📄 সাহাবা ও তাবেয়িদের বিদ্রোহ
সাইয়েদুনা হুসাইন রাযি. পাপিষ্ঠ ইয়াযিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। একদল সাহাবি তাকে বারণ করেন, কিন্তু তিনি বিদ্রোহকেই সঠিক মনে করেন। ৬১ হিজরিতে ঐতিহাসিক কারবালার ময়দানে জালেম ইয়াযিদের বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নবি-পরিবারের একাধিক সদস্যসহ শহিদ হয়ে যান।
আবদুল্লাহ ইবনে মুতি আদাভি, আবদুল্লাহ ইবনে হানযালাহ আনসারি, মা'কাল ইবনে সিনান এবং আবদুল্লাহ ইবনে যায়দ আনসারির নেতৃত্বে গোটা মদিনাবাসী এ জুলুমের বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠান। যাহাবির ভাষায়—হুসাইন রাযি.-এর পরে মদিনাবাসী ইয়াযিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আল্লাহর পথে দাঁড়িয়ে যান। দুরাচার ইয়াযিদ মদিনায় রক্তপাত করে। অসংখ্য সাহাবি ও তাবেয়িকে শহিদ করে দেওয়া হয়। কয়েক দিন মদিনায় লুটপাট করা হয় (৬৩ হি.)।
অতঃপর কারবালার প্রতিশোধ এবং জালেমদের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঁচু করেন রাসুলুল্লাহর সাহাবি সুলাইমান ইবনে সুরাদ রাযি.। 'তাওয়াবিন বাহিনী' নিয়ে বিদ্রোহ ও প্রতিশোধের আওয়াজ ওঠান তিনি। উমাইয়া শাসক মারওয়ান ইবনুল হাকাম উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে তাদের বিরুদ্ধে পাঠায়। ইবনে সুরাদের বাহিনীতে মুসাইয়াব ইবনে নাজাবাসহ অসংখ্য তাবেয়ি যোগদান করেন। তারাও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন। রাসুলের সাহাবিসহ অসংখ্য তাবেয়ি শহিদ হন (৬৫ হি.)। মারওয়ান ইবনুল হাকামের কাছে তাঁর ও মুসাইয়াবের কর্তিত মস্তক নিয়ে যাওয়া হয়।
অতঃপর জেগে ওঠেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি রাসুলের হাওয়ারি যুবাইর ইবনুল আওয়াম এবং আবু বকর রাযি.-এর কন্যা আসমাপুত্র আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি.। তিনি উমাইয়াদের জুলুমের বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠান। ইনসাফের খেলাফত ঘোষণা করেন। মক্কাকে এই খেলাফতের রাজধানী বানান। খোদ আসমা রাযি. তাঁর এই জিহাদ ও সংগ্রামে সহায়তা করেন। উমাইয়াদের পক্ষ থেকে জালেম ও পাপিষ্ঠ হাজ্জাজকে প্রেরণ করা হয়। হাজ্জাজ মক্কা শহর অবরোধ করেন। একপর্যায়ে আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইরকে হত্যা করে তার মাথা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের কাছে পাঠান। তার শরীর জঘন্যভাবে শূলে চড়িয়ে রাখেন! আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইরের সঙ্গে তার দুজন বিশিষ্ট সহযোগী আবদুল্লাহ ইবনে মুতি ও আবদুল্লাহ ইবনে সফওয়ান রাযি. সহ অসংখ্য বড় বড় তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়ি শাহাদাত বরণ করেন।
সাহাবিদের এই গাইরত ও ঈমানের পথে অটল থাকেন অসংখ্য তাবেয়ি। জালেমের বিরুদ্ধে তারাও সক্রিয় থাকেন, যেটা চূড়ান্তরূপে প্রকাশ পেয়েছিল ইবনুল আশআসের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে, ইতিহাসে যা 'আলেমদের বিদ্রোহ' (সাওরাতুল কুররা) নামেও পরিচিত। আবদুর রহমান ইবনুল আশআসের নেতৃত্বে হাজ্জাজ ও উমাইয়া শাসক আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহে শরিক হয়েছিলেন প্রায় পাঁচশত সাহাবি ও তাবেয়ি! তাদের মাঝে ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি আনাস ইবনে মালেক, আনাসের ছেলে নজর ইবনে আনাস, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের পুত্র মুহাম্মাদ (হাজ্জাজ তাকে হত্যা করে), আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের পুত্র আবু উবাইদা, মুজাহিদ ইবনে জবর, ইবনে দিনার, আমের ইবনে শুরাহবিল, সাইদ ইবনে যুবাইর এবং আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলার মতো বড় বড় মানুষ।
অন্যদিকে পবিত্র আহলে বাইতের অসংখ্য সদস্যও জালেমের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ময়দানে তাজা খুন বিলিয়ে শাহাদাতকে বেছে নেন। নবি-পরিবারের সদস্যরা কারবালার বেদনাদায়ক দৃশ্যের সামনে কখনো দমে যাননি; বরং নিজেদের গাইরত ও ঈমানি দাবি পূরণে সবসময় সচেষ্ট ছিলেন। জালেম ও পাপাচারীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শোণিত তারা বংশীয় সূত্রে ঐতিহ্য হিসেবে বহন করছিলেন। হুসাইন রাযি.-এর পরে তাঁর পুত্র যাইনুল আবিদিনের সন্তান (হুসাইন পৌত্র) যায়দ ইবনে আলি উমাইয়া শাসক হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। এ বিদ্রোহের মূল প্রাণোদনা ছিল সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ, যে পথে প্রাণ দিয়েছিলেন তাঁর দাদা হুসাইন রাযি.। তিনি আলেমদের সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধের প্রতি দাওয়াত দেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং সত্যের পক্ষে বঞ্চিতদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তার এ জিহাদে অংশগ্রহণের আহ্বান করেন (১২২ হি.)। একইভাবে পরবর্তী সময়ে ইবরাহিম ইবনে আবদুল্লাহ এবং তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ (মুহাম্মাদ আন-নাফসুয যাকিয়্যাহ) আব্বাসিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।
টিকাঃ
১৩৬২. দেখুন : তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সাদ (৫/১৭১)। সিয়ারু আলামিন নুবালা (৪/৩৮)। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১১/৬২৩)।
১৩৬৩. দেখুন: আল-ইসাবাহ (৪/৪৫৪)।
১৩৬৪. দেখুন: তারিখে তাবারি (৬/১৮৮-১৯২)। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১২/২২১-২২২)।
১৩৬৫. সিয়ারু আলামিন নুবালা (৪/৩৪১)।
১৩৬৬. দেখুন: তারিখে খলিফাহ ইবনে খাইয়াত (২৮৭)। সিয়ারু আলামিন নুবালা (৪/১৮৩-১৮৪)।
১৩৬৭. আল কামিল, ইবনুল আসির (৫/২৩৩)।
📄 বিদ্রোহ বৈধতা থেকে অবৈধতায় রূপান্তর
তবে এসব বিদ্রোহ জুলুম ও জালেমের প্রতি মনস্তাত্ত্বিক ঘৃণা ছাড়া আর কোনো বাস্তবসম্মত অর্জন বয়ে আনছিল না, যদিও এটা মূল্যহীন কিংবা অল্প ফলাফল এমন নয়; বরং জুলুমের প্রতি মনস্তাত্ত্বিক ঘৃণা অনেক বড় অর্জন নিঃসন্দেহে; তথাপি এর মূল্যটা ছিল বেশ চড়া। হাজার হাজার তাবেয়ি এতে নিহত হচ্ছিলেন। লাখ লাখ সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছিল। শহর বিরান হয়ে যাচ্ছিল। উম্মাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। বিপরীতে জালেমরা বহাল তবিয়তেই থেকে যাচ্ছিল। বরং তাদের জুলুম বাড়ছিল বই কমছিল না। এ কারণে উলামায়ে কেরাম পুরো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন। খোদ ইমাম আজম রহ. পুরো বিদ্রোহের সিলসিলাটির প্রতি পুনরায় মনোযোগ দেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর বারবার সতর্কবার্তা এবং সবরের নসিহতগুলো বাস্তবতার আলোকে পুনর্মূল্যায়ন করেন। পাশাপাশি আলেমদের উপর শাসকদের চাপ বৃদ্ধি পায়। তারা ইমাম আজম, সুফিয়ান সাওরিসহ বিভিন্ন আলেমকে কৌশলস্বরূপ রাষ্ট্রের বড় বড় দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব করেন। আলেমদের শ্রদ্ধা করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না, বরং প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল আলেমদের থেকে সম্ভাব্য বিদ্রোহ-বিৃঙ্খলা প্রকাশের দরজা বন্ধ করা, রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য এবং শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তাদের নিষ্ঠা পরীক্ষা করা। কেউ কেউ শাসকের প্রস্তাব গ্রহণ করে নেন। কিন্তু ইমাম আজমসহ প্রথম শ্রেণির ইমামগণ এখানেও অবিচলতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। জুলুমের মুখোমুখি হয়েও সরকারি পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে মক্কাতে পালিয়ে যান। সুফিয়ান সাওরিসহ অনেক আলেমই তখন বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে থাকেন। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাদের কৌশলগত পরিবর্তন মেনে নিতে বাধ্য করে। উমাইয়াদের পতনের পরে আব্বাসিরা নেতৃত্বে আসে। আব্বাসি সাম্রাজ্য দ্রুতই মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে যায়। শাসকরা ইসলাম, মুসলমান ও আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধা যাহির করতে থাকে। অন্যদিকে যাদের থেকে বিদ্রোহের আশঙ্কা ছিল, তাদের নজরবন্দি করে রাখে এবং বিভিন্ন শাস্তির সম্মুখীন করে। মনসুর কৌশল করে ইমাম আজমকে বিচারকের প্রস্তাব দেন। প্রত্যাখ্যান করলে বেত্রাঘাত করেন এবং জেলে বন্দি করে রাখেন। পরবর্তীকালে জেল থেকে ছাড়লেও গৃহবন্দি করে রাখেন। মানুষের সঙ্গে মিশতে, কথা বলতে এবং ছাত্রদের পাঠদান করতে নিষেধ করেন; বরং ঘর থেকে বের হওয়ার উপরও নিষেধাজ্ঞা আসে। এভাবেই একসময় তিনি দুনিয়া থেকে মজলুম ও শহিদ হিসেবে বিদায় নেন।
এভাবে ইমাম আজম রহ.-এর দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে যায় যে, 'যদি কোনো অঞ্চলে অন্যায় দেখা দেয় এবং সেটা কারও পক্ষে পরিবর্তনের সামর্থ্য না থাকে, তবে তার জন্য সেখান থেকে অন্য ভূখণ্ডে হিজরত করে যাওয়া উচিত, তবুও বিদ্রোহ করা উচিত হবে না।' এ প্রসঙ্গে তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে নিজস্ব সূত্রে (হাম্মাদ → ইবরাহিম → আলকামা → ইবনে মাসউদ) হাদিস বর্ণনা করেন; রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'যখন কোনো ভূখণ্ডে অন্যায় প্রকাশ পায় এবং সেটা তোমার পরিবর্তনের সাধ্য না থাকে, তবে অন্যত্র চলে যাও এবং সেখানে গিয়ে তোমার রবের ইবাদত করো।' ইমাম সাহাবির সূত্রে বলেন, 'ফেতনার ভয়ে যদি কেউ এক ভূখণ্ড থেকে অন্য ভূখণ্ডে হিজরত করে, আল্লাহ তার জন্য সত্তর জন সিদ্দিকের পুণ্য লিপিবদ্ধ করেন।'
টিকাঃ
১৩৬৮. মানাকিব, বাযযাযি (২৬৭)।
১৩৬৯. দেখুন: শাযারাতুয যাহাব (২/২০৩-২০৪)।
১৩৭০. মানাকিব, বাযযাযি (২৯৯)।
📄 জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সর্বসম্মতিক্রমে নিষিদ্ধ
যেমনটা বলা হলো— পরবর্তীকালে সকল হানাফি আলেম ইমাম আজমের সর্বশেষ সংশোধিত ও সংস্কারকৃত পথে হেঁটেছেন, প্রথম পথে হাঁটেননি। তারাও জালেম শাসকের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে নিষেধ করেছেন :
* সায়েদ নিশাপুরির বর্ণনা মতে ইমাম আজম রহ. বলেন, 'আহলে সুন্নাতের (আকিদা) হলো: আমরা কোনো মুসলমানকে গুনাহের কারণে কাফের বলি না। ইসলাম থেকে বের করি না। ...আমরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ (বিদ্রোহ) করি না।' নিশাপুরি বলেন, 'এটা আবু ইউসুফ এবং মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানেরও আকিদা।'
* আবু হাফস বুখারি বলেন, 'আহলে সুন্নাতের বৈশিষ্ট্য হলো—সৎ- অসৎ সকলের পিছনে নামায পড়া, প্রত্যেক শাসকের পিছনে দুই ঈদ ও জুমার নামায পড়া এবং এটাকে হক মনে করা, ...অন্যায়ভাবে কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ না করা।' তিনি আরও বলেন, 'চল্লিশজন তাবেয়ি থেকে আমার কাছে নির্ভরযোগ্য সূত্রে সংবাদ পৌঁছেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'সাতটি বস্তু হেদায়াত। তন্মধ্যে একটি হলো জামাতের সঙ্গে থাকা। ...সুতরাং তোমরা প্রত্যেক শাসকের সঙ্গে জিহাদ করো। তোমাদের শাসকগণ জুলুম করলেও তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করো না। তাদের শুদ্ধি ও সুস্থতার জন্য দোয়া করো। প্রবৃত্তিপূজা থেকে বিরত থাকো।' উক্ত হাদিসের যদিও সনদ উল্লেখ করা হয়নি, তবে এর অর্থ বিশুদ্ধ। পাশাপাশি এটাই আহলে সুন্নাতের মাযহাব; হানাফি ইমামদের মাযহাব। বরং আবু হাফস অন্যত্র আরও কঠিন ভাষায় বলেন, “শাসকের আনুগত্য ফরয। অবাধ্যতা কিংবা তরবারি কোনোভাবেই শাসকের বিরুদ্ধে ময়দানে নামা বৈধ নয়। যদি সে ইনসাফ করে, তবে তার প্রতিদান পাবে। আর যদি জুলুম করে, তবে সেটার বোঝা তাকেই বহন করতে হবে। কিন্তু মুসলমানদের কর্তব্য হলো শাসকের আনুগত্য করা। কেননা, যে ব্যক্তি শাসকের আনুগত্য না করে তার বিরুদ্ধাচরণ করবে, সে খারেজি! স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ۞ يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُم ۞ অর্থ: 'হে মুমিনগণ, আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো। আনুগত্য করো রাসুলের এবং তোমাদের মাঝে যারা দায়িত্বশীল তাদের।' [নিসা: ৫৯] এখানে 'দায়িত্বশীল' বলতে শাসক বোঝানো হয়েছে।”
* আবুল লাইস সমরকন্দি বলেন, 'শাসক যদি জালেম হয়, তবুও তার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ বৈধ নয়। কারণ, তাতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে, রক্তপাত ঘটে, ধনসম্পদ বিনষ্ট হয়।'
* মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল বলখি বলেন, 'শাসক জালেম হলেও তার আনুগত্য করতে হবে।'
* আবুল ইউসর বাযদাবি বলেন, 'শাসক যদি ফাসেক কিংবা জালেম হয়, তবুও তাকে পদচ্যুত করা বৈধ নয়। এটা আবু হানিফাসহ সকল হানাফির মত। এটাই গ্রহণযোগ্য মত।' বাযদাবি এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বর্ণনা করেন, সামানিয়িয়নের শেষ যুগে বুখারাতে কাদারিয়্যাহ-মুতাযিলা সম্প্রদায়ের প্রতিপত্তি ব্যাপক বেড়ে যায়। এমনকি মন্ত্রীও তাদের মতাদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আহলে সুন্নাত তাদের হাতে ব্যাপকভাবে নির্যাতনের শিকার ছিলেন। ঘটনাক্রমে বুখারার আমিরের একজন শিক্ষক ছিলেন আহলে সুন্নাতের। তিনি একদিন আমিরকে বললেন, যেসব লোক নিজেদের কাদারিয়্যাহ বলে দাবি করে, তারা কিন্তু আপনাকে শাসক মনে করে না। আর যারা নিজেদের 'আহলে সুন্নাত' বলে, তারা আপনাকে শাসক মনে করে। তিনি বললেন, কীভাবে? শিক্ষক বললেন, আগামীকাল নিজ চোখে দেখবেন। পরের দিন সেই শিক্ষক রাজকীয় প্রাসাদে আহলে সুন্নাতের আলেমদের দাওয়াত দিলেন। আমিরকে পর্দার আড়ালে বসতে অনুরোধ করলেন। সবাই এলে তিনি তাদের বললেন, যদি শাসক ব্যভিচার করে, জুলুম করে, মদ্যপান করে, বালকদের সাথে থাকে, এ সবকিছু হারাম জানা ও মানা সত্ত্বেও এগুলোতে লিপ্ত থাকে, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বিধান কী? আলেমগণ বললেন, না, সেটা করা যাবে না। কিন্তু শাসকের উচিত হলো এগুলো থেকে তাওবা করা। তিনি তাদের বিদায় দিলেন। অতঃপর কাদারিয়্যাহ ও মুতাযিলা আলেমদের ডাকলেন। তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, একজন শাসক জোর করে মানুষের সম্পদ দখল করে, ব্যভিচার ও মদ্যপান করে, কিশোরদের সঙ্গে থাকে; তবে এ সবকিছু হারাম জেনেই করে। তার বিধান কী? তার বিরুদ্ধে কি বিদ্রোহ করা যাবে? তারা বলল, হ্যাঁ, তাকে পদচ্যুত করা হবে। বেশ শক্তভাবেই তারা বিদ্রোহ ও পদচ্যুতির কথা বলল। তিনি তাদের বিদায় দিলেন। বিদায়ের পরে আমিরকে বললেন, তাদের কথা শুনেছেন? আমির বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর আমির মুতাযিলা ও কাদারিয়্যাহদের মূলোৎপাটনের নির্দেশ দিলেন। একপর্যায়ে বুখারাতে হানাফি (আহলে সুন্নাত ছাড়া) আর কাউকে দেখা গেল না। আমির আহলে সুন্নাতের সবাইকে সম্মানিত করলেন।
* জামালুদ্দিন আহমদ গযনবি (৫৯৩) বলেন, 'শাসক জুলুম করলেও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বৈধ নয়। জুলুম কিংবা কবিরা গুনাহের কারণে তারা ক্ষমতাচ্যুতও হবে না। জুলুমের কারণে আমরা তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করব না। বরং তাদের শুদ্ধি ও ন্যায়ের জন্য দোয়া করব।'
* শামসুল আয়িম্মাহ সারাখসি লিখেন, 'আমাদের বিশুদ্ধ মত হলো— জুলুমের কারণে কাযিকে অপসারণ করা হবে না, যদিও অপসারণের উপযুক্ত হয়। কেননা, আমাদের কাছে ফিসক (পাপাচার) প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধকতা নয়। সুতরাং সে পদে অবশিষ্ট থাকার পথে তো প্রতিবন্ধক হতেই পারে না...। খুলাফায়ে রাশেদিনের পরে খলিফা, রাজা-বাদশাহ ও বিচারকদের খুব কম লোকই পাপাচার ও জুলুম থেকে দূরে ছিল। ফলে ফাসেক (বা জালেম)-কে শাসক হিসেবে প্রত্যাখ্যান করলে এই পুরো সময় মুসলমানরা শাসকবিহীন ছিল মানতে হবে। অথচ এটা জঘন্য কথা।'
* সারাখসি অন্যত্র বলেন, 'যখন মুসলমানদের মাঝে ফেতনা (বিদ্রোহ, যুদ্ধ) ইত্যাদি দেখা দেয়, তখন প্রত্যেক মুসলিমের উপর ওয়াজিব হলো ফেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজ ঘরে বসে থাকা। এটা হাসান আবু হানিফা রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন।...হ্যাঁ, কোথাও যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠিত থাকে, মুসলমানরা তাদের শাসকের পক্ষে থাকে, নিরাপদে থাকে, তখন কোনো মুসলিম সম্প্রদায় যদি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তবে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শাসকের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ করা আবশ্যক। ...কেননা, তাদের বিদ্রোহটা অন্যায় ও অসৎকাজ। আর অসৎকাজের প্রতিরোধ করা ফরয।'
উপরের কথা ন্যায়নিষ্ঠ শাসকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ, এমন শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হলে বিদ্রোহীদের বিপক্ষে শাসককে সহায়তা করবে। কিন্তু খোদ শাসক যদি জালেম থাকে আর তার বিরুদ্ধে একদল বিদ্রোহ করে, তখন হানাফি আলেমদের মত হলো, বিদ্রোহীদের পক্ষ নেবে না, জালেমের পক্ষও নেবে না; বরং নিরপেক্ষ থাকবে।
* 'আল-হাভির উদ্ধৃতিতে তাতারখানিয়্যাহতে এসেছে—আহলে সুন্নাতের দশটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে : ...ছয়. শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ না করা।
* কামাল ইবনুল হুমাম লিখেন, 'ন্যায়নিষ্ঠ অবস্থায় শাসক হিসেবে নিয়োজিত হওয়ার পরে যদি কেউ জুলুম করে এবং পাপে লিপ্ত হয়, তবে সে পদচ্যুতির উপযুক্ত হলেও ফেতনার আশঙ্কা থাকলে পদুচ্যুত করা হবে না; বরং তার জন্য দোয়া করা আবশ্যক হবে। বিদ্রোহ করা যাবে না। এটা ইমাম আবু হানিফার মাযহাব।'
টিকাঃ
১৩৭১. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৬৪)।
১৩৭২. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৪)।
১৩৭৩. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৯)।
১৩৭৪. জামিউল মাসানিদ, খাওয়ারযেমি (১/৯২)।
১৩৭৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৬৪)।
১৩৭৬. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৮)।
১৩৭৭. প্রাগুক্ত (৪৮)।
১৩৭৮. আল-ফিকহুল আবসাত (৫২)। আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৫৪)।
১৩৭৯. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৫৭)।
১৩৮০. দেখুন : আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ (২১৪)।
১৩৮১. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (৯৪)।
১৩৮২. আস-সাওয়াদুল আজম (৩, ১০, ১৪)।
১৩৮৩. শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (২২)।
১৩৮৪. আল-ইতিকাদ, বলখি (১১১)।
১৩৮৫. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৯৬-১৯৭)।
১৩৮৬. উসুলুদ্দিন, গযনবি (২৮২-২৮৩)।
১৩৮৭. আল-মাবসুত, সারাখসি (৯/৮০)।
১৩৮৮. প্রাগুক্ত (১০/১২৪)।
১৩৮৯. দেখুন: ফাতাওয়া সিরাজিয়্যাহ (৩০০)।
১৩৯০. ফাতাওয়া তাতারখানিয়্যাহ (১৮/১৩)।
১৩৯১. আল-মুসায়ারাহ (১৭০)।
📄 শাসকের সঙ্গে ইমাম আজমের সম্পর্ক
জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিষিদ্ধের অর্থ এই নয় যে, শাসকের দরবারি আলেম হয়ে যেতে হবে, তার সঙ্গে দহরম-মহরম সম্পর্ক গড়তে হবে; বরং আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো, জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিষেধ হলেও সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ অব্যাহত রাখা আবশ্যক। শাসককে নসিহত করা আবশ্যক। অন্যায়ের ক্ষেত্রে তার অনুসরণ বর্জন করে তাকে সতর্ক করা আবশ্যক।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'কল্যাণকামনা (নসিহতই) দ্বীন।' তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কার জন্য? তিনি বললেন, 'আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, রাসুলের জন্য (অর্থাৎ, তাদের নির্দেশ মানা), মুসলিম শাসকের জন্য (তাদের আনুগত্য করা, সৎপরামর্শ দেওয়া) এবং সকল মানুষের জন্য (তাদের কল্যাণকামনা করা)।' অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'অতি শীঘ্রই এমন একদল শাসক আসবে, যাদের তোমরা ভালো কাজ করতে দেখবে, মন্দ কাজ করতে দেখবে। সুতরাং যে ব্যক্তি তাদের মন্দ কাজ ঘৃণা করবে, সে দায়মুক্ত হয়ে যাবে। আর যে প্রতিবাদ করবে, সে (আল্লাহর পাকড়াও থেকে) নিরাপদ থাকবে। কিন্তু যে তাদের মন্দে সন্তুষ্ট থাকবে এবং তাদের অনুসরণ করবে (সে তাদের পাপের ভাগীদার হবে)।' সাহাবারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না? তিনি বললেন, 'না। ততক্ষণ পর্যন্ত নামায কায়েম করে।'
ইমাম নিজস্ব সনদে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, 'সর্বোত্তম শহিদ হলেন হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব। অতঃপর সে ব্যক্তি যে জালেম শাসককে সৎকাজের আদেশ দেয়, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে এবং নিহত হয়।'
ইমাম আজম কেবল কথার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং কাজেও পরিণত করেছেন। জীবনভর অন্যায়ের বিরোধিতা করেছেন এবং শাসকগোষ্ঠীর ভুলের কড়া সমালোচনা করেছেন। ফলে যারা শাসকের অন্যায়ের সমালোচনার ক্ষেত্রেও মুখ বন্ধ করে রাখা সালাফের মানহাজ হিসেবে প্রচার করে, তাদের কথা ভিত্তিহীন।
একবার খলিফা মনসুর ফকিহদের একত্র করে বললেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, মুসলমানরা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বাধ্য। মাওসিলের লোকজন আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; অথচ তারা এখন আমার গভর্নরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। তাহলে কি এখন আমার জন্য তাদের রক্ত বৈধ নয়? কেউ কেউ বলল, তারা আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন। আপনি তাদের ব্যাপারে যা ইচ্ছা করতে পারেন। যদি ক্ষমা করেন, তবে আপনি ক্ষমাশীল। আর যদি শাস্তি দেন, তবে তারা সেটার যোগ্য। মনসুর ইমাম আজমের দিকে লক্ষ্য করে বললেন, শায়খ, আপনার কী মতামত? ইমাম বললেন, 'আমরা খেলাফতের অধীনে আছি। নিরাপত্তার মাঝে আছি। আপনি মুসলমানদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তিনটি কারণ ব্যতীত কোনো মুসলিমের রক্ত ঝরানো বৈধ নয়। সুতরাং আপনি তাদের রক্ত ঝরালে হারাম রক্ত ঝরাবেন। প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করবেন!' তখন মনসুর সবাইকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। ইমাম আজম যাওয়ার সময় মনসুর তাকে লক্ষ্য করে বললেন, 'শায়খ, আপনার কথা ঠিক আছে। এবার আপনার শহরে চলে যান। মানুষের কাছে আপনার ইমাম তথা শাসকের বদনাম হয় এমন কিছু বলবেন না। কারণ, তাতে আপনার শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের হস্ত প্রসারিত হবে।'
সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধের পরিধি ইমাম আজমের কাছে অত্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইমাম আজম রহ. মনে করতেন, যদি কেউ বৈধ শাসককে গালিগালাজ করে কিংবা তাকে হত্যার কথা বলে, তবুও শাসকের জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া বৈধ নয়। এক্ষেত্রে তিনি আলি রাযি.-এর ঘটনা দলিল হিসেবে পেশ করতেন। তাকে কিছু ব্যক্তি গালি দিত। তাদের একজন আলিকে হত্যা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়। তাকে আলি রাযি.-এর কাছে নিয়ে আসা হলে তিনি বলেন, তাকে ছেড়ে দাও। একলোক বলল, তাকে কীভাবে ছেড়ে দেবো? সে আপনাকে হত্যা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আলি বললেন, সে তো আমাকে হত্যা করেনি। তাহলে তাকে কেন হত্যা করব? লোকটি বলল, সে আপনাকে গালি দিয়েছে। আলি বললেন, তুমিও তাকে গালি দিয়ে দাও অথবা তার পথ ছেড়ে দাও। এ ঘটনার উপর ভিত্তি করে ইমাম আজম বলতেন, শাসকের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ করার আগ পর্যন্ত শাসকের জন্য কাউকে হত্যা করা বৈধ নয়। শাস্তি দেওয়াও বৈধ নয়। হ্যাঁ, যদি বিদ্রোহের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, তখন তাদের ধরে বন্দি করতে পারে, যাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, ফেতনা সৃষ্টি না হয়।
উক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ ও প্রতিহত করতে হবে, সেটা যে কারও অন্যায় হোক। অন্যায়কারী শাসক, তাই মুখ বুজে সহ্য করতে হবে, গোপন নসিহতের পরামর্শ দিয়ে প্রকাশ্যে তার আনুগত্যের কোরাস গাইতে হবে—এটা ইমাম আজম কিংবা সালাফের কারও মানহাজ নয়। ইমাম বলেন, 'আমি গত পঞ্চাশ বছর ধরে প্রত্যেক নামাযের পর আল্লাহর কাছে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধের ক্ষেত্রে আমার ত্রুটির কারণে ইস্তিগফার করি!'
পিছনেও আমরা উল্লেখ করেছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইমামের সরব কণ্ঠের কারণে জীবনের শেষ দিনগুলোতে শাসকরা তাকে জেলে বন্দি করে রাখে। পরবর্তীকালে জেল থেকে ছাড়লেও গৃহবন্দি করে রাখে। মানুষের সঙ্গে মিশতে, কথা বলতে এবং ছাত্রদের পাঠদান করতে নিষেধ করে। বরং ঘর থেকে বের হওয়ার উপরও নিষেধাজ্ঞা আসে। এভাবেই একসময় তিনি দুনিয়া থেকে মজলুম ও শহিদ হিসেবে বিদায় নেন।
ফলে শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করার অর্থ এই নয় যে, শাসকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে হবে; বরং আমরা ইমাম আজম রহ.-কে সারা জীবন শাসকের দরবার থেকে দূরে পালিয়ে থাকতে দেখব। তাঁর মাঝে এবং শাসকদের মাঝে একটা অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর দেখব। বিদ্রোহ না করলেও তাদের প্রতি সবসময় তাকে বিরূপ ও বিরাগভাজনই দেখব। এ কারণে খুব সম্ভবত তার থেকে নিরাপদ থাকার জন্যই শাসকগোষ্ঠী কৌশল হিসেবে তাকে সবসময় রাষ্ট্রের যেকোনো দায়িত্ব দিতে চেয়েছে, আর তিনিও সেটা প্রত্যাখ্যান করে গেছেন। বরং দেখব, তিনি বলছেন, 'যদি তারা একটি মসজিদ বানাতে চায় আর আমাকে সে মসজিদের ইট গোনার দায়িত্ব দেয়, আমি সেটাও করব না।'
আবু জাফর মনসুর তাঁকে কাযির দায়িত্ব নিতে বললে তিনি বললেন, 'আমি কাযির দায়িত্বের যোগ্য নই।' খলিফা বললেন, আপনি এর যোগ্য। ইমাম বললেন, 'আমিরুল মুমিনিন, আমি বললাম যোগ্য নই, আপনি বলছেন যোগ্য। এর মানে আমি মিথ্যা বলেছি। আর মিথ্যুক কাযির দায়িত্বের যোগ্য নয়!' খলিফা ক্রুদ্ধ হন। ইমামকে শাস্তির নির্দেশ দেন। তাঁকে বেত্রাঘাত করা হয়।
বাযযাযির বর্ণনায় এসেছে, (সর্বশেষ উমাইয়া শাসক মারওয়ান ইবনে মুহাম্মাদের ইরাকের গভর্নর) ইবনে হুবাইরা যখন তাঁকে সরকারি দায়িত্ব দিতে চায়, তিনি বলেন, যদি তারা আমাকে ওয়াসেতের মসজিদের দরজা গোনার দায়িত্ব দেয়, সেটাও করব না। তাহলে মানুষ হত্যার দায়িত্ব নেব কী করে? এভাবে শাসকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণে তিনি বেত্রাঘাতের শিকার হন। তবুও সেটা গ্রহণ করেননি।
ইমাম আজম রহ.-এর এ শক্ত নীতির কারণে হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলোতে শাসকদের থেকে হাদিয়া গ্রহণ করতেও নিষেধ করা হয়েছে।
ইমাম কেন শাসকের কাছে যেতেন না? বিভিন্ন কারণ ছিল। তন্মধ্যে সম্ভবত সর্বাপেক্ষা বড় কারণ ছিল আখেরাতের ভয়; শাসকদের জুলুমে যেকোনো প্রকারের সহায়তা হয়ে গেলে পরকাল বরবাদির আশঙ্কা। এ আশঙ্কা থেকেই তিনি শাসকের দরবার থেকে জীবনভর দূরে থেকেছেন এবং বিভিন্ন মুসিবত সহ্য করেছেন, তবুও তাদের দেওয়া কোনো পদ গ্রহণ করেননি। ইমাম আজম হাসান বসরি সূত্রে আবু যর রাযি.-এর হাদিস বর্ণনা করেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'আবু যর, নেতৃত্ব কিয়ামতের দিন লাঞ্ছনা ও লজ্জার কারণ হবে।'
কেবল নিজে নয়, ইমাম আজম তাঁর শাগরেদদেরও শাসক থেকে দূরে থাকতে বলতেন। তাদের সঙ্গে সতর্কতামূলক সম্পর্ক রাখতে বলতেন, যে সম্পর্কের মূলনীতি হলো মধ্যমপন্থা। ইমাম আজম তাঁর শাগরেদ আবু ইউসুফকে প্রদত্ত ওসিয়তে বলেন, 'ইয়াকুব, শাসককে সম্মান করো। তার সামনে মিথ্যা বলো না। তার দরবারে বেশি যেয়ো না। প্রয়োজন ছাড়া তার কাছে হাজির হয়ো না। কারণ, যখন শাসকের কাছে বেশি যাবে, তার চোখে তোমার সম্মান পড়ে যাবে, মর্যাদা হ্রাস পাবে। ফলে শাসকের সঙ্গে আগুনের সম্পর্ক রাখবে—তার থেকে উপকৃত হবে, কিন্তু দূরে থাকবে। কাছে গেলে পুড়ে যাবে।'
টিকাঃ
১৩৯২. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ৫৫)। আবু দাউদ (কিতাবুল আদব: ৪৯৪৪)।
১৩৯৩. মুসলিম (কিতাবুল ইমারাহ: ১৮৫৪)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুন নিসা: ২৭২২০)।
১৩৯৪. আহকামুল কুরআন (১/৮৬)।
১৩৯৫. দেখুন: আখবারু আবি হানিফা (৬৮-৬৯)। মানাকিব, বাযযাযি (২৯৬-২৯৭)।
১৩৯৬. দেখুন: আল-আসল, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান (৭/৫১২)। আল-মাবসুত, সারাখসি (১০/১২৫)।
১৩৯৭. মানাকিব, মক্কি (৩৪২)।
১৩৯৮. মানাকিব, বাযযাযি (২৯৯)।
১৩৯৯. আল-কাশশাফ (১/১৮৪)।
১৪০০. মানাকিব, মক্কি (৪৩৮)।
১৪০১. দেখুন: ফাযায়িলু আবি হানিফা (৬৬)। বাযযাযি (২৭৫-২৭৬)।
১৪০২. ফাতাওয়া তাতারখানিয়্যাহ (১৮/১৭১)।
১৪০৩. আল-আসার, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান (হাদিস নং: ৯১২)।
১৪০৪. মানাকিব, মক্কি (৩৭১)।