📄 আলিকে শ্রেষ্ঠ বলার বিধান
প্রশ্ন হতে পারে, কেউ যদি শাইখাইন তথা আবু বকর রাযি. এবং উমর রাযি.-এর শ্রেষ্ঠত্ব, উসমান রাযি.-এর মর্যাদা স্বীকার করা সত্ত্বেও আলি রাযি.-কে বেশি ভালোবাসে, তাঁর প্রতি বেশি ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, তবে সে কি আহলে সুন্নাত থেকে বেরিয়ে যাবে? বিচ্যুত ও পথভ্রষ্ট গণ্য হবে?
জবাবে আমরা বলব, না। এটা আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে পছন্দনীয় নয়। বিচ্ছিন্ন মতামত এবং বিচ্ছিন্ন কাজ বলে গণ্য হবে। কিন্তু আহলে সুন্নাত কাউকে জুলুম করে না। ফলে এটুকুর কারণে কাউকে গোমরাহ আখ্যা দেয় না, যেমন পিছনে বলা হয়েছে—ইবনে খুযাইমাসহ কিছু আলেম আলি রাযি.-কে উসমানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলতেন। তাই বলে তাদের গোমরাহ বলার সুযোগ নেই।
তা ছাড়া, এই শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি যেহেতু সরাসরি কুরআন-সুন্নাহতে বর্ণিত হয়নি, সে কারণে এটা 'কাতয়ি' (নিশ্চিত) নাকি 'যন্নি' (অনুমানমূলক) এটা নিয়েও আলেমগণ মতবিরোধ করেছেন। আবুল হাসান আশআরি রহ. মনে করতেন এই শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত বিষয়। এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বিপরীতে আবু বকর বাকেল্লানি, ইমামুল হারামাইন জুয়াইনিসহ একদল আলেম মনে করতেন এটা ইজতিহাদি বিষয়, কুরআন-সুন্নাহ থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। আবু সুলাইমান খাত্তাবি বলেন, আমাদের মাশায়েখের কারও কারও মত হলো, আবু বকর (সোহবতের কারণে) সবচেয়ে উত্তম। আলি (আত্মীয়তার কারণে) সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ।
আল্লামা কামাল ইবনুল হুমাম লিখেছেন, রাফেযিদের মাঝে যারা আলি রাযি.-কে বাকি তিনজনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে, তারা বিদআতি। আর যদি কেউ আবু বকর ও উমর রাযি.-এর খেলাফত অস্বীকার করে, তবে সে কাফের। কিন্তু এটা উন্মুক্তভাবে গৃহীত হবে না। ফলে কেউ আলি রাযি.-কে বাকি তিনজনের চেয়ে উত্তম মনে করলেই বিদআতি হয়ে যাবে এমন নয়, বরং বাকি তিনজনের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করে আলিকে শ্রেষ্ঠ মনে করলে বিদআতি। একইভাবে শাইখাইনের খেলাফত অস্বীকার করলেই কেউ কাফের হবে না, বরং যদি বিদ্বেষবশত অস্বীকার করে এবং কুরআন ও সুন্নাহতে তাদের দুজনের যেসব ফযিলত ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা এসেছে সেগুলোর প্রতি বিশ্বাস না রাখে, তবে এমন ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে।
মোটকথা, এ ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের সঙ্গে থাকা যেমন কর্তব্য, কেউ যদি ভিন্নমত পোষণ করে, সেক্ষেত্রে ইনসাফের সঙ্গে খণ্ডন করাও কর্তব্য। সঙ্গে সঙ্গেই তাকে আহলে সুন্নাত থেকে খারিজ করে শিয়া-রাফেযি বানানোর সুযোগ নেই। তাসাওউফের ইমাম শায়খ শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি রহ. বলেন, 'আমাদের কর্তব্য হলো, সাহাবিদের নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি বন্ধ করা, তাদের প্রত্যেককে ভালোবাসা এবং তাদের কাউকে কারও চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলা থেকে বিরত থাকা। যদি এমন কিছু করতেই হয়, তবে সেটা মনের ভিতর রাখো। প্রকাশ করার দরকার নেই। তাদের একজনকে আরেকজনের চেয়ে বেশি ভালোবাসার দরকার নেই। একজনের চেয়ে আরেকজনকে শ্রেষ্ঠ বলার দরকার নেই। বরং সবাইকে ভালোবাসো। সবার শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দাও। বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি করতে গেলেই জটিলতা তৈরি হয়। এটুকু বিশ্বাস রাখো যে, আবু বকর, উমর, উসমান ও আলি—চারজনের খেলাফতই বিশুদ্ধ ও হক ছিল।'
বাযযাযির (৮২৭ হি.) মানাকিবে এসেছে, 'যদি কেউ আবু বকর, উমর ও উসমান রাযি.-এর খেলাফত ও ফযিলতের স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু বলে, আমি আলি রাযি.-কে অধিক ভালোবাসি, তবে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন না, ইনশাআল্লাহ। কেননা, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, হে আল্লাহ, এটুকু আমার সাধ্যে আছে। আমার সাধ্যের বাইরের কিছুর জন্য আমাকে পাকড়াও করবেন না।' অর্থাৎ, সে প্রথম তিন সাহাবার খেলাফত ও মর্যাদা স্বীকার করছে, কিন্তু আলি রাযি.-এর প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা অনুভব করছে। এটুকু করলেই কাউকে আহলে সুন্নাত থেকে খারিজ করা হবে না। কিন্তু কাজটাকে উত্তম মনে করলে জটিলতা। কারণ, এটা পরবর্তীকালে অন্যান্য সীমালঙ্ঘনের দিকে নিয়ে যাবে। এ জন্য ইমাম আবু ইউসুফ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, 'কেউ যদি বলে, আমি রাসুলুল্লাহর কোনো সাহাবিকে গালি দিই না, কিন্তু আলি রাযি. বাকি সবার চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয়, তবে এই লোকের মাঝে সমস্যা আছে এবং তাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হবে।'
টিকাঃ
১৪৭০. দেখুন: শরহে মুসলিম, নববি (১৫/১৪৮)। তাদরিবুর রাবি (২/৬৮৪)।
১৪৭১. দেখুন: আস-সাওয়ায়িকুল মুহরিকাহ, ইবনে হাজার হাইতামি (১/১৭১)।
১৪৭২. ফাতহুল কাদির (১/৩৫০)।
১৪৭৩. আলামুল হুদা ওয়া আকিদাতু আরবাবিত তুকা, সোহরাওয়ার্দি (৪৪-৪৬)।
১৪৭৪. মানাকিব, বাযযাযি (৩৬)।
১৪৭৫. দেখুন: আল-আজনাস, নাতেফি (১/৪৫০-৪৫১)।
১৪৯১. শরহুল আকায়েদ, তাফতাযানি (১০৩)। ইয়াযিদ ইবনে মুআবিয়ার ব্যাপারে ইমামদের মতভেদপূর্ণ দীর্ঘ আলোচনা...
📄 আলি রাযি.-কেন্দ্রিক বিচ্যুতি
আলি রাযি.-কে নিয়ে আহলে সুন্নাতের সামগ্রিক অবস্থান অনুযায়ী চার খলিফার মাঝে আলি রাযি.-এর অবস্থান চতুর্থ স্থানে। তথাপি কেউ যদি তাঁর প্রতি অধিক ভক্তির ফলে উক্ত ধারাবাহিকতার বিরোধিতা করে, সেক্ষেত্রে স্রেফ এটুকুর কারণে তাকে সরাসরি পথভ্রষ্ট আখ্যা দেওয়া যাবে না।
বিপরীতে সেই শুরু থেকেই সাহাবাদের পরের একাধিক প্রজন্ম আলি রাযি.-এর ব্যাপারে বিপথগামী হয়েছে। বরং খোদ আলি রাযি. এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে জেনে বলে গিয়েছেন, 'আমার ব্যাপারে দুটো শ্রেণি ধ্বংস হবে—এক. আমার ভালোবাসা ও সম্মানের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জনকারী। দুই. আমার বিদ্বেষের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘনকারী।'
রাসুলুল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা হওয়ার ছিল না। ফলে বাস্তবেও তা-ই হয়েছে। একদল আলি রাযি.-কে কাফের আখ্যা দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। তারা ইতিহাসে খারেজি (বিদ্রোহী), নাসেবি (আহলে বাইতের শত্রু) হিসেবে পরিচিত হয়েছে। আর কতগুলো দল বিপরীত প্রান্তিকতার শিকার হয়েছে। তারা আলি রাযি.-এর ভালোবাসা ও ভক্তির ক্ষেত্রে সব ধরনের শরয়ি সীমারেখা লঙ্ঘন করেছে। এদের একদল আলি রাযি.-কে 'খোদা' (ইলাহ) বানিয়ে দিয়েছে! এরা আবদুল্লাহ ইবনে সাবার গোষ্ঠী। আরেক দল আলি রাযি.-কে নবি বানিয়ে দিয়েছে। এরা বিভিন্ন বাতেনি সম্প্রদায়। আরেক দল আলি ও নবি-পরিবারের ভালোবাসার দোহাই দিয়ে সকল সাহাবিদের দুশমন বানিয়ে দিয়েছে। আবু বকর, উমর, উসমান, আয়েশা, হাফসা, মুআবিয়া রাযি.সহ রাসুলুল্লাহর অধিকাংশ সাহাবাকে কাফের ও ফাসেক আখ্যা দিয়েছে। এরা শিয়া ও রাফেজা নামে পরিচিত। উপরের প্রত্যেকটি দল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশুদ্ধ আকিদা থেকে বিচ্যুত, আহলে বিদআত হিসেবে পরিগণিত। তাদের কিছু কিছু গোষ্ঠী কাফের। বাকিরা পথভ্রষ্ট।
টিকাঃ
১৪৭৬. মুসনাদে আবি ইয়ালা (মুসনাদু আলি: ৫৩৪)। মুসন্নাফে আবদির রাযযাক (কিতাবুল জামে: ২০৬৪৭)। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (কিতাবুল ফাযায়েল: ৩২৭৯৭)।
১৪৭৭. বাতেনি ও রাফেযি ফিরকাসমূহের আকিদাগত বিচ্যুতির বর্ণনা...