📄 ফাসেক কি শাসক হতে পারবে?
উপরে বলা হয়েছে, শাসক হওয়ার জন্য মুত্তাকি হওয়া শর্ত। প্রশ্ন হলো, ফাসেক তথা পাপাচারী কি শাসক হওয়ার যোগ্য? শাফেয়ি রহ.-এর মতে, ফাসেক ব্যক্তি সাক্ষী কিংবা বিচারক হতে পারবে না। ফলে শাসক তো হতেই পারবে না। খারেজি ও মুতাযিলাদের মতে ফাসেক ব্যক্তি মুমিনই নয়। ফলে সেও খলিফা হতে পারবে না। ইমাম আজম রহ.-এর মত সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ফাসেক ব্যক্তিকে শাসক বানানো মাকরুহ। তথাপি যদি বানিয়ে ফেলাই হয়, সেটা কার্যকর হবে। সে শাসক গণ্য হবে। উক্ত মতভেদ থেকে আরও একটি ফলাফল পাওয়া যায়। সেটা হলো, শাসক যদি কোনো কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায়, তবে শাফেয়ি, খারেজি ও মুতাযিলাদের মতে তাকে পদচ্যুত করা হবে। কারণ, সে শাসক হওয়ার যোগ্য থাকবে না। ইমাম আজমের মতে, ফাসেক (যেমন: জালেম, ঘুস গ্রহণকারী) পদচ্যুতির যোগ্য, পদচ্যুত করা হোক বা না হোক। তবে পদচ্যুত করা না হলে এবং শাসক হিসেবে থাকলে সেটা কার্যকর হবে এবং তার আনুগত্য জরুরি হবে। উক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে জালেম শাসক (যে মূলত ফাসেক)-এর বিরুদ্ধে ইমামের দৃষ্টিভঙ্গিও বোঝা গেল। সামনে এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আসছে।
টিকাঃ
১৩৩৮. আখবারু আবি হানিফা, সাইমারি (৮৪)। আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ, সাবুনি (২১৪)।
📄 শাসকের কুরাইশ বংশীয় হওয়ার শর্ত ব্যাখ্যাসাপেক্ষ
প্রশ্ন হলো, মুসলমানদের ইমাম তথা শাসক হওয়ার জন্য কি কুরাইশ বংশের হওয়া জরুরি? এটা নিয়ে সংশয় ও জটিলতা আছে। ফলে কিছু কথা বলা জরুরি মনে করছি।
আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের মতে শাসক কুরাইশ বংশের হওয়া জরুরি; স্রেফ বনু হাশিম নয়, যেমনটা রাফেযিরা দাবি করে থাকে এবং সে ভিত্তিতে আবু বকর, উমর ও উসমানের খেলাফতকে তারা প্রত্যাখ্যান করে থাকে। কারণ, আলি ব্যতীত বাকি তিন জন বনু হাশিমের অন্তর্ভুক্ত নন। ফলে স্রেফ কুরাইশি হওয়াই যথেষ্ট। এর দলিল রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর বাণী: 'ইমাম হবে কুরাইশ থেকে।' এই হাদিসের উপর ভিত্তি করেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাতের পরে যখন মুহাজির ও আনসার সাহাবাদের মাঝে খলিফা নিযুক্তি নিয়ে মতবিরোধ দেখা গিয়েছিল, তখন আনসারগণ মুহাজিরদের জন্য খেলাফতের দাবি পরিত্যাগ করেছিলেন। এটা ইমাম আজম রহ.-এর মত। শাফেয়ি ও মুহাদ্দিসিনের মতও এমন। সকল হানাফি আলেমের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এটা।
বিপরীতে মুতাযিলা ও খারেজি সম্প্রদায়ের মতে, ইমাম হওয়ার জন্য কুরাইশি হওয়া জরুরি নয়। ফলে কুরাইশ বংশের বাইরের লোকজনও মুসলমানদের শাসক হতে পারবে। তাদের দলিল আল্লাহর বাণী: ۞ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ۞ অর্থ: 'তোমাদের মাঝে আল্লাহর কাছে সে সবচেয়ে সম্মানিত যে তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে।' [হুজুরাত: ১৩] সুতরাং শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড তাকওয়া; বংশ নয়।
কিন্তু এটা তাদের দলিল নয়। কারণ, এখানে খেলাফতের প্রসঙ্গ নেই। এটা আল্লাহর কাছে সম্মানিত ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। আর আহলে সুন্নাতের কেউ বলেননি যে, খলিফা সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি কিংবা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত হবেন। বরং খলিফার চেয়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ের প্রজাও আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত ও প্রিয় হতে পারেন। খলিফা হওয়ার জন্য উম্মাহর সবচেয়ে বড় মুত্তাকি হওয়া শর্ত নয়।
প্রশ্ন আসতে পারে, কুরাইশ বংশের সঙ্গে নেতৃত্ব নির্ধারিত করা হলো কেন? অথচ আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিতে সকল জাতিগোষ্ঠী সৃষ্টিগতভাবে এক এবং মর্যাদার পার্থক্য তাকওয়ার ভিত্তিতে, বংশ পরিচয়ে নয়, যেমনটা উপরের আয়াতে বলা হয়েছে [হুজুরাত: ১৩]। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মক্কা বিজয়ের দিন খুতবার মাঝে বলেন, 'হে লোকসকল, আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে জাহেলিয়্যাতের আত্ম-অহমিকা এবং বাপ-দাদা নিয়ে অহংকারের দিন বিলুপ্ত করেছেন। সুতরাং এখন থেকে মানুষ কেবল দুই ধরনের। সৎকর্মশীল আল্লাহভীরু ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সম্মানিত, আর অবাধ্য দুরাচার আল্লাহর কাছে অবজ্ঞার পাত্র। সকল মানুষ আদমের সন্তান; আর আদম মাটির তৈরি।' অতঃপর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) উপরের আয়াত তেলাওয়াত করলেন। বিদায় হজের ঐতিহাসিক খুতবায় রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'হে লোকসকল, তোমাদের প্রভু একজন; তোমাদের পিতাও একজন। মনে রেখো, অনারবদের উপর আরবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আরবদের উপর অনারবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোর উপর লালের কিংবা লালের উপর কালোর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্বের মূল মানদণ্ড হলো তাকওয়া।' ফলে ইসলামের চোখে মানুষের সমান অধিকার চিরস্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত বিষয়। তাহলে শাসক হওয়ার জন্য অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর উপর কুরাইশি হওয়াকে শর্ত দেওয়া হলো কেন?
টিকাঃ
১৩০৯. বুখারি (কিতাবুল মানাকিব: ৩৫০০, ৩৫০১)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু মালে ইবনে আনাস : ১২৫০১)।
১১৪০. আল-ইতিকাদ, বলখি (১১২)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১১৮০-১১৮৫)।
১১৪১. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৯২)।
১৩৪২. তিরমিযি (আবওয়াবু তাফসিরিল কুরআন: ৩২৭০)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল হজ : ৩৮২৮)।
১৩৪৩. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুল আনসার: ২৩৯৭২)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
এগুলো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা, তবে চূড়ান্ত কথা নয়। কারণ, এসব গুণ-বৈশিষ্ট্য আল্লাহ তাআলা কুরাইশের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং আরব ও অনারবের অন্যান্য বংশের মাঝেও এ ধরনের গুণ বিদ্যমান থাকা স্বাভাবিক। গোটা মানবজাতি এক্ষেত্রে কিছু তারতাম্যসহ সমান অংশীদার। ফলে এসব কারণের বাইরে আরেকটি রহস্য উল্লেখ করা যায়, যেটা অধমের কাছে অধিকতর যৌক্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। সেটা হলো, মুসলিমদের ঐক্য ধরে রাখা, সম্ভাব্য সকল বিশৃঙ্খলা ও অনৈক্য থেকে মুসলিম উম্মাহকে সুরক্ষিত রাখা।
এর ব্যাখ্যা হলো, 'রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন কুরাইশ বংশের। চার খলিফাসহ ইসলামের প্রথম সারির অগণিত সাহাবি কুরাইশ বংশের। তারা রাসুলুল্লাহর সবচেয়ে কাছের মানুষ, ইসলামের সর্বাগ্র সেনা এবং বিশ্বাসীদের সর্বপ্রথম কাফেলা। ফলে এ বংশের প্রতি প্রত্যেক মুসলমানের স্বভাবজাত অনুরাগ ও দুর্বলতা ছিল। এ বংশের মানুষের প্রতি সম্মান এবং তাদের আনুগত্যের প্রতি বিশেষ সম্মতি ছিল। ফলে তখন বিশৃঙ্খল আরব জাতি এবং তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য জাতি, বর্ণ ও ভাষার মুসলমানদের নিয়ে সদ্য তৈরি হওয়া 'উম্মাহ'র ঐক্য বজায় রাখতে, কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা ধরে রাখতে খেলাফতকে কুরাইশের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখার বিকল্প ছিল না। এ জন্য এটা যতটা না ছিল শরয়ি ও 'তাআব্বুদি' (ইবাদতগত) দৃষ্টিকোণ থেকে, তারচেয়ে বেশি ছিল 'নিযাম' তথা শৃঙ্খলা রক্ষার্থে। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন কুরাইশ বংশের লোকদের মাঝে দুর্বলতা নেমে আসে, অন্য জাতির মুসলিমরা শক্তিশালী হয়ে যায়, উক্ত শর্ত কার্যত রহিত হয়ে যায়।
তাই এক্ষেত্রে ইনসাফপূর্ণ কথা হলো, কুরাইশি শর্ত পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে। যদি ইমাম হওয়ার জন্য মুসলিমদের মাঝে একাধিক যোগ্য ব্যক্তি থাকে যারা সামর্থ্য, গুণাবলি, তাকওয়াসহ অন্য সকল বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্বে সমান, মুসলমানদের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সমপরিমাণ যোগ্যতার অধিকারী, কিন্তু তাদের একজন কুরাইশ বংশের অন্যজন বা অন্যরা কুরাইশ বংশের নয়, এক্ষেত্রে কুরাইশিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আর যদি এমন হয়, যেকোনো এক কিংবা একাধিক ব্যক্তি কুরাইশি থাকে, কিন্তু তাদের মাঝে ইমামতির কোনো যোগ্যতা না থাকে, তখন যিনি যোগ্য তাকেই ইমাম বানানো হবে। কুরাইশি, তাই অযোগ্যকেও মুসলমানদের ইমাম বানিয়ে ফেলতে হবে এমন কথা কুরআন-সুন্নাহর মেযাজের খেলাফ। কারণ, এটা যতটা না মর্যাদার, তারচেয়ে বেশি দায়িত্বের জায়গা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلনَّাসِ إِمَامًا قَالَ وَمِن ذُرِّيَّتِي قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ ۞ অর্থ: “(স্মরণ করুন) যখন ইবরাহিমকে তার প্রতিপালক কয়েকটি কথা দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন এবং সেগুলো সে পূর্ণ করেছিল। আল্লাহ বললেন, 'আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা করছি।' সে বলল, 'আমার বংশধরের মধ্য হতেও?' আল্লাহ বললেন, 'আমার প্রতিশ্রুতি জালেমদের জন্য প্রযোজ্য নয়।” [বাকারা: ১২৪] সুতরাং যারা জালেম কিংবা অযোগ্য—এমন লোকরা খলিফা হওয়ার উপযুক্ত নয়। এক্ষেত্রে বংশপরিচয় কাজে আসবে না।
একইভাবে ইমাম বলতে খেলাফতের প্রশ্নে কুরাইশি জরুরি হওয়া যৌক্তিক। কিন্তু খেলাফতের বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে কায়েম হওয়া ইসলামি রাষ্ট্রের ইমাম হওয়ার জন্য কুরাইশি হওয়া জরুরি নয়। কারণ, পৃথিবীর সর্বত্র কুরাইশ বংশের লোক থাকবেন না। ফলে জগতের কোথাও ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে অন্য রাজ্য থেকে কোনো কুরাইশি ব্যক্তিকে ধরে এনে ইমাম বানাতে হবে এটাও অযৌক্তিক কথা। তাই কুরাইশি শর্তটাকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে রেখে বিচার করা চাই। এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি বর্জন করা কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'যদি তোমাদের উপর কালো-কদর্য কোনো হাবশি দাসকেও শাসক নিযুক্ত করা হয়, তবুও তার কথা শুনবে এবং তার আনুগত্য করবে।'
টিকাঃ
১৩৪৪. দেখুন: তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১১০৮-১১১১)।
১৩৪৫. বুখারি (কিতাবুল আযান: ৬৯৩)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল জিহাদ: ২৮৬০)।
📄 শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বিধান
মুসলমানদের ইমাম তথা শাসক হিসেবে যখন একজন যোগ্য, ইনসাফগার, দূরদর্শী মুসলিম ব্যক্তি নিযুক্ত হবেন এবং উম্মাহ তার নেতৃত্ব মেনে নেবে, ইসলামি রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা বিরাজ করবে, ন্যায়-ইনসাফ ও সমৃদ্ধির ঝান্ডা পতপত করে উড়বে, মুসলমানরা শরিয়াহর ছায়ায় শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করবে, সে মুহূর্তে সেই রাষ্ট্র কিংবা সেই শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ইসলামের সকল আলেমের সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। যারা বিদ্রোহ করবে, তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। বিদ্রোহের সকল চাল ও জাল সমূলে উপড়ে ফেলা হবে। কারণ, দ্বীন ও দুনিয়া উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এ ধরনের আচরণ পরিত্যাজ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ إِنَّমَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآখিরেতি عَذَابٌ عَظِيمٌ ۞ অর্থ: 'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি এটাই যে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে; অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত-পা কেটে দেওয়া হবে; কিংবা তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে। এটা তো তাদের পার্থিব লাঞ্ছনা। আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।' [মায়িদা: ৩৩] রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেবে- 'আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই আর আমি আল্লাহর রাসুল,' তাকে হত্যা করা হবে না (অর্থাৎ, তার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে)। তবে তিন ব্যক্তি এর ব্যতিক্রম : এক. বিবাহিত ব্যভিচারী। দুই. প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ (তথা হত্যাকারী)। তিন. ধর্মত্যাগকারী এবং মুসলিম জামাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী।'
এমনকি মুসলিম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখতে শাসক যদি সকল মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হয়, তবুও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হবে না। যেমন-শাসক যদি ফিসক তথা অন্যায়ে জড়িয়ে পড়ে, জুলুম করে, আহলে সুন্নাতের মতে, তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা হবে না। উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগের শাসকরা বিভিন্ন অন্যায়-অনাচারে ডুবে ছিল। সাহাবা ও তাবেয়িনসহ সালাফে সালেহিনের বড় বড় ইমাম তখন জীবিত ছিলেন। কিন্তু তারা সহ্য করেছেন। জালেম ও ফাসেক শাসকের পিছনে নামায পড়েছেন। তাদের অনুমতিতে ঈদ পালন করেছেন। তাদের বৈধ নির্দেশ মান্য করেছেন। কারণ, বিদ্রোহ মুসলমানদের মাঝে ফেতনার আগুন ঢেলে দেয়, বিশৃঙ্খলা ছড়ায়, ভূপৃষ্ঠে হানাহানি ও রক্তপাত ঘটায়। এর পর একজনকে সরিয়ে অন্যজনের নিয়োগ সংকটকে আরও জটিল করে। সমাধানের চেয়ে সমস্যা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে।
কারণ কী? কারণ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলে গিয়েছেন সবকিছু। তিনি একাধিক হাদিসে জালেম ও ফাসেক শাসকদের আবির্ভাবের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। সবরের সঙ্গে তাদের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'যদি তোমাদের কেউ শাসকের কোনোকিছু অপছন্দ করে, তবে যেন সে সবর করে। কারণ, যে ব্যক্তি সুলতানের আনুগত্য থেকে এক বিঘত পরিমাণ বেরিয়ে যাবে, সে জাহেলি মৃত্যু বরণ করবে।' অপর হাদিসে এসেছে, 'যে ব্যক্তি (শাসকের) আনুগত্য থেকে বাইরে যাবে এবং মুসলমানদের জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, সে জাহেলি মৃত্যুবরণ করবে।'
আউফ ইবনে মালেক আশজায়ি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, 'তোমাদের সর্বোত্তম শাসক হচ্ছে-যাদের তোমরা ভালোবাসো, তারাও তোমাদের ভালোবাসে; যাদের জন্য তোমরা দোয়া করো, তারাও তোমাদের জন্য দোয়া করে। আর তোমাদের সর্বনিকৃষ্ট শাসক হচ্ছে- যাদের তোমরা ঘৃণা করো, তারাও তোমাদের ঘৃণা করে; যাদের তোমরা অভিশাপ দাও, তারাও তোমাদের অভিশাপ দেয়।' সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করব না? তিনি বললেন, 'না। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে নামায কায়েম করে। (দ্বিতীয়বার বললেন) না, বিদ্রোহ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে নামায কায়েম করে। সাবধান! যার উপর কোনো শাসককে নিযুক্ত করা হলো, সে যদি তার মাঝে আল্লাহর কোনো অবাধ্যতা দেখে, তবে আল্লাহর অবাধ্যতাকে যেন ঘৃণা করে। শাসকের আনুগত্য বর্জন না করে।'
সালামা ইবনুল আকওয়া থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।' ইবনে হিব্বান উক্ত হাদিসের শিরোনাম দিয়েছেন, 'শাসক জুলুম করলেও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে।'
টিকাঃ
১৩৪৮. মুসলিম (কিতাবুল কাসামাহ ওয়াল মুহারিবিন: ১৬৭৬)। আবু দাউদ (কিতাবুল হুদুদ: ৪৩৫২)। তিরমিযি (আবওয়াবুদ দিয়াত: ১৪০২)।
১৩৪৯. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৯৬)।
১৩৫০. বুখারি (কিতাবুল ফিতান: ৭০৫৩)। মুসলিম (কিতাবুল ইমারাহ: ১৮৪৯)।
১৩৫১. মুসলিম (কিতাবুল ইমারাহ: ১৮৪৮)।
১৩৫২. মুসলিম (কিতাবুল ইমারাহ: ১৮৫৫)। মুসনাদে দারেমি (কিতাবুর রিকাক: ২৮৩৯)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদল আনসার: ২৪৬৩৩)।
১৩৫৩. ইবনে হিব্বান (কিতাবুস সিয়ার: ৪৫৮৮)।