📄 জনগণ নয়, আল্লাহ ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের উৎস
আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে মানুষকে খলিফা হিসেবে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً ۞ অর্থ: '(স্মরণ করুন) যখন আপনার প্রভু ফেরেশতাদের বলেছিলেন, পৃথিবীতে আমি খলিফা (প্রতিনিধি) বানাতে যাচ্ছি।' [বাকারা: ৩০] ফলে আল্লাহর গড়া মানুষ আল্লাহর গড়া পৃথিবী আবাদ করবে, এখানে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করবে, আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী চলবে এটাই স্বাভাবিক। এটাই খেলাফতের মূল মর্ম। আল্লাহ বলেন, ۞ الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَءَاتَوُا الزَّকَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ ۞ অর্থ: 'তারা এমন লোক যাদের আমি পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত (তথা ক্ষমতাবান) করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহর অধীনে।' [হজ: ৪১]
পৃথিবী আল্লাহর। সুতরাং এখানে আল্লাহর শাসন চলবে। পৃথিবী পরিচালিত হবে আল্লাহর আইনে। আল্লাহই হবেন সকল আইন, ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের উৎস। আল্লাহ তাআলা বলেন, ۞ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ ۞ অর্থ: 'সৃষ্টি তাঁর, নির্দেশও তাঁর।' [আরাফ: ৫৪] আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ۞ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ۞ অর্থ: 'আইন কেবল আল্লাহরই। তিনি আদেশ দিয়েছেন—তিনি ছাড়া তোমরা আর কারও দাসত্ব করবে না।' [ইউসুফ: ৪০]
তবে যেহেতু শয়তান এবং তার বাহিনী পৃথিবীতে শয়তানের রাজত্ব গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এ জন্য এখানে সত্য-মিথ্যার সংগ্রাম, হক ও বাতিলের লড়াই চিরন্তন। খেলাফত ও শয়তানিয়্যাতের দ্বন্দ্ব শাশ্বত। এই দ্বন্দ্বের ফলস্বরূপ যুগে যুগে অধিকাংশ মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানের দাসত্ব করেছে। পৃথিবীতে আল্লাহর খেলাফতের পরিবর্তে শয়তানের রাজত্ব কায়েম করেছে। তথাপি নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি বিশ্বাসী মুমিনদের সদাসর্বদা সাহায্যের ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ۞ وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِينَ ۞ অর্থ: 'মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।' [রুম: ৪৭] এটা দায়বদ্ধতা অর্থে নয়; কারণ, আল্লাহকে কিছু বাধ্য করতে পারে না; বরং নীতিগত অর্থে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৎকর্ম ও পুণ্যের বদৌলতে পৃথিবীর উত্তরাধিকারী বানানোর ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ ۞ অর্থ: 'আমি উপদেশের পর যাবুরে লিখে দিয়েছি যে, আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে।' [আম্বিয়া: ১০৫] অন্যত্র বলেন, ۞ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ ءَامَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمَنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَبِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ۞ অর্থ: 'তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদের পৃথিবীতে খেলাফত দান করবেন যেমন দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তী লোকদের। এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দ্বীনকে যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন। তাদের ভয়ভীতির পরিবর্তে তাদের নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে, আমার কোনো শরিক সাব্যস্ত করবে না। এর পরও যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই পাপাচারী।' [নুর: ৫৫] দাউদ আলাইহিস সালামকে লক্ষ্য করে আল্লাহ বলেন, ۞ وَيَندَاوُدُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَأَحْكُم بَيْنَ النَّাসِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ শَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ ۞ অর্থ: 'হে দাউদ, আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলিফা বানিয়েছি। অতএব, তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়সংগতভাবে রাজত্ব করো এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। সেটা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি এ কারণে যে, তারা হিসাব দিবসকে ভুলে গিয়েছে।' [সোয়াদ: ২৬]
ফলে এই পৃথিবী পরিচালনার মূল কথা খেলাফত। খেলাফতের মূল কথা আল্লাহর দাসত্বের পূর্ণ বাস্তবায়ন। জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁর গোলামি, তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত। আল্লাহর আইন পরিত্যাগ করে প্রবৃত্তির অনুসরণ, নিজ খেয়াল-খায়েশমতো আইন প্রণয়ন হলো সবচেয়ে বড় অন্যায়, জুলুম এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল। আল্লাহ বলেন, ۞ أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاকَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا * وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ اللَّهُ وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا * فَكَيْفَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا أُولَئِكَ الَّذِينَ يَعْلَمُ اللَّهُ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنফুﺴِﻬِﻢْ قَوْلًا بَلِيغًا وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّসُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ۞ অর্থ: “আপনি কি তাদের দেখেননি যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে আর আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস করে? এরপর তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়! অথচ তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাগুতকে বর্জন করার। শয়তান তাদের ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়। তাদের যখন বলা হয়, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে এবং রাসুলের দিকে আসো, তখন মুনাফিকদের আপনি আপনার নিকট থেকে মুখ একেবারে ফিরিয়ে নিতে দেখবেন। তাদের কৃতকর্মের জন্য যখন তাদের কোনো মুসিবত আসবে, তখন তাদের কী অবস্থা হবে? এরপর তারা আল্লাহর নামে শপথ করে আপনার নিকট এসে বলবে, 'আমরা কল্যাণ ও সম্প্রীতি ব্যতীত অন্য কিছুই চাই নাই।' বাস্তবে এরাই তারা যাদের অন্তরে কী আছে আল্লাহ তা জানেন। সুতরাং আপনি তাদের উপেক্ষা করুন, তাদের সদুপদেশ দিন এবং তাদের মর্ম স্পর্শ করে তাদের এমন কথা বলুন। আমি রাসুল এই উদ্দেশ্যেই প্রেরণ করেছি যে, আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে তার আনুগত্য করা হবে। যখন তারা নিজেদের প্রতি জুলুম করে, তখন তারা আপনার নিকট এলে, আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করলে এবং রাসুলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইলে, তারা অবশ্যই আল্লাহকে পরম ক্ষমাশীল এবং পরম দয়ালুরূপে পাবে। কিন্তু না! আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তারা নিজেদের বিবাদ-বিসংবাদের বিচারভার আপনার উপর অর্পণ করবে। এরপর আপনার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোনো দ্বিধা থাকবে না এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেবে।” [নিসা: ৬০-৬৫]
আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে মানবরচিত আইনের শাসনকে তিনি নিন্দা করেছেন। এগুলোকে জুলুম, পাপাচার ও কুফর আখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ وَمَن لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ۞ অর্থ: 'যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা কাফের।' [মায়িদা: ৪৪] আরও বলেন, ۞ وَمَن لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُونَ ۞ অর্থ: 'যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা জালেম।' [মায়িদা: ৪৫] আরও বলেন, ۞ وَمَن لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ۞ অর্থ: 'যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারা পাপাচারী।' [মায়িদা: ৪৭]
📄 মুসলমানদের ইমাম (শাসক) থাকা আবশ্যক
এই খেলাফত বাস্তবায়নের জন্যই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সকল ইমামের সর্বসম্মতিক্রমে মুসলমানদের জন্য ইমাম (শাসক=খলিফা) নিযুক্ত করা ওয়াজিব। কারণ, ইমাম না থাকলে মুসলমানদের সামগ্রিক জীবন স্থবির হয়ে পড়বে। শরিয়তের বিধিবিধান এবং হদ-কিসাস প্রয়োগ বন্ধ থাকবে। নামায, জুমা ও জামাত উঠে যাবে। মুসলিম রাষ্ট্রের সীমানা দুশমনদের জন্য উদোম হয়ে পড়বে। মুসলিম সেনাবাহিনী বিলুপ্ত হয়ে যাবে। জিহাদ বন্ধ হয়ে যাবে। যাকাত-সদকা উসুল ব্যাহত হবে। গনিমতের সম্পদ বণ্টনে জটিলতা দেখা দেবে। ভূপৃষ্ঠে বিশৃঙ্খলা ও অনাচার ছড়িয়ে পড়বে। অন্যায়, অশ্লীলতা ও ধর্মহীনতার অন্ধকারে উম্মাহ তলিয়ে যাবে। হালাল-হারাম মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। চোরে-ডাকাতে দেশ ভরে যাবে। গরিব, অসহায় ও এতিমরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়বে। এক কথায়, ইমাম না থাকলে মুসলমানদের সামাজিক, ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয়, আর্থিক ও আধ্যাত্মিক তথা জীবনের সর্বক্ষেত্রে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। মুসলমানরা পরিচয়-সংকটে পড়বে। স্বকীয়তা ও দ্বীনদারি হারাবে। অন্যান্য জাতির তাঁবেদার হয়ে পড়বে। উম্মাহর জীবনে দ্বীন চতুর্থ বিষয়ে পরিণত হবে। ইসলামের গৌরব ভূলুণ্ঠিত হবে। ইসলামের সামগ্রিক বাস্তবায়ন বন্ধ হয়ে যাবে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ইমামবিহীন মৃত্যুবরণ করল, সে যেন জাহেলি মৃত্যু বরণ করল।' রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন, 'যে ব্যক্তি (ইমামের বাইয়াত তথা) আনুগত্য ছাড়া মৃত্যুবরণ করল, সে জাহেলি মৃত্যু বরণ করল।'
এ কারণে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) নিজে খেলাফত বাস্তবায়ন করেন। তিনি যতদিন পৃথিবীতে জীবিত থাকেন, আল্লাহর আইন অনুযায়ী ইসলামি রাষ্ট্র ও উম্মাহর জীবন পরিচালনা করেন। মদিনায় প্রায় দশ বছর নবুওতি শাসন থাকে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তেকালের আগে খেলাফতের ঘোষণা করে যান। তিনি জানিয়ে যান, তাঁর পরে তাঁর উত্তরসূরি সাহাবাদের 'খলিফা' বলা হবে। তাদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্মের খেলাফত ত্রিশ বছর অব্যাহত থাকবে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'নবুওতের খেলাফত হবে ত্রিশ বছর। অতঃপর রাজত্ব (বা রাজতন্ত্র) আসবে।'
ফলে সাহাবায়ে কেরাম রাযি. এ বিষয়টির প্রতি শুরু থেকেই অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় আল্লাহর রাসুলই তাদের ইমাম ছিলেন। তিনি যখন দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন, তখন শীর্ষস্থানীয় সাহাবাগণ তাঁকে কাফন-দাফনের আগেই এ মহা গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পাদন করতে মনোযোগী হন, যাতে এক মুহূর্ত ইমাম ছাড়া থাকা না হয়। আল্লাহর শরিয়ত ও উম্মত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ফলে আহলে বাইতের সদস্যরা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর গোসল ও কাফনে লেগে যান। অপরদিকে অন্য সাহাবাগণ এই বিশাল কাজটি সুরাহার জন্য বসে যান। শেষ পর্যন্ত তারা আবু বকর রাযি.-কে ইমাম নিযুক্ত করেন। আবু বকরের পরে উমর আসেন। উমরের পরে উসমান। উসমানের পরে আলি। আলির পরে হাসান। হাসানের পরে মুআবিয়া। এভাবে সেই নববি যুগ থেকে দ্বিতীয় আবদুল হামিদ পর্যন্ত মুসলমানদের মাঝে কোনো-না-কোনো ইমাম (খলিফা/রাজা) থাকেন। বিভিন্ন উত্থান-পতনের মাঝ দিয়ে খেলাফত কায়েম থাকে। উম্মাহর সামগ্রিক অভিভাবকত্বের ধারা অব্যাহত থাকে। এর পর মুসলিমরা ইমামবিহীন হয়ে পড়ে। কেটে যায় শত বছর। ফলাফল সামনে। গুনতিতে প্রায় দুইশত কোটি হলেও আজকের মুসলিমরা একটা রাষ্ট্রবিহীন, অভিভাবকহীন এবং শরিয়তের সামগ্রিক প্রয়োগবিহীন জাতি। একটা পরিচয়হীন বেওয়ারিশ লাশের মতো, যার অতীতের গৌরব আছে, কিন্তু বর্তমান অস্তিত্ব ভাগাড়ে পড়ে আছে। ভবিষ্যৎ ডুবে আছে ঘোর অন্ধকারে।
টিকাঃ
১০০২. দেখুন : উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৯১)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১১০৩)। আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ (২১১-২১২)। আকিদাহ রুকনিয়্যাহ (৪১)।
১৩৩৩. ইবনে হিব্বান (কিতাবুস সিয়ার : ৪৫৭৩)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুশ শামিয়্যিন: ১৭১৫০)।
১৩৩৪. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুল মাক্কিয়্যিন: ১৫৯৩৬)। মুসনাদে বাযযার (মুসনাদু আমের ইবনে রবিআহ : ৩৮১৭)।
১৩৩৫. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুল আনসার: ২২৩৩৭)। শরহু মুশকিলিল আসার (বাবু বায়ানি মুশকিলি মা রুয়িয়া আন রাসুলিল্লাহ ফি উলাতিল আমরি বাদাহ: ৩৩৪৯)।
📄 শাসকের আবশ্যক গুণাবলি
মুসলমানদের ইমাম হওয়ার জন্য কতগুলো শর্ত রয়েছে। কিছু শর্ত হলো অত্যাবশ্যক, যেগুলো ছাড়া কেউ শাসক হতেই পারবে না। যথা: মুসলিম হওয়া, পুরুষ হওয়া, স্বাধীন হওয়া, বালেগ হওয়া, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া, কুরাইশ বংশীয় হওয়া। এর সঙ্গে আরও কিছু শর্ত হলো ইলম, তাকওয়া, বীরত্ব ও বংশ, আখলাক ইত্যাদি দিক থেকে উপযুক্ত হওয়া। কুরআন-সুন্নাহয় জ্ঞানী, দূরদর্শী, শক্তিশালী ও প্রজ্ঞাবান হওয়া। হালাল-হারামসহ ইসলামের যাবতীয় বিধান সম্পর্কে অবহিত থাকা। অন্যায়ের প্রতিবাদ, জুলুমের নিরসন এবং মজলুমের পক্ষে কাজ করার সামর্থ্য, শক্তি ও সাহস রাখা। যুদ্ধের নেতৃত্বে সমর্থ হওয়া। অর্থাৎ, শারীরিক ও মানসিক সবদিক থেকে উপযুক্ত হওয়া।
তবে সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়া জরুরি নয়। অর্থাৎ, যদি শ্রেষ্ঠকে বর্জন করে কোনো কারণে অশ্রেষ্ঠ কিংবা পিছনের সারির কাউকে ইমাম নিযুক্ত করা হয় এবং সে শাসন পরিচালনার যোগ্য হয়, তবে সেটা বিশুদ্ধ হবে। মুসলানদের উপর তার আনুগত্য মেনে নেওয়া আবশ্যক হবে। ফলে শাসককে সর্বদিক থেকে সবার শ্রেষ্ঠ হতে হবে কিংবা নিষ্পাপ (মাসুম) হতে হবে—এটা জরুরি নয়। কারণ, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেক সৎ-অসৎ ব্যক্তির পিছনে নামায পড়ো।’ সুতরাং নামাযের ক্ষেত্রে যেমন উত্তম ছেড়ে অনুত্তমের পিছনে পড়লে আদায় হয়ে যাবে, তেমনই অনুত্তম শাসকও নিযুক্ত হয়ে গেলে তার আনুগত্য করতে হবে। অন্যত্র রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘যদি তোমাদের উপর এমন কোনো হাবশি দাসকেও শাসক নিযুক্ত করা হয়, যার মাথা কিশমিশের মতো, তবুও তার কথা শোনো এবং তার আনুগত্য করো।’ তবে যদি ফেতনা ছাড়া তাকে পদচ্যুত করা যায় এবং তার জায়গায় উত্তম কাউকে নিযুক্ত করা যায়, সেটা করতে হবে।
টিকাঃ
১৩৩৬. আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী 'ইমামতে উজমা' তথা শাসক হওয়ার জন্য পুরুষ হওয়া জরুরি। ফলে কোনো নারী ইসলামি রাষ্ট্রের খলিফা বা শাসক হতে পারবে না। হ্যাঁ, পরামর্শ দিতে পারবে এবং সহায়তা করতে পারবে, কিন্তু নিজে শাসক হতে পারবে না। এটা ইমাম আজম আবু হানিফা-সহ বাকি তিন ইমাম এবং সকল আলেমের মত। কুরআন-সুন্নাহর দলিল, সুস্থ যুক্তি, দায়িত্বের প্রকৃতি এবং নারীর ফিতরত-সবগুলোর দাবিও এটা। হ্যাঁ, হানাফি মাযহাবে নারী 'কাযি' তথা বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু সেটাও উত্তম নয়। বরং কোনো কোনো ফকিহ বলেছেন, এমন পদেও নারীকে নিয়োগ দেওয়া অবৈধ। তবে নিযুক্ত হয়ে গেলে সে দায়িত্ব পালন করতে পারবে এবং তার ফয়সালা বাস্তবায়িত হবে। তথাপি সেটাও 'হদ' ও 'কিসাস'-এর ক্ষেত্রে নয়; বরং অন্যান্য সাধারণ বিচারকার্যে। সুতরাং নারীর 'ইমামতে উজমা' তথা রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার কোনোই সুযোগ নেই। ইসলামের সকল মুহাক্কিক আলেমের বক্তব্য এড়িয়ে বর্তমানে ফেমিনিজমের প্রভাবে প্রভাবিত গবেষক দাবিদার কিছু মানুষ নারীর শাসক হওয়ার উপযুক্ততা প্রমাণ করতে চান। এক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর দূরবর্তী তাবিল (বা তাহরিফ) এবং দুর্বল যুক্তি-তর্ক ছাড়া তাদের কাছে মজবুত কোনো প্রমাণ নেই। ফলে তাদের কথা বর্জনীয়। [দেখুন : ফাতহুল কাদির: ৭/২৫৩; বাদায়েউস সানায়ে ৭/৩; মাজমাউল আনহুর ২/১৬৮; রদ্দুল মুহতার: ৫/৪৪০]
১৩৩৭. প্রথম হাদিসটি দেখুন দারাকুতনি (কিতাবুল ঈদাইন: ১৭৬৮)। দ্বিতীয় হাদিসটি দেখুন: বুখারি (কিতাবুল আহকাম: ৭১৪২)। আরও দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৯৩)। দেখুন: লুবাবুল কালাম, উসমান্দি (পাণ্ডুলিপি : ৮৩)। তালখিসুল আদিল্লাহ (৮৪২-৮৪৩)। তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১১১৩)।
📄 ফাসেক কি শাসক হতে পারবে?
উপরে বলা হয়েছে, শাসক হওয়ার জন্য মুত্তাকি হওয়া শর্ত। প্রশ্ন হলো, ফাসেক তথা পাপাচারী কি শাসক হওয়ার যোগ্য? শাফেয়ি রহ.-এর মতে, ফাসেক ব্যক্তি সাক্ষী কিংবা বিচারক হতে পারবে না। ফলে শাসক তো হতেই পারবে না। খারেজি ও মুতাযিলাদের মতে ফাসেক ব্যক্তি মুমিনই নয়। ফলে সেও খলিফা হতে পারবে না। ইমাম আজম রহ.-এর মত সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ফাসেক ব্যক্তিকে শাসক বানানো মাকরুহ। তথাপি যদি বানিয়ে ফেলাই হয়, সেটা কার্যকর হবে। সে শাসক গণ্য হবে। উক্ত মতভেদ থেকে আরও একটি ফলাফল পাওয়া যায়। সেটা হলো, শাসক যদি কোনো কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায়, তবে শাফেয়ি, খারেজি ও মুতাযিলাদের মতে তাকে পদচ্যুত করা হবে। কারণ, সে শাসক হওয়ার যোগ্য থাকবে না। ইমাম আজমের মতে, ফাসেক (যেমন: জালেম, ঘুস গ্রহণকারী) পদচ্যুতির যোগ্য, পদচ্যুত করা হোক বা না হোক। তবে পদচ্যুত করা না হলে এবং শাসক হিসেবে থাকলে সেটা কার্যকর হবে এবং তার আনুগত্য জরুরি হবে। উক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে জালেম শাসক (যে মূলত ফাসেক)-এর বিরুদ্ধে ইমামের দৃষ্টিভঙ্গিও বোঝা গেল। সামনে এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আসছে।
টিকাঃ
১৩৩৮. আখবারু আবি হানিফা, সাইমারি (৮৪)। আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ, সাবুনি (২১৪)।