📄 মাহদির আগমন
তিনি শেষ যুগে একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক এবং মুসলিম উম্মাহর ইমাম হিসেবে আবির্ভূত হবেন। তাঁর নাম হবে মুহাম্মাদ। পিতার নাম হবে আবদুল্লাহ। তিনি রাসুলুল্লাহর (ﷺ) বংশধর হবেন। ফেতনাবিক্ষুদ্ধ এবং জুলুমে পূর্ণ পৃথিবীতে এসে ইনসাফের রাজত্ব কায়েম করবেন। পৃথিবী থেকে জুলুম দূর করবেন। গোটা পৃথিবীতে শান্তি, শৃঙ্খলা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করবেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বিভিন্ন হাদিসে তাঁর আগমনের ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হবে না যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা আমার বংশধর থেকে এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করবেন, যার নাম আমার নামসদৃশ হবে, যার পিতার নাম আমার পিতার নামে হবে। তিনি জুলুমে পূর্ণ গোটা পৃথিবী ন্যায়-ইনসাফে পূর্ণ করবেন।’¹⁵³²
বিভিন্ন হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, মাহদি কিয়ামতের পূর্বলগ্নে আগমন করবেন। পৃথিবী তখন বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত থাকবে। ন্যায়-ইনসাফ নিশ্চিহ্ন থাকবে। মানুষের অধিকার ভূলুণ্ঠিত হবে। গোটা পৃথিবী অন্যায়-অনাচারে ছেয়ে যাবে। ইসলামি শাসনের কোনো চিহ্ন বাকি থাকবে না। তখন ফাতেমা রাযি.-এর বংশে এই পবিত্র পুরুষ জন্মগ্রহণ করবেন। আল্লাহ তাআলা তাকে দৈহিক ও আধ্যাত্মিক সকল দিক থেকে পূর্ণতা দান করবেন। তাকে তৌফিক দেবেন। তিনি পৃথিবীতে নববি খেলাফত ফিরিয়ে আনবেন। উৎপীড়ন ও অরাজকতা দূর করে ইনসাফের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন। শতাব্দের পর শতাব্দ জুলুমে দগ্ধ পৃথিবীতে বয়ে চলবে রহমতের বারিধারা। আসমানবাসী ও জমিনবাসী সবাই তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে। কমবেশি সাত বছর স্থায়ী হবে তাঁর খেলাফত। এই সাত বছর পৃথিবী জাগতিক ও আসমানি নেয়ামতের মাঝে ডুবে থাকবে। অতঃপর কিয়ামতের অন্যান্য বড় আলামত (ফিতান ও মালাহিম) প্রকাশিত হওয়া শুরু করবে। দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। ঈসা আলাইহিস সালাম উম্মাহর সুরক্ষার জন্য আসমান থেকে অবতরণ করবেন।¹⁵৩৩
তবে এর অর্থ এই নয় যে, এখন থেকে মাহদির আগমনের আগ পর্যন্ত পৃথিবী কেবল অধঃপতনের পথেই হাঁটবে, পৃথিবীতে শান্তি আসবে না, মাহদির আগে কখনো খেলাফত কায়েম হবে না। এ ধরনের বিশ্বাস বরং মাহদি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহর (ﷺ) ভবিষ্যদ্বাণীর হিকমতের সম্পূর্ণ বিপরীত। মুসলমানদের মাহদি শিয়াদের মাহদির মতো প্রতীক্ষিত ব্যক্তি নন। তাঁর জন্য মুসলিম উম্মাহ সব কাজ বাদ দিয়ে বসে থাকবে এটা বৈধ নয়। বিজয়, নেতৃত্ব ও সংস্কারের সব আশা ছেড়ে দিয়ে মুসলিম উম্মাহ তাঁর অপেক্ষায় বসে বসে দিন গুনবে—এটা ইসলামের রুহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং উম্মাহ তাদের সকল কাজ অব্যাহত রাখবে। দাওয়াত, তাবলিগ, তালিম, জিহাদ, নেতৃত্ব, সংস্কার—সবকিছুর জন্য মেহনত জারি থাকবে। ফলাফল আল্লাহর যিম্মায় থাকবে। মাহদির যখন আসার আসবে, উম্মাহর প্রত্যেক সদস্যকে তার নিজের কাজের হিসাব দিতে হবে। মাহদির কথা বলে কেউ পার পাবে না।
টিকাঃ
১৫৩২. আবু দাউদ (কিতাবুল মাহদি: ৪২৮২)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল ফিতান: ৪০৮৬)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবদিল্লাহ ইবনে মাসউদ: ৩৬৪৩)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুত তারিখ: ৬৮২৩)।
১৫৩৩. আবু দাউদ (কিতাবুল মাহদি: ৪২৮৫)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবি সাইদ খুদরি: ১১৫০১, ১১৬৬০)। মুসনাদে বাযযার (মুসনাদু আবি সাইদ খুদরি: ১৮/৭৫)।
📄 দাজ্জালের আগমন
এটা ইসলামের কিয়ামতসম্পর্কিত বিষয়গুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকিদা। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত অগণিত সহিহ হাদিসের মাধ্যমে এটা প্রমাণিত। ফলে এ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, "ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হবে না যতক্ষণ না আমার উম্মত থেকে ত্রিশজন দাজ্জাল (মিথ্যুকের) আবির্ভাব ঘটবে। তাদের সর্বশেষে থাকবে কানা দাজ্জাল। ...সে বের হয়ে নিজেকে 'আল্লাহ' দাবি করবে। যে ব্যক্তি তার উপর ঈমান আনবে এবং তার অনুসরণ করবে, তার সকল ভালো আমল বাতিল হয়ে যাবে। যে তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহের জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া হবে না (অর্থাৎ, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন)। সে পুরো ভূপৃষ্ঠ ঘুরে বেড়াবে। তবে হারাম ও বাইতুল মুকাদ্দাসে ঢুকতে পারবে না। সে মুমিনদের বাইতুল মুকাদ্দাসে অবরুদ্ধ করে রাখবে। তখন আল্লাহ তাআলা দাজ্জাল এবং তার বাহিনী ধ্বংস করে দেবেন...। প্রত্যেক দেওয়াল ও গাছের নিচ থেকে আওয়াজ বের হবে : 'হে মুমিন/মুসলিম, এই এক ইহুদি আমার পিছনে লুকিয়ে আছে। আসো, তাকে হত্যা করো।”¹⁵³⁴
রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে ইবনে সাইয়াদ নামে এক ইহুদি ছিল। প্রথমে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এবং সাহাবায়ে কেরাম তাকে দাজ্জাল মনে করেছিলেন। কারণ, তার মাঝে দাজ্জালের অনেক আলামত দেখা গিয়েছিল। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তার মূল দাজ্জাল না হওয়া প্রমাণিত হয়। আজ পর্যন্ত দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটেনি। তার অস্তিত্ব কিংবা বাসস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি। কিয়ামতের আগ মুহূর্তে আল্লাহ যখন অনুমতি দেবেন, তখন সে আবির্ভূত হবে। প্রথমে ভালোর অভিনয় করবে। পরে নবুওতের দাবি করবে। সবশেষে নিজেকে খোদা ঘোষণা করবে।¹⁵৩৫
বিভিন্ন হাদিস দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায়, কানা দাজ্জাল একজন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি। ফলে সভ্যতা কিংবা জাতি দিয়ে তাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এ ধরনের ব্যাখ্যা কুরআন-সুন্নাহর বিকৃতি ও অপব্যাখ্যা গণ্য হবে। ইবনে হাজার কাযি ইয়াযের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেন, দাজ্জাল একজন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি হবে। আল্লাহ তার মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করবেন। মৃতকে জীবিত করা, ভূমি উর্বর করে তাতে ফসল ফলানো, নদী প্রবাহিত করা, জান্নাত-জাহান্নাম সামনে তুলে ধরা, ভূপৃষ্ঠের সম্পদ তার পিছনে ছোটা, তার নির্দেশে বৃষ্টি বর্ষিত হওয়াসহ আল্লাহ তাকে বিভিন্ন ক্ষমতা দান করবেন। এটা করা হবে মানুষকে পরীক্ষার জন্য। এর ফলে সন্দেহকারীরা ধ্বংস হয়ে যাবে। দৃঢ় বিশ্বাসের অধিকারী মুমিনরা রক্ষা পাবে। অতঃপর একপর্যায়ে আল্লাহ তাআলা তার ক্ষমতা তিনি ছিনিয়ে নেবেন। ফলে সে কিছুই করতে পারবে না। ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম এসে তাকে হত্যা করবেন।¹⁵৩৬
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) দাজ্জাল সম্পর্কে কেবল সতর্ক করেই শেষ করেননি, বরং তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন। তার ষড়যন্ত্র, শয়তানি এবং ফেতনার ভিতরের কথাও বলেছেন। মুসলমানরা কী করে তার ধোঁকা ও প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকবে সে পথও বাতলে দিয়েছেন।
আবু উমামা বাহেলি রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল আমাদের উদ্দেশে খুতবা দিলেন। খুতবার বেশিরভাগ অংশ জুড়ে ছিল দাজ্জালের আলোচনা। তিনি দাজ্জাল থেকে আমাদের সতর্ক করলেন। তিনি বললেন, 'আল্লাহ কর্তৃক আদম সন্তানকে সৃষ্টি করার পর থেকে পৃথিবীতে দাজ্জালের চেয়ে অধিকতর ভয়াবহ ফেতনা আর নেই। আল্লাহ যত নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন, প্রত্যেকেই তাদের উম্মতকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। আমি হলাম সর্বশেষ নবি। তোমরা হলে সর্বশেষ উম্মত। সুতরাং সে অবশ্যই তোমাদের মাঝেই আবির্ভূত হবে। যদি আমি তোমাদের মাঝে থাকা অবস্থায় সে এসে পড়ে, তবে আমিই তোমাদের দেখব। আর যদি সে আমার পরে আসে, তাহলে প্রত্যেককে নিজের দায়িত্ব নিতে হবে। তবে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহকে রেখে যাচ্ছি। সে ইরাক ও শামের মধ্যবর্তী অঞ্চল থেকে বের হবে। ডানে ও বামে সর্বত্র ফ্যাসাদ সৃষ্টি করবে। হে আল্লাহর বান্দারা, তোমরা অবিচল থাকো! হে লোকসকল, তোমরা দৃঢ়পদ থাকো!'
'আমি তোমাদের দাজ্জাল সম্পর্কে এমন বর্ণনা দেবো, যা আমার পূর্বে কোনো নবি দেননি। সে এসে প্রথমে বলবে, আমি নবি। অথচ আমার পরে কোনো নবি নেই। অতঃপর সে বলবে, আমি তোমাদের রব। অথচ তোমরা মৃত্যুর আগে তোমাদের রবকে দেখতে পাবে না। তার এক চোখ কানা থাকবে। অথচ তোমাদের রব কানা নন। তার দু চোখের মাঝখানে 'কাফের' (كافر) লেখা থাকবে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি সেটা পড়তে পারবে। তার আরেকটি ফেতনা হবে এই যে, তার সঙ্গে জান্নাত এবং জাহান্নাম থাকবে। তার জান্নাত মূলত জাহান্নাম আর জাহান্নাম মূলত জান্নাত। সুতরাং তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি তার জাহান্নামে পতিত হবে, সে যেন আল্লাহর কাছে সাহায্য চায় এবং সুরা কাহাফের প্রথম আয়াতগুলো পড়ে। তাহলে দাজ্জালের জাহান্নাম তার জন্য শীতল এবং শান্তিদায়ক হয়ে যাবে যেমনটা ইবরাহিমের ক্ষেত্রে (নমরুদের আগুন) হয়েছিল। তার আরেকটি ফেতনা হলো—সে একজন গ্রাম্য লোককে বলবে, যদি আমি তোমার বাবা-মাকে জীবিত করে দিই, তাহলে তুমি কি আমাকে রব হিসেবে মেনে নেবে? সে বলবে, হ্যাঁ। তখন দুটো শয়তান তার বাবা-মায়ের রূপ ধারণ করে তার সামনে উপস্থিত হবে এবং বলবে, বৎস, তার অনুসরণ করো। কেননা, সে তোমার রব! দাজ্জালের আরেকটি ফেতনা হলো—সে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলবে। তাকে করাত দিয়ে দুই টুকরো করে মানুষকে বলবে, তোমরা সবাই আমার এই বান্দাকে দেখো! আমি এখন তাকে পুনরায় জীবিত করব অথচ সে আমাকে রব বলে না মেনে অন্য কাউকে রব বলবে! অতঃপর দাজ্জাল লোকটাকে জীবিত করে বলবে, তোমার রব কে? লোকটি বলবে, আমার রব আল্লাহ। তুই আমার দুশমন। তুই মিথ্যুক দাজ্জাল। আল্লাহর শপথ! আমি তোকে আজকের চেয়ে ভালো করে আর কখনো চিনিনি।'¹⁵৩৭ দাজ্জালের এই কূট-কৌশলে দুর্বল হৃদয়ের মুমিন ও মুনাফিকরা আরও বেশি বিভ্রান্ত হবে। এভাবে তার ফেতনা অব্যাহত থাকবে। একপর্যায়ে ঈসা আলাইহিস সালাম এসে তাকে হত্যা করবেন।
টিকাঃ
১৫৩৪. মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুল কুসুফ: ১২৩৪)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুল বাসরিয়িয়ন: ২০৪৯৫)। সহিহ ইবনে খুযাইমা (কিতাবুস সালাত: ১৩৯৭)।
১৫৩৫. দেখুন: ফাতহুল বারি, ইবনে হাজার (১৩/৯১)।
১৫৩৬. প্রাগুক্ত (১৩/১০৫)।
১৫৩৭. ইবনে মাজা (আবওয়াবুল ফিতান: ৪০৭৭)। মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুল ঈমান: ৬৫)।
📄 ঈসা আলাইহিস সালামের পুনরাগমন
এটা ফিতানসম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আকিদা। আহলে সুন্নাতের প্রায় সকল আকিদার কিতাবে কিয়ামত সংঘটনের আলামত হিসেবে ঈসা আলাইহিস সালামের পুনরায় দুনিয়াতে আগমনের বিষয়টি রয়েছে। এর কারণ হলো, অতীত ও বর্তমানে অনেক মানুষ এক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। তারা ঈসা আলাইহিস সালামের জীবিত অবস্থায় আকাশে উড্ডয়ন এবং পৃথিবীর শেষ সময়ে পুনরাগমনের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। কারণ, তাদের মতে, এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহতে সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই। ফলে এতে বিশ্বাস রাখা আকিদার আবশ্যক অংশ নয়। অতীত ও সমকালীন আহলে সুন্নাতের অনুসারী বিভিন্ন আলেমও এ ধরনের বিচ্যুত ও গলত ফাতাওয়া দিয়েছেন। এর অন্যতম কারণ হলো, কুরআন-সুন্নাহর মাঝে এবং সালাফের পথে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজের উপর অতি আস্থা স্থাপন এবং পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন। ফলে তারা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছেন। এ বিষয়ে তাদের অনুসরণ বৈধ নয়।
আহলে সুন্নাতের ইমামগণ এই ভ্রান্ত আকিদা খণ্ডনের উদ্দেশ্যে আকিদার প্রায় সকল কিতাবে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। বরং এর উপর অনেকেই অসংখ্য স্বতন্ত্র গ্রন্থ লিখেছেন। সেখানে তারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন যে, ঈসা আলাইহিস সালামের জীবিত অবস্থায় আকাশে উড্ডয়ন এবং পৃথিবীর শেষ দিনগুলোতে পুনরায় তাঁর আগমন কুরআন-সুন্নাহর সন্দেহাতীত আকিদা; অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থক বিষয় নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ إِذْ قَالَ اللَّهُ يَعِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَجَاعِلُ الَّذِينَ اتَّبَعُوكَ فَوْقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأَحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ ۞ অর্থ : 'আর স্মরণ করো যখন আল্লাহ বলেছিলেন, হে ঈসা, আমি তোমাকে নিয়ে নেব এবং তোমাকে নিজের দিকে তুলে নেব। কাফেরদের থেকে তোমাকে পবিত্র করে দেবো। আর যারা তোমার অনুগত রয়েছে, তাদের কিয়ামতের দিন পর্যন্ত কাফেরদের উপর জয়ী করে রাখব। বস্তুত তোমাদের সবাইকে আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। তখন যে বিষয়ে তোমরা বিবাদ করতে, আমি তোমাদের মধ্যে তার ফয়সালা করে দেবো।' [আলে ইমরান : ৫৫] অন্যত্র আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেন, ۞ وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِن شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَيْءٍ مِنْهُ مَا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا أَتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا * بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا ۞ অর্থ : ‘(তাদের উপর অভিশম্পাত) তাদের এ কথা বলার কারণে যে, আমরা মরিয়ম পুত্র ঈসা মসিহকে হত্যা করেছি যিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুল। অথচ তারা না তাকে হত্যা করেছে, আর না শূলে চড়িয়েছে; বরং তারা এরূপ বিভ্রমে পতিত হয়েছিল। বস্তুত তারা এ ব্যাপারে নানারকম কথা বলে। তারা এক্ষেত্রে সন্দেহের মাঝে পড়ে আছে। শুধু অনুমান করা ছাড়া এ বিষয়ে তাদের কোনো জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই তাকে তারা হত্যা করেনি। বরং আল্লাহ তাকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' [নিসা : ১৫৭-১৫৮] প্রথম আয়াতে কিছুটা দ্ব্যর্থটা ও অস্পষ্টতা থাকলেও দ্বিতীয় আয়াত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। এর পরেও এ ব্যাপারে সন্দেহ রাখা গোমরাহি ছাড়া কিছু নয়।
কুরআনের পাশাপাশি অসংখ্য হাদিস দ্বারা ঈসা আলাইহিস সালামের দুনিয়াতে পুনরাগমনের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। এসব হাদিস অত্যন্ত বিশুদ্ধ এবং সনদের ক্ষেত্রে মুতাওয়াতির পর্যায়ের। ফলে যে ব্যক্তি এটা অস্বীকার করবে, তার কাফের হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বুখারি ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাযি.-এর বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! অতি শীঘ্রই তোমাদের মাঝে মারইয়াম পুত্র ন্যায়নিষ্ঠ শাসক হিসেবে অবতরণ করবেন। ক্রুশ চূর্ণ করবেন। শূকর হত্যা করবেন। জিযিয়া রহিত করবেন। তাঁর সময়ে প্রচুর সমৃদ্ধি আসবে। একপর্যায়ে মানুষ কেউ কারও দান-অনুদান গ্রহণ করবে না।'¹⁵৩৮
আবু দাউদ আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'আমার মাঝে আর ঈসার মাঝে কোনো নবি নেই। তিনি (শীঘ্রই) অবতরণ করবেন। তোমরা তাকে দেখে চিনতে পারবে। তিনি মধ্যম গড়নের। তার গায়ের রং লালিমা বর্ণের সাদা। হলদে/জাফরানি রঙের দুই টুকরো কাপড় পরিধান করা থাকবেন। তার মাথা থেকে যেন টপটপ পানি ঝরতে থাকবে, অথচ তিনি সিক্ত থাকবেন না (অর্থাৎ, অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন হবেন)। তিনি ইসলামের জন্য মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। ক্রুশ চূর্ণবিচূর্ণ করবেন। শূকর হত্যা করবেন। (কাফেরদের উপর) জিযিয়া রহিত করবেন (অর্থাৎ, ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করবেন না)। আল্লাহ তাআলা তখন ইসলাম ব্যতীত সকল ধর্ম ও জাতি মিটিয়ে দেবেন। কানা দাজ্জালকে ধ্বংস করবেন।' মুসনাদে আহমদের বর্ণনায় অতিরিক্ত এসেছে, 'ঈসা আলাইহিস সালাম চল্লিশ বছর বেঁচে থাকবেন। অতঃপর মৃত্যুবরণ করবেন। মুসলমানগণ তাঁর জানাযা আদায় করবে।'¹⁵৩৯
ঈসা আলাইহিস সালাম শেষ যুগে যদিও নবুওতসহই আগমন করবেন, অন্যকথায়, তিনি তখনও নবি ও রাসুল থাকবেন, তথাপি তিনি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর শরিয়তের অনুসারী হয়ে আসবেন। শরিয়তে মুহাম্মাদির একজন প্রচারক (দাঈ) ও মুজাদ্দিদ গণ্য হবেন। নতুন নবুওত বা শরিয়ত নিয়ে আসবেন না। ফলে 'খতমে নবুওত' আকিদার সঙ্গে তাঁর পুনরাগমনের কোনো সংঘাত নেই।¹⁵৪০
টিকাঃ
১৫৩৮. বুখারি (কিতাবুল বুয়ু: ২২২২)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ১৫৫)।
১৫৩৯. আবু দাউদ (কিতাবুল মালাহিম: ৪৩২৪)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবি হুরাইরা : ৯৩৯৩)। অধিকাংশ মুহাক্কিকের মতে, চল্লিশ বছর বেঁচে থাকবেন বলতে আকাশে উড্ডয়নের আগের ত্রিশ বছর আর অবতরণের পরে সাত বছর। কোথাও সতেরো বছরের কথাও পাওয়া যায়। কারও কারও মতে, অবতরণের পরেও চল্লিশ বছর বেঁচে থাকবেন। বাস্তব কথা হলো, এ বিষয়ে সুনিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়।
১৫৪০. দেখুন: আল-মুতামাদ ফিল মুতাকাদ, কাসানি (১০)।
📄 ইয়াজুজ-মাজুজের আগমন
এটাও কিয়ামতের একটি বড় আলামত। বরং পৃথিবীর এক যুগান্তকারী অভাবনীয় ঘটনা। এমন ঘটনার সাক্ষী পৃথিবী আগে কখনো হয়নি এবং হবেও না। এক অদ্ভুত মানব প্রজাতি গোটা পৃথিবীর বুক দাপিয়ে বেড়াবে। তাদের নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, অনাচার, ত্রাস আর ধ্বংসে মুহুর্মুহু কম্পিত হবে পৃথিবীর বুক। আবির্ভাবের পর থেকে ধ্বংস হওয়ার আগ পর্যন্ত পৃথিবী তাদের পদভারে ক্লান্ত থাকবে।
ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীর চূড়ান্ত লগ্নে জন্ম নেবে এমন নয়, বরং তারা এখনও বিদ্যমান। তারা পৃথিবীতে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বেড়াত। এ জন্য বাদশাহ যুলকারনাইন তাদের সামনে এক বিশাল প্রাচীর নির্মাণ করেন। তারা প্রাচীরের ওপারে বন্দি হয়ে যায়। কিয়ামতের আগে তারা জেগে উঠবে। প্রবল বেগে গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে। আল্লাহ তাআলা তাদের পুরো ঘটনা সংক্ষেপে বলেন, ۞ حَتَّى إِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدَّيْنِ وَجَدَ مِن دُونِهِمَا قَوْمًا لَّا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ قَوْلًا * قَالُوا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِنَّ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلَى أَن تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّا * قَالَ مَا مَكَّنِي فِيهِ رَبِّي خَيْرٌ فَأَعِينُونِي بِقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا * ءَاتُونِي زُبَرَ الْحَدِيدِ ۖ حَتَّى إِذَا سَاوَى بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ انفُخُوا ۖ حَتَّى إِذَا جَعَلَهُ نَارًا قَالَ ءَاتُونِي أُفْرِغْ عَلَيْهِ قِطْرًا * فَمَا اسْتَطَاعُوا أَن يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا * قَالَ هَذَا رَحْمَةٌ مِّن رَّبِّي ۖ فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ ۖ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا * وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعْضٍ ۖ وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَجَمَعْتَهُمْ جَمْعًا ۞ অর্থ : 'অবশেষে যখন তিনি (যুলকারনাইন) দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যস্থলে পৌঁছলেন, তখন তিনি সেখানে এক জাতিকে পেলেন, যারা তাঁর কথা যেন বুঝতে পারছিল না। তারা বলল, হে যুলকারনাইন, ইয়াজুজ ও মাজুজ এ দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায়। আমরা কি আপনাকে কিছু কর দেবো, যার বিনিময়ে আপনি আমাদের ও তাদের মাঝখানে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন? তিনি বললেন : আমার পালনকর্তা আমাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তা-ই যথেষ্ট। অতএব, তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য করো। আমি তোমাদের ও তাদের মাঝে একটি সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেবো। তোমরা আমার নিকট লৌহপিণ্ডসমূহ নিয়ে আসো। অতঃপর যখন লৌহস্তূপ দুই পর্বতের সমান হলো, তখন তিনি বললেন, তোমরা হাঁপরে দম দিতে থাকো। যখন তা অগ্নিবৎ উত্তপ্ত হলো তিনি বললেন, তোমরা গলিত তামা আনো, আমি তা ঢেলে দিই এটার উপর। অতঃপর ইয়াজুজ ও মাজুজ প্রাচীরের উপরে আরোহণ করতে পারল না এবং তা ভেদ করতেও সক্ষম হলো না। যুলকারনাইন বললেন : এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ। যখন আমার পালনকর্তার প্রতিশ্রুত সময় আসবে, তখন তিনি একে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবেন এবং আমার পালনকর্তার প্রতিশ্রুতি সত্য। সেদিন আমি তাদের ছেড়ে দেবো এই অবস্থায় যে, একদল অন্যদলের উপর তরঙ্গের ন্যায় পতিত হবে এবং শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে। এরপর আমি তাদের সকলকেই একত্র করব।' [কাহাফ : ৯৩-৯৯]
۞ حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُم مِّن كُلِّ حَدَبٍ يَنسِلُونَ * وَاقْتَرَبَ الْوَعْدُ الْحَقُّ فَإِذَا هِيَ شَاخِصَةٌ أَبْصَارُ الَّذِينَ كَفَرُوا يَا وَيْلَنَا قَدْ كُنَّا فِي غَفْلَةٍ مِّنْ هَذَا بَلْ كُنَّا ظَالِمِينَ ۞ অর্থ : 'অবশেষে যখন ইয়াজুজ ও মাজুজকে মুক্ত করে দেওয়া হবে এবং তাদের প্রতিটি উঁচু ভূমি থেকে আছড়ে পড়তে দেখা যাবে। অমোঘ প্রতিশ্রুত কাল আসন্ন হলে অকস্মাৎ কাফেরদের চোখ স্থির হয়ে যাবে। তারা বলবে, 'হায়! দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো ছিলাম এ বিষয়ে উদাসীন। না, আমরা বরং সীমালঙ্ঘনকারীই ছিলাম।' [আম্বিয়া : ৯৬-৯৭] মোটকথা, ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর খুলে দেওয়া হলে তারা বাঁধভাঙা স্রোতের মতো বেরিয়ে আসবে। তাদের সামনে কেউ দাঁড়ানোর হিম্মত পাবে না। তারা পৃথিবীতে ভীষণ নৈরাজ্য ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। তখন ঈসা আলাইহিস সালাম মুমিনদের নিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেবেন। আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করবেন। আল্লাহ ইয়াজুজ-মাজুজকে নিজ কুদরতে ধ্বংস করে দেবেন।¹⁵⁴¹
ইয়াজুজ-মাজুজবিষয়ক আকিদার ক্ষেত্রে অনেক লোক, বিশেষত আকলপূজারীরা, বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। এসব বিষয়কে তারা প্রাচীন রূপকথার অংশ মনে করেছে। মানবিক বিবেক-বুদ্ধির মানদণ্ডে এগুলো মাপতে অক্ষম হয়ে বিভিন্ন যুক্তিতে প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করেছে। অথচ ইয়াজুজ-মাজুজবিষয়ক আকিদা ইসলামের কিয়ামতের আলামতসম্পর্কিত আকিদার একটি মৌলিক মাসআলা। কুরআন এবং বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। ফলে তাদের অস্তিত্বে সন্দেহ পোষণ কিংবা অস্বীকার করা কুফর। বরং এগুলো চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিশ্বাস করতে হবে। এগুলোতে পূর্ণ ও দৃঢ় ঈমান রাখতে হবে। আমাদের ইমামগণ যুগে যুগে সেটাই করেছেন। প্রত্যেকে তাদের আকিদার কিতাবে এগুলো উল্লেখ করেছেন। যুক্তির দোহাই দিয়ে সন্দেহ করেননি, প্রত্যাখ্যান করেননি। অথচ তারা বর্তমানের মানুষের তুলনায় অনেক বেশি বিদ্বান, সুশিক্ষিত, বুদ্ধিমান ও যুক্তিমান ছিলেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা মানুষকে খুব সামান্য জ্ঞান দান করেছেন [ইসরা : ৮৫]। আল্লাহ মানুষকে অত্যন্ত দুর্বল [নিসা : ২৮] অথচ প্রচণ্ড বিতর্কপ্রবণ ও ঝগড়াটে বানিয়েছেন [কাহাফ : ৫৪]। ফলে নিজের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাকে বুঝে কুরআন-সুন্নাহর সামনে আত্মসমর্পণই প্রকৃত বুদ্ধিমানের পরিচয়।
টিকাঃ
১৫৪১. মুসলিম (কিতাবুল ফিতান : ২৯৩৭)। তিরমিযি (আবওয়াবুল ফিতান : ২২৪০)।