📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আশারায়ে মুবাশশারা তথা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন

📄 আশারায়ে মুবাশশারা তথা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন


শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে চার খলিফার পরে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন আশারায়ে মুবাশশারা বা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবি। ইমাম আজম আবদুল মালেক সূত্রে সাইদ ইবনে যায়দ রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘দশ জন জান্নাতে—আবু বকর জান্নাতে, উমর জান্নাতে, উসমান জান্নাতে, আলি জান্নাতে, তালহা জান্নাতে, যুবাইর জান্নাতে, সাইদ জান্নাতে, আবদুর রহমান ইবনে আউফ জান্নাতে, আবু উবাইদা জান্নাতে। তাকে বলা হলো, আপনি? তখন তিনি কাঁদতে লাগলেন।

সাইদ বিন যায়দ রাযি. একবার কুফার এক মসজিদে গেলেন। গিয়ে দেখলেন, একব্যক্তি সেখানে কাউকে গালি দিচ্ছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, সে কাকে গালি দিচ্ছে? লোকজন বলল, আলিকে! তিনি বললেন, আল্লাহর রাসুলের সাহাবিকে গালি দেওয়া হচ্ছে আর তোমরা নীরব? কোনো প্রতিবাদ করছ না? আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি না বললে আমি এটা বলতাম না; কারণ, কাল কিয়ামতের দিন তিনি আমাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন, 'আবু বকর জান্নাতে, উমর জান্নাতে, উসমান জান্নাতে, আলি জান্নাতে, তালহা জান্নাতে, যুবাইর ইবনুল আওয়াম জান্নাতে, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস জান্নাতে, আবদুর রহমান ইবনে আউফ জান্নাতে। দশম জনের নামও আমি জানি।' লোকজন বলল, আপনি? তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' অতঃপর তিনি বললেন, 'রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে তাদের কারও আল্লাহর পথে ধুলোয় ধূসরিত একটি লড়াই তোমাদের নুহের মতো দীর্ঘ জীবনের চেয়ে উত্তম।'

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, জান্নাতের সুংসবাদপ্রাপ্ত সাহাবা মাত্র এই দশজনই। বরং তাদের বাইরে অসংখ্য সাহাবা জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছেন। যেমন—ইমাম আজম নিজস্ব সনদে হাদিস বর্ণনা করেছেন, যেখানে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি আয়েশা রাযি.-কে লক্ষ্য করে বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, 'আয়েশা জান্নাতে। আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে জাহান্নামের কোনো অঙ্গার জীবনসঙ্গিনী হিসেবে দান করবেন এরচেয়ে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে।'

তাই বরং অসংখ্য সাহাবিকেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। কিন্তু তাদের মাঝে এই দশজন শ্রেষ্ঠ, শীর্ষস্থানীয়, অধিকতর প্রসিদ্ধ এবং ইসলামের খেদমতে তাদের অবদান সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাদের দশজনকে একসঙ্গে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। এ জন্য তারা অধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন।

টিকাঃ
১৪৭৮. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৯-৩০)। আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৮)।
১৪৭৯. আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৬৪৯)। মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল (মুসনাদুল আশারাহ আল- মুবাশশারিন বিল জান্নাহ: ১৬৫১)।
১৪৮০. শরহু মুসনাদে আবি হানিফা (৪১৭)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 সাহাবাদের ব্যাপারে নাসেবি ও রাফেযিদের সীমালঙ্ঘন

📄 সাহাবাদের ব্যাপারে নাসেবি ও রাফেযিদের সীমালঙ্ঘন


সাহাবাগণ এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। কিন্তু তারা মাসুম ছিলেন না। ফলে মানুষ যেমন ভুল করে, তাদের কেউ কেউ ভুল করেছেন, বিচ্যুতির শিকার হয়েছেন। কিন্তু সাহাবা আর আমাদের মাঝে পার্থক্য হলো—তারা ভুলের পরে আল্লাহর আরও কাছাকাছি চলে যেতেন, তাদের মর্যাদা আগের চেয়ে আরও সমুন্নত হতো। এটা মূলত তাদের ইখলাস, তাওবা, অনুতাপ-অনুশোচনা ও লিল্লাহিয়্যাতের কারণে। বিপরীতে সাধারণ মানুষ একবার গুনাহে লিপ্ত হলে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে তার কেবল দূরত্বই তৈরি হয়। শয়তানের পিছনে ছুটতে থাকে।

মোটকথা, সাহাবাগণ মানবিক কারণে ভুল করেছেন। বরং রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরে তাদের বড় বড় সংকট তৈরি হয়েছে। তারা পারস্পরিক একাধিক যুদ্ধে জড়িয়েছেন। যেমন—রাসুলুল্লাহর প্রিয়তমা স্ত্রী আয়েশা রাযি. এবং রাসুলের জামাতা আলি (রা)-এর মাঝে সংঘটিত হওয়া জামাল যুদ্ধ। আলি রাযি. ও মুআবিয়া রাযি.-এর মাঝে সংঘটিত সিফফিন যুদ্ধ। এসব যুদ্ধে অসংখ্য বড় বড় সাহাবিও জড়িয়ে পড়েন। অনেক সাহাবি তাতে শাহাদাত বরণ করেন!

এসব দুর্ঘটনা পরবর্তী মুসলিম উম্মাহর জন্য ফেতনা (পরীক্ষা) হয়ে দাঁড়ায়। তারা রাসুলুল্লাহর সাহাবাদের এসব যুদ্ধের আলোকে বিচার করা শুরু করে। একদল সাহাবার প্রতি ভালোবাসার দাবিতে তাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে অন্য দলের প্রতিপক্ষ হয়ে যায়। তাদের দুনিয়ালোভী, ফাসেক, ফাজের এমনকি কাফের বানিয়ে ফেলে। এভাবে একদল ভালোবাসার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের প্রতিপক্ষের শত্রু হয়ে পড়ে! অথচ তারা সবাই ভুলে যায় সাহাবাদের প্রশংসা করেছেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসুল। আল্লাহ কি জানতেন না যে, রাসুলুল্লাহর পরে সাহাবাগণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন, বিভিন্ন ধরনের সংকট তাদের ঘিরে ধরবে, তাদের কেউ কেউ ভুল করবেন? তিনি সবকিছু জানতেন। তবুও তাদের তাকওয়া, নিষ্ঠা ও সন্তুষ্টির সনদ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ওহির মাধ্যমে ভবিতব্য এসব ঘটনা জানতে পেরেছিলেন। তবুও তিনি বলে গিয়েছেন, ‘আমার প্রজন্ম সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম।’ আবু সাইদ খুদরি রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন—‘তোমরা আমার সাহাবাদের গালি দিয়ো না। কারণ, তোমাদের কেউ উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ ব্যয় করলেও তাদের একজনের এক মুষ্টি সমপরিমাণ হবে না।’

সাহাবাদের ব্যাপারে ইনসাফপূর্ণ পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়িতে লিপ্ত হয়েছে একাধিক প্রান্তিক গোষ্ঠী। মোটাদাগে তাদের দুইভাগে ভাগ করা যায়—এক. খারেজি নাসেবি, যারা আলি ও আহলে বাইতের সাহাবাদের বিদ্বেষে সীমালঙ্ঘন করেছে। দুই. শিয়া-রাফেযি, যারা আহলে বাইতের বাইরে অন্য সকল সাহাবির প্রতি বিদ্বেষে সীমালঙ্ঘন করেছে। সাহাবাসংক্রান্ত আলোচনায় ইমাম আজম রহ. একাধিক জায়গায় এই দুই প্রান্তিক সম্প্রদায়ের বিরোধিতা করেছেন এবং দুই প্রান্তিকতার মাঝে আহলে সুন্নাতের ভারসাম্যপূর্ণ মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেছেন। রাফেযিরা মনে করে—আবু বকর, উমর ও উসমানসহ অন্য সাহাবিরা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাতের পরে মুরতাদ হয়ে গিয়েছেন, তাঁর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলেছেন! ইমাম তাদের খণ্ডনে বলেন, ‘নবিদের পরে সর্বোত্তম মানুষ হলেন আবু বকর সিদ্দিক রাযি., এরপর উমর ফারুক ইবনুল খাত্তাব রাযি., এরপর উসমান যুন নুরাইন ইবনে আফফান রাযি., এরপর আলি মুরতাযা ইবনে আবি তালিব রাযি.। তারা সকলেই ছিলেন ইবাদতকারী, হকের উপর অবিচল।' ফলে রাসুলুল্লাহর পরে তাদের পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার দাবি সর্বৈব মিথ্যা। এই দুই প্রান্তিকতার মাঝামাঝি আহলে সুন্নাতের অবস্থান।

টিকাঃ
১৪৮১. বুখারি (কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবাহ: ৩৬৫০)। মুসলিম (কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবা: ২৫৩৩)।
১৪৮২. বুখারি (কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবাহ: ৩৬৭৩)। তিরমিযি (আবওয়াবুল মানাকিব: ৩৮৬১)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৬৫)। আবু হুরাইরা থেকে মুসলিম (কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবা: ২৫৪০)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সুন্নাহ: ১৬১)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আহলে বাইতকে ভালোবাসা শিয়া হওয়া নয়

📄 আহলে বাইতকে ভালোবাসা শিয়া হওয়া নয়


আহলে বাইতের প্রতি আহলে সুন্নাতের অনুসারীরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করলেও এক্ষেত্রে অনেক সময় বিচ্যুতি দেখা যায়। অর্থাৎ, অনেকে মধ্যমপন্থা অবলম্বন বলতে অন্যান্য সাহাবির মতো তাদের সমান ভালোবাসা বোঝে। তাদের প্রতি একটু বেশি ভালোবাসাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। অথচ আহলে বাইত রাসুলুল্লাহর পরিবার। ফলে তাদের নিজের চেয়ে, নিজের পরিবারের চেয়ে বেশি ভালোবাসা কর্তব্য। জীবনের শেষ লগ্নে তথা বিদায় হজ থেকে প্রত্যাবর্তনকালে 'গদিরে খুম্ম' অঞ্চলে প্রদত্ত ঐতিহাসিক খুতবায় রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তিনবার সাহাবাদের বললেন, 'আমি তোমাদের আমার পরিবারের ব্যাপারে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।'¹৫১০

সুতরাং রাসুলুল্লাহর চলে যাওয়ার পরে কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর পরিবারের দেখাশোনার দায়িত্ব উম্মাহর কাঁধে। আহলে বাইতের প্রতি কারও গভীর ভালোবাসা ও আকর্ষণ থাকলে সেটাকে মোটেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা যাবে না। হ্যাঁ, ভালোবাসার নামে যদি অতিরঞ্জন করা হয়, সুন্নাহবিরোধী কোনো কথা বা কাজ করা হয়, সেটা ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু অন্য সাহাবিদের প্রতি বিদ্বেষ না রেখে আহলে বাইতের প্রতি অধিকতর মহব্বত ও দুর্বলতার মাঝেও ষড়যন্ত্র কিংবা 'শিয়াবাদ' সন্ধান করা অনুচিত। এটা একটা পুরোনো রোগ। যুগে যুগে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের হাতে বিভিন্ন মাত্রায় প্রকাশ পেয়েছে। যেমন—ইমাম আজমের ক্ষেত্রেও এ ধরনের লোকেরা অভিন্ন আচরণ করেছে। সাহাবায়ে কেরাম বিশেষত আহলে বাইতের প্রতি ইমামের অত্যধিক মহব্বতের কারণে একদল মানুষ তাকে শিয়া হওয়ার অপবাদ দিয়েছে! অথচ তিনি এমন অপবাদ থেকে মুক্ত।

আহলে বাইত, বিশেষত আলি রাযি.-এর প্রতি তাঁর মহব্বতের একাধিক উদাহরণ পিছনে আমরা উল্লেখ করেছি। সেখানে দেখেছি তিনি আলি রাযি.-এর নাম উসমান রাযি.-এর নামের আগে কিংবা একসঙ্গে রাখতেন। যদিও মর্যাদার দিক থেকে তিনি আহলে সুন্নাতের অনুসরণে আলিকে পরে রাখতেন, কিন্তু মহব্বত করতেন অনেক বেশি। ফলে কেউ যেন আলির প্রতি বিরূপ ধারণা না রাখে, সে জন্য তিনি কখনো কখনো তাকে উসমান রাযি.-এর আগে উল্লেখ করতেন! বরং তিনি বলতেন, 'আলি আমাদের কাছে উসমানের চেয়ে বেশি প্রিয়।¹৫১১

আলি রাযি.-এর প্রতি এই ভালোবাসা ইমাম থেকে বারংবার প্রকাশ পেয়েছে। সালম ইবনে সালেম বলেন, আবু হানিফা রহ. একবার উপস্থিত লোকদের লক্ষ্য করে বলেন, 'তোমরা কি জানো আহলে বসরা কেন আমাদের অপছন্দ করে?' সবাই বলল, না। ইমাম বললেন, 'কারণ, আমরা যদি সিফফিনের ময়দানে উপস্থিত থাকতাম, তবে মুআবিয়ার বিপরীতে আলির শিবিরে যোগ দিতাম! এ কারণে তারা আমাদের পছন্দ করে না।¹৫১২

উক্ত বর্ণনায় হক ও আহলে বাইত দুটোর প্রতি ইমাম আজমের নিবেদিতপ্রাণ হওয়া প্রকাশ পায়। কারণ, আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মতিক্রমে আলি ও মুআবিয়া রাযি.-এর মধ্যে সৃষ্ট সংকটে আলি রাযি. ছিলেন হকের উপর, আর মুআবিয়া রাযি. ইজতিহাদি ভুলের শিকার ছিলেন। অপরদিকে আলি রাযি. মর্যাদায় মুআবিয়া রাযি.-এর অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন। তিনি ছিলেন সেই মানুষ যার ব্যাপারে নবিজি বলে গিয়েছেন, ' তোমাকে কেবল মুমিনই ভালোবাসে, কেবল মুনাফিকই তোমাকে ঘৃণা করে।¹৫১৩ ফলে তাঁর শিবিরে থাকা যেকোনো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারীর প্রত্যাশা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এতে তাকে শিয়া হতে হবে না।

আলি রাযি.-এর পরে তাঁর বংশধর তথা আহলে বাইতের প্রতিটি সদস্যের সঙ্গে ইমাম আজমের গভীর মহব্বতপূর্ণ ও মজবুত সম্পর্ক অব্যাহত ছিল। সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আহলে বাইতের পাশে ছিলেন তিনি। উমাইয়া ও আব্বাসি শাসকদের প্রতি তিনি বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি রাখতেন। কেবল এটুকু নয়—যেমনটা পিছনে বলা হয়েছে—তিনি জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহগুলোতে আহলে বাইতের সদস্যদের প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছেন। অর্থ, ফাতাওয়া, পরামর্শ ও দোয়ার মাধ্যমে সহায়তা অব্যাহত রেখেছেন। কখনোই নিজের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে শাসকের সঙ্গ দেননি। যায়দ ইবনে আলি বিদ্রোহ করলে তিনি তার কাছে দশ হাজার দিরহাম অর্থ পাঠিয়ে বলেন, 'এটা আপনার সংগ্রামে কাজে লাগান।' নিজেও অংশগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু হুসাইন রাযি.-এর মতো যায়দ ইবনে আলির সঙ্গেও কুফাবাসীর গাদ্দারির আশঙ্কায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন (এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর আশঙ্কাই বাস্তবায়িত হয়েছিল)। অন্য বর্ণনায় আছে, তাঁর কাছে মানুষের আমানত গচ্ছিত ছিল। এগুলো ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া শহিদ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি যায়দ ইবনে আলির সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। ইবরাহিম ইবনে সুওয়াইদ বলেন, আমি আবু হানিফাকে ইবরাহিম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হাসানের (বিদ্রোহের) ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করি, আপনার কাছে হজ উত্তম, নাকি এটা (অর্থাৎ, তার বিদ্রোহে শরিক হওয়া)? তিনি বলেন, 'ফরয হজের পরে একটি যুদ্ধে শরিক হওয়া পঞ্চাশটি হজের চেয়ে উত্তম।'¹৫১৪

ফলে শরয়ি সীমার ভিতরে থেকে আহলে বাইত কিংবা আলি রাযি.-এর প্রতি মহব্বত থাকার কারণে কাউকে শিয়া বলা ভ্রান্ত নাসেবিদের বৈশিষ্ট্য। এটাকে গুরুত্ব দেওয়া যাবে না। বরং যুগে যুগে আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসাবঞ্চিত নাসেবিয়্যাতের বাতাসলাগা কিছু মানুষ এটা করেছে। যে-ই রাসুলুল্লাহর পরিবারের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়েছে, তাকেই তারা রাফেযি আখ্যা দিয়েছে। যেমন—ইমাম আজমের সঙ্গে এটা হয়েছে। তাঁর পরে শাফেয়ির সঙ্গেও হয়েছে। আবু নুআইম বর্ণনা করেন, শাফেয়ি রহ. আহলে বাইতকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন, পছন্দ করতেন। ফলে কিছু মানুষ তার সমালোচনা করে। কেউ কেউ তাকে রাফেযি বানিয়ে দেয়। তখন তিনি বলেন, যদি মুহাম্মাদের পরিবারকে ভালোবাসলে 'রাফেযি' হতে হয়, তবে জিন ও ইনসান সাক্ষী থাকুক, আমি রাফেযি।¹৫১৫

ইমাম আজমের ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে। আহলে বাইতের প্রতি ইমামের ভালোবাসাকে কিছু লোক ভুল বুঝেছেন কিংবা ভুল শব্দে ব্যক্ত করেছেন। তারা ইমাম আজমকে শিয়া আখ্যা দিয়েছেন। হ্যাঁ, যদিও প্রাচীন পরিভাষায় আলি রাযি. এবং আহলে বাইতের প্রতি মহব্বতকে 'তাশাইউ' নাম দেওয়া হতো, তথাপি ইমাম আজমের উপর এ ধরনের শব্দপ্রয়োগ উচিত নয়। কারণ, আহলে বাইতকে কেউ মহব্বত করলেই সে প্রচলিত অর্থে শিয়া হয়ে যাবে—এটা ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক ব্যাপার। বরং প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আহলে বাইতকে ভালোবাসা অপরিহার্য। তাহলে তো সবাইকে শিয়া বলতে হবে! নবিপরিবারের সদস্যগণ—যাদের প্রতি ইমাম আজম রহ. অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং যাদের সঙ্গে গভীর সম্পর্কে জড়িত ছিলেন, যেমন: জাফর আস-সাদেক এবং মুহাম্মাদ আল বাকের প্রমুখ—তারাও কেউ প্রচলিত অর্থে শিয়া (রাফেযি) ছিলেন না; বরং ইমাম আজম রহ. শিয়া ও রাফেযিদের বিভিন্ন ভ্রান্ত আকিদা খণ্ডন করেছেন। আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদসহ ইমামের অন্যান্য শাগরেদও শিয়াদের প্রচণ্ড বিরোধী ছিলেন। আলি রাযি. এবং আহলে বাইতের প্রতি গভীর মহব্বত ও ভালোবাসা সত্ত্বেও তারা তাদের ব্যাপারে কখনো শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করতেননা, যেমনটা শিয়া ও রাফেযিরা করেছে। ভালোবাসার পাশাপাশি যেকোনো ক্ষুদ্র সীমালঙ্ঘন এবং লঘু বিচ্যুতির ব্যাপারেও সমান সতর্ক থাকতেন। আলি রাযি.-কে নিয়ে যেন মানুষ বাড়াবাড়ি না করে, এ জন্য ইমাম আজম বলতেন, “নবি-রাসুল ও ফেরেশতা ব্যতীত অন্য কারও উপর সালাম পাঠ করা (অর্থাৎ, 'আলাইহিস সালাম' বলা) যাবে না।” ইমাম মুহাম্মাদও এটাকে মাকরুহ বলতেন। আলি রাযি. বা ফাতিমা রাযি.-এর নামের শেষে 'আলাইহিস সালাম' বলা কোনো মারাত্মক বিচ্যুতি নয়। বরং আহলে বাইতের প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসার কারণে তারা এটাকে বৈধ বলবেন—এটাই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু তারা আবেগের কাছে শরিয়তকে ভূলুণ্ঠিত হতে দিতেন না। বরং ইমাম আবু ইউসুফ বলেন, 'কেউ যদি বলে, আমি রাসুলুল্লাহর কোনো সাহাবিকে গালি দিই না, কিন্তু আলি রাযি. বাকি সবার চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয়, তবে এই লোকের মাঝে সমস্যা আছে এবং তাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হবে।' মহব্বত ও শরিয়তের মাঝে ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের ইমামদের আদর্শ দেখুন!

ইমাম আজম শিয়া হবেন তো দূরের কথা, বরং শিয়াদের সাহাবাবিদ্বেষের কারণে তিনি তাদের সঙ্গে সুস্পষ্ট সম্পর্কহীনতার ঘোষণা করেন। তাদের উপর অনাস্থা প্রকাশ করেন। তাদের কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করতে নিষেধ করেন। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক থেকে বর্ণিত, নুহ ইবনে আবু মারইয়াম ইমামকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কার কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করব? তিনি বললেন, 'প্রত্যেক ইনসাফগার সত্যে অবিচল (আদল) ব্যক্তির কাছ থেকে গ্রহণ করো। তবে রাফেযিদের কাছ থেকে গ্রহণ করো না। কেননা, তাদের মাযহাবের ভিত্তিই হচ্ছে নবিজির সাহাবাদের গোমরাহ বলা। আবু বকর ও উমরকে শ্রেষ্ঠ বলো। আলি ও উসমানকে ভালোবেসো। তাদের যে ভালো না বাসে, তার কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করো না।'¹৫১৭

ইমাম রাফেযিদের খণ্ডনে আরও বলেন, খাদিজাতুল কুবরার পরে আয়েশা রাযি. জগতের নারীদের ভিতরে সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি মুমিনদের মাতা (উম্মুল মুমিনিন)। ব্যভিচার থেকে পূত ও পবিত্র। রাফেযিদের অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদি তাকে কেউ ব্যভিচারিণী বলে, তবে সে নিজে ব্যভিচারের ফসল।¹৫১৮

ফলে ইমামকে শিয়া সাব্যস্ত করার কোনো সুযোগ নেই, শাব্দিক অর্থের প্রতি লক্ষ রেখেও নয়। বিশেষত আহলে সুন্নাত থেকে শিয়া সম্প্রদায়ের সুস্পষ্ট বিভাজন প্রকাশ হওয়ার পরে এবং এটা পরবর্তী সময়ে রাফেযিদের একক পরিচয়বোধক নামে পরিণত হওয়ার ফলে আহলে সুন্নাতের কারও উপর 'শিয়া' লকব প্রয়োগ করা বাস্তবতাবিবর্জিত বক্তব্য। ইমামের উপর 'মুরজিয়া' শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রেও পিছনে আমরা আহলে সুন্নাতের একই মূলনীতির কথা উল্লেখ করেছি।

সমকালীনদের মাঝে মিসরীয় লেখক আবু যাহরা তাঁর ইমাম আজমের জীবনী গ্রন্থের বিভিন্ন জায়গায় ইমামকে 'আহলে বাইতের প্রতি মহব্বত ও অনুরাগ' অর্থে শিয়া বলেছেন। কিন্তু সঠিক কথা হলো, এই অর্থেও তাঁর উপর শিয়া শব্দ প্রয়োগ বিশুদ্ধ নয়। বরং অসম্ভব নয় যে, উক্ত লেখক শিয়াদের কারও বক্তব্যও গ্রহণ করে থাকবেন। কারণ, ইমাম আজম রহ.-কে শিয়া বলা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে মুরজিয়ারা যেমন তাকে মুরজিয়া দাবি করেছে, শিয়ারাও তাকে শিয়া দাবি করেছে। তাদের একজন ছিলেন আবুল ফযল সুলাইমানি। যাহাবি রহ. তাকে খণ্ডন করে লিখেন, 'আবু ফযল সুলাইমানি নুমান ইবনে সাবেত, শুবা ইবনুল হাজ্জাজ, আবদুর রাযযাক, আবদুর রহমান ইবনে আবি হাতেম প্রমুখকে শিয়া মুহাদ্দিসদের তালিকায় উল্লেখ করেছে। এটা জঘন্য কাজ।'¹৫১৯

টিকাঃ
১৫১০. মুসলিম (ফাযায়িলুস সাহাবাহ: ২৪০৮)। সুনানে কুবরা, নাসায়ি (কিতাবুল মানাকিব : ৮১১৯)। সহিহ ইবনে খুযাইমা (কিতাবুয যাকাত: ২৩৫৭)।
১৫১১. দেখুন: মানাকিব, মক্কি (৩৪৩, ২৫৯)। কাশফুল আসার, হারেসি (১/১৪৬-১৪৭)।
১৫১২. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৫৯)।
১৫১৩. তিরমিযি (আবওয়াবুল মানাকিব: ৩৭৩৬)। সুনানে কুবরা, নাসায়ি (কিতাবুল খাসাইস : ৮৪৩৩)।
১৫১৪. মানাকিব, মক্কি (৩৪২-৩৪৩)। বাযযাযি (২৬৭)।
১৫১৫. দিওয়ানুল ইমাম শাফেয়ি (১৪)। দেখুন: হিলইয়াতুল আউলিয়া (৯/১৫২)।
১৫১৬. দেখুন: আল-আজনাস (১/৪৫০-৪৫১)।
১৫১৭. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৫৮)।
১৫১৮. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৬১)।
১৫১৯. দেখুন: মিযানুল ইতিদাল (২/৫১৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00