📄 ইমাম আজম রহ. থেকে বর্ণিত কুফরের কারণসমূহ
ইমাম আজম রহ. বলেন, “আল্লাহর কোনো গুণকে আংশিকভাবে হলেও অস্বীকার করা (কুফর)। যেমন—কেউ যদি ইসলামের সবকিছু স্বীকার করে, কিন্তু পৃথিবীতে বিদ্যমান কোনো বিশেষ বস্তুর সৃষ্টিকর্তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে বলে, এটার স্রষ্টা কে আমি জানি না, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, পৃথিবীর সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা। কুরআনে তিনি বলেছেন, ۞ وَاللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ ۞ অর্থ : 'আল্লাহ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা।' [যুমার: ৬২] আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা স্বীকার করার পরেও উক্ত বক্তব্য কুফর গণ্য হবে। কারণ, তার উক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝা যায়, পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়াও দ্বিতীয় কোনো সৃষ্টিকর্তা আছে।”¹⁵⁴⁹
ইমাম আরও বলেন, “একইভাবে ইসলামের কোনো বিধানকে অস্বীকার করাও কুফর। যেমন—কেউ যদি বলে, আল্লাহ নামায, রোযা ও যাকাত ফরয করেছেন কি না আমার জানা নেই, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, কুরআনে আল্লাহ নামায কায়েম এবং যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ۞ وَأَقِيمُوا الصَّلَوَةَ وَءَاتُوا الزَّكَوٰةَ ۞ অর্থ : 'তোমরা নামায কায়েম করো, যাকাত প্রদান করো।' [বাকারা : ৪৩] অন্যত্র বলেন, ۞ يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ ۞ অর্থ : 'হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে।” [বাকারা : ১৮৩]¹⁵⁵⁰ সুতরাং কুরআন কিংবা মুতাওয়াতির সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত ইসলামের কোনো সুস্পষ্ট বিধান অস্বীকার করা কুফর প্রমাণিত হলো।
সরাসরি অস্বীকার করা হোক কিংবা অস্বীকারের পর্যায়ে কিছু বলা বা করা হোক—সবগুলোই কুফর গণ্য হবে। ফলে বিশ্বাসগত নিফাক বা মুনাফিকিও কুফর। মুনাফিক বরং নিকৃষ্টতম কাফের। ইমাম এ ব্যাপারে বলেন, “নিফাক হলো মুখে ইসলাম প্রকাশ করা, অন্তরে অস্বীকার এবং মিথ্যাপ্রতিপন্ন করা। যে ব্যক্তি এমন করবে, তাকে বলা হবে মুনাফিক। মুনাফিকের কথা মিথ্যা হওয়া জরুরি নয়। সে সত্য (তথা বাস্তবসম্মত কথা) বলতে পারে। তবে তার মুখের কথা আর অন্তরের বিশ্বাস এক হয় না। সে মুখে যা বলে, অন্তরে সেটা বিশ্বাস করে না। এ কারণেই তাকে মুনাফিক বলা হয়। আল্লাহ তাআলা তাদের বৈশিষ্ট্য কুরআনে উল্লেখ করেছেন এভাবে : ۞ إِذَا جَاءَكَ الْمُنْفِقُوْنَ قَالُوْا نَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُوْلُ اللَّهِ ۞ অর্থ : 'যখন মুনাফিকরা আপনার কাছে আসে, তখন বলে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসুল।' [মুনাফিকুন : ১] তখন আল্লাহ তাদের জবাবে বলেন, ۞ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُ وَ اللهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنْفِقِينَ لَكَذِبُونَ ۞ অর্থ : 'আল্লাহ জানেন আপনি নিশ্চয়ই তাঁর রাসুল। আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন, নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী।' [মুনাফিকুন: ১] আল্লাহ তাদের এ জন্য মুনাফিক বলেননি যে, তারা মিথ্যা কথা বলেছে। কারণ, তারা তো সত্যই বলেছে (মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল)। কিন্তু তারা মুখে এটা বললেও অন্তরে বিপরীত বিশ্বাস লালন করে, যেমনটা আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেছেন, ۞ وَ إِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوْا قَالُوْا آمَنَّا وَ إِذَا خَلَوْا إِلَى شَيْطِيْنِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِءُونَ ۞ অর্থ : 'তারা যখন ঈমানদারদের কাছে আসে, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি। আবার যখন তাদের শয়তানদের সাথে একান্তে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তোমাদের সাথে রয়েছি। আমরা তো (মুসলমানদের সাথে) স্রেফ উপহাস করি।” [বাকারা : ১৪]¹⁵⁵¹
কুফরকে কুফর মনে না করাও কুফর। কারণ, সেটা দ্বীনের মৌলিক বিষয় অস্বীকারের নামান্তর। ইমাম বলেন, “যদি কেউ বলে—আমি কাফেরকে কাফের মনে করি না, তবে সেও তার মতো গণ্য হবে। যদি কেউ বলে, কাফেরের পরকালে কী পরিণতি হবে আমার জানা নেই, তবে সেও কাফের হয়ে যাবে। কারণ, উক্ত বক্তব্য মূলত কুরআন অস্বীকার করা। আর কুরআন অস্বীকারকারী কাফের। কেউ যদি বলে, কাফের ব্যক্তি জান্নাতি নাকি জাহান্নামি আমি নিশ্চিত নই, তবে সেও কাফের হয়ে যাবে। কারণ, আল্লাহ বলেছেন, ۞ وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ نَارُ جَهَنَّمَ لَا يُقْضَىٰ عَلَيْهِمْ فَيَمُوتُوا وَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُم مِّنْ عَذَابِهَا ۞ অর্থ: 'যারা কাফের, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। সেখানে তারা মৃত্যুবরণ করবে না। তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না।” ইমাম আজম রহ. সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব থেকে বর্ণনা করেন, 'যে ব্যক্তি কাফেরদের তাদের উপযুক্ত স্তরে রাখবে না, সে তাদের মতো গণ্য হবে।'¹⁵⁵²
টিকাঃ
১৫৪৯. আল-ফিকহুল আবসাত (৪১)।
১৫৫০. প্রাগুক্ত (৪১)।
১৫৫১. প্রাগুক্ত (২১)।
১৫৫২. প্রাগুক্ত (৪৬-৪৭)।
📄 (তাকফির) কাউকে কাফের বলার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন
কুফর বর্ণনা এবং তাকফিরের মাঝে ফারাক না করা একটি উল্লেখযোগ্য প্রান্তিকতা। কোনো কথা বা কাজকে কুফর বলা আর ব্যক্তিকে কাফের বলা এক বিষয় নয়। প্রথমটাকে বলা হয় 'তাকফিরে মুতলাক' তথা কুফরের সাধারণ বর্ণনা। আর ব্যক্তিবিশেষকে কাফের বলা হলো 'তাকফিরে মুআইয়ান।' দুটোর মাঝে বেশ ফারাক রয়েছে। কারণ, কুফরে লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও শুবুহাত (সন্দেহ-সংশয় ও অস্পষ্টতা), জাহালত (অজ্ঞতা), গলত-খাতা ( ভুলবিচ্যুতি), তাবিল (ব্যাখ্যা-অপব্যাখ্যা), ইখতিলাফ (মতভেদ) ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থাকলে হুজ্জত কায়েম হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি কাফের হবে না। তাই সাধারণ কুফর বর্ণনার মতো ব্যক্তিবিশেষকে কাফের বলা সহজ নয়। এ ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক থাকা ওয়াজিব।
ইমাম আজমকে জিজ্ঞাসা করা হলো—কেউ যদি নিজেকে কাফের আখ্যা দেয়, তবে তার বিধান কী? ইমাম আজম রহ. বলেন, 'ব্যক্তির মুখের দাবি নয়, বরং কথা ও কাজই গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে কাফের আখ্যা দেয় অথচ সে আল্লাহ, আল্লাহর রাসুল এবং দ্বীনের যাবতীয় মৌলিক আকিদায় বিশ্বাস রাখে, তবে সে মুমিন হিসেবে গণ্য হবে, ঠিক যেমন বিপরীতে কেউ যদি নিজেকে মুমিন হিসেবে আখ্যা দেয়, অথচ সে আল্লাহ কিংবা আল্লাহর রাসুলকে অস্বীকার করে, তবে তার মুখের দাবির কোনো মূল্য নেই।'¹⁵⁸⁵ ইমামের বক্তব্যের প্রথম অবস্থা বাস্তবে সংঘটিত হওয়ার উদাহরণ বিরল হলেও এটা ব্যক্তিকে কাফের বলার ক্ষেত্রে ইমামের সর্বোচ্চ সতর্কতার দলিল।
উপরন্তু কুরআন-সুন্নাহর বাইরে মানবরচিত আইনে শাসনকারীকেও তিনি উন্মুক্তভাবে কাফের বলতেন না, বরং সেটাকে বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতেন। এ ব্যাপারে তিনি ইবনে উমরের বক্তব্য দিয়ে দলিল দিতেন। হারেসি বর্ণনা করেন—আবু হানিফা রহ. ইবনে উমর থেকে আল্লাহর বাণী : ۞ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ۞ অর্থ : 'আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা কাফের।' [মায়িদা : ৪৪]—এর অর্থ করেছেন—যারা আল্লাহর অবতীর্ণ করা বিধানে ঈমান না রাখবে, তারা কাফের।'¹⁵⁸⁶ 'ঈমান না রাখা'র বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যাসাপেক্ষ আলোচনা। সারকথা হলো, আল্লাহর আইনের শাসন অবধারিত—এটাতে যারা ঈমান রাখবে না তারা সুস্পষ্ট কাফের। কিন্তু আল্লাহর আইন অবধারিত মেনে অন্য কোনো কারণে যদি মানুষের বানানো আইনে শাসন করে, সেটার বিধান অবস্থাভেদে ভিন্ন হবে। মোটকথা, শর্ত ও কুয়ুদ ছাড়া এমন ব্যক্তিকে উন্মুক্তভাবে কাফের বলা হবে না।
ইমাম আজম প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ওজর তালাশ করতেন, ব্যাখ্যা খুঁজতেন, যেটা সকল সালাফে সালেহিনের মানহাজ। অর্থাৎ, কারও কাছ থেকে কোনো কুফরি বাক্য পাওয়ার পর সেটার যদি ইতিবাচক ব্যাখ্যার সুযোগ থাকে, তবে ব্যাখ্যা করতে হবে। যদি কোনো ব্যাখ্যাই না করা যায়, তখন তাকফির করা যাবে। ইমাম আজমকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কেউ যদি আপনাকে বলে—আমি তোমার দ্বীন থেকে কিংবা তুমি যার ইবাদত করো তার থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করছি, এমন লোককে কি কাফের বলা যাবে? ইমাম বলেন, 'এমন ব্যক্তির ব্যাপারে উপস্থিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না, বরং তার বক্তব্যের উদ্দেশ্য বুঝতে হবে। সে যদি আল্লাহ কিংবা আল্লাহর দ্বীন থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। আর যদি সে আমার দ্বীনকে ভ্রান্ত দ্বীন মনে করে বলে—আমি তোমার দ্বীন থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করছি। কারণ, তোমার দ্বীন কুফর। কিংবা আমি শয়তানের ইবাদত করি এমন অভিযোগ করে, তবে সে মিথ্যাবাদী হিসেবে গণ্য হবে; কাফের নয়।¹⁵⁸⁷
ব্যক্তির মতো মুসলমানদের বিভিন্ন ফিরকার ব্যাপারেও তিনি ধীরস্থিরতা ও দূরদর্শিতার অভিন্ন মানহাজ লালন করতেন। ইমামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, মুহাক্কিমাহ খারেজিদের ব্যাপারে আপনার মতামত কী?¹⁵⁸⁸ তিনি বললেন, 'তারা তাদের মাঝে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সম্প্রদায়।' জিজ্ঞাসা করা হলো, তাহলে কি আমরা তাদের কাফের বলব? তিনি বললেন, 'না। তবে আলি ও উমর ইবনে আবদিল আযিযের মতো সালাফের ইমামগণ যেমন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, আমরাও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।'¹⁵⁸৯ জঘন্য পথভ্রষ্ট খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বললেও সেটা তাদের অমুসলিম গণ্য করে নয়। এ কারণে অমুসলিমদের সঙ্গে যুদ্ধ-পরবর্তী নীতি খারেজিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। ইমাম বলেন, 'খারেজিদের সঙ্গে যখন যুদ্ধ সম্পন্ন হবে, তাদের উপর কিছু চাপানো হবে না। হদ কায়েম করা হবে না। যেসব রক্তপাত হয়েছে, সেসবের কিসাসও নেওয়া হবে না। এর দলিল সাহাবাদের আমল। হযরত উসমান রাযি.-কে কেন্দ্র করে যখন ফেতনা সংঘটিত হলো, তখন সকল সাহাবি এ ব্যাপারে একমত পোষণ করলেন যে, যারা তাবিলের কারণে কাউকে হত্যা করেছে, তাদের উপর কোনো কিসাস নেই; কিংবা যারা তাবিলের মাধ্যমে কোনো নারীকে লুণ্ঠন করেছে, তাদের উপর কোনো হদ নেই। একইভাবে যারা তাবিলের মাধ্যমে সম্পদ নিয়েছে, তাদেরও জরিমানা করা হবে না। হ্যাঁ, হুবহু সম্পদটি যদি তার কাছে বিদ্যমান থাকে, তবে সেটা মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।'¹⁵৯০
তাফতাযানি 'আল-মুনতাকা'র উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেন, 'ইমাম আবু হানিফা রহ. আহলে কিবলার (বিভিন্ন ভ্রান্ত ফিরকার) কাউকে কাফের বলেননি। এটাই অধিকাংশ ফকিহের মত।¹⁵৯¹
এসব বক্তব্য থেকে মুসলমানদের তাকফিরের ক্ষেত্রে ইমামের চূড়ান্ত সতর্কতার দৃষ্টান্ত মেলে। পরবর্তী উলামায়ে আহনাফ ইমামের পথেই হেঁটেছেন। আবু হাফস বুখারি বলেন, 'চল্লিশজন তাবেয়ি থেকে আমার কাছে নির্ভরযোগ্য সূত্রে সংবাদ পৌঁছেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, সাতটি বস্তু হেদায়াত। তন্মধ্যে একটি হলো জামাতের সঙ্গে থাকা। সুতরাং তোমরা আহলে কিবলার ব্যাপারে কুফরের সাক্ষ্য দিয়ো না। তাদের মুশরিক বা মুনাফিক বলো না। তাদের ভিতরের অবস্থা আল্লাহর কাছে সঁপে দাও। আহলে কিবলার যে মারা যায়, তার জানাযা পড়ো। সৎ-অসৎ প্রত্যেকের পিছনে নামায আদায় করো।'¹⁵৯২
কামাল ইবনুল হুমাম লিখেন, 'আমরা আমাদের (ফাতহুল কাদির) গ্রন্থে বিদআতপন্থি ও প্রবৃত্তিপূজারীদের অনেক কুফরের আলোচনা করেছি। অথচ আবু হানিফা ও শাফেয়ি প্রমুখ থেকে বর্ণিত আছে, তারা বিদআতপন্থি আহলে কিবলা (তথা মুসলমানদের) কাফের বলতেন না। তাহলে দুটোর মাঝে সমন্বয় হবে কী করে? এটার সমন্বয় হলো, আহলে বিদআত যেসব আকিদা রাখে, সেগুলো বাস্তবেই কুফর। ফলে কেউ যদি তেমন কথা বলে, তবে কুফরি কথা বলার অপরাধে অভিযুক্ত হবে, কিন্তু হতে পারে সে নিজে কাফের হবে না।'¹⁵৯৩
ইবনে নুজাইম (৯৭০ হি.) লিখেন, 'জামেউল ফুসুলাইন' ও 'ফাতাওয়া সুগরা'-তে এসেছে—'কুফর একটি ভয়ংকর ব্যাপার। ফলে কোথাও একটি রেওয়ায়েত পাওয়া গেলেই সেটার উপর ভিত্তি করে মুমিনকে কাফের বানানো থেকে বিরত থাকতে হবে।' ... 'খুলাসা'সহ অন্যান্য গ্রন্থে এসেছে, 'যদি কোনো মাসআলাতে তাকফির করার একাধিক দিক থাকে, তাকফির না করার মাত্র একটি দিক থাকে, তবে মুফতির কর্তব্য হলো মুসলমানের প্রতি সুধারণা রেখে সেই একটি দিক গ্রহণ করা' (এবং তাকফির না করা)। ... 'তাতারখানিয়্যাহ'-তে এসেছে, 'কোনো সংশয়-সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে কাউকে কাফের বলা যাবে না।' ... শেষে ইবনে নুজাইম বলেন, 'ফলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হলো— যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো মুসলিমের কথা ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় অথবা সেটা কুফর হওয়ার ব্যাপারে মতপার্থক্য থাকে—এমনকি দুর্বল কোনো বর্ণনার উপর ভিত্তি করে হলেও—সেক্ষেত্রে কোনো মুসলিমকে কাফের ফাতাওয়া দেওয়া যাবে না। এই ভিত্তিতে (ফিকহি গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত) কুফরের অধিকাংশ বক্তব্যের কারণে কাউকে কাফের বলা যাবে না। আমি নিজেও এগুলোর ভিত্তিতে ফাতাওয়া দিই না।'¹⁵৯৪
ইবনে আবিদিন এ ব্যাপারে অত্যন্ত মূল্যবান কথা লিখেছেন। তিনি প্রথমে ইমাম তহাবি রহ.-এর বক্তব্য—'কোনো ব্যক্তি ঈমান থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত বের হবে না যতক্ষণ না এমন কোনো বিষয় অস্বীকার করে যেগুলো স্বীকারের মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করেছিল'—উল্লেখ করেন। কারণ, তাকফিরের ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি।¹⁵৯৫ অতঃপর 'আদ-দুররুল মুখতার'সহ বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত কুফরি কথা ও কাজের যেসব মাসআলা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে তিনি বলেন, 'এ অধ্যায়ে এমন অনেক মাসআলা পাওয়া যাবে, যেগুলোকে কুফর বলা হয়েছে; অথচ উক্ত মূলনীতির আলোকে এগুলো কুফর নয়!' সুতরাং একজন আলেমের কাছে যখন কোনো কুফর উল্লেখ করা হয়, তখন সে যেন হুট করে কোনো মুসলিমকে কাফের ফাতাওয়া না দেয়। এটা ফিকহি গ্রন্থগুলোর (কুফরসংবলিত অধ্যায়ের) মাসআলা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি।'¹⁵৯৬
অন্যান্য মাযহাবের আলেমদেরও একই বক্তব্য। ইবনে হাজার হাইতামি বলেন, আমাদের ইমামগণ সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, 'যদি কেউ এমন কোনো কথা বলে যা কুফরির সম্ভাব্য নির্দেশক, তবে তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার আগ পর্যন্ত কাফের বলা হবে না।'¹⁵৯৭ কাযি ইয়ায (৫৪৫ হি.) লিখেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর ব্যাপারে অশোভন কিছু বলে বা বিশ্বাস রাখে এবং সে বিশ্বাসের উৎস থাকে তাবিল, ইজতিহাদ, বিদআতের অনুসরণ এবং প্রবৃত্তিঘটিত ভুলবিচ্যুতি ইত্যাদি; গালি, রিদ্দাহ কিংবা কুফরের ইচ্ছা না থাকে...এমন লোককে তাকফির করার ক্ষেত্রে সালাফের মতভেদ রয়েছে...। ইমাম মালেক এবং তাঁর অধিকাংশ শাগরেদের মতে তাকে কাফের বলা হবে না, হত্যা করা হবে না। হ্যাঁ, কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে, বন্দি করে রাখা হবে, যাতে প্রকাশ্যে তাওবা করে।'¹⁵৯৮
দুঃখজনকভাবে আমাদের চারপাশে তাকফিরের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায়কে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত দেখা যায়। একজন অন্যজনকে কাফের বলার ক্ষেত্রে এটুকু ছাড় দিতে চায় না। তাদের জন্য ইমামের কর্মপন্থা আদর্শ হতে পারে। ইমামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, যদি কেউ আপনাকে কাফের বলে, তার ব্যাপারে আপনি কী বলবেন? ইমাম বললেন, 'আমি তাকে মিথ্যাবাদী বলব, কিন্তু কাফের বলব না। কারণ, আল্লাহর সম্মান নষ্ট করা আর বান্দার সম্মান নষ্ট করা এক বিষয় নয়। আল্লাহর সম্মানে আঘাত করা হলো আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা, তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা, কুফরি করা ইত্যাদি। আর বান্দার সম্মান নষ্ট করা হয় জুলুমের মাধ্যমে। সুতরাং আল্লাহ কিংবা রাসুলের নামে মিথ্যাচার করা আর আমার নামে মিথ্যাচার করা সমান নয়। কারণ, আল্লাহ ও রাসুলের উপর মিথ্যাচার করা সমগ্র মানবজাতির উপর মিথ্যাচারের চেয়েও জঘন্য। সুতরাং যে আমাকে কাফের বলবে, তাকে আমি মিথ্যুক বলব। কিন্তু বিনিময়ে তার নামে আমার মিথ্যাচার করা জায়েয হবে না। কারণ, আল্লাহ বলেছেন, ۞ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ ۞ অর্থ : 'হে মুমিনগণ, কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদের ইনসাফ পরিত্যাগে উদ্বুদ্ধ না করে। ইনসাফ করো। এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী।' [মায়িদা : ৮]¹⁵৯৯
টিকাঃ
১৫৮৫. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৭)।
১৫৮৬. কাশফুল আসার (১/২২৯)।
১৫৮৭. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৭)।
১৫৮৮. এরা খারেজিদের সর্বপ্রথম সংঘবদ্ধ প্রকাশ ছিল...।
১৫৮৯. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৪)।
১৫৯০. প্রাগুক্ত (৪৫)।
১৫৯১. শরহুল মাকাসিদ (২/২৬৯)।
১৫৯২. আস-সাওয়াদুল আজম (১০)।
১৫৯৩. ফাতহুল কাদির (১/৩৫১)।
১৫৯৪. আল-বাহরুর রায়েক (৫/২১০)।
১৫৯৫. এই গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেখুন আমাদের 'আকিদাহ তহাবিয়্যাহ'র ব্যাখ্যাগ্রন্থে।
১৫৯৬. দেখুন: রদ্দুল মুহতার (৪/২২৪)।
১৫৯৭. আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা (৪/২১৬)।
১৫৯৮. শিফা, কাযি ইয়ায (২/২৭২)।
১৫৯৯. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (২৭)।
📄 তাকফিরের প্রতিবন্ধকতাসমূহ
উপরের আলোচনাতে আরও যে বিষয়টি স্পষ্ট হলো সেটা হচ্ছে, আকিদাকেন্দ্রিক সব ধরনের বিচ্যুতি কুফর নয়। বরং এক্ষেত্রে যেগুলো সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর উসুলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে, কুরআন-সুন্নাহর সরাসরি প্রত্যাখ্যানের পর্যায়ে হবে, সেগুলো কুফর গণ্য হবে। আর যেগুলো বিভিন্ন 'শুবুহাত' (সন্দেহ-সংশয় ও অস্পষ্টতা), 'জাহালত' (অজ্ঞতা), 'তাবিল' (অপব্যাখ্যা), 'তাকলিদ' (অনুকরণ), 'ইখতিলাফ' (মতপার্থক্য) ইত্যাদির কারণে হবে, সেগুলো বিদআত ও ভ্রষ্টতা বিবেচনা করা হবে।
প্রথমটার উদাহরণ হলো, যেমন—কাদারিয়্যাহদের চরমপন্থি সম্প্রদায়গুলো তাকদির অস্বীকারের পাশাপাশি আল্লাহর ইলম তথা জ্ঞানকেও অস্বীকার করেছে। এটা কুফর গণ্য হবে। কারণ, এটা কুরআন দ্বারা প্রমাণিত বাস্তবতাকে অস্বীকার করছে। ফলে এটা কুরআন অস্বীকারের নামান্তর। এ কারণে সাহাবা ও তাবেয়িদের একাধিক আলেম কাদারিয়্যাহকে ইসলামত্যাগী (কাফের) সম্প্রদায় গণ্য করেছেন। এ ধরনের আরও একটি উদাহরণ হলো জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়। তারা আল্লাহর অসংখ্য সিফাতকে সরাসরি অস্বীকার করেছে। দ্বীনের অসংখ্য মৌলিক বিষয় সরাসরি লঙ্ঘন করেছে। এ কারণে ইমাম আজমসহ সালাফের অসংখ্য আলেম তাদের কাফের বলেছেন। কাফের সম্প্রদায়ের আরও কিছু উদাহরণ হলো ইসমাইলি, নুসাইরি, কারামেতাসহ বাতেনি সম্প্রদায়গুলো। তারা ইসলামকে ঢাল বানানো সত্ত্বেও এবং নিজেদের মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো অস্বীকার করে। ফলে তাদের কুফর সুস্পষ্ট।
দ্বিতীয় প্রকারের উদাহরণ হলো মুতাযিলাদের আল্লাহর বিভিন্ন সিফাতের অস্বীকৃতি, আল্লাহ কর্তৃক মানুষের সকল কর্ম সৃষ্টি, পরকালে আল্লাহর দিদার, কবরের আযাব, মুনকার-নাকিরের প্রশ্ন, শাফায়াত, হাউযে কাউসার, মিযান, পুলসিরাত, জান্নাত-জাহান্নামের বর্তমান বিদ্যমানতা কিংবা এগুলোর ধ্বংসহীনতা ইত্যাদি অস্বীকৃতি। এসব অস্বীকৃতি সত্ত্বেও তারা মুহাক্কিক আলেমদের মতে কাফের নয়, বরং পথভ্রষ্ট। কারণ, তারা কুরআনের আয়াত কিংবা মুতাওয়াতির তথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত সুন্নাহকে সরাসরি অস্বীকার করে না; বরং বিভিন্ন সংশয়ের বশবর্তী হয়ে অপব্যাখ্যা করে। ফলে তাদের উদ্দেশ্য ইসলামের মুখোমুখি হওয়া নয়, বরং আল্লাহ ও তাওহিদের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, তাদের উদ্দেশ্য মহৎ, কিন্তু সেটা বাস্তবায়নের জন্য তারা যে পথ অবলম্বন করেছে, সেটা সুস্পষ্ট ভ্রষ্টতা। এ জন্য তারা গোমরাহ; কাফের নয়। একই কথা খারেজি ও শিয়াদের বিভিন্ন ফিরকার ব্যাপারেও প্রযোজ্য।¹⁶⁰⁰
বরং ইমাম আজম নেশাগ্রস্ত মাতাল ব্যক্তির ধর্মত্যাগ (রিদ্দাহ) অধর্তব্য গণ্য করেছেন। তাঁর মতে, কুফর হচ্ছে অন্তরের বিশ্বাস। সুস্থ ও সজাগ অবস্থায় এ বিশ্বাস পরিত্যাগ ছাড়া কেউ মুরতাদ হবে না। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি যেহেতু সংজ্ঞাহীন, সে কী বলে নিজেও জানে না। ফলে এ অবস্থায় তার উপর মুরতাদের বিধান প্রযোজ্য হবে না! যদিও বিষয়টি মতভেদপূর্ণ এবং খোদ ইমাম আজম রহ. থেকেও বিপরীত মত বিদ্যমান, তথাপি এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ব্যক্তির উপর কুফরের বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইমাম আজম রহ. কতটা সতর্ক ছিলেন। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যদি কেউ ভুলে অথবা বেঘোরে অনিচ্ছাকৃত মুখ থেকে কুফরি বাক্য উচ্চারণ করে, তাকে শাস্তি দেওয়া হবে না।¹⁶⁰¹
এ বিষয়ে আল্লামা হাসকাফি অনেক সুন্দর কথা বলেছেন। তিনি লিখেন, 'কিবলার অনুসারী (তথা মুসলমান) সংশয় বিদ্যমান থাকার কারণে কাফের হবে না। ফলে খারেজি সম্প্রদায়, যারা আমাদের রক্ত ও সম্পদকে হালাল মনে করে, রাসুলুল্লাহকে গালি দেয়, আল্লাহর সিফাত এবং পরকালে তাঁর দিদারকে অস্বীকার করে, তারাও কাফের নয়। (মুসলিম হিসেবে আদালতে) তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। মূলত তাবিল ও সংশয়ের কারণে তারা এসব ক্ষেত্রে বিচ্যুতির শিকার হয়েছে। ... হ্যাঁ, যদি দ্বীনের সুস্পষ্ট ও অত্যাবশ্যক কোনো বিষয়কে সরাসরি অস্বীকার করে, যেমন—কেউ আল্লাহকে অন্যান্য শরীরী বস্তুর মতো দেহধারী বলে কিংবা আবু বকর রাযি.-এর সাহাবি হওয়াকে অস্বীকার করে, সে কাফের হয়ে যাবে।'¹⁶⁰²
একইভাবে সাহাবাদের গালি ও সমালোচনার বিষয়টিও এখানে অভিন্ন মূলনীতিতে বিচার্য। অর্থাৎ, স্বাভাবিক অবস্থায় সাহাবাদের সমালোচনা ফিসক তথা গুনাহের কাজ বিবেচিত হবে। কিন্তু সমালোচনা যদি কুরআনের কোনো বিষয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিংবা মিথ্যাপ্রতিপন্ন করার নামান্তর হয়, তবে সেটা কুফর গণ্য হবে। নাসাফি লিখেন, 'সাহাবাদের সমালোচনা যদি (কুরআন-সুন্নাহতে বর্ণিত) কোনো মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে সেটা কুফর গণ্য হবে। যেমন—আয়েশা রাযি.-কে অপবাদ দেওয়া (মূলত কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা) কুফর। কিন্তু সাধারণ সমালোচনা গুনাহের কাজ ও বিদআত।'¹⁶⁰³ আলাউদ্দিন বুখারি লিখেন, 'একদল রাফেযি মনে করে, জিবরাইল আলাইহিস সালাম ভুল করে আলির পরিবর্তে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কাছে ওহি নিয়ে গিয়েছেন। আরেক দলের মতে, আলি রাযি. নবুওতের শরিক। এরা কাফের। কারণ, এরা কুরআনকে অস্বীকার করেছে।'¹⁶⁰⁴
আরেকটি ব্যাপার হলো, অনেক ক্ষেত্রে কাজ কুফর হলেও ব্যক্তিকে কাফের বলা হয় না। এটা এ জন্য যে, ব্যক্তির সেই কুফরে নিমজ্জিত হওয়ার ভিন্ন কারণ থাকে, যা তাকে কাফের বলার পথে প্রতিবন্ধক। যেমন—ইমাম আজম রহ. আল-ওয়াসিয়্যাহতে বলেছেন, 'তাকদিরের ভালোমন্দ উভয়টিই আল্লাহর পক্ষ থেকে। সুতরাং কেউ যদি এটা মনে করে যে, ভালোমন্দ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে, তার তাওহিদ নষ্ট হবে এবং সে কাফের হয়ে যাবে।'¹⁶⁰⁵ এটা বাস্তব কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মুতাযিলারা মনে করে, মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে নয়, বরং স্রেফ ভালোটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং মন্দ কাজ মানুষ নিজে করে। ফলে উপর্যুক্ত মূলনীতির ভিত্তিতে মুতাযিলাদের কাফের বলা আবশ্যক হয়ে পড়ে। একইভাবে বিভিন্ন ফিরকা আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে তাশবিহ ও তাতিলের শিকার হয়েছে, তাদেরও কাফের বলা আবশ্যক হয়ে পড়ে। তথাপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম তাদের কাফের বলেননি। কারণ, তারা মূলত কুরআন-সুন্নাহ অস্বীকারের উদ্দেশ্যে উক্ত বক্তব্য দেয়নি কিংবা সরাসরি অবিশ্বাস বা প্রত্যাখ্যান করেনি; বরং উক্ত বক্তব্যের উৎস শুবুহাত (সংশয়), জাহালত (অজ্ঞতা), তাবিল তথা অপব্যাখ্যা ও আখতা তথা ভুলবিচ্যুতি। তারা কুরআন কারিমের ভাষা বুঝতে ভুল করেছে। আল্লাহকে মন্দ বিষয় থেকে পবিত্র রাখার মহতি উদ্দেশ্যে কুরআনের ব্যাখ্যা (যা মূলত অপব্যাখ্যা) করেছে। অর্থাৎ, তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য মহৎ। কিন্তু এ লক্ষ্যে পৌঁছতে তারা ভুল পথ অবলম্বন করেছে। ফলে আলেমগণ তাদের বিভ্রান্ত বলেছেন, কাফের বলেননি।¹⁶⁰⁶
ইমামের শাগরেদ হাসান ইবনে যিয়াদ বলেন, 'কাদারিয়্যাহরা বিভ্রান্ত সম্প্রদায়, প্রবৃত্তির অনুসারী। তাদের অনুসরণ করা যাবে না। কিন্তু তারা কাফের নয়। কারণ, তারা তাবিল করেছে। তাবিলের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে।'¹⁶⁰⁷ শরিফ জুরজানি লিখেন, 'আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকার, নবুওত অস্বীকার কিংবা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর আনীত দ্বীনের কোনো মৌলিক বিষয় অস্বীকার কুফর। একইভাবে উম্মাহর সর্বসম্মত কোনো হালালকে হারাম বলা কিংবা হারামকে হালাল বলাও কুফর। তবে যদি সেখানে মতপার্থক্য থাকে, সেক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে কাফের বলা যাবে না।'¹⁶⁰⁸
মোল্লা খসরু ও গুমুশখানভি লিখেন, যদি কোনো মাসআলাতে কাউকে কাফের বলার অসংখ্য দিক থাকে, কিন্তু কাফের না বলার একটা দিক থাকে, তবে তাকে কাফের বলা হবে না...। যদি কেউ বাধ্য হয়ে অথবা ভুলে কুফরি কথা বলে, সে কাফের হবে না। কিন্তু যদি ঠাট্টা বা উপহাস করে বলে, তবে কাফের হয়ে যাবে।¹⁶⁰৯
টিকাঃ
১৬০০. বিস্তারিত দেখুন : আত-তামহিদ, আবু শাকুর (১০৭-এর পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ)। ফাতহুল কাদির (৬/১০০)।
১৬০১. দেখুন: আল-আজনাস (১/৪৩২-৪৩৩)।
১৬০২. আদ-দুররুল মুখতার [রদ্দুল মুহতারের অন্তর্ভুক্ত] (১/৫৬১)।
১৬০৩. শরহুল আকায়েদ (১০২)।
১৬০৪. রিসালাহ ফিল ইতিকাদ (১৮১)।
১৬০৫. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৩৪)।
১৬০৬. শরহুল ওয়াসিয়্যাহ, মুফতি যাদাহ (৬৮-৬৯)।
১৬০৭. দেখুন: আল-আজনাস (১/৪৪৭)।
১৬০৮. শরহুল মাওয়াকিফ (৮/৪০০)।
১৬০৯. দেখুন : দুরারুল হুক্কাম শরহু গুরারিল আহকাম (১/৩২৪)। জামেউল মুতুন, গুমুশখানভি (৩৮)।
১৬১০. রিসালাতুত তানযিহাত (৮-৯)।
📄 মুসলমানের রক্তপাত নিষিদ্ধ
তাকফিরের সঙ্গে ব্যক্তিকে হত্যার একটা গভীর সম্পর্ক আছে। ফলে তাকফিরের বিধান বর্ণনার পরে এ ব্যাপারে কিছু কথা বলা জরুরি। প্রথমেই মনে রাখা উচিত, ইসলামে মুসলিমের রক্ত সুরক্ষিত। অন্যায়ভাবে রক্তপাত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বরং কুরআনে কোনো মুসলিমকে হত্যা করলে জাহান্নামে দীর্ঘকাল কঠোর শাস্তির ঘোষণা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا ۞ অর্থ : 'যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার শাস্তি হবে জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হন। তাকে লানত করেন। তার জন্য মহা শাস্তি প্রস্তুত করেন।' [নিসা : ৯৩]
হাদিসে মানুষ হত্যাকে ধ্বংসাত্মক কাজ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।¹⁶¹¹ কিছু হাদিসে একজন মুসলমানকে হত্যার চেয়ে গোটা দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়া লঘু সাব্যস্ত করা হয়েছে।¹⁶¹² কোনো কোনো হাদিসে মুসলিমের রক্তের গুরুত্ব বোঝাতে হত্যাকে কুফর সাব্যস্ত করা হয়েছে।¹⁶¹³
এত সতর্কতা সত্ত্বেও খারেজি ও মুতাযিলারা বিভ্রান্ত হয়েছে। তারা মুসলমানের রক্তকে পানির মতো বানিয়ে দিয়েছে। তাদের মতে, কেউ যদি কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয় অথবা কোনো বিদআত আবিষ্কার করে, কোনো ফরয আমল ছেড়ে দেয়, তবে তার রক্তপাত বৈধ। তাকে হত্যা করা হবে! এগুলো সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি। কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
প্রশ্ন হলো, তাহলে কি মুসলমানকে কখনোই হত্যা করা যাবে না? না, বিষয়টি তেমন নয়। বরং স্বাভাবিকভাবে মুসলমানের রক্তপাত নিষিদ্ধ। কিন্তু এমন গর্হিত কিছু অপরাধ রয়েছে, যে কারণে এই নিষেধাজ্ঞা রহিত হয়ে যায়। তখন রক্তপাত বৈধ হয়। আহলে সুন্নাতের মতে, মোটামুটি তিন কারণে একজন মুসলিমের রক্তপাত বৈধ হয়, যা মূলত একটি হাদিস থেকে উৎসারিত। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, কোনো ব্যক্তি যখন 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসুল'—এই সাক্ষ্য দেবে, তখন তার রক্ত ঝরানো বৈধ হবে না। হ্যাঁ, তিন ব্যক্তিকে হত্যা করা বৈধ হবে : ১. অন্যকে হত্যাকারী। ২. বিবাহিত ব্যভিচারী। ৩. ধর্মত্যাগী বিদ্রোহী।¹⁶¹⁴
প্রথম প্রকারটি কিসাস—হত্যার বিনিময়ে হত্যা। দ্বিতীয় প্রকারটি 'হদ।' তৃতীয় প্রকারটিতে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ—দুটোই অন্তর্ভুক্ত। ফলে ইসলামে মুরতাদের শাস্তি হলো হত্যা। একইভাবে মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে (অন্যায়মূলক) সশস্ত্র বিদ্রোহও অস্ত্রসহ দমন করা হবে। প্রয়োজনে তাদের হত্যা করা হবে। আলি রাযি.-এর যুদ্ধ ছিল এর বাস্তব প্রয়োগ।
একইভাবে কেউ যদি মুসলিম ভূখণ্ডে বিশৃঙ্খলা-বিপর্যয় সৃষ্টি করে, ডাকাতি ও লুটতরাজের মাধ্যমে জনমনে ত্রাস ছড়ায়, তাকেও হত্যা করা হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ۚ ذَٰلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا ۖ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ ۞ অর্থ : 'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি এটাই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে, অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত-পা কেটে দেওয়া হবে, কিংবা তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে। এটা তো তাদের পার্থিব লাঞ্ছনা। পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।' [মায়িদা: ৩৩]
মোটকথা, ইসলামের চোখে মানুষ-হত্যা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। ফলে শরিয়তে নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট কিছু অপরাধের বাইরে কোনো মানুষের রক্তপাত করার সুযোগ নেই। তাই খারেজি বা মুতাযিলাদের মতের অনুসরণ করে কেউ গুনাহ করলে কিংবা কোনো ফরয ইবাদত ছেড়ে দিলেই তাকে হত্যা করা বৈধ নয়। এমনকি কারও হাতে হত্যাযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হলেও যে-কেউ শরিয়তের শাস্তি প্রয়োগ করার অধিকার রাখে না। বরং শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত দায়িত্বশীল তদন্ত ও যাচাই-বাছাই শেষে নির্ধারিত শাস্তি বাস্তবায়িত করবেন।¹⁶¹⁵
ইসলামি শরিয়াহর সিদ্ধান্ত হলো, যদি কোনো ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে যায়, তাকে বন্দি করা হবে। তিন দিন তার কাছে ইসলাম পেশ করা হবে। তার সন্দেহ দূর করার চেষ্টা করা হবে। যদি ইসলামে ফিরে আসে, ভালো কথা; নতুবা হত্যা করা হবে। যদি ইসলাম পেশ করার আগেই কেউ তাকে হত্যা করে ফেলে, তবে সেটা মাকরুহ ও নিষিদ্ধ গণ্য হবে। কিন্তু হত্যাকারীকে এ জন্য হত্যা কিংবা গুরুতর শাস্তি দেওয়া হবে না। কারণ, নিহত ব্যক্তির রক্ত আগে থেকেই মুরতাদ হওয়ার কারণে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।¹⁶¹⁶
এটা পুরুষ মুরতাদের বিধান। নারী মুরতাদকে কেবল বন্দি করা হবে, হত্যা করা হবে না। ইমাম আজম রহ. বলেন, নারী মুরতাদকে হত্যা করা হবে না, বরং ইসলামে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত বন্দি করে রাখা হবে। এক্ষেত্রে ইমামের দলিল ইবনে আব্বাস রাযি.-এর হাদিস। তিনি বলেছেন, 'কোনো নারী মুরতাদ হয়ে গেলে ইসলামে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তাকে বন্দি করে রাখা হবে।' ইমাম আরও যুক্তি দেন, যুদ্ধের ময়দানে মুশরিক নারীদের রাসুলুল্লাহ (ﷺ) হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।¹⁶¹⁷
টিকাঃ
১৬১১. বুখারি (কিতাবুল ওসায়া : ২৭৬৬)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৮৯)।
১৬১২. তিরমিযি (আবওয়াবুত দিয়াত : ১৩৯৫)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুত দিয়াত : ২৬১৯)।
১৬১৩. বুখারি (কিতাবুল আদাব : ৬০৪৪)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৬৪)।
১৬১৪. বুখারি (কিতাবুদ দিয়াত: ৬৮৭৮)। মুসলিম (কিতাবুল কাসামাহ: ১৬৭৬)।
১৬১৫. দেখুন: বাহরুল কালাম (২৫৭)।
১৬১৬. দেখুন: তুহফাতুল মুলুক (৩০৭)। ফাতহুল কাদির (৬/৭১)। আল-বাহরুর রায়েক (৫/২০১-২০২)।
১৬১৭. দেখুন: আল-আসল, ইমাম মুহাম্মাদ (৭/৪৯৭)। কাশফুল আসার, হারেসি (১/৯১)।