📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 অধমের পর্যবেক্ষণ

📄 অধমের পর্যবেক্ষণ


এগুলো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা, তবে চূড়ান্ত কথা নয়। কারণ, এসব গুণ-বৈশিষ্ট্য আল্লাহ তাআলা কুরাইশের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং আরব ও অনারবের অন্যান্য বংশের মাঝেও এ ধরনের গুণ বিদ্যমান থাকা স্বাভাবিক। গোটা মানবজাতি এক্ষেত্রে কিছু তারতাম্যসহ সমান অংশীদার। ফলে এসব কারণের বাইরে আরেকটি রহস্য উল্লেখ করা যায়, যেটা অধমের কাছে অধিকতর যৌক্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। সেটা হলো, মুসলিমদের ঐক্য ধরে রাখা, সম্ভাব্য সকল বিশৃঙ্খলা ও অনৈক্য থেকে মুসলিম উম্মাহকে সুরক্ষিত রাখা।

এর ব্যাখ্যা হলো, 'রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন কুরাইশ বংশের। চার খলিফাসহ ইসলামের প্রথম সারির অগণিত সাহাবি কুরাইশ বংশের। তারা রাসুলুল্লাহর সবচেয়ে কাছের মানুষ, ইসলামের সর্বাগ্র সেনা এবং বিশ্বাসীদের সর্বপ্রথম কাফেলা। ফলে এ বংশের প্রতি প্রত্যেক মুসলমানের স্বভাবজাত অনুরাগ ও দুর্বলতা ছিল। এ বংশের মানুষের প্রতি সম্মান এবং তাদের আনুগত্যের প্রতি বিশেষ সম্মতি ছিল। ফলে তখন বিশৃঙ্খল আরব জাতি এবং তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য জাতি, বর্ণ ও ভাষার মুসলমানদের নিয়ে সদ্য তৈরি হওয়া 'উম্মাহ'র ঐক্য বজায় রাখতে, কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা ধরে রাখতে খেলাফতকে কুরাইশের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখার বিকল্প ছিল না। এ জন্য এটা যতটা না ছিল শরয়ি ও 'তাআব্বুদি' (ইবাদতগত) দৃষ্টিকোণ থেকে, তারচেয়ে বেশি ছিল 'নিযাম' তথা শৃঙ্খলা রক্ষার্থে। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন কুরাইশ বংশের লোকদের মাঝে দুর্বলতা নেমে আসে, অন্য জাতির মুসলিমরা শক্তিশালী হয়ে যায়, উক্ত শর্ত কার্যত রহিত হয়ে যায়।

তাই এক্ষেত্রে ইনসাফপূর্ণ কথা হলো, কুরাইশি শর্ত পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে। যদি ইমাম হওয়ার জন্য মুসলিমদের মাঝে একাধিক যোগ্য ব্যক্তি থাকে যারা সামর্থ্য, গুণাবলি, তাকওয়াসহ অন্য সকল বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্বে সমান, মুসলমানদের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সমপরিমাণ যোগ্যতার অধিকারী, কিন্তু তাদের একজন কুরাইশ বংশের অন্যজন বা অন্যরা কুরাইশ বংশের নয়, এক্ষেত্রে কুরাইশিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আর যদি এমন হয়, যেকোনো এক কিংবা একাধিক ব্যক্তি কুরাইশি থাকে, কিন্তু তাদের মাঝে ইমামতির কোনো যোগ্যতা না থাকে, তখন যিনি যোগ্য তাকেই ইমাম বানানো হবে। কুরাইশি, তাই অযোগ্যকেও মুসলমানদের ইমাম বানিয়ে ফেলতে হবে এমন কথা কুরআন-সুন্নাহর মেযাজের খেলাফ। কারণ, এটা যতটা না মর্যাদার, তারচেয়ে বেশি দায়িত্বের জায়গা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلনَّাসِ إِمَامًا قَالَ وَمِن ذُرِّيَّتِي قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ ۞ অর্থ: “(স্মরণ করুন) যখন ইবরাহিমকে তার প্রতিপালক কয়েকটি কথা দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন এবং সেগুলো সে পূর্ণ করেছিল। আল্লাহ বললেন, 'আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা করছি।' সে বলল, 'আমার বংশধরের মধ্য হতেও?' আল্লাহ বললেন, 'আমার প্রতিশ্রুতি জালেমদের জন্য প্রযোজ্য নয়।” [বাকারা: ১২৪] সুতরাং যারা জালেম কিংবা অযোগ্য—এমন লোকরা খলিফা হওয়ার উপযুক্ত নয়। এক্ষেত্রে বংশপরিচয় কাজে আসবে না।

একইভাবে ইমাম বলতে খেলাফতের প্রশ্নে কুরাইশি জরুরি হওয়া যৌক্তিক। কিন্তু খেলাফতের বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে কায়েম হওয়া ইসলামি রাষ্ট্রের ইমাম হওয়ার জন্য কুরাইশি হওয়া জরুরি নয়। কারণ, পৃথিবীর সর্বত্র কুরাইশ বংশের লোক থাকবেন না। ফলে জগতের কোথাও ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে অন্য রাজ্য থেকে কোনো কুরাইশি ব্যক্তিকে ধরে এনে ইমাম বানাতে হবে এটাও অযৌক্তিক কথা। তাই কুরাইশি শর্তটাকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে রেখে বিচার করা চাই। এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি বর্জন করা কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'যদি তোমাদের উপর কালো-কদর্য কোনো হাবশি দাসকেও শাসক নিযুক্ত করা হয়, তবুও তার কথা শুনবে এবং তার আনুগত্য করবে।'

টিকাঃ
১৩৪৪. দেখুন: তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১১০৮-১১১১)।
১৩৪৫. বুখারি (কিতাবুল আযান: ৬৯৩)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল জিহাদ: ২৮৬০)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বিধান

📄 শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বিধান


মুসলমানদের ইমাম তথা শাসক হিসেবে যখন একজন যোগ্য, ইনসাফগার, দূরদর্শী মুসলিম ব্যক্তি নিযুক্ত হবেন এবং উম্মাহ তার নেতৃত্ব মেনে নেবে, ইসলামি রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা বিরাজ করবে, ন্যায়-ইনসাফ ও সমৃদ্ধির ঝান্ডা পতপত করে উড়বে, মুসলমানরা শরিয়াহর ছায়ায় শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করবে, সে মুহূর্তে সেই রাষ্ট্র কিংবা সেই শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ইসলামের সকল আলেমের সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। যারা বিদ্রোহ করবে, তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। বিদ্রোহের সকল চাল ও জাল সমূলে উপড়ে ফেলা হবে। কারণ, দ্বীন ও দুনিয়া উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এ ধরনের আচরণ পরিত্যাজ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ إِنَّমَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآখিরেতি عَذَابٌ عَظِيمٌ ۞ অর্থ: 'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি এটাই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে; অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত-পা কেটে দেওয়া হবে; কিংবা তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে। এটা তো তাদের পার্থিব লাঞ্ছনা। আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।' [মায়িদা: ৩৩] রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেবে- 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই আর আমি আল্লাহর রাসুল,' তাকে হত্যা করা হবে না (অর্থাৎ, তার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে)। তবে তিন ব্যক্তি এর ব্যতিক্রম : এক. বিবাহিত ব্যভিচারী। দুই. প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ (তথা হত্যাকারী)। তিন. ধর্মত্যাগকারী এবং মুসলিম জামাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী।'

এমনকি মুসলিম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখতে শাসক যদি সকল মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হয়, তবুও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হবে না। যেমন-শাসক যদি ফিসক তথা অন্যায়ে জড়িয়ে পড়ে, জুলুম করে, আহলে সুন্নাতের মতে, তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা হবে না। উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগের শাসকরা বিভিন্ন অন্যায়-অনাচারে ডুবে ছিল। সাহাবা ও তাবেয়িনসহ সালাফে সালেহিনের বড় বড় ইমাম তখন জীবিত ছিলেন। কিন্তু তারা সহ্য করেছেন। জালেম ও ফাসেক শাসকের পিছনে নামায পড়েছেন। তাদের অনুমতিতে ঈদ পালন করেছেন। তাদের বৈধ নির্দেশ মান্য করেছেন। কারণ, বিদ্রোহ মুসলমানদের মাঝে ফেতনার আগুন ঢেলে দেয়, বিশৃঙ্খলা ছড়ায়, ভূপৃষ্ঠে হানাহানি ও রক্তপাত ঘটায়। এর পর একজনকে সরিয়ে অন্যজনের নিয়োগ সংকটকে আরও জটিল করে। সমাধানের চেয়ে সমস্যা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে।

কারণ কী? কারণ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলে গিয়েছেন সবকিছু। তিনি একাধিক হাদিসে জালেম ও ফাসেক শাসকদের আবির্ভাবের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। সবরের সঙ্গে তাদের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'যদি তোমাদের কেউ শাসকের কোনোকিছু অপছন্দ করে, তবে যেন সে সবর করে। কারণ, যে ব্যক্তি সুলতানের আনুগত্য থেকে এক বিঘত পরিমাণ বেরিয়ে যাবে, সে জাহেলি মৃত্যু বরণ করবে।' অপর হাদিসে এসেছে, 'যে ব্যক্তি (শাসকের) আনুগত্য থেকে বাইরে যাবে এবং মুসলমানদের জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, সে জাহেলি মৃত্যুবরণ করবে।'

আউফ ইবনে মালেক আশজায়ি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, 'তোমাদের সর্বোত্তম শাসক হচ্ছে-যাদের তোমরা ভালোবাসো, তারাও তোমাদের ভালোবাসে; যাদের জন্য তোমরা দোয়া করো, তারাও তোমাদের জন্য দোয়া করে। আর তোমাদের সর্বনিকৃষ্ট শাসক হচ্ছে- যাদের তোমরা ঘৃণা করো, তারাও তোমাদের ঘৃণা করে; যাদের তোমরা অভিশাপ দাও, তারাও তোমাদের অভিশাপ দেয়।' সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করব না? তিনি বললেন, 'না। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে নামায কায়েম করে। (দ্বিতীয়বার বললেন) না, বিদ্রোহ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে নামায কায়েম করে। সাবধান! যার উপর কোনো শাসককে নিযুক্ত করা হলো, সে যদি তার মাঝে আল্লাহর কোনো অবাধ্যতা দেখে, তবে আল্লাহর অবাধ্যতাকে যেন ঘৃণা করে। শাসকের আনুগত্য বর্জন না করে।'

সালামা ইবনুল আকওয়া থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।' ইবনে হিব্বান উক্ত হাদিসের শিরোনাম দিয়েছেন, 'শাসক জুলুম করলেও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে।'

টিকাঃ
১৩৪৮. মুসলিম (কিতাবুল কাসামাহ ওয়াল মুহারিবিন: ১৬৭৬)। আবু দাউদ (কিতাবুল হুদুদ: ৪৩৫২)। তিরমিযি (আবওয়াবুদ দিয়াত: ১৪০২)।
১৩৪৯. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৯৬)।
১৩৫০. বুখারি (কিতাবুল ফিতান: ৭০৫৩)। মুসলিম (কিতাবুল ইমারাহ: ১৮৪৯)।
১৩৫১. মুসলিম (কিতাবুল ইমারাহ: ১৮৪৮)।
১৩৫২. মুসলিম (কিতাবুল ইমারাহ: ১৮৫৫)। মুসনাদে দারেমি (কিতাবুর রিকাক: ২৮৩৯)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদল আনসার: ২৪৬৩৩)।
১৩৫৩. ইবনে হিব্বান (কিতাবুস সিয়ার: ৪৫৮৮)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 সাহাবা ও তাবেয়িদের বিদ্রোহ

📄 সাহাবা ও তাবেয়িদের বিদ্রোহ


সাইয়েদুনা হুসাইন রাযি. পাপিষ্ঠ ইয়াযিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। একদল সাহাবি তাকে বারণ করেন, কিন্তু তিনি বিদ্রোহকেই সঠিক মনে করেন। ৬১ হিজরিতে ঐতিহাসিক কারবালার ময়দানে জালেম ইয়াযিদের বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নবি-পরিবারের একাধিক সদস্যসহ শহিদ হয়ে যান।

আবদুল্লাহ ইবনে মুতি আদাভি, আবদুল্লাহ ইবনে হানযালাহ আনসারি, মা'কাল ইবনে সিনান এবং আবদুল্লাহ ইবনে যায়দ আনসারির নেতৃত্বে গোটা মদিনাবাসী এ জুলুমের বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠান। যাহাবির ভাষায়—হুসাইন রাযি.-এর পরে মদিনাবাসী ইয়াযিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আল্লাহর পথে দাঁড়িয়ে যান। দুরাচার ইয়াযিদ মদিনায় রক্তপাত করে। অসংখ্য সাহাবি ও তাবেয়িকে শহিদ করে দেওয়া হয়। কয়েক দিন মদিনায় লুটপাট করা হয় (৬৩ হি.)।

অতঃপর কারবালার প্রতিশোধ এবং জালেমদের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঁচু করেন রাসুলুল্লাহর সাহাবি সুলাইমান ইবনে সুরাদ রাযি.। 'তাওয়াবিন বাহিনী' নিয়ে বিদ্রোহ ও প্রতিশোধের আওয়াজ ওঠান তিনি। উমাইয়া শাসক মারওয়ান ইবনুল হাকাম উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে তাদের বিরুদ্ধে পাঠায়। ইবনে সুরাদের বাহিনীতে মুসাইয়াব ইবনে নাজাবাসহ অসংখ্য তাবেয়ি যোগদান করেন। তারাও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন। রাসুলের সাহাবিসহ অসংখ্য তাবেয়ি শহিদ হন (৬৫ হি.)। মারওয়ান ইবনুল হাকামের কাছে তাঁর ও মুসাইয়াবের কর্তিত মস্তক নিয়ে যাওয়া হয়।

অতঃপর জেগে ওঠেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি রাসুলের হাওয়ারি যুবাইর ইবনুল আওয়াম এবং আবু বকর রাযি.-এর কন্যা আসমাপুত্র আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি.। তিনি উমাইয়াদের জুলুমের বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠান। ইনসাফের খেলাফত ঘোষণা করেন। মক্কাকে এই খেলাফতের রাজধানী বানান। খোদ আসমা রাযি. তাঁর এই জিহাদ ও সংগ্রামে সহায়তা করেন। উমাইয়াদের পক্ষ থেকে জালেম ও পাপিষ্ঠ হাজ্জাজকে প্রেরণ করা হয়। হাজ্জাজ মক্কা শহর অবরোধ করেন। একপর্যায়ে আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইরকে হত্যা করে তার মাথা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের কাছে পাঠান। তার শরীর জঘন্যভাবে শূলে চড়িয়ে রাখেন! আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইরের সঙ্গে তার দুজন বিশিষ্ট সহযোগী আবদুল্লাহ ইবনে মুতি ও আবদুল্লাহ ইবনে সফওয়ান রাযি. সহ অসংখ্য বড় বড় তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়ি শাহাদাত বরণ করেন।

সাহাবিদের এই গাইরত ও ঈমানের পথে অটল থাকেন অসংখ্য তাবেয়ি। জালেমের বিরুদ্ধে তারাও সক্রিয় থাকেন, যেটা চূড়ান্তরূপে প্রকাশ পেয়েছিল ইবনুল আশআসের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে, ইতিহাসে যা 'আলেমদের বিদ্রোহ' (সাওরাতুল কুররা) নামেও পরিচিত। আবদুর রহমান ইবনুল আশআসের নেতৃত্বে হাজ্জাজ ও উমাইয়া শাসক আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহে শরিক হয়েছিলেন প্রায় পাঁচশত সাহাবি ও তাবেয়ি! তাদের মাঝে ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি আনাস ইবনে মালেক, আনাসের ছেলে নজর ইবনে আনাস, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের পুত্র মুহাম্মাদ (হাজ্জাজ তাকে হত্যা করে), আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের পুত্র আবু উবাইদা, মুজাহিদ ইবনে জবর, ইবনে দিনার, আমের ইবনে শুরাহবিল, সাইদ ইবনে যুবাইর এবং আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলার মতো বড় বড় মানুষ।

অন্যদিকে পবিত্র আহলে বাইতের অসংখ্য সদস্যও জালেমের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ময়দানে তাজা খুন বিলিয়ে শাহাদাতকে বেছে নেন। নবি-পরিবারের সদস্যরা কারবালার বেদনাদায়ক দৃশ্যের সামনে কখনো দমে যাননি; বরং নিজেদের গাইরত ও ঈমানি দাবি পূরণে সবসময় সচেষ্ট ছিলেন। জালেম ও পাপাচারীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শোণিত তারা বংশীয় সূত্রে ঐতিহ্য হিসেবে বহন করছিলেন। হুসাইন রাযি.-এর পরে তাঁর পুত্র যাইনুল আবিদিনের সন্তান (হুসাইন পৌত্র) যায়দ ইবনে আলি উমাইয়া শাসক হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। এ বিদ্রোহের মূল প্রাণোদনা ছিল সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ, যে পথে প্রাণ দিয়েছিলেন তাঁর দাদা হুসাইন রাযি.। তিনি আলেমদের সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধের প্রতি দাওয়াত দেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং সত্যের পক্ষে বঞ্চিতদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তার এ জিহাদে অংশগ্রহণের আহ্বান করেন (১২২ হি.)। একইভাবে পরবর্তী সময়ে ইবরাহিম ইবনে আবদুল্লাহ এবং তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ (মুহাম্মাদ আন-নাফসুয যাকিয়্যাহ) আব্বাসিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।

টিকাঃ
১৩৬২. দেখুন : তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সাদ (৫/১৭১)। সিয়ারু আলামিন নুবালা (৪/৩৮)। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১১/৬২৩)।
১৩৬৩. দেখুন: আল-ইসাবাহ (৪/৪৫৪)।
১৩৬৪. দেখুন: তারিখে তাবারি (৬/১৮৮-১৯২)। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (১২/২২১-২২২)।
১৩৬৫. সিয়ারু আলামিন নুবালা (৪/৩৪১)।
১৩৬৬. দেখুন: তারিখে খলিফাহ ইবনে খাইয়াত (২৮৭)। সিয়ারু আলামিন নুবালা (৪/১৮৩-১৮৪)।
১৩৬৭. আল কামিল, ইবনুল আসির (৫/২৩৩)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 বিদ্রোহ বৈধতা থেকে অবৈধতায় রূপান্তর

📄 বিদ্রোহ বৈধতা থেকে অবৈধতায় রূপান্তর


তবে এসব বিদ্রোহ জুলুম ও জালেমের প্রতি মনস্তাত্ত্বিক ঘৃণা ছাড়া আর কোনো বাস্তবসম্মত অর্জন বয়ে আনছিল না, যদিও এটা মূল্যহীন কিংবা অল্প ফলাফল এমন নয়; বরং জুলুমের প্রতি মনস্তাত্ত্বিক ঘৃণা অনেক বড় অর্জন নিঃসন্দেহে; তথাপি এর মূল্যটা ছিল বেশ চড়া। হাজার হাজার তাবেয়ি এতে নিহত হচ্ছিলেন। লাখ লাখ সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছিল। শহর বিরান হয়ে যাচ্ছিল। উম্মাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। বিপরীতে জালেমরা বহাল তবিয়তেই থেকে যাচ্ছিল। বরং তাদের জুলুম বাড়ছিল বই কমছিল না। এ কারণে উলামায়ে কেরাম পুরো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন। খোদ ইমাম আজম রহ. পুরো বিদ্রোহের সিলসিলাটির প্রতি পুনরায় মনোযোগ দেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর বারবার সতর্কবার্তা এবং সবরের নসিহতগুলো বাস্তবতার আলোকে পুনর্মূল্যায়ন করেন। পাশাপাশি আলেমদের উপর শাসকদের চাপ বৃদ্ধি পায়। তারা ইমাম আজম, সুফিয়ান সাওরিসহ বিভিন্ন আলেমকে কৌশলস্বরূপ রাষ্ট্রের বড় বড় দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব করেন। আলেমদের শ্রদ্ধা করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না, বরং প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল আলেমদের থেকে সম্ভাব্য বিদ্রোহ-বিৃঙ্খলা প্রকাশের দরজা বন্ধ করা, রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য এবং শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তাদের নিষ্ঠা পরীক্ষা করা। কেউ কেউ শাসকের প্রস্তাব গ্রহণ করে নেন। কিন্তু ইমাম আজমসহ প্রথম শ্রেণির ইমামগণ এখানেও অবিচলতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। জুলুমের মুখোমুখি হয়েও সরকারি পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে মক্কাতে পালিয়ে যান। সুফিয়ান সাওরিসহ অনেক আলেমই তখন বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে থাকেন। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাদের কৌশলগত পরিবর্তন মেনে নিতে বাধ্য করে। উমাইয়াদের পতনের পরে আব্বাসিরা নেতৃত্বে আসে। আব্বাসি সাম্রাজ্য দ্রুতই মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে যায়। শাসকরা ইসলাম, মুসলমান ও আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধা যাহির করতে থাকে। অন্যদিকে যাদের থেকে বিদ্রোহের আশঙ্কা ছিল, তাদের নজরবন্দি করে রাখে এবং বিভিন্ন শাস্তির সম্মুখীন করে। মনসুর কৌশল করে ইমাম আজমকে বিচারকের প্রস্তাব দেন। প্রত্যাখ্যান করলে বেত্রাঘাত করেন এবং জেলে বন্দি করে রাখেন। পরবর্তীকালে জেল থেকে ছাড়লেও গৃহবন্দি করে রাখেন। মানুষের সঙ্গে মিশতে, কথা বলতে এবং ছাত্রদের পাঠদান করতে নিষেধ করেন; বরং ঘর থেকে বের হওয়ার উপরও নিষেধাজ্ঞা আসে। এভাবেই একসময় তিনি দুনিয়া থেকে মজলুম ও শহিদ হিসেবে বিদায় নেন।

এভাবে ইমাম আজম রহ.-এর দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে যায় যে, 'যদি কোনো অঞ্চলে অন্যায় দেখা দেয় এবং সেটা কারও পক্ষে পরিবর্তনের সামর্থ্য না থাকে, তবে তার জন্য সেখান থেকে অন্য ভূখণ্ডে হিজরত করে যাওয়া উচিত, তবুও বিদ্রোহ করা উচিত হবে না।' এ প্রসঙ্গে তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে নিজস্ব সূত্রে (হাম্মাদ → ইবরাহিম → আলকামা → ইবনে মাসউদ) হাদিস বর্ণনা করেন; রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'যখন কোনো ভূখণ্ডে অন্যায় প্রকাশ পায় এবং সেটা তোমার পরিবর্তনের সাধ্য না থাকে, তবে অন্যত্র চলে যাও এবং সেখানে গিয়ে তোমার রবের ইবাদত করো।' ইমাম সাহাবির সূত্রে বলেন, 'ফেতনার ভয়ে যদি কেউ এক ভূখণ্ড থেকে অন্য ভূখণ্ডে হিজরত করে, আল্লাহ তার জন্য সত্তর জন সিদ্দিকের পুণ্য লিপিবদ্ধ করেন।'

টিকাঃ
১৩৬৮. মানাকিব, বাযযাযি (২৬৭)।
১৩৬৯. দেখুন: শাযারাতুয যাহাব (২/২০৩-২০৪)।
১৩৭০. মানাকিব, বাযযাযি (২৯৯)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00