📄 উমরের শ্রেষ্ঠত্ব
আবু বকর রাযি.-এর পরে মুসলিম উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ তিনি। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) উমর রাযি.-এর ব্যাপারে বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা উমরের মুখ ও অন্তরে হক প্রতিষ্ঠিত করেছেন।’ কারণ, উমর যখনই রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে কোনো ব্যাপারে পরামর্শ দিতেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে সেটার সমর্থনে ওহি নাযিল হতো।
উমরের হৃদয় ছিল কাচের চেয়েও স্বচ্ছ। নিষ্ঠা ছিল আকাশসমান। হকের সামনে তিনি কাউকে পরোয়া করতেন না। বাতিল কোনোভাবেই সহ্য করতেন না। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুলকে তিনি হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসতেন। এ জন্য মানুষ তো দূরের কথা, শয়তানও তাঁকে ভয় করত। আল্লাহর রাসুল (ﷺ) তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! শয়তান যখনই তোমাকে কোনো পথে হাঁটতে দেখে, সে তোমার পথ ছেড়ে অন্য পথ ধরে!’ এভাবে তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় তাঁর সর্বাপেক্ষা প্রিয় মানুষদের একজনে পরিণত হন; রাসুলুল্লাহর সর্বোচ্চ আস্থার জায়গা লাভ করেন; তাঁর ভালোবাসা অর্জন করেন। তিনি তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন। রাসুলুল্লাহ তাঁর মেয়ে হাফসাকে বিবাহ করে তাঁকে সম্মানিত করেন; দুনিয়া ও আখেরাতে তাঁকে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করেন।
আবু বকর রাযি. উমরের এই শ্রেষ্ঠত্বের কথা জানতেন। ফলে তিনি ওফাতের আগে উমরকে নিজে খলিফা নিযুক্ত করে যান। উমর এই আস্থার সর্বোচ্চ প্রতিদান দেন। তাঁর সময়ে মুসলিম বাহিনীর বিজয়-পতাকা উড়তে থাকে পৌত্তলিকদের কেল্লাতে। ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা সুদূরের ভূখণ্ডে বিস্তৃত হয়। ন্যায়, ইনসাফ ও সুশাসনে অর্ধ জাহান ভরে ওঠে। উমর পৃথিবীর বুকে সুশাসনের এমন নজির স্থাপন করেন, যা মানব সভ্যতা তাঁর আগে ও পরে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি।
টিকাঃ
১৪৪৬. তিরমিযি (আবওয়াবুল মানাকিব : ৩৬৮২)। আবু দাউদ (কিতাবুল খারাজ : ২৯৬১)।
১৪৪৭. বুখারি (কিতাবু বাদয়িল খালক : ৩২৯৪)। মুসলিম (কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবা : ২৩৯৭)।
📄 উসমানের শ্রেষ্ঠত্ব
উমর রাযি. পরবর্তী খলিফা নিযুক্তির জন্য সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন তথা আশারায়ে মুবাশশারার বেঁচে থাকা ছয়জনকে দায়িত্ব দেন। তারা হলেন: উসমান ইবনে আফফান, আলি ইবনে আবি তালিব, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ এবং যুবাইর ইবনুল আওয়াম।
ইমাম আজম জামে' সূত্রে যিয়াদ ইবনে জারির থেকে বর্ণনা করেন, উমর রাযি. যখন ছুরিকাঘাতপ্রাপ্ত হলেন, তখন বললেন, হে লোকসকল, আমি তোমাদের (খেলাফতের) বিষয়টি এমন ছয়জন মানুষের হাতে রেখে যাচ্ছি, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যাদের উপর সন্তুষ্ট অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমি তাদের তিনদিন সময় দিয়েছি। এর মাঝে যাতে তারা তাদের জন্য এবং তোমাদের জন্য (একজন খলিফা) নির্বাচন করে। যদি তারা কারও ব্যাপারে একমত হয়ে যায় আর একজন সেটা অস্বীকৃতি জানায়, তবে তোমরা (সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী) তাকে বেছে নাও। আর যদি তারা (সমান সমান সংখ্যায়) মতপার্থক্যে জড়িয়ে পড়ে, তবে ইবনে আউফ যে (তিন জনের) দলে থাকবে তাদের সঙ্গে থাকো। উক্ত ছয়জনের উপদেষ্টা পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায় অনুযায়ী উসমান রাযি. খলিফা নিযুক্ত হন।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর সঙ্গে নিজের দুই কন্যা বিবাহ দেন। একজনের পরে একজন। ইসলামের জন্য তিনি তাঁর অধিকাংশ সম্পদ দান করে দিয়েছিলেন। ইবনে উমর বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় বলতাম : 'তাঁর উম্মতের মাঝে শ্রেষ্ঠ হলেন আবু বকর, অতঃপর উমর, অতঃপর উসমান।'
আবু বকর রাযি. কুরআনের প্রাথমিক সংকলন করেছিলেন। সেটা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে উসমান রাযি.-এর হাতে। তিনি একাধিক সাহাবির তত্ত্বাবধানে কুরআনের চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেন। আমাদের কাছে আজকের বিদ্যমান কুরআন উসমান রাযি.-এর সংকলিত ও প্রস্তুতকৃত কুরআন। শিয়ারা দাবি করে, আলি রাযি. কুরআন সংকলন করেছেন। এটা ভিত্তিহীন দাবি।
টিকাঃ
১৪৪৮. অবশ্য তখন আশারায়ে মুবাশশারার সাত জন বেঁচে ছিলেন। সপ্তম ব্যক্তি হলেন সাইদ বিন যায়দ রাযি.। কিন্তু তিনি উমর রাযি.-এর চাচাতো ভাই ও ভগ্নিপতি হওয়ার কারণে উমর রাযি. তাকে মজলিসে শুরার বাইরে রাখেন, যাতে মানুষ পরিবারতন্ত্র কিংবা বংশপ্রীতির সন্দেহ না করে! দেখুন তাদের হৃদয়ের স্বচ্ছতা!
১৪৪৯. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৭-৫৮)।
১৪৫০. তিরমিযি (আবওয়াবুল মানাকিব: ৩৭০৭)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৬২৮)।
১৪৫১. দেখুন: বাহরুল কালাম (২৭৭-২৭৮)।
📄 আলির শ্রেষ্ঠত্ব
উপরের তিনজনের পরে গোটা উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হলেন আলি রাযি.। তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর চাচাতো ভাই। তাঁর কলিজার টুকরো মেয়ে ফাতিমার জামাতা। কিশোর হিসেবে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী। উসমান রাযি.-এর ওফাতের পরে উম্মাহর সর্বসম্মতিক্রমে তিনি মুসলিম উম্মাহর খলিফা নিযুক্ত হন। তিনিই হলেন খুলাফায়ে রাশেদিনের সর্বশেষ খলিফা, নবুওতের খেলাফতের সর্বশেষ প্রতিনিধি। চরম ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে এসেও তিনি ইসলামি রাষ্ট্রকে নিপুণভাবে পরিচালিত করেন, সমৃদ্ধি আনেন। পরিশেষে মজলুম অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন।
তাঁর শাসনামলে সাহাবায়ে কেরাম রাযি. একাধিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তন্মধ্যে প্রথমটি ছিল ‘উষ্ট্র যুদ্ধ' (জামাল), যা সংঘটিত হয়েছিল আলি আর আয়েশা, তালহা ও যুবাইর রাযি.-এর মাঝে। দ্বিতীয়টি ছিল 'সিফফিনের যুদ্ধ', যা সংঘটিত হয়েছিল আলি আর মুআবিয়া রাযি.-এর মাঝে। তবে এসব যুদ্ধ দুনিয়ার জন্য নয়, বরং ইজতিহাদ ও দৃষ্টিভঙ্গিগত মতপার্থক্য, ভুল বোঝাবুঝি, শত্রুর ইন্ধন ও ষড়যন্ত্রের ফলে সংঘটিত হয়েছিল। এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো—এসব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া সকল সাহাবির মাঝে আলি রাযি. মর্যাদা ও পুণ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন, পাশাপাশি তিনি ছিলেন হকের উপর। আর তালহা, যুবাইর, মুআবিয়া প্রমুখ সাহাবি ভুল করেছেন। আয়েশা রাযি. যুদ্ধই চাননি, বরং তিনি দুই পক্ষের মাঝে সমঝোতার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝি হয় এবং সেটা যুদ্ধে গড়ায়। তবে তারা যেহেতু ইজতিহাদ করেছেন, ফলে ভুল করা সত্ত্বেও তারা নিন্দিত নন। আল্লাহ তাআলা ও রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাদের প্রত্যেকের ব্যাপারে সন্তুষ্টি ও ক্ষমার সুসংবাদ দিয়েছেন। এ জন্য সাধারণ মুসলিমদের কর্তব্য হলো তাদের কেবল উত্তম পন্থায় স্মরণ করা, তাদের মাঝে সৃষ্ট সংকটের মাঝে প্রবেশ না করা, সেগুলোর ঘাঁটাঘাঁটি পরিত্যাগ করা। কোনো সাহাবির ব্যাপারে মন্দ আলোচনা না করা। কারণ, তাদের মাঝে যারা ভুল করেছেন, তারাও পরবর্তী সকল মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। রাসুলুল্লাহর (ﷺ) সঙ্গে তাদের জিহাদের ময়দানের এক মুহূর্ত পরবর্তী লোকদের নুহের মতো জীবন পেয়ে সিজদায় পড়ে থাকার চেয়েও উত্তম। এ কারণে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মৌলিক আকিদা হলো সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা থেকে বিরত থাকা। তাদের মাঝে সৃষ্ট হওয়া সংকট ও জটিলতাগুলো এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যেন তাদের সম্মানে আঘাত না হানে। কারণ, তারাই জানমাল বিসর্জন দিয়ে, সুখশান্তি কুরবান করে, দ্বীনের পথে শত মুসিবত সহ্য করে এই দ্বীন আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
টিকাঃ
১৪৫২. দেখুন: তালখিসুল আদিল্লাহ (৮৩৭-৮৩৮)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১১৬৬-১১৭৫)।