📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 দুই. সকল সাহাবি ‘উদুল’ (ন্যায়নিষ্ঠ)

📄 দুই. সকল সাহাবি ‘উদুল’ (ন্যায়নিষ্ঠ)


আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত আকিদা অনুযায়ী সকল সাহাবি উদুল তথা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। তারা ন্যায়নিষ্ঠার প্রতীক। স্বয়ং আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল তাদের প্রশংসা করেছেন। যদি তাদের কারও কাছ থেকে এমন কোনো কাজ প্রকাশ পেয়ে থাকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে যা খারাপ দেখায়, সেটাও ছিল ইজতিহাদের উপর ভিত্তি করে, প্রবৃত্তির দাসত্বে নয়, ইসলাম বা ঈমানের ক্ষতির জন্য নয়। ফলে তারা কোনো ভুল করে থাকলেও দ্রুত তাওবা করে আল্লাহর আরও অধিক প্রিয় হয়ে গিয়েছেন। নিজেদের সম্পর্ক শুধরে নিয়েছেন। দূরত্ব দূর করেছেন। ইমাম আজম একবার ইমাম মুহাম্মাদ বাকেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আলি রাযি. কি উমর রাযি.-এর জানাযায় শরিক হয়েছিলেন?' তিনি বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! তিনি কি বলেননি এই কাফনে ঢাকা মানুষটির সঙ্গে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার চেয়ে অন্য কারও সঙ্গে উপস্থিত হওয়া আমার কাছে প্রিয় নয়? তা ছাড়া, তিনি তার সঙ্গে নিজ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন। যদি তাকে যোগ্য মনে না-ই করতেন, তবে কখনো এটা করতেন? তার মেয়ে ছিলেন জগতের শ্রেষ্ঠ নারীদের একজন।¹⁴⁸⁷

উমর ইবনে আবদিল আযিয রহ.-কে আলি, উসমান, জামাল ও সিফফিন যুদ্ধের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা সেসব রক্ত থেকে আমার হাত রক্ষা করেছেন। তাহলে সেগুলোতে কেন আমার মুখ ডোবাব?¹⁴⁸⁸

হ্যাঁ, আহলে সুন্নাতের মতে, আলি ও মুআবিয়া রাযি.-এর মধ্যকার যুদ্ধে আলি রাযি. ছিলেন হকের উপর। মুআবিয়া রাযি. ভুল করেছেন। এটুকু বলা যাবে। কিন্তু এটা বলতে গিয়ে প্রতিপক্ষের সমালোচনার আশঙ্কা থাকলে এসব আলোচনা সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে। ইমাম আজম বলেন, 'যুদ্ধের ক্ষেত্রে আলি রাযি. সঠিক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করেছে, তারা ভুলের উপর ছিল। তবে আমরা তালহা, যুবাইর, আয়েশা রাযি. প্রমুখ সাহাবির যুদ্ধ সম্পর্কে চুপ থাকব এবং সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব না।¹⁴⁸৯ মক্কি বর্ণনা করেন, ইমাম আজমকে আলি ও মুআবিয়া এবং সিফফিনের শহিদদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, 'এ ব্যাপারে কথা বলতে আমি পরকালে আল্লাহর জবাবদিহিতার ভয় করি। তা ছাড়া, পরকালে আল্লাহ আমাকে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন না। বরং আমাকে আমার আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। তাই সেটা নিয়ে ব্যস্ত থাকাই উত্তম।¹⁴৯০

সুতরাং কোনো যুক্তিতেই সাহাবিদের 'আদালতের' (সত্যনিষ্ঠার) বিরুদ্ধাচার বৈধ নয়। তাদের সমালোচনা বৈধ নয়। ফলে কেউ যদি আলি রাযি.-কে অধিক ভালোবাসে, তার জন্য মুআবিয়া রাযি.-এর সঙ্গে দুশমনি করা বৈধ নয়। তাফতাযানি লিখেন, 'সালাফে সালেহিন এবং পূর্ববর্তী যুগের একজন আলেমও মুআবিয়া রাযি. এবং তাঁর বাহিনীর লোকদের অভিশাপ দেওয়ার বৈধতার কথা বলেননি।¹⁴৯১ গযনবি লিখেন, 'আলি ও মুআবিয়া রাযি.-এর মাঝে যা হয়েছে সেটা ইজতিহাদের উপর ভিত্তি করে হয়েছে। এক্ষেত্রে আলি রাযি. ছিলেন হকের উপর। তবে যেহেতু প্রত্যেকে ইজতিহাদ করেছেন, তাই যার ইজতিহাদ ভুল হয়েছে তিনিও পুণ্যের অধিকারী হবেন।'¹⁴৯২

বরং কেবল সিফফিন নয়, সকল যুদ্ধেই আলি রাযি. ছিলেন হকের উপর। হাসান ইবনে যিয়াদ ইমাম আজম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আলি রাযি. যার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছেন, প্রতিপক্ষের চেয়ে তিনি অধিকতর হকের উপর ছিলেন।' ইমাম আরও বলেন, 'আলি ইবনে আবি তালিব কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে আমাদের হুজ্জত (দলিল)। তিনি না থাকলে আমরা জানতেই পারতাম না বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কীভাবে (আদর্শপূর্ণ) হয়! অথবা আহলে কিবলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ কীভাবে (মহানুভবতাপূর্ণ) হয়।¹⁴৯৩

নাসাফি ইমামের অনুসরণে বলেন, 'জামালের যুদ্ধে আলি রাযি. ছিলেন সঠিক। কারণ, তিনি ছিলেন ইমাম। ফলে অন্যদের জন্য তার আনুগত্য করা জরুরি ছিল। ...একই কথা সিফফিনের ময়দানে আহলে শামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেননা, এখানেও আলি ছিলেন হকের উপর। তা ছাড়া, আলি ও মুআবিয়ার মাঝে ব্যবধান ছিল অনেক। শ্রেষ্ঠত্ব, জ্ঞান, বীরত্ব, কুরবানি, ইসলামের প্রতি অগ্রগামিতা—সর্বক্ষেত্রে আলি রাযি. মুআবিয়া রাযি.-এর চেয়ে সুস্পষ্টভাবে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু মুআবিয়া রাযি. ইজতিহাদ করেছেন। আর সে ক্ষেত্রে ভুল করেছেন। তবে যেহেতু তাবিলের কারণে ভুল করেছেন, এ জন্য তাকে পাপী (ফাসেক) বলার সুযোগ নেই।'¹⁴৯৪

মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল বলখি বলেন, 'মুআবিয়া, খারেজিসহ বিভিন্ন দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আলি রাযি. ছিলেন হকের উপর। যে এটার বিপরীত বলবে, সে বিভ্রান্ত খারেজি গণ্য হবে। তিনি আরও বলেন, তালহা, যুবাইর, আয়েশা রাযি. প্রমুখ (ভুল করেছেন এবং) তাওবা করেছেন। হকের পথে ফিরে এসেছেন। উপরন্তু আয়েশা রাযি. যুদ্ধের জন্য নয়, সন্ধির জন্য এসেছিলেন। তারা সকলে জান্নাতি। আমরা তাদের কেবল উত্তমরূপেই স্মরণ করি।'¹⁴৯৫ কাযি সদর বাযদাবি বলেন, 'আলি রাযি. ছিলেন হকের উপর। মুআবিয়া ছিলেন ভুলের উপর। তবে তিনি ইজতিহাদ করেছেন।’¹⁴৯৬

মোটকথা, সাহাবাদের মাঝে যিনি হকের উপর ছিলেন আর যিনি ভুলের শিকার হয়েছেন, উভয়ই আল্লাহর কাছে সম্মানিত। আল্লাহ উভয়ের উপর সন্তুষ্ট। ফলে তাদের কারও প্রতি বিদ্বেষ রাখা যাবে না, কারও সমালোচনা করা যাবে না। ইমাম গাযালি লিখেন, কুরআন ও সুন্নাহ সাহাবায়ে কেরামের শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষী। সংঘবদ্ধভাবে যেমন তাদের প্রশংসা করা হয়েছে, স্বতন্ত্রভাবেও তাদের প্রত্যেকের প্রশংসা করা হয়েছে। সুতরাং সাহাবাদের ব্যাপারে এসব আকিদা মনে রাখা দরকার। তাদের ব্যাপারে মনে কখনোই কুধারণা স্থান দেওয়া যাবে না। হ্যাঁ, তাদের ব্যাপারে কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো সুধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক; কিন্তু সেসব বর্ণনার অধিকাংশিই তাদের শত্রুদের মনগড়া ও ভিত্তিহীন। আর যেগুলো প্রমাণিত, সেগুলোও বিভিন্ন ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। সেসব জায়গায় ভুলভ্রান্তি হওয়া অসম্ভব ছিল না। ফলে তারা ভুল করলেও তাদের উদ্দেশ্য কল্যাণকর ছিল। তাই তাদের ব্যাপারে সুধারণা রাখা আবশ্যক।¹⁴৯৭

টিকাঃ
১৪৮৭. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৮)।
১৪৮৮. তাবাকাতে ইবনে সাদ (৭/৩৮২)।
১৪৮৯. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৮)।
১৪৯০. মানাকিব, মক্কি (৩৪৭)।
১৪৯১. শরহুল আকায়েদ, তাফতাযানি (১০৩)।
১৪৯২. উসুলুদ্দিন, গযনবি (২৯৪-২৯৫)।
১৪৯৩. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৫৯- ১৬০)।
১৪৯৪. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১১৬৬-১১৬৭, ১১৭২)।
১৪৯৫. আল-ইতিকাদ, বলখি (১০৯)।
১৪৯৬. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২০৩)।
১৪৯৭. দেখুন: আল-ইকতিসাদ ফিল ইতিকাদ (১৭৩; দারু কুতাইবা) [১৩১; দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ]।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 তিন. সকল সাহাবাকে ভালোবাসা। কারও সমালোচনা না করা। কারও প্রতি বিদ্বেষ না রাখা।

📄 তিন. সকল সাহাবাকে ভালোবাসা। কারও সমালোচনা না করা। কারও প্রতি বিদ্বেষ না রাখা।


কাউকে ভালোবাসা আর কারও সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করা থেকেই সকল অন্যায় ও সীমালঙ্ঘনের উৎপত্তি। ফলে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে ভালোবাসা কর্তব্য। ইমাম আজম আবু হানিফা রহ. বলেন, 'আমরা সকল সাহাবির প্রতি ভালোবাসার সম্পর্ক রাখি, ভালোর সঙ্গে তাদের স্মরণ করি।'¹⁴৯৮ আল-ফিকহুল আবসাতে এসেছে, ইমাম বলেন, 'আমরা রাসুলুল্লাহর (ﷺ) কোনো সাহাবি থেকে নিজেদের মুক্ত ও সম্পর্কহীন ঘোষণা করি না। আমরা তাদের কাউকে ভালোবেসে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ রাখি না।¹⁴৯৯

ইবনে আবদিল বার ইমামপুত্র হাম্মাদ থেকে বর্ণনা করেন, ইমাম বলেছেন : (আহলে সুন্নাত ওয়াল) জামাত হলো : আবু বকর, উমর, আলি ও উসমানকে শ্রেষ্ঠ বলা, রাসুলের কোনো সাহাবির সমালোচনা না করা, গুনাহের কারণে কাউকে কাফের না বলা, প্রত্যেক মুমিনের জানাযা পড়া, প্রত্যেক মুমিনের পিছনে নামায পড়া, মোজার উপর মাসাহ করা, তাকদিরের ভালোমন্দ আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়া এবং আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে কথা বলা পরিত্যাগ করা।¹৫০০

এটাই ইমাম আজমের সকল শাগরেদ এবং তাদের পরবর্তী সকল হানাফি আলেমের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'তোমরা বিভ্রান্ত ও তর্কপ্রিয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিতর্ক করো না। চারটি বিষয় মনে রাখতে পারলে তোমরা এই উম্মতের প্রথম প্রজন্ম যে পথে ছিল সে পথে থাকতে পারবে : (এক.) তাকদিরের ভালোমন্দ সবকিছুতে বিশ্বাস রাখবে। (দুই.) গুনাহের কারণে কোনো মুসলিমকে কাফের বলবে না। (তিন.) নিজেদের ঈমানের মাঝে সন্দেহ করবে না। (চার.) আল্লাহর রাসুলের কোনো সাহাবির সমালোচনা করবে না।¹৫০১

আবু হাফস আল কাবির (তাঁর শায়খ) ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান শাইবানি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'তোমরা আল্লাহর রাসুলের সাহাবাদের ব্যাপারে ভালো ব্যতীত কোনো মন্দ কথা বলো না।'¹৫০২

আবু হাফস বলেন, 'আহলে সুন্নাতের নীতি হলো রাসুলুল্লাহর সাহাবাদের ব্যাপারে মন্দ কথা না বলা, তাদের সমালোচনা না করা। যে ব্যক্তি তাদের নামে মন্দ বলবে, সে পথভ্রষ্ট ও বিদআতি।'¹৫০৩

আবুল লাইস সমরকন্দি লিখেন, 'আমরা রাসুলুল্লাহর কোনো সাহাবি থেকে নিজেদের সম্পর্কহীন ঘোষণা করি না। এটা রাফেযি সম্প্রদায়ের নীতি। তারা আলি রাযি. ছাড়া অন্য সাহাবিদের থেকে নিজেদের মুক্ত ঘোষণা করে। অথচ রাসুলুল্লাহ তাঁর সকল সাহাবির প্রশংসা করেছেন। যেমন—আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেন, 'আমার সাহাবিরা আকাশের তারার মতো। তাদের ভিতর থেকে তোমরা যার অনুসরণ করবে, হেদায়াত পাবে।' শিয়াদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হলো, শিয়ারা সকল সাহাবিকে বাদ দিয়ে কেবল আলিকে মহব্বত করে; তাকে নিজেদের বন্ধু ও অভিভাবক ঘোষণা করে। কিন্তু আমরা সকল সাহাবিকে মহব্বত করি।¹৫০৪

টিকাঃ
১৪৯৮. আল-ফিকহুল আকবার (৪-৫)।
১৪৯৯. আল-ফিকহুল আবসাত (৪০)।
১৫০০. আল-ইনতিকা (৩১৫)।
১৫০১. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১২৪)।
১৫০২. প্রাগুক্ত (১২২, ১২৪)।
১৫০৩. আস-সাওয়াদুল আজম (২৬)।
১৫০৪. শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (১০)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 চার. সাহাবাদের সমালোচনা কখনো পাপ, কখনো কুফর

📄 চার. সাহাবাদের সমালোচনা কখনো পাপ, কখনো কুফর


সাহাবাদের প্রতি ভালোবাসা স্রেফ মুস্তাহাব আমল নয়। সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ ও সমালোচনা থেকে বেঁচে থাকা নফল কাজ নয়। এমন নয় যে, মনে চাইলে করা হবে, মনে না চাইলে করা হবে না; বরং এগুলো দ্বীনের জন্য আবশ্যক। ইসলামি আকিদার অংশ। কারণ, সাহাবাদের প্রতি ভালোবাসা মানুষকে সাধারণ মুমিন থেকে ওলি-আউলিয়া ও সিদ্দিকদের স্তরে উন্নীত করে। অপরদিকে সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ একজন মুমিনকে মুনাফিকে পরিণত করে, তার হৃদয়কে অসুস্থ করে, অন্তরে পর্দা ফেলে দেয়। অনেক সময় ইসলাম থেকে বের করে কুফর ও বদদ্বীনির দিকে নিয়ে যায়। সাহাবাদের সমালোচনা একসময় খোদ রাসুলুল্লাহর সমালোচনা এবং কুরআন-হাদিসের সমালোচনার পথ উন্মুক্ত করে। এ জন্য আমাদের সালাফে সালেহিন এ ব্যাপারে তাদের আকিদার গ্রন্থগুলোতে সতর্ক করেছেন।

ইমাম আজম রহ. সাহাবাদের ভালোবাসা মুমিন হওয়ার লক্ষণ আর সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ মুনাফিক হওয়ার লক্ষণ সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেন, 'প্রত্যেক মুত্তাকি মুমিন তাদের ভালোবাসে। আর দুর্ভাগা মুনাফিক তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখে।¹৫০৫ তহাবি লিখেন, 'যে ব্যক্তি রাসুলের সাহাবি, তাঁর পূতপবিত্র সহধর্মিনীগণ এবং তাঁর নিষ্কলুষ সন্তানগণের ক্ষেত্রে উত্তম কথা বলে, সে মুনাফিকি থেকে মুক্ত।'¹৫০৬ তহাবি আরও লিখেন, 'আমরা রাসুলুল্লাহর সকল সাহাবিকে ভালোবাসি। তাদের ভালোবাসাকে দ্বীন, ঈমান ও ইহসান আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখাকে কুফর, নিফাক এবং সীমালঙ্ঘন মনে করি।'¹৫০৭

উপরের বক্তব্য থেকে প্রাপ্ত ফলাফল হলো, সাহাবায়ে কেরামের প্রতি বিদ্বেষ সর্বাবস্থায় দুর্ভাগ্যের লক্ষণ বিবেচিত হবে। কারণ, সাহাবাবিদ্বেষীর পরিণতি সুন্দর হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে দুরারোগ্য ও সর্বনাশা ব্যাধি আর নেই। দুনিয়ার বিধান হিসেবে সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ কখনো ফিসক তথা গুনাহ ও নিফাকি বিবেচিত হবে, আবার কখনো কুফর বিবেচিত হবে। অর্থাৎ, যখন ব্যক্তিগত রোষ কিংবা হিংসা বা মতাদর্শিক কারণে কোনো সাহাবিকে অপছন্দ করবে, সাহাবির ব্যাপারে মন্দ বলবে, সেটা পাপ ও মুনাফিকি বিবেচিত হবে। কিন্তু এই হিংসা-বিদ্বেষ যদি কোনো সাহাবির ব্যাপারে এমন কোনো কটুকথা কিংবা সমালোচনার দিকে নিয়ে যায় যা কুরআন ও দ্বীনের মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তবে সেটা কুফর হবে।

উদাহরণস্বরূপ সকল উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে, যদি কেউ আয়েশা রাযি.-এর জীবনের স্বাভাবিক কোনো দিক নিয়ে সমালোচনা করে, তবে সেটা গুনাহ; কুফর নয়। কিন্তু কেউ যদি তাকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে আয়েশার পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন। সুতরাং তাঁর উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করা প্রকারান্তরে কুরআনকে অস্বীকার করা। ইমাম আজম বলেন, 'খাদিজাতুল কুবরার পরে আয়েশা রাযি. জগতের নারীদের ভিতরে সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি মুমিনদের মাতা (উম্মুল মুমিনিন)। ব্যভিচার থেকে পবিত্র। রাফেযিদের অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদি তাকে কেউ ব্যভিচারিণী বলে, তবে সে নিজে ব্যভিচারের ফসল।¹৫০৮

অভিন্ন মূলনীতি অনুযায়ী কেউ যদি আবু বকর রাযি.-এর সমালোচনা করে, তবে সে পাপী ও মুনাফিক বিবেচিত হবে। কিন্তু কেউ যদি তাঁর সাহাবি হওয়া অস্বীকার করে, তবে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, তাঁর সাহাবি হওয়া কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। একইভাবে রাসুলুল্লাহর কোনো সাহাবির প্রতি 'সাহাবি হওয়ার' কারণে বিদ্বেষ রাখলে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। কারণ, সেটা মূলত রাসুলুল্লাহর প্রতি বিদ্বেষ রাখা।

মোটকথা, স্বাভাবিক অবস্থায় সাহাবাদের সমালোচনা ফিসক তথা গুনাহের কাজ বিবেচিত হবে। কিন্তু সমালোচনা যদি কুরআন কিংবা মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা প্রমাণিত কোনো বিষয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিংবা মিথ্যাপ্রতিপন্ন করার নামান্তর হয়, সেটা কুফর হবে। নাসাফি লিখেন, 'সাহাবাদের সমালোচনা যদি (কুরআন-সুন্নাহতে বর্ণিত) কোনো মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, সেটা কুফর গণ্য হবে। যেমন—আয়েশা রাযি.-কে অপবাদ দেওয়া (কারণ, তাতে কুরআনকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করা হয়) কুফর। কিন্তু সাধারণ সমালোচনা গুনাহের কাজ ও বিদআত।'¹৫০৯

টিকাঃ
১৫০৫. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪৪)।
১৫০৬. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (৩০)।
১৫০৭. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২১)।
১৫০৮. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৬১)।
১৫০৯. শরহুল আকায়েদ, তাফতাযানি (১০২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00