📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 চার. সাহাবাদের সমালোচনা কখনো পাপ, কখনো কুফর

📄 চার. সাহাবাদের সমালোচনা কখনো পাপ, কখনো কুফর


সাহাবাদের প্রতি ভালোবাসা স্রেফ মুস্তাহাব আমল নয়। সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ ও সমালোচনা থেকে বেঁচে থাকা নফল কাজ নয়। এমন নয় যে, মনে চাইলে করা হবে, মনে না চাইলে করা হবে না; বরং এগুলো দ্বীনের জন্য আবশ্যক। ইসলামি আকিদার অংশ। কারণ, সাহাবাদের প্রতি ভালোবাসা মানুষকে সাধারণ মুমিন থেকে ওলি-আউলিয়া ও সিদ্দিকদের স্তরে উন্নীত করে। অপরদিকে সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ একজন মুমিনকে মুনাফিকে পরিণত করে, তার হৃদয়কে অসুস্থ করে, অন্তরে পর্দা ফেলে দেয়। অনেক সময় ইসলাম থেকে বের করে কুফর ও বদদ্বীনির দিকে নিয়ে যায়। সাহাবাদের সমালোচনা একসময় খোদ রাসুলুল্লাহর সমালোচনা এবং কুরআন-হাদিসের সমালোচনার পথ উন্মুক্ত করে। এ জন্য আমাদের সালাফে সালেহিন এ ব্যাপারে তাদের আকিদার গ্রন্থগুলোতে সতর্ক করেছেন।

ইমাম আজম রহ. সাহাবাদের ভালোবাসা মুমিন হওয়ার লক্ষণ আর সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ মুনাফিক হওয়ার লক্ষণ সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেন, 'প্রত্যেক মুত্তাকি মুমিন তাদের ভালোবাসে। আর দুর্ভাগা মুনাফিক তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখে।¹৫০৫ তহাবি লিখেন, 'যে ব্যক্তি রাসুলের সাহাবি, তাঁর পূতপবিত্র সহধর্মিনীগণ এবং তাঁর নিষ্কলুষ সন্তানগণের ক্ষেত্রে উত্তম কথা বলে, সে মুনাফিকি থেকে মুক্ত।'¹৫০৬ তহাবি আরও লিখেন, 'আমরা রাসুলুল্লাহর সকল সাহাবিকে ভালোবাসি। তাদের ভালোবাসাকে দ্বীন, ঈমান ও ইহসান আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখাকে কুফর, নিফাক এবং সীমালঙ্ঘন মনে করি।'¹৫০৭

উপরের বক্তব্য থেকে প্রাপ্ত ফলাফল হলো, সাহাবায়ে কেরামের প্রতি বিদ্বেষ সর্বাবস্থায় দুর্ভাগ্যের লক্ষণ বিবেচিত হবে। কারণ, সাহাবাবিদ্বেষীর পরিণতি সুন্দর হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে দুরারোগ্য ও সর্বনাশা ব্যাধি আর নেই। দুনিয়ার বিধান হিসেবে সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ কখনো ফিসক তথা গুনাহ ও নিফাকি বিবেচিত হবে, আবার কখনো কুফর বিবেচিত হবে। অর্থাৎ, যখন ব্যক্তিগত রোষ কিংবা হিংসা বা মতাদর্শিক কারণে কোনো সাহাবিকে অপছন্দ করবে, সাহাবির ব্যাপারে মন্দ বলবে, সেটা পাপ ও মুনাফিকি বিবেচিত হবে। কিন্তু এই হিংসা-বিদ্বেষ যদি কোনো সাহাবির ব্যাপারে এমন কোনো কটুকথা কিংবা সমালোচনার দিকে নিয়ে যায় যা কুরআন ও দ্বীনের মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তবে সেটা কুফর হবে।

উদাহরণস্বরূপ সকল উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে, যদি কেউ আয়েশা রাযি.-এর জীবনের স্বাভাবিক কোনো দিক নিয়ে সমালোচনা করে, তবে সেটা গুনাহ; কুফর নয়। কিন্তু কেউ যদি তাকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে আয়েশার পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন। সুতরাং তাঁর উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করা প্রকারান্তরে কুরআনকে অস্বীকার করা। ইমাম আজম বলেন, 'খাদিজাতুল কুবরার পরে আয়েশা রাযি. জগতের নারীদের ভিতরে সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি মুমিনদের মাতা (উম্মুল মুমিনিন)। ব্যভিচার থেকে পবিত্র। রাফেযিদের অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদি তাকে কেউ ব্যভিচারিণী বলে, তবে সে নিজে ব্যভিচারের ফসল।¹৫০৮

অভিন্ন মূলনীতি অনুযায়ী কেউ যদি আবু বকর রাযি.-এর সমালোচনা করে, তবে সে পাপী ও মুনাফিক বিবেচিত হবে। কিন্তু কেউ যদি তাঁর সাহাবি হওয়া অস্বীকার করে, তবে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, তাঁর সাহাবি হওয়া কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। একইভাবে রাসুলুল্লাহর কোনো সাহাবির প্রতি 'সাহাবি হওয়ার' কারণে বিদ্বেষ রাখলে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। কারণ, সেটা মূলত রাসুলুল্লাহর প্রতি বিদ্বেষ রাখা।

মোটকথা, স্বাভাবিক অবস্থায় সাহাবাদের সমালোচনা ফিসক তথা গুনাহের কাজ বিবেচিত হবে। কিন্তু সমালোচনা যদি কুরআন কিংবা মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা প্রমাণিত কোনো বিষয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিংবা মিথ্যাপ্রতিপন্ন করার নামান্তর হয়, সেটা কুফর হবে। নাসাফি লিখেন, 'সাহাবাদের সমালোচনা যদি (কুরআন-সুন্নাহতে বর্ণিত) কোনো মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, সেটা কুফর গণ্য হবে। যেমন—আয়েশা রাযি.-কে অপবাদ দেওয়া (কারণ, তাতে কুরআনকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করা হয়) কুফর। কিন্তু সাধারণ সমালোচনা গুনাহের কাজ ও বিদআত।'¹৫০৯

টিকাঃ
১৫০৫. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪৪)।
১৫০৬. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (৩০)।
১৫০৭. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২১)।
১৫০৮. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৬১)।
১৫০৯. শরহুল আকায়েদ, তাফতাযানি (১০২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00