَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ جَنَّاتُ النَّعِيمِ ۞ অর্থ : 'যারা ঈমান আনে আর সৎকাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত।' [লুকমান : ৮] রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'আল্লাহ তাআলা সে ব্যক্তির উপর জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' সাক্ষ্য দেয়।'¹⁶²²

এটা হলো উন্মুক্ত ও সাধারণ অবস্থায়। কিন্তু ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে জান্নাত-জাহান্নামের সাক্ষ্য দেওয়ার বিধান কী? এটা নিয়েই মূলত আলোচনা। এক্ষেত্রে আহলে সুন্নাতের স্বাভাবিক নীতি হলো, নির্দিষ্ট কারও ব্যাপারে জান্নাত ও জাহান্নামের সাক্ষ্য না দেওয়া। ইমাম আজম বলেন, 'যদি কেউ নিজেকে জান্নাতি হিসেবে দাবি করে, তবে সে মিথ্যুক। কারণ, সে জান্নাতি নাকি জাহান্নামি সে সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ অবহিত নয়। একইভাবে কেউ যদি নিজেকে জাহান্নামি বলে, সেও মিথ্যাবাদী। কারণ, আল্লাহ ছাড়া কারও সে-সম্পর্কিত জ্ঞান নেই।'¹⁶²³

ইমামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, নবিগণ ছাড়া অন্য কাউকে যদি আপনি দিনরাত নামায ও রোযায় মগ্ন দেখেন, তবে কি তার জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য দেবেন? ইমাম বললেন, 'আমরা কেবল তাদের জন্য জান্নাত ও জাহান্নামের সাক্ষ্য দেবো যাদের জন্য কুরআন-সুন্নাহ সাক্ষ্য দিয়েছে। এর বাইরে আমরা কথা বলব না।'¹⁶²⁴

এটা একটা বিশাল মূলনীতি। এই মূলনীতির উপরই দাঁড়িয়ে আছে আহলে সুন্নাতের এ-সম্পর্কিত আকিদা। অর্থাৎ, কুরআন ও সুন্নাহ যাদের ব্যাপারে জান্নাত কিংবা জাহান্নামের সাক্ষ্য দিয়েছে, আমরা তাদের ব্যাপারে এ সাক্ষ্য দেবো। বাকি সকল মুসলমানের পরিণতির ব্যাপারে নীরব থাকব। ইমাম এ মূলনীতি বিভিন্ন জায়গায় ব্যাখ্যা করেছেন। আবু মুকাতিল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হানিফাকে বলতে শুনেছি, 'আমাদের কাছে মানুষ তিন মঞ্জিলে বিভক্ত : এক. নবিগণ। তারা নিশ্চিতভাবে জান্নাতি। একইভাবে নবিগণ যাদের ব্যাপারে জান্নাতি হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন তারাও জান্নাতি। দুই. মুশরিকগণ। তাদের ব্যাপারে আমরা জাহান্নামের সাক্ষ্য দিই। তিন. সাধারণ মুমিনগণ। তাদের ব্যাপারে আমরা নীরব থাকি। তাদের মধ্যে নির্ধারিত ব্যক্তিবিশেষের জন্য আমরা জান্নাত কিংবা জাহান্নামের সাক্ষ্য দিই না। কিন্তু তাদের জন্য আমরা জান্নাতের আশা করি, জাহান্নামের আশঙ্কা করি।'¹⁶²⁵

ইমাম আজম রহ. আতিয়্যাহ সূত্রে হুযাইফা, ইবনে আব্বাসসহ একাধিক সাহাবি থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর বাণী ۞ وَعَسَىٰ أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا ۞ অর্থ : 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আপনাকে মাকামে মাহমুদে পৌঁছাবেন।' [ইসরা : ৭৯]—এর ব্যাখ্যায় বলেন, 'মাকামে মাহমুদ শাফায়াত। আল্লাহ তাআলা গুনাহের কারণে একদল মুমিনকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। পরবর্তীকালে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর শাফায়াতের মাধ্যমে তাদের জাহান্নাম থেকে বের করবেন। ...অতঃপর তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।'¹⁶²⁶

ইমাম আজম রহ. বলেন, 'হ্যাঁ। বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যাদের ব্যাপারে জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের ব্যাপারে আমি জান্নাতের সাক্ষ্য দিই।'¹⁶²⁷ ইমাম তহাবি বলেন, 'আমরা আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত সৎ-অসৎ সকলের পিছনে নামায আদায় এবং সকলের মৃত্যুর পরে জানাযা পড়া শরিয়তসম্মত মনে করি। তাদের কাউকে আমরা জান্নাতি-জাহান্নামি সাব্যস্ত করি না।'¹⁶²⁸ কাসানি লিখেন, 'নবিগণ এবং রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যাদের জান্নাতি বলেছেন, তারা ব্যতীত অন্য কাউকে জান্নাতি ঘোষণা করা বৈধ নয়। একইভাবে কোনো মুমিনকে জাহান্নামি বলা বৈধ নয়।'¹⁶²৯

টিকাঃ
১৬২১. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ১৫৩)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবি হুরাইরা : ৮৩২০)।
১৬২২. বুখারি (কিতাবুস সালাত: ৪২৫)। মুসলিম (কিতাবুল মাসাজিদ : ৩৩)।
১৬২৩. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৬)।
১৬২৪. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৩)।
১৬২৫. আল-ইনতিকা (৩১৯-৩২০)।
১৬২৬. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৬)।
১৬২৭. আল-ইনতিকা (৩১৯)।
১৬২৮. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৩-২৪)।
১৬২৯. আল-মুতামাদ ফিল মুতাকাদ (১৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00