📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 এখান থেকেই প্রশ্ন ওঠে, গুনাহ কি কুফর নয়?

📄 এখান থেকেই প্রশ্ন ওঠে, গুনাহ কি কুফর নয়?


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সকল ধারার একটি প্রতিষ্ঠিত আকিদা হলো, গুনাহের কারণে আহলে কিবলা তথা মুসলিমকে কাফের না বলা। এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের কোনো নির্ভরযোগ্য আলেম দ্বিমত করেননি। কারণ, এটা খারেজি ও মুতাযিলাদের বিপক্ষে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পরিচয়নির্দেশক (শিআর)। পিছনে 'ঈমান ও কবিরা গুনাহ' অধ্যায়ে এ ব্যাপারে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ইমাম আজম রহ. বলেন, 'তাওহিদ এবং রাসুলুল্লাহর রিসালাতের অনুসারীদের মাঝে যারা গুনাহগার, তারা (গুনাহ সত্ত্বেও) নিঃসন্দেহে মুমিন। তারা সন্দেহাতীতভাবেই কুফর থেকে মুক্ত।'¹⁵⁶⁰ আল-ফিকহুল আবসাতে ইমাম রহ. বলেন, 'আমাদের আকিদা হচ্ছে, গুনাহের কারণে কোনো আহলে কিবলাকে আমরা কাফের বলব না। গুনাহের ফলে কারও ঈমানকে আমরা নাকচ করব না।'¹⁵⁶¹ আল-ফিকহুল আকবারে ইমাম রহ. বলেন, “আমরা গুনাহের কারণে কোনো মুসলিমকে কাফের মনে করি না, হোক সেটা কবিরা গুনাহ, যতক্ষণ না সেটাকে হালাল মনে করবে। এ কারণে তার কাছ থেকে 'মুমিন' শব্দটি কেড়ে নিই না। বরং সে বাস্তবিক অর্থেই মুমিন—এমন বলি। হ্যাঁ, সে ফাসেক মুমিন হতে পারে, কিন্তু কাফের নয়।”¹⁵⁶²

ইমাম আরও বলেন, 'অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, চুরি করা, ডাকাতি করা, অন্যায়-অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়া, ব্যভিচার করা এবং মদ্যপান করা কুফর নয়, ফিসক (পাপাচার)। সুতরাং কোনো মুমিন এসবে জড়িয়ে পড়লে সে পাপী ও অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে, কাফের নয়। আল্লাহ চাইলে তাকে এ পাপের জন্য জাহান্নামের শাস্তি দিতে পারেন। পরে ঈমানের কারণে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন।'¹⁵⁶³

অর্থাৎ, খারেজিরা গুনাহে লিপ্ত মুমিনকে কাফের বলে এবং পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নামি বলে। মুতাযিলারা ও দুনিয়াতে এমন ব্যক্তিকে ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি কিংবা মুনাফিক বলে। পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নামি বলে। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত গুনাহের কারণে কাউকে ঈমান থেকে বের করে দেয় না, তার কাছ থেকে মুমিন নাম কেড়ে নেয় না; বরং তাকে গুনাহগার (ফাসেক) মুসলিম নামে অভিহিত করে। কারণ, হারামকে হালাল কিংবা হালালকে হারাম মনে করা ছাড়া গুনাহ কুফরের পর্যায়ে পৌঁছয় না। ফলে এমন বিশ্বাস ছাড়া স্রেফ গুনাহের কারণে কাউকে কাফের বলা যাবে না।¹⁵⁶⁴

ইমাম আবু ইউসুফ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'তোমরা বিভ্রান্ত ও তর্কপ্রিয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিতর্ক করো না। চারটি বিষয় মনে রাখতে পারলে তোমরা এই উম্মতের প্রথম প্রজন্ম যে পথে ছিল সে পথে থাকতে পারবে : (এক.) তাকদিরের ভালোমন্দ সবকিছুতে বিশ্বাস রাখবে। (দুই.) গুনাহের কারণে কোনো মুসলিমকে কাফের বলবে না। (তিন.) নিজেদের ঈমানের মাঝে সন্দেহ করবে না। (চার.) আল্লাহর রাসুলের কোনো সাহাবির সমালোচনা করবে না।'¹⁵⁶⁵

কিন্তু এসব বক্তব্যের অর্থ কখনোই এটা নয় যে, কোনো গুনাহই কুফর নয় এবং কোনো গুনাহের কারণেই মানুষ কাফের হয় না; বরং অনেক গুনাহ ও পাপ কাজ কুফর। 'গুনাহ বা অন্যায় কর্মের কারণে কাফের হয় না'—এটা মূলত খারেজি ও মুতাযিলা সম্প্রদায়কে খণ্ডনের জন্য আমাদের ইমামগণ বলেছেন। ফলে স্বাভাবিক কবিরা গুনাহ, যা কুফর নয়—যেমন: অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, চুরি করা, ডাকাতি করা, অন্যায়-অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়া, ব্যভিচার করা, মদ্যপান করা কুফর নয়—তা ফিসক (পাপাচার)। কোনো মুমিন ব্যক্তি এসবে জড়িয়ে পড়লে সে পাপী ও অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে, কাফের নয়। একইভাবে (অলসতাবশত) নামায পরিত্যাগ, রোযা পরিত্যাগ ইত্যাদিও গুনাহ; কুফর নয়।¹⁵⁶⁶

তবে সকল গুনাহ ফিসক নয়, বরং অনেক গুনাহ কুফর। অর্থাৎ, যেখানে গুনাহের প্রকৃতিটাই কুফর সেখানে 'গুনাহ কুফর নয়' এমন যুক্তি চলবে না। খোদ ইমাম বলেন, 'কালিমার চেয়ে বড় পুণ্যের কাজ আর কিছু হতে পারে না। সাত আকাশ, সাত যমিন এবং এগুলোর মাঝের জায়গার তুলনায় একটা ডিম যতটা ক্ষুদ্র, কালিমার তুলনায় সকল ফরয ইবাদতের পরিমাণ তারচেয়েও নগণ্য। বিপরীতে সকল গুনাহের মাঝে শিরক সবচেয়ে জঘন্য। আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিলেও শিরকের গুনাহ ক্ষমা করবেন না।'¹⁵⁶⁷ এখানে ইমাম সুস্পষ্টভাবে 'শিরক'-কে গুনাহ সাব্যস্ত করছেন। এমন অনেক গুনাহ রয়েছে যা মূলত কুফর। অর্থাৎ, সেটা গুনাহ এবং কুফর একসঙ্গে। ফলে কেউ যদি এমন গুনাহে লিপ্ত হয় যা প্রকারান্তরে কুফর বা শিরক, তবে গুনাহের মাধ্যমে সে ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে। সুতরাং কোনো গুনাহ কিংবা পাপ কাজই কুফর নয়—এমন বক্তব্য যেন মুরজিয়াদের আকিদার দিকে ঠেলে না দেয় সে ব্যাপারে সতর্কতা কাম্য।¹⁵⁶⁸

টিকাঃ
১৫৬০. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৩১)।
১৫৬১. আল-ফিকহুল আবসাত (৪০)।
১৫৬২. আল-ফিকহুল আকবার (৫)।
১৫৬৩. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৭)।
১৫৬৪. দেখুন: আস-সাওয়াদুল আজম (৩)।
১৫৬৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১২৪)।
১৫৬৬. দেখুন : আল-ফিকহুল আবসাত (৪৭)।
১৫৬৭. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৭-১৮)।
১৫৬৮. দেখুন : আল-জাওহারাতুল মুনিফাহ (৫৭)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কুফরের কিছু উদাহরণ

📄 কুফরের কিছু উদাহরণ


হানাফি মাযহাবের কিতাবসমূহে বর্ণিত অবিশ্বাসগত কুফরের উল্লেখযোগ্য কিছু উদাহরণ হলো: উসুলুদ্দিন তথা দ্বীনের মৌলিক কোনো বিষয়কে অস্বীকার করা। যেমন—আল্লাহ, ফেরেশতা, পরকাল কিংবা রাসুলুল্লাহর শেষ নবি হওয়া অস্বীকার করা; শরিয়তে সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত কোনো ফরয বিধান—যেমন : পাঁচ ওয়াক্ত নামায, রমযানের রোযা, হজ, যাকাত ইত্যাদি—অস্বীকার করা; শরিয়তে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত কোনো হারাম—যেমন : সুদ, ব্যভিচার, জুয়া, মদ্যপান ইত্যাদি—অস্বীকার করা; সুনিশ্চিত হারামকে হালাল মনে করা; সুস্পষ্ট হালালকে হারাম মনে করা; সগিরা কিংবা কবিরা যেকোনো গুনাহকে হালাল মনে করা; গণক ও জ্যোতিষীদের গায়েব সম্পর্কে অবহিত বিশ্বাসপূর্বক সত্যায়ন করা; কুরআনের কোনো শব্দ বা বিধান অস্বীকার করা; কুরআন ও বিশুদ্ধ সুন্নাহর মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত আল্লাহর কোনো গুণ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা; আল্লাহকে সৃষ্টির মতো মনে করা; আল্লাহ ছাড়া কাউকে বিধানদাতা মানা; আল্লাহর আইন অবজ্ঞা করা এবং আধুনিক সময়ের অনুপযোগী ভাবা; মানব রচিত আইনকে শরিয়তের চেয়ে উত্তম কিংবা উপযুক্ত বিকল্প মনে করা।

মৌখিক অস্বীকৃতি এবং কর্মগত কুফরের কিছু উদাহরণ হলো: আল্লাহ অথবা তাঁর কোনো নবি বা রাসুলকে গালি দেওয়া কিংবা তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা; আল্লাহর শানে অশোভন কথা বলা কিংবা তাঁর কোনো নাম বা গুণ নিয়ে ঠাট্টা করা; আল্লাহ, আল্লাহর রাসুল, দ্বীন ও ঈমানের কোনো রুকন কিংবা দ্বীনসংশ্লিষ্ট মৌলিক যেকোনো বিষয় (যথা ফেরেশতা, কুরআন, নামায, হজ ইত্যাদি) নিয়ে উপহাস করা; মূর্তি-প্রতিমা বা এ-জাতীয় বস্তুর সামনে সিজদা করা; ছোট্ট অথচ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত কোনো সুন্নতকেও অবজ্ঞা করা; এমন কোনো কথা বলা বা কাজ করা যাতে রাসুলুল্লাহর প্রতি বিন্দুমাত্র অবহেলা কিংবা বিদ্বেষ বা বিরক্তি প্রকাশ পায়। যেমন—কারও সামনে বলা হলো, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) লাউ পছন্দ করতেন। সে (রাসুলুল্লাহর সত্তা, রুচি বা তাঁর কাজের প্রতি বিরক্ত হয়ে) বলল, আমি পছন্দ করি না! এমন লোক মুরতাদ হয়ে যাবে। পৃথিবীতে যদি নবি-রাসুল না আসতেন এমন আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা; প্রকাশ করা বাদ্যযন্ত্রের তাল ও বাঁশির সুরের সঙ্গে মিলিয়ে কুরআন পড়া; কুরআনের ব্যাপারে যেকোনো অমূলক, ঠাট্টা কিংবা বিদ্রূপাত্মক কথা বলা; মসজিদ, মাদরাসা কিংবা ইসলামের সম্মানিত যেকোনো নিদর্শনকে অবজ্ঞা করা। ফলে মদ্যপান, ব্যভিচার কিংবা হারাম কাজের আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা কুফর; নামায-রোযা কিংবা ইসলামের যেকোনো ফরয বিধানকে বিরক্তি, ঠাট্টা কিংবা অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করা। যেমন—কাউকে নামায পড়তে বলার পরে সে খোদ নামাজের প্রতি বিরক্তি বা অবজ্ঞা দেখিয়ে বলল, জীবনেও নামায পড়ব না; শরিয়ত বর্জন করে নিজেদের বানানো শরিয়তবিরোধী আইনে জীবন ও জগত পরিচালনা করা।¹⁵⁶৯

টিকাঃ
১৫৬৯. দেখুন : আল-বাহরুর রায়েক (৫/২০২-২১০। শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (১৩৮-১৫৮)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কুফর বর্ণনার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি

📄 কুফর বর্ণনার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি


কুফর বর্ণনার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িমূলক প্রান্তিকতা হলো অন্তর ও অবিশ্বাসের বিষয়টি কম গুরুত্ব দিয়ে স্রেফ কর্মগত বিষয়টি দেখা। সামান্য কথা কিংবা কাজের কারণে কাউকে কাফের বলা, অথচ বাস্তবে দেখা যাবে সে কথা বা কাজটা কুফর নয়। ফিকহের প্রাচীন কিতাবগুলোতে এমন অসংখ্য কাজকে কুফর ও রিদ্দাহ (ধর্মত্যাগ) বলা হয়েছে, যেগুলোর সিংহভাগই ব্যাখ্যাসাপেক্ষ এবং বিশেষ প্রেক্ষিতে প্রযোজ্য। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কোনো অর্থে নিলে হয়তো সেগুলোকে কুফর বলা যাবে। কিন্তু উন্মুক্তভাবে সেগুলো মোটেই কুফর নয়।

ফিকহের কিতাবগুলোতে বিদ্যমান এ ধরনের কিছু উদাহরণ হলো: কারও সামনে বলা হলো, আল্লাহর রাসুল লাউ পছন্দ করতেন। সে বলল, আমি লাউ পছন্দ করি না; তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। [উপরে আমরা দেখিয়েছি—এটা কুফর হওয়া ব্যাখ্যাসাপেক্ষ] কাউকে বলা হলো: আল্লাহর ওয়াস্তে এই কাজটা করো, সে বলল, করব না; তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। কাউকে কুরআন পড়তে বলায় সে যদি বলে, তৃপ্ত হয়ে গেছি অথবা ভালো লাগে না, কাফের হয়ে যাবে; কাউকে নামায পড়তে বলার পরে যদি বলে পড়ব না, সেও কাফের হয়ে যাবে [পিছনে আমরা বলেছি এটা ব্যখ্যাসাপেক্ষ]। কেউ যদি কুরআনের আয়াতকে তার নিজের কথার মাঝে প্রবেশ করায়, তবে সে কাফের হয়ে যাবে! যেমন—কেউ ভিড় দেখে যদি বলে : ۞ فَجَمَعْنَاهُمْ جَمْعًا ۞ অর্থ: 'আমি তাদের একত্র করলাম!' [যা মূলত কুরআনের আয়াত, কাহাফ : ৯৯] কেউ যদি ভরা কোনো পাত্র দেখে বলে, ۞ وَكَأْسًا دِهَاقًا ۞ অর্থ : 'পূর্ণ পানপাত্র' [যা মূলত কুরআনের আয়াত, নাবা : ৩৪], তবে কাফের হয়ে যাবে! অর্থাৎ, দৈনন্দিন কথার মাঝে কেউ কুরআনের আয়াত প্রবেশ করালেই কাফের হবে! ইচ্ছাকৃত যদি কেউ পবিত্রতা অর্জন ছাড়া নামায পড়ে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কেউ যদি বলে, কেন ইলম শিখব জানি না, সে কাফের হয়ে যাবে! কেউ যদি বলে, জানি না আল্লাহ তাআলা ওই লোকটাকে কেন সৃষ্টি করলেন, সে কাফের হয়ে যাবে! কাউকে যদি বলা হয়, 'কোথায় যাও?' আর সে জবাবে বলে, 'জাহান্নামে যাই', তবে কাফের হয়ে যাবে।¹⁵⁷⁰

এখানে উল্লিখিত অধিকাংশ বিষয় মৌলিকভাবে কুফর নয়। হ্যাঁ, কুফরের অন্যান্য কারণ, যথা : অস্বীকার, বিরক্তি, বিদ্রুপ, ঘৃণা, সরাসরি প্রত্যাখ্যান ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলে কাফের হবে, কিন্তু উন্মুক্তভাবে কাফের বলার সুযোগ নেই।

একইভাবে অনেক আলেমের আকিদা বিষয়ক স্বতন্ত্র গ্রন্থাবলিতে এ ধরনের উন্মুক্ত তাকফিরের প্রচুর উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায়। যেমন—আবু ইসহাক সাফফার তাঁর প্রসিদ্ধ 'তালখিসুল আদিল্লাহ' গ্রন্থে কাদারিয়্যাহ, মুতাযিলা, রাফেজা, খারেজি, জাহমিয়্যাহ, কাররামিয়্যাহ, জাবরিয়্যাহ প্রমুখ সম্প্রদায়কে উন্মুক্তভাবে কাফের বলেছেন।¹⁵⁷¹ কেবল সাফফার নন, 'আস-সাওয়াদুল আজম', মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল বলখির 'আল-ইতিকাদ' (তিনি পুরো গ্রন্থ জুড়ে বিভ্রান্ত বিদআতি ফিরকাগুলোকে ঢালাওভাবে তাকফির করেছেন), আবুল ইউসর বাযদাবির 'উসুলুদ্দিন', সাবুনির 'আল-কিফায়াহ'সহ সে যুগের অধিকাংশ আকিদার গ্রন্থেই বিপরীত ফিরকাগুলোকে, এমনকি বিভিন্ন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেও, একরকম উন্মুক্তভাবে তাবদি-তাকফিরের (বিদআতি ও কাফের বলার) চিত্র প্রকট। পরবর্তী আলেমদের মাঝে গুমুশখানভি রহ. কাদারিয়্যাহ, রাফেজা, খারেজি থেকে শুরু করে মুতাযিলা, জাবরিয়্যাহ, মুজাসসিমাহ ও মুরজিয়াদের কাফের বলা আবশ্যক করে দিয়েছেন। বরং তিনি 'যারা আল্লাহকে একটি নির্দিষ্ট স্থান তথা আরশে অথবা আকাশে বলবে', তাদেরও তাকফির করা ওয়াজিব বলেছেন! কেউ যদি আল্লাহর ব্যাপারে দাঁড়ানো বা বসার কথা বলে, তাঁর জন্য 'উপর' অথবা 'নিচ' শব্দ প্রয়োগ করে তাকে কাফের বলেছেন! বরং কেউ যদি বলে, 'আমার জন্য আকাশে আল্লাহ আর যমিনে আপনি আছেন', তাকেও কাফের বলেছেন! কেউ যদি বলে, 'আল্লাহ তাআলা আমাদের আরশের উপর থেকে অথবা আকাশের উপর থেকে দেখছেন', তাকেও কাফের বলেছেন! ফারসি কিংবা অন্য ভাষায় কেউ কুরআনের কাব্যানুবাদ করলে তাকেও কাফের বলেছেন!¹⁵⁷² অথচ সালাফে সালেহিনের ইমামগণ এসব সম্প্রদায়কে ঢালাওভাবে কাফের বলেননি। ব্যক্তির তাকফিরের ক্ষেত্রে তো তাদের সতর্কতার মাত্রা আরও বেশি। এসব শব্দ উচ্চারণ করলেই কেউ কাফের হয়ে যাবে এমন সুযোগই নেই। কারণ, এক্ষেত্রে অনেক বিষয় পর্যবেক্ষণযোগ্য। উপরন্তু আল্লাহর জন্য 'দিক' সাব্যস্ত করলে কিংবা কুরআনের কাব্যানুবাদ করলে কেউ কাফের হয়ে যাবে—এটা তো চূড়ান্ত পর্যায়ের উদ্ভট বক্তব্য।

এতে করে বড় ধরনের একটি সংকট সামনে আসে। সেটা হলো—ফকিহদের কেউ কেউ এমন অনেক বক্তব্যকে কুফর বলেছেন যা উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের বক্তব্য। স্রেফ মতবিরোধের কারণে সেগুলোকে কেবল ভুল বলে ক্ষান্ত হননি, কুফর পর্যন্ত বলেছেন! ফলে তাদের বক্তব্য অনুযায়ী সালাফের বিশাল সংখ্যক ইমামকে কাফের হয়ে যেতে হয়! যেমন—উপরে আল্লাহর জন্য 'উপর' বা 'নিচ' তথা দিকসংক্রান্ত বক্তব্য দেখানো হয়েছে। একইভাবে কেউ যদি বলে, 'ঈমান বাড়ে ও কমে', তারা তাকেও কাফের বলেছেন! অথচ এটা সালাফের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামের বক্তব্য। কী ভয়ংকর ব্যাপার!

তাদের কেউ কেউ লিখেছেন, কেউ যদি তাবিল ছাড়া 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ' বলে, তবে সে কাফের।¹⁵⁷৩ অথচ এটা অনেক সাহাবি, তাবেয়ি এবং সালাফে সালেহিনের বক্তব্য। ফলে তারাও কি সবাই কাফের? ইবনে নুজাইম (৯৭০ হি.) 'আল-খুলাসাহ' (খুলাসাতুল ফাতাওয়া) ও 'বাযযাযিয়্যাহ'র উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেন, “যে ব্যক্তি বলবে, 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ', সে কাফের। তার সঙ্গে বিয়েশাদি বৈধ নয়।” আবু হাফস তাঁর 'ফাওয়ায়িদ'-এ লিখেন, 'কোনো হানাফির জন্য তাঁর মেয়েকে কোনো শাফেয়ির কাছে বিয়ে দেওয়া বৈধ নয়, তবে তাদের মেয়ে বিয়ে করা বৈধ, আহলে কিতাবদের বিধানের মতো!' অথচ সালাফের বিশাল সংখ্যক ইমাম তাবিল ছাড়াই 'আমি মুমিন, ইনশাআল্লাহ' বলেছেন। ফলে এটা কোনোভাবেই কুফর নয়। এ কারণে ইবনে নুজাইম রহ. এসব বক্তব্য উল্লেখের পরে সেগুলো কঠোরভাবে খণ্ডন করেন। তিনি লিখেন, "ঈমানের ক্ষেত্রে 'ইস্তিসনা' করায় কাউকে কাফের বলা গলত। এরচেয়েও জঘন্য হলো তাদের সঙ্গে বিয়েশাদি নিষেধ করা। এটা তো স্রেফ (মতাদর্শিক) গোঁড়ামি। আল্লাহ আমাদের নফসের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন।”¹⁵⁷⁴

কেউ কেউ আল্লাহর 'মাজি' (আগমন) ও 'নুযুল' (অবতরণ)-কে স্থানান্তর (ইন্তিকাল) দ্বারা ব্যক্ত করাকে কুফর বলেছেন! আরও লিখেছেন, 'কেউ যদি বলে, আল্লাহ আরশের উপর বিদ্যমান, তবে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, আরশের উপর আল্লাহর সত্তাকে সাব্যস্ত করা কুফর!' কেউ লিখেছেন, যদি কেউ আল্লাহর জন্য 'মাকান' তথা স্থান সাব্যস্ত করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। বরং কেউ আরও একধাপ সামনে এগিয়ে 'আল্লাহর জন্য জিহাহ তথা (উপরের) দিক সাব্যস্ত করাকে'ই কুফর বলেছেন!¹⁵⁷⁵ ফাতাওয়া আলমগিরিতে আল-বাহরুর রায়েক এবং ফাতাওয়া কাযি খানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, কেউ যদি বলে, আল্লাহ ইনসাফের জন্য 'উপবিষ্ট' হয়েছেন, কিংবা কেউ যদি আল্লাহকে 'উপর' বা 'নিচ'-এর গুণে গুণান্বিত করে, তবে সে কাফের!¹⁵⁷৬ দামাদ আফেন্দি লিখেছেন, কেউ যদি বলে, আমি আল্লাহকে স্বপ্নে দেখেছি, তবে সে কাফের হয়ে যাবে!¹⁵⁷৭

সুবহানাল্লাহ! এগুলোকে কুফর বলার কোনো সুযোগ নেই। ভুলশুদ্ধ পরের কথা। কুরআন-সুন্নাহর অনেক 'যাহের' (বাহ্যিক অবস্থা) থেকে এগুলো বোঝা যায়। ফলে আহলে সুন্নাতের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী একদল আলেম এ ধরনের কথা বলেছেন। মাযহাবের আলোকে এগুলোকে সর্বোচ্চ ভুলবিচ্যুতি বলা যেতে পারে, কিন্তু কুফর বলা এবং এগুলো যে বলবে তাকে কাফের বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। বরং তারা এক্ষেত্রে অতিরঞ্জনের শিকার হয়ে বিশুদ্ধ আকিদাকেও ভুল বলেছেন। 'আল্লাহ আরশের উপর ধরনহীন ইস্তিওয়া করেছেন', 'আল্লাহ ধরনহীন আগমন করেন এবং নুযুল করেন'—এটাকেও বিদআত বলেছেন। এটা গলত বক্তব্য। কারণ, শেষোক্ত কথাগুলো ইমাম আজম এবং সালাফে সালেহিনের আকিদা।¹⁵⁷⁸

এ ধরনের উদাহরণ অসংখ্য। আমরা কেবল এলোপাতাড়ি কয়েকটা উল্লেখ করলাম। এটা যে সর্বপ্রথম আমাদের দৃষ্টিতে পড়েছে এমন নয়, বরং অনেক বড় বড় আলেমও এ ধরনের পর্যবেক্ষণ পেশ করেছেন। খোদ কামাল ইবনুল হুমাম লিখেন, ‘...বিভিন্ন মাযহাবের আলেমদের বক্তব্যে অনেক তাকফির পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলো মুজতাহিদ ফকিহদের বক্তব্য নয়, বরং অন্যদের বক্তব্য। আর (মুজতাহিদ) ফুকাহা ছাড়া অন্যদের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।'¹⁵⁷৯ ইবনে নুজাইম লিখেন, ‘... (ফিকহি গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত) কুফরের অধিকাংশ বক্তব্যের কারণে কাউকে কাফের বলা যাবে না। আমি নিজেও এগুলোর ভিত্তিতে ফাতাওয়া দিই না।'¹⁵⁸⁰

কিন্তু ইবনে নুজাইমও উক্ত মূলনীতির উপর থাকেননি। তিনি অন্যত্র লিখেছেন, 'যে ব্যক্তি শাইখাইন তথা আবু বকর ও উমরকে গালি দেবে এবং তাদের সমালোচনা করবে, সে কাফের। তাকে হত্যা করা হবে। তাওবা করে নতুন করে মুসলমান হলেও তাওবা কবুল করা হবে না।'¹⁵⁸১ অথচ আবু বকর ও উমর রাযি.-এর গালিদাতাকে উন্মুক্তভাবে কাফের বলা যাবে না। এ কারণে পরবর্তী অনেক হানাফি ফকিহ উক্ত বক্তব্যকে ভিত্তিহীন ও বাতিল বলেছেন। আমলযোগ্য নয় বলে আখ্যা দিয়েছেন। আল্লামা ইবনে আবিদিন লিখেন, 'বিস্ময়কর হলো, আল-বাহরুর রায়েকের গ্রন্থকার এসব ক্ষেত্রে কাফের ফাতাওয়া না দেওয়ার কথা বললেও শিথিলতা দেখিয়েছেন এবং এমন ব্যক্তিকে হত্যার কথা বলেছেন।'¹⁵⁸২

এটাই সঠিক বক্তব্য। কারণ, যেমনটা পিছনে আমরা বলে এসেছি—আবু বকর, উমর কিংবা কোনো সাহাবিকে গালি দিলেই কেউ কাফের হয়ে যাবে না; বরং কাফের হওয়ার জন্য কুরআন দ্বারা প্রমাণিত কাতয়ি (সুনিশ্চিত) কোনো বিষয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিশ্বাস বা বক্তব্য থাকতে হবে। যেমন—কেউ যদি আয়েশা রাযি.-এর চরিত্রের উপর অপবাদ দেয়, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, তাঁর পবিত্রতা কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। কেউ যদি আবু বকরের সাহাবি হওয়া অস্বীকার করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, তাঁর সোহবত কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। একইভাবে কেউ যদি আলি রাযি.-কে খোদা মনে করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। মোটকথা, সাহাবিদের ক্ষেত্রে সেসব বক্তব্য বা সমালোচনা কুফর হবে, যেগুলো কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট ও সুপ্রতিষ্ঠিত বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমন না হলে কুফর হবে না। ফাতাওয়া আলমগিরিতেও আবু বকর ও উমর রাযি.-এর গালিদাতাকে কাফের বলা হয়েছে।¹⁵⁸³ কিন্তু এটা উন্মুক্তভাবে আমলযোগ্য নয়।

ইবনে হাজার হাইতামি লিখেন, (তাকফির ও রিদ্দাহর) 'অধিকাংশ মাসআলা হানাফিদের ফাতাওয়া গ্রন্থগুলোতে বিদ্যমান। তারা তাদের মাশায়েখ থেকে এগুলো বর্ণনা করেন। কিন্তু পরবর্তী যুগের সচেতন হানাফি আলেমগণ এগুলোর অধিকাংশেরই বিরোধিতা ও প্রত্যাখ্যান করেন। এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য হলো— এসব লোকের তাকলিদ বৈধ নয়। কারণ, তারা ইজতিহাদের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ নন। উপরন্তু তারা এসব মাসআলা ইমাম আবু হানিফার মূলনীতির আলোকে বের করেননি; বরং এগুলো তাঁর থেকে বর্ণিত আকিদার বিপরীত। ফলে হানাফি হোক বা শাফেয়ি হোক, প্রত্যেকের কর্তব্য হলো এসব বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে মানুষকে কাফের বলা থেকে সতর্ক থাকা! কারণ, মুসলমানকে কাফের বলতে গিয়ে নিজের কাফের হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়।'¹⁵⁸⁴ হাইতামি যদিও এখানে কেবল হানাফি মাযহাবকে অভিযুক্ত করেছেন, বাস্তবতা হলো, কোনো মাযহাবই এর বাইরে নয়; বরং সর্বত্রই চিত্র এক ও অভিন্ন। এমনকি যারা নিজেদের চার মাযহাবের বাইরে এবং সকল তাকলিদের ঊর্ধ্বে দাবি করেন, তাদের গ্রন্থেও তাকফিরের চিত্র আরও প্রকট এবং অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ। নিকট অতীতেও এর বাস্তব উদাহরণ বিদ্যমান।

টিকাঃ
১৫৭০. দেখুন : আলি কারির শরহুল ফিকহিল আকবার (১৪০-১৫৫)। আরও দেখুন: গুমুশখানভির জামেউল মুতুন (৩১-৮৫)
১৫৭১. দেখুন: তালখিসুল আদিল্লাহ (৭২৭)।
১৫৭২. বিস্তারিত দেখুন : জামেউল মুতুন (৩১-৮৬)।
১৫৭৩. দেখুন : আলফাজুল কুফর, বদরুর রশিদ হানাফি (৫১)।
১৫৭৪. আল-বাহরুর রায়েক (২/৮১)।
১৫৭৫. দেখুন: আত-তামহিদ, আবু শাকুর (২০৫)। মুলজিমাতুল মুজাসসিমাহ (৬০-৬১)। আল-বাহরুর রায়েক (৫/২০২-২০৩)।
১৫৭৬. ফাতাওয়া আলমগিরি (২/২৫৯)।
১৫৭৭. মাজমাউল আনহুর (১/৬৯১)।
১৫৭৮. দেখুন : আত-তামহিদ, আবু শাকুর সালেমি (২০৫)।
১৫৭৯. ফাতহুল কাদির (৬/১০০)।
১৫৮০. আল-বাহরুর রায়েক (৫/২১০)।
১৫৮১. প্রাগুক্ত (৫/২১২)।
১৫৮২. রদ্দুল মুহতার (৬/৩৮৭) (দারু আলামিল কুতুব)।
১৫৮৩. ফাতাওয়া আলমগিরি (২/২৬৪)।
১৫৮৪. আল ইলাম বিকাওয়াতিয়িল ইসলাম (১১০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00