📄 কিয়ামতের ছোট আলামতসমূহ
উপরে যেমনটা বলা হয়েছে, কিয়ামতের ছোট আলামত বলতে সেসব আলামত বোঝায়, যেগুলোর মাঝে আর কিয়ামতের মাঝে লম্বা সময়ের ব্যবধান থাকবে। অর্থাৎ, সেগুলো কিয়ামতের দূরবর্তী ভূমিকা হিসেবে কাজ করবে। সেগুলো প্রকাশ পাওয়ামাত্রই কিয়ামত হয়ে যাবে এমন নয়; বরং সেগুলো প্রকাশের সঙ্গে কিয়ামত কাছাকাছি চলে আসছে মনে করতে হবে। এসব ঘটনা সাধারণত প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মতোই হবে। দূরদর্শী লোক ব্যতীত সাধারণ মানুষ এগুলো অনুভব করতে পারবে না। কিয়ামতের বৃহৎ আলামতগুলো যেখানে অস্বাভাবিক এবং পৃথিবীর গতিপ্রকৃতিতে, মানব ইতিহাসে ব্যাপক সাড়াজাগানিয়া হবে, ছোট আলামতগুলো সে তুলনায় নিতান্তই স্বাভাবিক হবে। ফলে মানুষ এগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। গুরুত্ব দেবে না, ভ্রুক্ষেপ করবে না।
এ কারণে হাদিসে এসব আলামতের ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন হাদিসে এমন অনেক আলামতের কথা এসেছে। ইমাম আজম রহ.-এর আকিদার গ্রন্থগুলোতে কিয়ামতের ছোট আলামত উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু আমরা আলোচনাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সংক্ষেপে এতৎসম্পর্কিত কিছু বর্ণনা তুলে ধরব, ইনশাআল্লাহ।
আনাস ইবনে মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'কিয়ামতের কিছু আলামত হলো: ইলম উঠে যাবে। মূর্খতার প্রসার ঘটবে। ব্যভিচার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। মদ্যপান বাড়বে। পুরুষদের সংখ্যা কমতে থাকবে। নারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। একজন পুরুষের বিপরীতে পঞ্চাশজন নারী হবে।'¹⁵²⁰ কোনো কোনো বর্ণনায় চল্লিশ জন নারীর কথাও পাওয়া যায়। হাদিসে মূলত তত্ত্বাবধান শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে (আল-কাইয়িম)। এই তত্ত্বাবধানের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন আলেমগণ। তন্মধ্যে একটি ব্যাখ্যা হলো, সাধারণত প্রত্যেক পুরুষের এক থেকে চারজন স্ত্রী থাকবে। তাদের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য নারীও থাকবে। মোটকথা, নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অত্যন্ত বেশি হবে।
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যখন আমানত নষ্ট হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করতে থাকবে।' তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এর অর্থ কী, ইয়া রাসুলাল্লাহ? রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, 'যখন অনুপযুক্ত ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করবে।'¹⁵²¹
আনাস ইবনে মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'কিয়ামতের একটি আলামত হলো, মানুষ মসজিদ নিয়ে গর্ব করবে।'¹⁵²² অর্থাৎ, মসজিদের বাহ্যিক রূপ-অবয়ব সুন্দর করার ক্ষেত্রে মানুষ প্রতিযোগিতা করবে। প্রত্যেকে অন্য মসজিদের তুলনায় নিজেদের মসজিদের বিশালতা, সৌন্দর্য ইত্যাদি নিয়ে অহংকার করবে!
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদিসে জিবরিলে এসেছে— জিবরাইল আলাইহিস সালাম আল্লাহর নবিকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময়ের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, সেটা জিবরাইল যেমন জানেন না, তিনিও জানেন না। অতঃপর জিবরাইল তাঁকে কিয়ামতের আলামতের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে নবিজি (ﷺ) বলেন, 'যখন দাসী তার মনিবকে জন্ম দেবে, যখন ভুখা-নাঙ্গা নিঃস্ব-দরিদ্র উটের রাখালরা বড় বড় অট্টালিকা বানিয়ে গর্ব করবে।'¹⁵²³ উক্ত হাদিসে দাসী কর্তৃক মনিবকে জন্ম দেওয়া-সংবলিত বক্তব্যের আলেমগণ বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের মতে, এখানে দাস-দাসীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, একটা সময় দাসীর গর্ভে মনিবের বাচ্চা হবে। আর মনিবের বাচ্চা তার সন্তান হলেও তার মনিবের মতোই।
কিয়ামতের আরেকটি আলামত হচ্ছে ফেতনা এবং মুসিবত প্রচণ্ডরূপে বৃদ্ধি পাওয়া। ইমাম আজম রহ. আবদুর রহমান আরাজ সূত্রে আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'অতি শীঘ্রই এমন একটি যুগ আসবে, যখন মানুষ গোপনে কবরের কাছে গিয়ে তাতে নিজেদের পেট লাগিয়ে বলবে, হায়! আমরা যদি এই কবরের অধিবাসী হতাম!' জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, কারণ কী? তিনি বললেন, 'যুগের দুর্বিপাক, বিপদাপদ এবং ফেতনার আধিক্য।'¹⁵²⁴ এই হাদিসটিই বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় এভাবে এসেছে, 'ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হবে না যতক্ষণ না মানুষ কবরের কাছে গিয়ে বলবে, হায়! আমি যদি তার জায়গায় হতাম!'¹⁵²⁵ অর্থাৎ, মৃত্যু কামনা করবে। মাটির উপরে থাকার চেয়ে নিচে থাকতে চাইবে। এটা দ্বীনের দুরবস্থা দেখে দ্বীনদার মানুষ বলতে পারে, আবার দুনিয়াবি নানা সমস্যা, সংকট ও মুসিবতের সাগরে পড়ে দুনিয়াদারও বলতে পারে।
কিয়ামতের আরেকটি আলামত হলো ইসলাম উঠে যাওয়া। ইমাম আজম রহ. আবু মালেক আশজায়ি সূত্রে হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'ইসলাম (পৃথিবী থেকে) সেভাবে মুছে যাবে যেভাবে কাপড়ের আল্পনা মুছে যায়। বাকি থাকবে কিছু বৃদ্ধ-বৃদ্ধা মানুষ যারা বলবে, আমাদের আগে একটি সম্প্রদায় ছিল যারা বলত 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।'¹⁵²⁶
তবে এসব বিষয়ে তফসিলি জ্ঞান আবশ্যক নয়; বরং মৌলিক বিষয়গুলোতে ইজমালি ঈমান এনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিবরণ আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়াই যথেষ্ট। এ জন্য ইমাম বলেছেন, 'বিশুদ্ধ হাদিসে কিয়ামতের যত আলামত বর্ণিত হয়েছে, সবই সত্য এবং তদনুযায়ী সংঘটিত হবে।'¹⁵²⁷ 'কিয়ামতের যত আলামত' বলে ইমাম বিষয়টাকে ইজমালি করে দিয়েছেন। অর্থাৎ, সবগুলো আলামত জানা জরুরি নয়। তবে বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত কোনো আলামত নিয়ে যদি সন্দেহ-সংশয় তৈরি হয়, তখন সন্দেহ ছুড়ে ফেলে তাতে ঈমান আনা জরুরি হবে।
টিকাঃ
১৫২০. বুখারি (কিতাবুন নিকাহ: ৫২৩১)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুত তারিখ: ৬৭৬৮)।
১৫২১. বুখারি (কিতাবুর রিকাক: ৬৪৯৬)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবি হুরাইরা : ৮৮৫০)।
১৫২২. আবু দাউদ (কিতাবুস সালাত: ৪৪৯)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল মাসাজিদ : ৭৩৯)।
১৫২৩. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ৮)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ : ৪৬৯৫)।
১৫২৪. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৬২)।
১৫২৫. বুখারি (কিতাবুল ফিতান: ৭১১৫)। মুসলিম (কিতাবুল ফিতান: ১৫৭)।
১৫২৬. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৬২)।
১৫২৭. আল-ফিকহুল আকবার (৮)।