📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 মুসলমানের রক্তপাত নিষিদ্ধ

📄 মুসলমানের রক্তপাত নিষিদ্ধ


তাকফিরের সঙ্গে ব্যক্তিকে হত্যার একটা গভীর সম্পর্ক আছে। ফলে তাকফিরের বিধান বর্ণনার পরে এ ব্যাপারে কিছু কথা বলা জরুরি। প্রথমেই মনে রাখা উচিত, ইসলামে মুসলিমের রক্ত সুরক্ষিত। অন্যায়ভাবে রক্তপাত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বরং কুরআনে কোনো মুসলিমকে হত্যা করলে জাহান্নামে দীর্ঘকাল কঠোর শাস্তির ঘোষণা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا ۞ অর্থ : 'যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার শাস্তি হবে জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হন। তাকে লানত করেন। তার জন্য মহা শাস্তি প্রস্তুত করেন।' [নিসা : ৯৩]

হাদিসে মানুষ হত্যাকে ধ্বংসাত্মক কাজ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।¹⁶¹¹ কিছু হাদিসে একজন মুসলমানকে হত্যার চেয়ে গোটা দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়া লঘু সাব্যস্ত করা হয়েছে।¹⁶¹² কোনো কোনো হাদিসে মুসলিমের রক্তের গুরুত্ব বোঝাতে হত্যাকে কুফর সাব্যস্ত করা হয়েছে।¹⁶¹³

এত সতর্কতা সত্ত্বেও খারেজি ও মুতাযিলারা বিভ্রান্ত হয়েছে। তারা মুসলমানের রক্তকে পানির মতো বানিয়ে দিয়েছে। তাদের মতে, কেউ যদি কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয় অথবা কোনো বিদআত আবিষ্কার করে, কোনো ফরয আমল ছেড়ে দেয়, তবে তার রক্তপাত বৈধ। তাকে হত্যা করা হবে! এগুলো সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি। কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

প্রশ্ন হলো, তাহলে কি মুসলমানকে কখনোই হত্যা করা যাবে না? না, বিষয়টি তেমন নয়। বরং স্বাভাবিকভাবে মুসলমানের রক্তপাত নিষিদ্ধ। কিন্তু এমন গর্হিত কিছু অপরাধ রয়েছে, যে কারণে এই নিষেধাজ্ঞা রহিত হয়ে যায়। তখন রক্তপাত বৈধ হয়। আহলে সুন্নাতের মতে, মোটামুটি তিন কারণে একজন মুসলিমের রক্তপাত বৈধ হয়, যা মূলত একটি হাদিস থেকে উৎসারিত। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, কোনো ব্যক্তি যখন 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসুল'—এই সাক্ষ্য দেবে, তখন তার রক্ত ঝরানো বৈধ হবে না। হ্যাঁ, তিন ব্যক্তিকে হত্যা করা বৈধ হবে : ১. অন্যকে হত্যাকারী। ২. বিবাহিত ব্যভিচারী। ৩. ধর্মত্যাগী বিদ্রোহী।¹⁶¹⁴

প্রথম প্রকারটি কিসাস—হত্যার বিনিময়ে হত্যা। দ্বিতীয় প্রকারটি 'হদ।' তৃতীয় প্রকারটিতে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ—দুটোই অন্তর্ভুক্ত। ফলে ইসলামে মুরতাদের শাস্তি হলো হত্যা। একইভাবে মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে (অন্যায়মূলক) সশস্ত্র বিদ্রোহও অস্ত্রসহ দমন করা হবে। প্রয়োজনে তাদের হত্যা করা হবে। আলি রাযি.-এর যুদ্ধ ছিল এর বাস্তব প্রয়োগ।

একইভাবে কেউ যদি মুসলিম ভূখণ্ডে বিশৃঙ্খলা-বিপর্যয় সৃষ্টি করে, ডাকাতি ও লুটতরাজের মাধ্যমে জনমনে ত্রাস ছড়ায়, তাকেও হত্যা করা হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ۚ ذَٰلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا ۖ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ ۞ অর্থ : 'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি এটাই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে, অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত-পা কেটে দেওয়া হবে, কিংবা তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে। এটা তো তাদের পার্থিব লাঞ্ছনা। পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।' [মায়িদা: ৩৩]

মোটকথা, ইসলামের চোখে মানুষ-হত্যা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। ফলে শরিয়তে নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট কিছু অপরাধের বাইরে কোনো মানুষের রক্তপাত করার সুযোগ নেই। তাই খারেজি বা মুতাযিলাদের মতের অনুসরণ করে কেউ গুনাহ করলে কিংবা কোনো ফরয ইবাদত ছেড়ে দিলেই তাকে হত্যা করা বৈধ নয়। এমনকি কারও হাতে হত্যাযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হলেও যে-কেউ শরিয়তের শাস্তি প্রয়োগ করার অধিকার রাখে না। বরং শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত দায়িত্বশীল তদন্ত ও যাচাই-বাছাই শেষে নির্ধারিত শাস্তি বাস্তবায়িত করবেন।¹⁶¹⁵

ইসলামি শরিয়াহর সিদ্ধান্ত হলো, যদি কোনো ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে যায়, তাকে বন্দি করা হবে। তিন দিন তার কাছে ইসলাম পেশ করা হবে। তার সন্দেহ দূর করার চেষ্টা করা হবে। যদি ইসলামে ফিরে আসে, ভালো কথা; নতুবা হত্যা করা হবে। যদি ইসলাম পেশ করার আগেই কেউ তাকে হত্যা করে ফেলে, তবে সেটা মাকরুহ ও নিষিদ্ধ গণ্য হবে। কিন্তু হত্যাকারীকে এ জন্য হত্যা কিংবা গুরুতর শাস্তি দেওয়া হবে না। কারণ, নিহত ব্যক্তির রক্ত আগে থেকেই মুরতাদ হওয়ার কারণে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।¹⁶¹⁶

এটা পুরুষ মুরতাদের বিধান। নারী মুরতাদকে কেবল বন্দি করা হবে, হত্যা করা হবে না। ইমাম আজম রহ. বলেন, নারী মুরতাদকে হত্যা করা হবে না, বরং ইসলামে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত বন্দি করে রাখা হবে। এক্ষেত্রে ইমামের দলিল ইবনে আব্বাস রাযি.-এর হাদিস। তিনি বলেছেন, 'কোনো নারী মুরতাদ হয়ে গেলে ইসলামে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তাকে বন্দি করে রাখা হবে।' ইমাম আরও যুক্তি দেন, যুদ্ধের ময়দানে মুশরিক নারীদের রাসুলুল্লাহ (ﷺ) হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।¹⁶¹⁷

টিকাঃ
১৬১১. বুখারি (কিতাবুল ওসায়া : ২৭৬৬)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৮৯)।
১৬১২. তিরমিযি (আবওয়াবুত দিয়াত : ১৩৯৫)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুত দিয়াত : ২৬১৯)।
১৬১৩. বুখারি (কিতাবুল আদাব : ৬০৪৪)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৬৪)।
১৬১৪. বুখারি (কিতাবুদ দিয়াত: ৬৮৭৮)। মুসলিম (কিতাবুল কাসামাহ: ১৬৭৬)।
১৬১৫. দেখুন: বাহরুল কালাম (২৫৭)।
১৬১৬. দেখুন: তুহফাতুল মুলুক (৩০৭)। ফাতহুল কাদির (৬/৭১)। আল-বাহরুর রায়েক (৫/২০১-২০২)।
১৬১৭. দেখুন: আল-আসল, ইমাম মুহাম্মাদ (৭/৪৯৭)। কাশফুল আসার, হারেসি (১/৯১)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কাফের বা মুরতাদ হওয়ার পরে ঈমানে ফিরে আসা

📄 কাফের বা মুরতাদ হওয়ার পরে ঈমানে ফিরে আসা


যদি কোনো মুসলিম মুরতাদ হয়ে যায়, অতঃপর আল্লাহর অনুগ্রহে আবার ঈমানের পথে ফিরে আসে, তাওবা করে কালিমা পড়ে মুসলমান হয়, তাহলে সর্বসম্মতিক্রমে সে ব্যক্তির ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে। সে মুসলিম গণ্য হবে। প্রশ্ন হলো, মাঝের সময়টুকুর বিধান কী? মুরতাদ হওয়ার আগে সে জীবনভর যা আমল করেছিল, সেগুলোর অবস্থা কী?

আহলে সুন্নাতের বিশুদ্ধ মতে, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ উপস্থিত কর্ম ও অবস্থা অনুযায়ী সৌভাগ্যবান বা দুর্ভাগা বিবেচিত হবে। অর্থাৎ, যতক্ষণ ঈমানের উপর থাকবে, ততক্ষণ সৌভাগ্যবান বিবেচিত হবে। যতক্ষণ কুফরের উপর থাকবে, ততক্ষণ দুর্ভাগা বিবেচিত হবে। ফলে কেউ যদি কাফের থাকার পরে ঈমান আনে, তবে ঈমান আনার আগ পর্যন্ত সে দুর্ভাগা এবং আল্লাহর কাছে ঘৃণিত থাকবে। ঈমান আনার মুহূর্ত থেকে সৌভাগ্যবান এবং আল্লাহর প্রিয় বিবেচিত হবে। বিপরীতে ইবলিস কুফরে লিপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত সৌভাগ্যবান ছিল, আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসাপ্রাপ্ত ছিল। কিন্তু কুফর করার মুহূর্ত থেকে দুর্ভাগাদের তালিকায় তার নাম লিপিবদ্ধ হয়ে গেল। ইমাম আজম বলেন, 'ঈমান ও কুফর বান্দার কাজ। যে ব্যক্তি কুফরি করে, আল্লাহ তাকে কুফরি অবস্থায় কাফের হিসেবে জানেন। পরবর্তীকালে সে যখন ঈমান আনে, তখন তাকে ঈমান অবস্থায় মুমিন হিসেবে জানেন এবং তাকে ভালোবাসেন। এতে তাঁর জ্ঞান ও গুণের ভিতরে কোনো পরিবর্তন আসে না।'¹⁶¹⁸

বিপরীতে একদল আলেমের মত হলো, সার্বক্ষণিক অবস্থা নয়, বরং শেষ অবস্থার উপর চিরন্তন সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য, ভালোবাসা-ঘৃণা নির্ভর করবে। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে যদি লেখা থাকে যে, সে প্রথম জীবনে কাফের এবং শেষ জীবনে মুমিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, তবে সে জীবনভর কাফের থাকা অবস্থাতেও সৌভাগ্যবান এবং আল্লাহর প্রিয়পাত্র বিবেচিত হবে! এ কথার ফল দাঁড়ায়, শেষ অবস্থা যদি মুমিন লেখা থাকে, তবে কেউ মূর্তির সামনে সিজদারত অবস্থাতেও আল্লাহর কাছে মুমিন গণ্য হবে এবং তাঁর মহব্বতের পাত্র হবে!¹⁶¹৯

এটা গলত কথা এবং বাস্তবতাবিবর্জিত বক্তব্য। সুস্থ বিবেক ও যুক্তিও ইমাম আজম তথা সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাতের বক্তব্যকে সমর্থন করে। কারণ, আল্লাহ তায়ালা সবকিছু জানেন। ফলে একটা লোকের ব্যাপারে যখন আল্লাহর জানা থাকে যে, এ লোকটি জীবনভর কাফের থাকবে এবং শেষ জীবনে ঈমান এনে মুমিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, আল্লাহ তাআলা জীবনভর তার সঙ্গে তার কর্মের বিপরীত ফয়সালা করেন না। বাস্তবতার বিপরীত আচরণ করেন না।

উপর্যুক্ত মতপার্থক্যের ফলাফল হলো, কোনো মুমিন যদি মুরতাদ হয়ে যায়, অতঃপর মৃত্যুর আগে আবারও ঈমানে ফিরে আসে, তবে তার আগের আমল বাতিল হবে না বলে তারা মনে করেন। কারণ, সে যেহেতু ঈমানের উপর মৃত্যুবরণ করবে লেখা আছে, সুতরাং সে মুরতাদ অবস্থাতেও সৌভাগ্যবান ছিল। এমনকি মুরতাদ হওয়ার আগে যদি হজ পালন করে থাকে, দ্বিতীয়বার ঈমান আনার পরে পুনরায় হজ করা নিষ্প্রয়োজন। কারণ, আগের হজ বাতিল হয়নি! তারা তাদের মতের পক্ষে কুরআনের সেই আয়াত দিয়ে দলিল দেন যেখানে আমল বাতিল হওয়া 'কুফর অবস্থায় মৃত্যু'র সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে [বাকারা: ২১৭]। কিন্তু এ দলিল সঠিক নয়। কারণ, এখানে স্রেফ একটা অবস্থার কথা বলা হয়েছে। কুরআনের অন্যান্য আয়াত দেখলে সুস্পষ্টভাবে বুঝে আসবে যে, অন্য বিভিন্ন কারণে আমল বাতিল হয়। যেমন—কুফর ও শিরক সর্বাবস্থায় আমল বাতিলকারী, মৃত্যুবরণ করা জরুরি নয়।

এ জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাত এবং হানাফি আলেমগণ বলেন, কেউ মুরতাদ হলে তার সকল আমল বাতিল হয়ে যায়। ফলে কোনো মুসলমান মুরতাদ হওয়ার পরে যদি দ্বিতীয়বার ইসলামে প্রবেশ করে, তবে তার হজ পুনরায় আদায় করতে হবে। আহলে সুন্নাতের ইমামদের দলিল কুরআনের একাধিক আয়াত। ۞ وَمَنْ يَكْفُرْ بِالْإِيْمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ ۞ অর্থ : 'যে ব্যক্তি ঈমান প্রত্যাখ্যান করে, তার সকল আমল নষ্ট হয়ে যাবে এবং পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।' [মায়িদা: ৫] এখানে মৃত্যুর সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কাফের হলেই আমল বাতিল হয়ে যাবে। আল্লাহ আরও বলেন, ۞ وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ ۞ অর্থ : 'আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে—যদি আল্লাহর শরিক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।' [যুমার : ৬৫] এখানেও সরাসরি শিরকের সঙ্গে আমল বাতিল হয়ে যাওয়াকে সম্প্পৃক্ত করা হয়েছে।¹⁶²⁰

টিকাঃ
১৬১৮. আল-ফিকহুল আকবার (৪)।
১৬১৯. আস-সাওয়াদুল আজম (৫১-৫৩)। আত-তামহিদ, নাসাফি (১৫২-১৫৩)।
১৬২০. বিস্তারিত দেখুন : উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৭৭-১৮১)। নাজমুল ফারায়েদ (৫৬-৫৭)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলার বিধান

📄 কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলার বিধান


কারও ব্যাপারে জান্নাত-জাহান্নামের সাক্ষ্য দেওয়ার বিধান কী? বিষয়টি ব্যাখ্যার সাপেক্ষ। অর্থাৎ, জান্নাত-জাহান্নামের সাক্ষ্য দেওয়ার বিধান একাধিক প্রেক্ষিতে বিচার্য—কিছু ক্ষেত্রে জান্নাত ও জাহান্নামের সাক্ষ্য দিতে হবে, কিছু ক্ষেত্রে সাক্ষ্য দেওয়া যাবে না।

সাধারণ কাফের-মুশরিকদের ব্যাপারে জাহান্নামের সাক্ষ্য দিতে হবে। কারণ, কুরআন-সুন্নাহতে তাদের জাহান্নামি বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ۞ إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا وَظَلَمُوا لَمْ يَكُنِ اللَّهُ لِيَغْفِرَ لَهُمْ وَلَا لِيَهْدِيَهُمْ طَرِيقًا إِلَّا طَرِيقَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ وَكَانَ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا ۞ অর্থ : 'যারা কুফরি ও সীমালঙ্ঘন করেছে, আল্লাহ তাদের কখনো ক্ষমা করবেন না এবং তাদের কোনো পথও দেখাবেন না, জাহান্নামের পথ ব্যতীত। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে এবং এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।' [নিসা : ১৬৮-১৬৯] রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! এই উম্মতের মধ্য থেকে কোনো ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টান যদি আমার ব্যাপারে শোনে, অতঃপর আমার আনীত দ্বীনের উপর ঈমান আনা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করে, তবে সে জাহান্নামি হবে।'¹⁶²¹

বিপরীতে সাধারণভাবে মুমিনদের জান্নাতি বলে সাক্ষ্য দেওয়া যাবে। কারণ, কুরআন-সুন্নাহতে তাদের ব্যাপারে জান্নাতের সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ إِنَّ الَّذِينَ ءَامَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ جَنَّاتُ النَّعِيمِ ۞ অর্থ : 'যারা ঈমান আনে আর সৎকাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত।' [লুকমান : ৮] রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'আল্লাহ তাআলা সে ব্যক্তির উপর জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' সাক্ষ্য দেয়।'¹⁶²²

এটা হলো উন্মুক্ত ও সাধারণ অবস্থায়। কিন্তু ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে জান্নাত-জাহান্নামের সাক্ষ্য দেওয়ার বিধান কী? এটা নিয়েই মূলত আলোচনা। এক্ষেত্রে আহলে সুন্নাতের স্বাভাবিক নীতি হলো, নির্দিষ্ট কারও ব্যাপারে জান্নাত ও জাহান্নামের সাক্ষ্য না দেওয়া। ইমাম আজম বলেন, 'যদি কেউ নিজেকে জান্নাতি হিসেবে দাবি করে, তবে সে মিথ্যুক। কারণ, সে জান্নাতি নাকি জাহান্নামি সে সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ অবহিত নয়। একইভাবে কেউ যদি নিজেকে জাহান্নামি বলে, সেও মিথ্যাবাদী। কারণ, আল্লাহ ছাড়া কারও সে-সম্পর্কিত জ্ঞান নেই।'¹⁶²³

ইমামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, নবিগণ ছাড়া অন্য কাউকে যদি আপনি দিনরাত নামায ও রোযায় মগ্ন দেখেন, তবে কি তার জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য দেবেন? ইমাম বললেন, 'আমরা কেবল তাদের জন্য জান্নাত ও জাহান্নামের সাক্ষ্য দেবো যাদের জন্য কুরআন-সুন্নাহ সাক্ষ্য দিয়েছে। এর বাইরে আমরা কথা বলব না।'¹⁶²⁴

এটা একটা বিশাল মূলনীতি। এই মূলনীতির উপরই দাঁড়িয়ে আছে আহলে সুন্নাতের এ-সম্পর্কিত আকিদা। অর্থাৎ, কুরআন ও সুন্নাহ যাদের ব্যাপারে জান্নাত কিংবা জাহান্নামের সাক্ষ্য দিয়েছে, আমরা তাদের ব্যাপারে এ সাক্ষ্য দেবো। বাকি সকল মুসলমানের পরিণতির ব্যাপারে নীরব থাকব। ইমাম এ মূলনীতি বিভিন্ন জায়গায় ব্যাখ্যা করেছেন। আবু মুকাতিল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হানিফাকে বলতে শুনেছি, 'আমাদের কাছে মানুষ তিন মঞ্জিলে বিভক্ত : এক. নবিগণ। তারা নিশ্চিতভাবে জান্নাতি। একইভাবে নবিগণ যাদের ব্যাপারে জান্নাতি হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন তারাও জান্নাতি। দুই. মুশরিকগণ। তাদের ব্যাপারে আমরা জাহান্নামের সাক্ষ্য দিই। তিন. সাধারণ মুমিনগণ। তাদের ব্যাপারে আমরা নীরব থাকি। তাদের মধ্যে নির্ধারিত ব্যক্তিবিশেষের জন্য আমরা জান্নাত কিংবা জাহান্নামের সাক্ষ্য দিই না। কিন্তু তাদের জন্য আমরা জান্নাতের আশা করি, জাহান্নামের আশঙ্কা করি।'¹⁶²⁵

ইমাম আজম রহ. আতিয়্যাহ সূত্রে হুযাইফা, ইবনে আব্বাসসহ একাধিক সাহাবি থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর বাণী ۞ وَعَسَىٰ أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا ۞ অর্থ : 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আপনাকে মাকামে মাহমুদে পৌঁছাবেন।' [ইসরা : ৭৯]—এর ব্যাখ্যায় বলেন, 'মাকামে মাহমুদ শাফায়াত। আল্লাহ তাআলা গুনাহের কারণে একদল মুমিনকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। পরবর্তীকালে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর শাফায়াতের মাধ্যমে তাদের জাহান্নাম থেকে বের করবেন। ...অতঃপর তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।'¹⁶²⁶

ইমাম আজম রহ. বলেন, 'হ্যাঁ। বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যাদের ব্যাপারে জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের ব্যাপারে আমি জান্নাতের সাক্ষ্য দিই।'¹⁶²⁷ ইমাম তহাবি বলেন, 'আমরা আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত সৎ-অসৎ সকলের পিছনে নামায আদায় এবং সকলের মৃত্যুর পরে জানাযা পড়া শরিয়তসম্মত মনে করি। তাদের কাউকে আমরা জান্নাতি-জাহান্নামি সাব্যস্ত করি না।'¹⁶²⁸ কাসানি লিখেন, 'নবিগণ এবং রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যাদের জান্নাতি বলেছেন, তারা ব্যতীত অন্য কাউকে জান্নাতি ঘোষণা করা বৈধ নয়। একইভাবে কোনো মুমিনকে জাহান্নামি বলা বৈধ নয়।'¹⁶²৯

টিকাঃ
১৬২১. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ১৫৩)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবি হুরাইরা : ৮৩২০)।
১৬২২. বুখারি (কিতাবুস সালাত: ৪২৫)। মুসলিম (কিতাবুল মাসাজিদ : ৩৩)।
১৬২৩. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৬)।
১৬২৪. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৩)।
১৬২৫. আল-ইনতিকা (৩১৯-৩২০)।
১৬২৬. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৬)।
১৬২৭. আল-ইনতিকা (৩১৯)।
১৬২৮. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৩-২৪)।
১৬২৯. আল-মুতামাদ ফিল মুতাকাদ (১৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00