📄 প্রথম পক্ষের বক্তব্য
খতিবে বাগদাদি ইমাম আওযায়ি থেকে বর্ণনা করেন, 'আবু হানিফা শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হালাল ঘোষণা করেছেন।' খতিবের বর্ণনামতে আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন, 'আমি আওযায়ির কাছে ইমাম আবু হানিফার কথা উল্লেখ করলে তিনি আমাকে ভর্ৎসনা করে বলেন, এমন লোকের কাছে যাও যে উম্মতে মুহাম্মাদির মাঝে অস্ত্রধারণ বৈধ মনে করে আবার তার কথা আমাকে বলো?' খতিবের বর্ণনাকৃত এসব ঘটনার সনদ আপত্তিকর হলেও বাস্তবতা অন্যান্য সূত্রেও প্রমাণিত।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবিস্তার কথা বলেছেন খ্যাতনামা হানাফি ফকিহ ও মুফাসসির আবু বকর জাসসাস। তিনি তার বিখ্যাত 'আহকামুল কুরআন' গ্রন্থে উক্ত মত দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জাসসাস লিখেন, '... সুতরাং ফাসেক শাসক হতে পারবে না। তার হুকুম বাস্তবায়িত করা হবে না। ...কোনো কোনো মানুষ মনে করে, ইমাম আজম রহ. ফাসেক ব্যক্তির ইমাম ও খলিফা হওয়া বৈধ মনে করতেন। এটা ভুল কথা। ইমামের কাছে খলিফা কিংবা কাযি সকলের জন্য ইনসাফগার হওয়া আবশ্যক। ফাসেক ব্যক্তি তাঁর মতে খলিফা হতে পারবে না। কাযি (সুতরাং শাসক) হতে পারবে না। তার (হাদিস) বর্ণনা গ্রহণ করা হবে না। সাক্ষ্য কবুল করা হবে না। তার নির্দেশ পালন করা হবে না।' জাসসাস লিখেন, 'জালেম শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাযহাব। এ জন্য আওযায়ি বলেছেন, 'আমরা আবু হানিফার সবকিছু মেনে নিয়েছি। কিন্তু একপর্যায়ে তিনি আমাদের বিরুদ্ধে (তথা জালেমের বিরুদ্ধে) অস্ত্রধারণের বৈধতা ঘোষণা করেন। সেটা আমরা মেনে নিইনি।' জাসসাসের মতে, 'ইমাম আবু হানিফার মত ছিল— মুখে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করা ফরয। যদি মুখে কাজ না হয়, অস্ত্র নিতে হবে।' ইবরাহিম সায়েগ ইমামকে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, 'এটা ফরয।' অতঃপর ইমাম নিজস্ব সনদে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, 'সর্বোত্তম শহিদ হলেন হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব। অতঃপর সে ব্যক্তি যে জালেম শাসককে সৎকাজের আদেশ দেয়, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে এবং নিহত হয়।' ইমামের এ কথা শুনে ইবরাহিম মারভে গিয়ে সেখানকার শাসক আবু মুসলিমকে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করতে থাকেন। তাকে জুলুম ও রক্তপাত করতে নিষেধ করেন। একপর্যায়ে আবু মুসলিম ইবরাহিমকে হত্যা করে ফেলে! জাসসাস আরও বলেন, 'যায়দ ইবনে আলির ক্ষেত্রে ইমামের ভূমিকা প্রসিদ্ধ। তিনি তাকে সম্পদ দিয়ে সহায়তা করেন। (বিদ্রোহ করার পরে) তাকে সাহায্য করা এবং তার পক্ষে যুদ্ধ করা ওয়াজিব বলে গোপনে মানুষকে ফাতাওয়া দেন। একইভাবে আবদুল্লাহ ইবনে হাসানের দুই পুত্র মুহাম্মাদ (আন-নাফসুয যাকিয়্যাহ) ও ইবরাহিমকেও তিনি সহায়তা করেন। আবু ইসহাক ফাযারি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন আপনি আমার ভাইকে ইবরাহিমের সঙ্গে বিদ্রোহ করতে বললেন এবং সে তাতে নিহত হলো? ইমাম বললেন, 'আপনার চেয়ে আপনার ভাইয়ের কাজ আমার কাছে অতি প্রিয়।'
হারেসি লিখেন, 'তিনি যায়দ ইবনে আলির কাছে সালাম পাঠাতেন। তাঁর জন্য ইস্তিগফার করতেন।'
জারুল্লাহ যমখশারিও (৫৩৮ হি.) কাছাকাছি কথা বলেছেন। তিনি লিখেন, 'যায়দ ইবনে আলি (উমাইয়্যাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে) ইমাম গোপনে তার সঙ্গে যোগ দেওয়া এবং অর্থ ও সম্পদ দিয়ে তাকে সহায়তার ফাতাওয়া দিয়েছিলেন। ...এক নারী তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আপনি আমার ছেলেকে আবদুল্লাহ ইবনুল হাসানের পুত্রদ্বয় ইবরাহিম ও মুহাম্মাদের সঙ্গে বিদ্রোহের পরামর্শ দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে সে নিহত হয়। এটা কেন করলেন? ইমাম বললেন, 'হায়! আমি যদি আপনার সন্তানের জায়গায় থাকতাম!' (খলিফা) মনসুর ও তার মন্ত্রীসান্ত্রিদের ব্যাপারে তিনি বলতেন, '(কাযির দায়িত্ব তো দূরের কথা) যদি তারা একটি মসজিদ বানাতে চায় আর আমাকে সে মসজিদের ইট গোনার দায়িত্ব দেয়, আমি সেটাও করব না।'
আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ বর্ণনা করেন—আবু ইউসুফ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আবু হানিফা রহ. অস্ত্রধারণ (তথা বিদ্রোহ) বৈধ মনে করতেন!' আবু ইউসুফকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি? তিনি বললেন, 'নাউযুবিল্লাহ!' আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক থেকেও বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন, 'আবু হানিফা বিদ্রোহ বৈধ মনে করতেন।'
টিকাঃ
১৩৫৪. তারিখে বাগদাদ (১৫/৫২৮)। আওযায়ি প্রথম দিকে ইমাম আজমের প্রতিপক্ষের সমালোচনায় প্রভাবিত হয়ে ইমামের ব্যাপারে বিরূপ ধারণা রাখতেন। পরবর্তী সময়ে ইমাম আজমের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কথা হলে তাঁর ভুল ধারণা দূর হয়ে যায় এবং তিনি সেটা খোলাখুলি স্বীকার করেন। দেখুন: মানাকিব, বাযযাযি (৪৫)।
১৩৫৫. দেখুন: আহকামুল কুরআন (১/৮৬-৮৭)।
১৩৫৬. কাশফুল আসার (১/১৬৯)।
১৩৫৭. আল-কাশশাফ (১/১৮৪)।
১৩৫৮. আস-সুন্নাহ, আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ (১২৫, ১৩২)।
📄 দ্বিতীয় পক্ষের বক্তব্য
ইবনে আবিল আওয়াম বর্ণনা করেন, নজর ইবনে মুহাম্মাদকে জিজ্ঞাসা করা হলো : আবু হানিফা কি (শাসকের বিরুদ্ধে) অস্ত্রধারণ সঠিক মনে করতেন? নজর বলেন, 'নাউযুবিল্লাহ! ইমাম এমন ছিলেন না।' নজর ইবনে মুহাম্মাদ থেকে আরও বর্ণিত, 'আবু হানিফা রহ. শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বৈধ মনে করতেন না। তাঁর শাগরেদরাও এটাকে বৈধ মনে করতেন না।'
তহাবি বলেন, 'শরয়ি বিধানের বাইরে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত কারও বিরুদ্ধে আমরা তরবারি উত্তোলন বৈধ মনে করি না। আমাদের শাসক ও নেতৃবৃন্দ জালেম হলেও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ মনে করি না। তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করি না। তাদের আনুগত্য লঙ্ঘন করি না। গুনাহের নির্দেশ দেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের আনুগত্য মূলত আল্লাহর আনুগত্য হিসেবে অনিবার্য মনে করি। আমরা তাদের শুদ্ধি এবং সুস্থতার জন্য দোয়া করি।' এটা তো স্পষ্ট ব্যাপার যে, ইমাম তহাবির আকিদা ইমাম আজম ও তাঁর শাগরেদদের আকিদা থেকে গৃহীত। বোঝা গেল, ইমাম আজম বিদ্রোহ বৈধ মনে করতেন না। কেবল তহাবি নন, পরবর্তী সকল হানাফি ফকিহের মাযহাবের ব্যাপারে কী বলা হবে?
টিকাঃ
১৩৫৯. ফাযায়িলু আবি হানিফা (৭৫)। আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৬৫)।
১৩৬০. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৬৩)।
১৩৬১. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৪)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
উক্ত প্রশ্নের উত্তর বেশ দুরূহ বটে। এ কারণে অনেকেই বিষয়গুলো গুলিয়ে ফেলেছেন, এলোমেলো করে দিয়েছেন; নানাজন নানাপ্রকার প্রান্তিক ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। তবে অধমের ধারণা—এই বৈপরীত্যপূর্ণ অবস্থান ও বক্তব্যগুলো সময়ের বিবর্তনের ফলে ঘটে থাকবে। অর্থাৎ, ইমাম আজম প্রথম যুগে জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সঠিক মনে করতেন। ফাসেককে শাসকের অযোগ্য মনে করতেন। ফলে বিদ্রোহের মত দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে খলিফা থেকে শুরু করে আমির-উমারা, হাকেম-কাযি সর্বত্র জুলুম ও ফিসক ছড়িয়ে পড়ে, প্রাথমিক সময়ে সংঘটিত বিদ্রোহগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে, তখন তিনিও মত পরিবর্তন করেন, বিদ্রোহ বারণ করেন, সবরের পরামর্শ দেন।
এই যে বিবর্তনটা, এটা মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না। বরং প্রথম সময়ে অনেক ইমাম ও আলেমই বিদ্রোহের পক্ষে ছিলেন। মাত্র খিলাফতে রাশেদার যুগ শেষ হয়েছিল। ইসলামের স্বর্ণযুগ, ন্যায়-ইনসাফের উদাহরণ তখনও চোখেমুখে জীবন্ত ছিল। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবাদের শোভামণ্ডিত এ পবিত্র দায়িত্বের আসন ফাসেকরা কলংকিত করবে—এটা সালাফের কেউ মেনে নিতে পারছিলেন না। একদিকে সর্বত্র দায়িত্বশীলদের পাপাচার ও জুলুম দেখে তারা অতিষ্ঠ ছিলেন, অপরদিকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সবরসংক্রান্ত অনেক সতর্কবাণীও তাদের সামনে ছিল। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকজন নীরব থাকলেন। কিন্তু সবাই সেটা মেনে নিতে পারলেন না। দ্বীনি গাইরত তাদের তুলনামূলক ঝুঁকি তথাপি আযিমতের পথ অবলম্বনে বাধ্য করল। এতে তাদের কেউ নিন্দিত হবেন না। 'বাগি' (বিদ্রোহী) বিবেচিত হবেন না। কারণ ঈমান, ইখলাস ও দ্বীনি গাইরত তাদের এ পথে নিয়ে এসেছিল। তারা কীভাবে নিন্দিত হবেন যখন খোদ নবি-দৌহিত্র এবং জান্নাতের যুবকদের সর্দার সাইয়েদুনা হুসাইন রাযি. এ পথের পথিকদের নেতৃত্বে ছিলেন? পরবর্তীকালে একাধিক সাহাবি এ পথ অবলম্বন করেছেন।