📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 মুসলমানদের ইমাম (শাসক) থাকা আবশ্যক

📄 মুসলমানদের ইমাম (শাসক) থাকা আবশ্যক


এই খেলাফত বাস্তবায়নের জন্যই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সকল ইমামের সর্বসম্মতিক্রমে মুসলমানদের জন্য ইমাম (শাসক=খলিফা) নিযুক্ত করা ওয়াজিব। কারণ, ইমাম না থাকলে মুসলমানদের সামগ্রিক জীবন স্থবির হয়ে পড়বে। শরিয়তের বিধিবিধান এবং হদ-কিসাস প্রয়োগ বন্ধ থাকবে। নামায, জুমা ও জামাত উঠে যাবে। মুসলিম রাষ্ট্রের সীমানা দুশমনদের জন্য উদোম হয়ে পড়বে। মুসলিম সেনাবাহিনী বিলুপ্ত হয়ে যাবে। জিহাদ বন্ধ হয়ে যাবে। যাকাত-সদকা উসুল ব্যাহত হবে। গনিমতের সম্পদ বণ্টনে জটিলতা দেখা দেবে। ভূপৃষ্ঠে বিশৃঙ্খলা ও অনাচার ছড়িয়ে পড়বে। অন্যায়, অশ্লীলতা ও ধর্মহীনতার অন্ধকারে উম্মাহ তলিয়ে যাবে। হালাল-হারাম মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। চোরে-ডাকাতে দেশ ভরে যাবে। গরিব, অসহায় ও এতিমরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়বে। এক কথায়, ইমাম না থাকলে মুসলমানদের সামাজিক, ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয়, আর্থিক ও আধ্যাত্মিক তথা জীবনের সর্বক্ষেত্রে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। মুসলমানরা পরিচয়-সংকটে পড়বে। স্বকীয়তা ও দ্বীনদারি হারাবে। অন্যান্য জাতির তাঁবেদার হয়ে পড়বে। উম্মাহর জীবনে দ্বীন চতুর্থ বিষয়ে পরিণত হবে। ইসলামের গৌরব ভূলুণ্ঠিত হবে। ইসলামের সামগ্রিক বাস্তবায়ন বন্ধ হয়ে যাবে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ইমামবিহীন মৃত্যুবরণ করল, সে যেন জাহেলি মৃত্যু বরণ করল।' রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন, 'যে ব্যক্তি (ইমামের বাইয়াত তথা) আনুগত্য ছাড়া মৃত্যুবরণ করল, সে জাহেলি মৃত্যু বরণ করল।'

এ কারণে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) নিজে খেলাফত বাস্তবায়ন করেন। তিনি যতদিন পৃথিবীতে জীবিত থাকেন, আল্লাহর আইন অনুযায়ী ইসলামি রাষ্ট্র ও উম্মাহর জীবন পরিচালনা করেন। মদিনায় প্রায় দশ বছর নবুওতি শাসন থাকে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তেকালের আগে খেলাফতের ঘোষণা করে যান। তিনি জানিয়ে যান, তাঁর পরে তাঁর উত্তরসূরি সাহাবাদের 'খলিফা' বলা হবে। তাদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্মের খেলাফত ত্রিশ বছর অব্যাহত থাকবে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'নবুওতের খেলাফত হবে ত্রিশ বছর। অতঃপর রাজত্ব (বা রাজতন্ত্র) আসবে।'

ফলে সাহাবায়ে কেরাম রাযি. এ বিষয়টির প্রতি শুরু থেকেই অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় আল্লাহর রাসুলই তাদের ইমাম ছিলেন। তিনি যখন দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন, তখন শীর্ষস্থানীয় সাহাবাগণ তাঁকে কাফন-দাফনের আগেই এ মহা গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পাদন করতে মনোযোগী হন, যাতে এক মুহূর্ত ইমাম ছাড়া থাকা না হয়। আল্লাহর শরিয়ত ও উম্মত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ফলে আহলে বাইতের সদস্যরা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর গোসল ও কাফনে লেগে যান। অপরদিকে অন্য সাহাবাগণ এই বিশাল কাজটি সুরাহার জন্য বসে যান। শেষ পর্যন্ত তারা আবু বকর রাযি.-কে ইমাম নিযুক্ত করেন। আবু বকরের পরে উমর আসেন। উমরের পরে উসমান। উসমানের পরে আলি। আলির পরে হাসান। হাসানের পরে মুআবিয়া। এভাবে সেই নববি যুগ থেকে দ্বিতীয় আবদুল হামিদ পর্যন্ত মুসলমানদের মাঝে কোনো-না-কোনো ইমাম (খলিফা/রাজা) থাকেন। বিভিন্ন উত্থান-পতনের মাঝ দিয়ে খেলাফত কায়েম থাকে। উম্মাহর সামগ্রিক অভিভাবকত্বের ধারা অব্যাহত থাকে। এর পর মুসলিমরা ইমামবিহীন হয়ে পড়ে। কেটে যায় শত বছর। ফলাফল সামনে। গুনতিতে প্রায় দুইশত কোটি হলেও আজকের মুসলিমরা একটা রাষ্ট্রবিহীন, অভিভাবকহীন এবং শরিয়তের সামগ্রিক প্রয়োগবিহীন জাতি। একটা পরিচয়হীন বেওয়ারিশ লাশের মতো, যার অতীতের গৌরব আছে, কিন্তু বর্তমান অস্তিত্ব ভাগাড়ে পড়ে আছে। ভবিষ্যৎ ডুবে আছে ঘোর অন্ধকারে।

টিকাঃ
১০০২. দেখুন : উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৯১)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১১০৩)। আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ (২১১-২১২)। আকিদাহ রুকনিয়্যাহ (৪১)।
১৩৩৩. ইবনে হিব্বান (কিতাবুস সিয়ার : ৪৫৭৩)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুশ শামিয়্যিন: ১৭১৫০)।
১৩৩৪. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুল মাক্কিয়্যিন: ১৫৯৩৬)। মুসনাদে বাযযার (মুসনাদু আমের ইবনে রবিআহ : ৩৮১৭)।
১৩৩৫. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুল আনসার: ২২৩৩৭)। শরহু মুশকিলিল আসার (বাবু বায়ানি মুশকিলি মা রুয়িয়া আন রাসুলিল্লাহ ফি উলাতিল আমরি বাদাহ: ৩৩৪৯)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 শাসকের আবশ্যক গুণাবলি

📄 শাসকের আবশ্যক গুণাবলি


মুসলমানদের ইমাম হওয়ার জন্য কতগুলো শর্ত রয়েছে। কিছু শর্ত হলো অত্যাবশ্যক, যেগুলো ছাড়া কেউ শাসক হতেই পারবে না। যথা: মুসলিম হওয়া, পুরুষ হওয়া, স্বাধীন হওয়া, বালেগ হওয়া, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া, কুরাইশ বংশীয় হওয়া। এর সঙ্গে আরও কিছু শর্ত হলো ইলম, তাকওয়া, বীরত্ব ও বংশ, আখলাক ইত্যাদি দিক থেকে উপযুক্ত হওয়া। কুরআন-সুন্নাহয় জ্ঞানী, দূরদর্শী, শক্তিশালী ও প্রজ্ঞাবান হওয়া। হালাল-হারামসহ ইসলামের যাবতীয় বিধান সম্পর্কে অবহিত থাকা। অন্যায়ের প্রতিবাদ, জুলুমের নিরসন এবং মজলুমের পক্ষে কাজ করার সামর্থ্য, শক্তি ও সাহস রাখা। যুদ্ধের নেতৃত্বে সমর্থ হওয়া। অর্থাৎ, শারীরিক ও মানসিক সবদিক থেকে উপযুক্ত হওয়া।

তবে সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়া জরুরি নয়। অর্থাৎ, যদি শ্রেষ্ঠকে বর্জন করে কোনো কারণে অশ্রেষ্ঠ কিংবা পিছনের সারির কাউকে ইমাম নিযুক্ত করা হয় এবং সে শাসন পরিচালনার যোগ্য হয়, তবে সেটা বিশুদ্ধ হবে। মুসলানদের উপর তার আনুগত্য মেনে নেওয়া আবশ্যক হবে। ফলে শাসককে সর্বদিক থেকে সবার শ্রেষ্ঠ হতে হবে কিংবা নিষ্পাপ (মাসুম) হতে হবে—এটা জরুরি নয়। কারণ, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেক সৎ-অসৎ ব্যক্তির পিছনে নামায পড়ো।’ সুতরাং নামাযের ক্ষেত্রে যেমন উত্তম ছেড়ে অনুত্তমের পিছনে পড়লে আদায় হয়ে যাবে, তেমনই অনুত্তম শাসকও নিযুক্ত হয়ে গেলে তার আনুগত্য করতে হবে। অন্যত্র রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘যদি তোমাদের উপর এমন কোনো হাবশি দাসকেও শাসক নিযুক্ত করা হয়, যার মাথা কিশমিশের মতো, তবুও তার কথা শোনো এবং তার আনুগত্য করো।’ তবে যদি ফেতনা ছাড়া তাকে পদচ্যুত করা যায় এবং তার জায়গায় উত্তম কাউকে নিযুক্ত করা যায়, সেটা করতে হবে।

টিকাঃ
১৩৩৬. আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী 'ইমামতে উজমা' তথা শাসক হওয়ার জন্য পুরুষ হওয়া জরুরি। ফলে কোনো নারী ইসলামি রাষ্ট্রের খলিফা বা শাসক হতে পারবে না। হ্যাঁ, পরামর্শ দিতে পারবে এবং সহায়তা করতে পারবে, কিন্তু নিজে শাসক হতে পারবে না। এটা ইমাম আজম আবু হানিফা-সহ বাকি তিন ইমাম এবং সকল আলেমের মত। কুরআন-সুন্নাহর দলিল, সুস্থ যুক্তি, দায়িত্বের প্রকৃতি এবং নারীর ফিতরত-সবগুলোর দাবিও এটা। হ্যাঁ, হানাফি মাযহাবে নারী 'কাযি' তথা বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু সেটাও উত্তম নয়। বরং কোনো কোনো ফকিহ বলেছেন, এমন পদেও নারীকে নিয়োগ দেওয়া অবৈধ। তবে নিযুক্ত হয়ে গেলে সে দায়িত্ব পালন করতে পারবে এবং তার ফয়সালা বাস্তবায়িত হবে। তথাপি সেটাও 'হদ' ও 'কিসাস'-এর ক্ষেত্রে নয়; বরং অন্যান্য সাধারণ বিচারকার্যে। সুতরাং নারীর 'ইমামতে উজমা' তথা রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার কোনোই সুযোগ নেই। ইসলামের সকল মুহাক্কিক আলেমের বক্তব্য এড়িয়ে বর্তমানে ফেমিনিজমের প্রভাবে প্রভাবিত গবেষক দাবিদার কিছু মানুষ নারীর শাসক হওয়ার উপযুক্ততা প্রমাণ করতে চান। এক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর দূরবর্তী তাবিল (বা তাহরিফ) এবং দুর্বল যুক্তি-তর্ক ছাড়া তাদের কাছে মজবুত কোনো প্রমাণ নেই। ফলে তাদের কথা বর্জনীয়। [দেখুন : ফাতহুল কাদির: ৭/২৫৩; বাদায়েউস সানায়ে ৭/৩; মাজমাউল আনহুর ২/১৬৮; রদ্দুল মুহতার: ৫/৪৪০]
১৩৩৭. প্রথম হাদিসটি দেখুন দারাকুতনি (কিতাবুল ঈদাইন: ১৭৬৮)। দ্বিতীয় হাদিসটি দেখুন: বুখারি (কিতাবুল আহকাম: ৭১৪২)। আরও দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৯৩)। দেখুন: লুবাবুল কালাম, উসমান্দি (পাণ্ডুলিপি : ৮৩)। তালখিসুল আদিল্লাহ (৮৪২-৮৪৩)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১১১৩)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ফাসেক কি শাসক হতে পারবে?

📄 ফাসেক কি শাসক হতে পারবে?


উপরে বলা হয়েছে, শাসক হওয়ার জন্য মুত্তাকি হওয়া শর্ত। প্রশ্ন হলো, ফাসেক তথা পাপাচারী কি শাসক হওয়ার যোগ্য? শাফেয়ি রহ.-এর মতে, ফাসেক ব্যক্তি সাক্ষী কিংবা বিচারক হতে পারবে না। ফলে শাসক তো হতেই পারবে না। খারেজি ও মুতাযিলাদের মতে ফাসেক ব্যক্তি মুমিনই নয়। ফলে সেও খলিফা হতে পারবে না। ইমাম আজম রহ.-এর মত সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ফাসেক ব্যক্তিকে শাসক বানানো মাকরুহ। তথাপি যদি বানিয়ে ফেলাই হয়, সেটা কার্যকর হবে। সে শাসক গণ্য হবে। উক্ত মতভেদ থেকে আরও একটি ফলাফল পাওয়া যায়। সেটা হলো, শাসক যদি কোনো কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায়, তবে শাফেয়ি, খারেজি ও মুতাযিলাদের মতে তাকে পদচ্যুত করা হবে। কারণ, সে শাসক হওয়ার যোগ্য থাকবে না। ইমাম আজমের মতে, ফাসেক (যেমন: জালেম, ঘুস গ্রহণকারী) পদচ্যুতির যোগ্য, পদচ্যুত করা হোক বা না হোক। তবে পদচ্যুত করা না হলে এবং শাসক হিসেবে থাকলে সেটা কার্যকর হবে এবং তার আনুগত্য জরুরি হবে। উক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে জালেম শাসক (যে মূলত ফাসেক)-এর বিরুদ্ধে ইমামের দৃষ্টিভঙ্গিও বোঝা গেল। সামনে এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আসছে।

টিকাঃ
১৩৩৮. আখবারু আবি হানিফা, সাইমারি (৮৪)। আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ, সাবুনি (২১৪)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 শাসকের কুরাইশ বংশীয় হওয়ার শর্ত ব্যাখ্যাসাপেক্ষ

📄 শাসকের কুরাইশ বংশীয় হওয়ার শর্ত ব্যাখ্যাসাপেক্ষ


প্রশ্ন হলো, মুসলমানদের ইমাম তথা শাসক হওয়ার জন্য কি কুরাইশ বংশের হওয়া জরুরি? এটা নিয়ে সংশয় ও জটিলতা আছে। ফলে কিছু কথা বলা জরুরি মনে করছি।

আহলে সুন্নাতের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের মতে শাসক কুরাইশ বংশের হওয়া জরুরি; স্রেফ বনু হাশিম নয়, যেমনটা রাফেযিরা দাবি করে থাকে এবং সে ভিত্তিতে আবু বকর, উমর ও উসমানের খেলাফতকে তারা প্রত্যাখ্যান করে থাকে। কারণ, আলি ব্যতীত বাকি তিন জন বনু হাশিমের অন্তর্ভুক্ত নন। ফলে স্রেফ কুরাইশি হওয়াই যথেষ্ট। এর দলিল রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর বাণী: 'ইমাম হবে কুরাইশ থেকে।' এই হাদিসের উপর ভিত্তি করেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাতের পরে যখন মুহাজির ও আনসার সাহাবাদের মাঝে খলিফা নিযুক্তি নিয়ে মতবিরোধ দেখা গিয়েছিল, তখন আনসারগণ মুহাজিরদের জন্য খেলাফতের দাবি পরিত্যাগ করেছিলেন। এটা ইমাম আজম রহ.-এর মত। শাফেয়ি ও মুহাদ্দিসিনের মতও এমন। সকল হানাফি আলেমের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এটা।

বিপরীতে মুতাযিলা ও খারেজি সম্প্রদায়ের মতে, ইমাম হওয়ার জন্য কুরাইশি হওয়া জরুরি নয়। ফলে কুরাইশ বংশের বাইরের লোকজনও মুসলমানদের শাসক হতে পারবে। তাদের দলিল আল্লাহর বাণী: ۞ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ۞ অর্থ: 'তোমাদের মাঝে আল্লাহর কাছে সে সবচেয়ে সম্মানিত যে তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে।' [হুজুরাত: ১৩] সুতরাং শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড তাকওয়া; বংশ নয়।

কিন্তু এটা তাদের দলিল নয়। কারণ, এখানে খেলাফতের প্রসঙ্গ নেই। এটা আল্লাহর কাছে সম্মানিত ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। আর আহলে সুন্নাতের কেউ বলেননি যে, খলিফা সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি কিংবা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত হবেন। বরং খলিফার চেয়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ের প্রজাও আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত ও প্রিয় হতে পারেন। খলিফা হওয়ার জন্য উম্মাহর সবচেয়ে বড় মুত্তাকি হওয়া শর্ত নয়।

প্রশ্ন আসতে পারে, কুরাইশ বংশের সঙ্গে নেতৃত্ব নির্ধারিত করা হলো কেন? অথচ আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিতে সকল জাতিগোষ্ঠী সৃষ্টিগতভাবে এক এবং মর্যাদার পার্থক্য তাকওয়ার ভিত্তিতে, বংশ পরিচয়ে নয়, যেমনটা উপরের আয়াতে বলা হয়েছে [হুজুরাত: ১৩]। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মক্কা বিজয়ের দিন খুতবার মাঝে বলেন, 'হে লোকসকল, আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে জাহেলিয়্যাতের আত্ম-অহমিকা এবং বাপ-দাদা নিয়ে অহংকারের দিন বিলুপ্ত করেছেন। সুতরাং এখন থেকে মানুষ কেবল দুই ধরনের। সৎকর্মশীল আল্লাহভীরু ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সম্মানিত, আর অবাধ্য দুরাচার আল্লাহর কাছে অবজ্ঞার পাত্র। সকল মানুষ আদমের সন্তান; আর আদম মাটির তৈরি।' অতঃপর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) উপরের আয়াত তেলাওয়াত করলেন। বিদায় হজের ঐতিহাসিক খুতবায় রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'হে লোকসকল, তোমাদের প্রভু একজন; তোমাদের পিতাও একজন। মনে রেখো, অনারবদের উপর আরবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আরবদের উপর অনারবদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোর উপর লালের কিংবা লালের উপর কালোর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্বের মূল মানদণ্ড হলো তাকওয়া।' ফলে ইসলামের চোখে মানুষের সমান অধিকার চিরস্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত বিষয়। তাহলে শাসক হওয়ার জন্য অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর উপর কুরাইশি হওয়াকে শর্ত দেওয়া হলো কেন?

টিকাঃ
১৩০৯. বুখারি (কিতাবুল মানাকিব: ৩৫০০, ৩৫০১)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু মালে ইবনে আনাস : ১২৫০১)।
১১৪০. আল-ইতিকাদ, বলখি (১১২)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১১৮০-১১৮৫)।
১১৪১. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৯২)।
১৩৪২. তিরমিযি (আবওয়াবু তাফসিরিল কুরআন: ৩২৭০)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল হজ : ৩৮২৮)।
১৩৪৩. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুল আনসার: ২৩৯৭২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00