📄 আবু বকরের শ্রেষ্ঠত্ব
তিনি ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সবচেয়ে পছন্দের ব্যক্তিত্ব। তাঁর দুনিয়া ও আখেরাতের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তাঁর সবচেয়ে বড় পরামর্শক। তাঁর সর্বপ্রথম খলিফা। ইসলামের সর্বাপেক্ষা বড় সেবক। আবু বকর রাযি.-এর শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের কারও মতভেদ নেই।
আবু বকর রাযি.-এর মর্যাদা কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা তাঁর ব্যাপারে বলেন, ۞ إِلَّا تَنْصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِينَ كَفَرُوا السُّفْلَى وَكَلِمَةُ اللهِ هِيَ الْعُلْيَا وَاللهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ۞ অর্থ: “যদি তোমরা তাকে (তথা রাসুলকে) সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফেররা তাকে বহিষ্কার করেছিল। আর সে ছিল দুইজনের দ্বিতীয় জন। যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল, সে তখন তার সঙ্গী (আবু বকর)-কে বলছিল, ‘দুঃখিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।' এরপর আল্লাহ তাঁর উপর প্রশান্তি বর্ষণ করেন এবং তাকে শক্তিশালী করেন এমন এক সৈন্যবাহিনী দিয়ে যা তোমরা দেখতে পাওনি। আল্লাহ কাফেরদের মাথা নিচু করে দিলেন। আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [তাওবা: ৪০] ফলে তিনি যে আল্লাহর রাসুলের সাহাবি, আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত, সেটা সুস্পষ্ট।
আল্লাহ তাআলা নিজে আবু বকরকে তাকওয়া এবং হৃদয়ের শুদ্ধতার সনদ দেন এভাবে: ۞ وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى * الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّى ۞ অর্থ: ‘আর তা (জাহান্নাম) থেকে দূরে রাখা হবে পরম মুত্তাকি ব্যক্তিকে, যে আত্মশুদ্ধির জন্য তার ধনসম্পদ দান করে।' [লাইল: ১৭-১৮]
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'যে ব্যক্তি ইসলামের মাঝে কোনো সুন্দর বিষয়ের প্রচলন ঘটাল, সে তার পুণ্য পাবে এবং তাকে যারা অনুসরণ করবে সবার পুণ্য লাভ করবে।' আবু বকর রাযি. রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর অনুসরণের প্রচলন করেছেন। তাঁর পরে মানুষ রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে অনুসরণ করা শুরু করেছে। সুতরাং কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করবে, আবু বকর সেটার পুণ্য লাভ করবেন। উসমানসহ জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের বেশ কয়েকজন যথা: তালহা, যুবাইর, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস এবং অসংখ্য সাহাবি আবু বকরের দাওয়াতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তাদের পুণ্যও আবু বকর পাবেন! তাঁর সম্পদ দিয়েও ইসলাম উপকৃত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'আবু বকরের সম্পদ আমাকে যতটা উপকার করেছে, অন্য কারও সম্পদ করেনি! যে-ই আমার প্রতি কোনো অনুগ্রহ করেছে, আমি সেটার বিনিময় দিয়েছি। কিন্তু আবু বকরকে দেওয়া হয়নি। আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন দেবেন।'
আবু বকর রাযি. অন্যদের চেয়ে কেবল তাকওয়া ও ঈমানের ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিলেন এমন নয়; জ্ঞানের ক্ষেত্রেও তিনি অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। রাসুলুল্লাহর সঙ্গে তাঁর সোহবত অন্যদের চেয়ে বেশি দীর্ঘ ছিল, বেশি গভীর ছিল। কিন্তু—যেমনটা বাযদাবি বলেন—আবু বকর রাযি.-এর অভ্যাস ছিল নীরব থাকা। অন্যদের অভ্যাস ছিল কথা বলা। এ জন্য তাঁর থেকে বর্ণিত বক্তব্য ও হাদিস সংখ্যায় বেশ কম। তথাপি আবু বকরের জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্ব বিভিন্ন জায়গায় দেখা গিয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাতের পরে যখন কোনো কোনো সাহাবি তাঁর মৃত্যুকে অবিশ্বাসে করতে থাকেন, তখন আবু বকর বলেন, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। কারণ, আল্লাহ বলেছেন, ۞ إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُم مَّمَيِّتُونَ ۞ অর্থ: 'নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল, তারাও মরণশীল।' [যুমার: ৩০] তিনি আরও বলেন, ۞ وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِيْن مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَن يَنقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَن يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ ۞ অর্থ: 'মুহাম্মাদ একজন রাসুল মাত্র। তার পূর্বে বহু রাসুল গত হয়েছে। সুতরাং তিনি যদি মারা যান অথবা নিহত হন, তবে তোমরা কি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে? আর কেউ পৃষ্ঠপ্রদর্শন করলে সে কখনো আল্লাহর ক্ষতি করতে পারবে না; বরং আল্লাহ শীঘ্রই কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন।' [আলে ইমরান: ১৪৪]
একইভাবে সাহাবায়ে কেরাম যখন রাসুলুল্লাহর দাফনের জায়গা নিয়ে মতভেদ শুরু করেন, আবু বকর বলেন, 'প্রত্যেক নবিকে তাঁর ওফাতের জায়গাতেই দাফন করা হয়।' রাসুলের ওফাতের পরে শামের দিকে (উসামার নেতৃত্বে) বাহিনী পাঠানো নিয়ে মতভেদ তৈরি হলে আবু বকর বললেন, 'তাদের পাঠানো হবে। কারণ, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাদের প্রস্তুত করেছেন।' পরে দেখা গেল আবু বকরের মত সঠিক ছিল। অতঃপর যখন গোটা আরবে ইরতিদাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে, তারা যাকাত অস্বীকার করে, অধিকাংশ সাহাবির মত ছিল তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করা হোক। কিন্তু আবু বকর বললেন, 'যে ব্যক্তি রাসুলের যুগে একটি ছাগলের রশি দিত, সেটা অস্বীকার করলেও আমি যুদ্ধ করব।' শেষ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ করলেন। অধিকাংশ মুরতাদ ইসলামে ফিরে এলো। সাহাবারা বুঝতে পারলেন, আবু বকরই হকের উপর ছিলেন।
এ সব কিছু দ্বারা প্রমাণিত হয়, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরে এ উম্মতের নেতৃত্বের সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত ব্যক্তি তিনি। এটা রাসুলুল্লাহও জানতেন। ফলে তাঁর জীবদ্দশায় তিনি তাঁকে মুসলমানদের নামাযের ইমাম বানান। এর মাধ্যমে তিনি যেন তাঁর ওফাতের পরে আবু বকর মুসলমানদের ইমাম (শাসক) হবেন—এমন ইঙ্গিত দিয়ে যান। রাসুলুল্লাহর (ﷺ) ওফাতের পরে মানুষজন খলিফা নিযুক্তি নিয়ে মতভেদে জড়িয়ে পড়ে। আনসারগণ প্রস্তাব দেন তাদের মাঝ থেকে একজন আমির হবেন আর মুহাজিরদের মাঝ থেকে একজন। কিন্তু আবু বকর রাযি. বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলে গিয়েছেন, ‘ইমাম হবে কুরাইশ থেকে।’ তখন সবাই তাঁর কথা মেনে নিলেন। উমর রাযি. কথা বললেন। আবু বকরের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরলেন। সবাই আবু বকর রাযি.-এর হাতে খেলাফতের বাইয়াত নিলেন। রাফেযিরা মনে করে, আলি রাযি. কখনো আবু বকরের খেলাফত মেনে নেননি। এটা আলির উপর তাদের মিথ্যাচার।
টিকাঃ
১৪৪১. মুসলিম (কিতাবুল ইলম: ১০১৭)। তিরমিযি (আবওয়াবুল ইলম: ২৬৭৫)।
১৪৪২. তিরমিযি (আবওয়াবুল মানাকিব: ৩৬৬১)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সুন্নাহ: ৯৪)।
১৪৪৩. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২০০)।
১৪৪৪. তিরমিযি (আবওয়াবুল মানাকিব : ৩৬৬১)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১১৮০-১১৮৫)।
১৪৪৫. দেখুন : তালখিসুল আদিল্লাহ (৮২৬)।
📄 উমরের শ্রেষ্ঠত্ব
আবু বকর রাযি.-এর পরে মুসলিম উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ তিনি। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) উমর রাযি.-এর ব্যাপারে বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা উমরের মুখ ও অন্তরে হক প্রতিষ্ঠিত করেছেন।’ কারণ, উমর যখনই রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে কোনো ব্যাপারে পরামর্শ দিতেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে সেটার সমর্থনে ওহি নাযিল হতো।
উমরের হৃদয় ছিল কাচের চেয়েও স্বচ্ছ। নিষ্ঠা ছিল আকাশসমান। হকের সামনে তিনি কাউকে পরোয়া করতেন না। বাতিল কোনোভাবেই সহ্য করতেন না। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুলকে তিনি হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসতেন। এ জন্য মানুষ তো দূরের কথা, শয়তানও তাঁকে ভয় করত। আল্লাহর রাসুল (ﷺ) তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! শয়তান যখনই তোমাকে কোনো পথে হাঁটতে দেখে, সে তোমার পথ ছেড়ে অন্য পথ ধরে!’ এভাবে তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় তাঁর সর্বাপেক্ষা প্রিয় মানুষদের একজনে পরিণত হন; রাসুলুল্লাহর সর্বোচ্চ আস্থার জায়গা লাভ করেন; তাঁর ভালোবাসা অর্জন করেন। তিনি তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন। রাসুলুল্লাহ তাঁর মেয়ে হাফসাকে বিবাহ করে তাঁকে সম্মানিত করেন; দুনিয়া ও আখেরাতে তাঁকে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করেন।
আবু বকর রাযি. উমরের এই শ্রেষ্ঠত্বের কথা জানতেন। ফলে তিনি ওফাতের আগে উমরকে নিজে খলিফা নিযুক্ত করে যান। উমর এই আস্থার সর্বোচ্চ প্রতিদান দেন। তাঁর সময়ে মুসলিম বাহিনীর বিজয়-পতাকা উড়তে থাকে পৌত্তলিকদের কেল্লাতে। ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা সুদূরের ভূখণ্ডে বিস্তৃত হয়। ন্যায়, ইনসাফ ও সুশাসনে অর্ধ জাহান ভরে ওঠে। উমর পৃথিবীর বুকে সুশাসনের এমন নজির স্থাপন করেন, যা মানব সভ্যতা তাঁর আগে ও পরে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি।
টিকাঃ
১৪৪৬. তিরমিযি (আবওয়াবুল মানাকিব : ৩৬৮২)। আবু দাউদ (কিতাবুল খারাজ : ২৯৬১)।
১৪৪৭. বুখারি (কিতাবু বাদয়িল খালক : ৩২৯৪)। মুসলিম (কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবা : ২৩৯৭)।
📄 উসমানের শ্রেষ্ঠত্ব
উমর রাযি. পরবর্তী খলিফা নিযুক্তির জন্য সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন তথা আশারায়ে মুবাশশারার বেঁচে থাকা ছয়জনকে দায়িত্ব দেন। তারা হলেন: উসমান ইবনে আফফান, আলি ইবনে আবি তালিব, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ এবং যুবাইর ইবনুল আওয়াম।
ইমাম আজম জামে' সূত্রে যিয়াদ ইবনে জারির থেকে বর্ণনা করেন, উমর রাযি. যখন ছুরিকাঘাতপ্রাপ্ত হলেন, তখন বললেন, হে লোকসকল, আমি তোমাদের (খেলাফতের) বিষয়টি এমন ছয়জন মানুষের হাতে রেখে যাচ্ছি, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যাদের উপর সন্তুষ্ট অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমি তাদের তিনদিন সময় দিয়েছি। এর মাঝে যাতে তারা তাদের জন্য এবং তোমাদের জন্য (একজন খলিফা) নির্বাচন করে। যদি তারা কারও ব্যাপারে একমত হয়ে যায় আর একজন সেটা অস্বীকৃতি জানায়, তবে তোমরা (সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী) তাকে বেছে নাও। আর যদি তারা (সমান সমান সংখ্যায়) মতপার্থক্যে জড়িয়ে পড়ে, তবে ইবনে আউফ যে (তিন জনের) দলে থাকবে তাদের সঙ্গে থাকো। উক্ত ছয়জনের উপদেষ্টা পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায় অনুযায়ী উসমান রাযি. খলিফা নিযুক্ত হন।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর সঙ্গে নিজের দুই কন্যা বিবাহ দেন। একজনের পরে একজন। ইসলামের জন্য তিনি তাঁর অধিকাংশ সম্পদ দান করে দিয়েছিলেন। ইবনে উমর বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় বলতাম : 'তাঁর উম্মতের মাঝে শ্রেষ্ঠ হলেন আবু বকর, অতঃপর উমর, অতঃপর উসমান।'
আবু বকর রাযি. কুরআনের প্রাথমিক সংকলন করেছিলেন। সেটা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে উসমান রাযি.-এর হাতে। তিনি একাধিক সাহাবির তত্ত্বাবধানে কুরআনের চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেন। আমাদের কাছে আজকের বিদ্যমান কুরআন উসমান রাযি.-এর সংকলিত ও প্রস্তুতকৃত কুরআন। শিয়ারা দাবি করে, আলি রাযি. কুরআন সংকলন করেছেন। এটা ভিত্তিহীন দাবি।
টিকাঃ
১৪৪৮. অবশ্য তখন আশারায়ে মুবাশশারার সাত জন বেঁচে ছিলেন। সপ্তম ব্যক্তি হলেন সাইদ বিন যায়দ রাযি.। কিন্তু তিনি উমর রাযি.-এর চাচাতো ভাই ও ভগ্নিপতি হওয়ার কারণে উমর রাযি. তাকে মজলিসে শুরার বাইরে রাখেন, যাতে মানুষ পরিবারতন্ত্র কিংবা বংশপ্রীতির সন্দেহ না করে! দেখুন তাদের হৃদয়ের স্বচ্ছতা!
১৪৪৯. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৭-৫৮)।
১৪৫০. তিরমিযি (আবওয়াবুল মানাকিব: ৩৭০৭)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৬২৮)।
১৪৫১. দেখুন: বাহরুল কালাম (২৭৭-২৭৮)।
📄 আলির শ্রেষ্ঠত্ব
উপরের তিনজনের পরে গোটা উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হলেন আলি রাযি.। তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর চাচাতো ভাই। তাঁর কলিজার টুকরো মেয়ে ফাতিমার জামাতা। কিশোর হিসেবে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী। উসমান রাযি.-এর ওফাতের পরে উম্মাহর সর্বসম্মতিক্রমে তিনি মুসলিম উম্মাহর খলিফা নিযুক্ত হন। তিনিই হলেন খুলাফায়ে রাশেদিনের সর্বশেষ খলিফা, নবুওতের খেলাফতের সর্বশেষ প্রতিনিধি। চরম ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে এসেও তিনি ইসলামি রাষ্ট্রকে নিপুণভাবে পরিচালিত করেন, সমৃদ্ধি আনেন। পরিশেষে মজলুম অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন।
তাঁর শাসনামলে সাহাবায়ে কেরাম রাযি. একাধিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তন্মধ্যে প্রথমটি ছিল ‘উষ্ট্র যুদ্ধ' (জামাল), যা সংঘটিত হয়েছিল আলি আর আয়েশা, তালহা ও যুবাইর রাযি.-এর মাঝে। দ্বিতীয়টি ছিল 'সিফফিনের যুদ্ধ', যা সংঘটিত হয়েছিল আলি আর মুআবিয়া রাযি.-এর মাঝে। তবে এসব যুদ্ধ দুনিয়ার জন্য নয়, বরং ইজতিহাদ ও দৃষ্টিভঙ্গিগত মতপার্থক্য, ভুল বোঝাবুঝি, শত্রুর ইন্ধন ও ষড়যন্ত্রের ফলে সংঘটিত হয়েছিল। এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো—এসব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া সকল সাহাবির মাঝে আলি রাযি. মর্যাদা ও পুণ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন, পাশাপাশি তিনি ছিলেন হকের উপর। আর তালহা, যুবাইর, মুআবিয়া প্রমুখ সাহাবি ভুল করেছেন। আয়েশা রাযি. যুদ্ধই চাননি, বরং তিনি দুই পক্ষের মাঝে সমঝোতার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝি হয় এবং সেটা যুদ্ধে গড়ায়। তবে তারা যেহেতু ইজতিহাদ করেছেন, ফলে ভুল করা সত্ত্বেও তারা নিন্দিত নন। আল্লাহ তাআলা ও রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাদের প্রত্যেকের ব্যাপারে সন্তুষ্টি ও ক্ষমার সুসংবাদ দিয়েছেন। এ জন্য সাধারণ মুসলিমদের কর্তব্য হলো তাদের কেবল উত্তম পন্থায় স্মরণ করা, তাদের মাঝে সৃষ্ট সংকটের মাঝে প্রবেশ না করা, সেগুলোর ঘাঁটাঘাঁটি পরিত্যাগ করা। কোনো সাহাবির ব্যাপারে মন্দ আলোচনা না করা। কারণ, তাদের মাঝে যারা ভুল করেছেন, তারাও পরবর্তী সকল মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। রাসুলুল্লাহর (ﷺ) সঙ্গে তাদের জিহাদের ময়দানের এক মুহূর্ত পরবর্তী লোকদের নুহের মতো জীবন পেয়ে সিজদায় পড়ে থাকার চেয়েও উত্তম। এ কারণে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মৌলিক আকিদা হলো সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা থেকে বিরত থাকা। তাদের মাঝে সৃষ্ট হওয়া সংকট ও জটিলতাগুলো এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যেন তাদের সম্মানে আঘাত না হানে। কারণ, তারাই জানমাল বিসর্জন দিয়ে, সুখশান্তি কুরবান করে, দ্বীনের পথে শত মুসিবত সহ্য করে এই দ্বীন আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
টিকাঃ
১৪৫২. দেখুন: তালখিসুল আদিল্লাহ (৮৩৭-৮৩৮)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১১৬৬-১১৭৫)।