📄 পুলসিরাত
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পরকালসংক্রান্ত আরেকটি আকিদা হলো ‘পুলসিরাত।’ এটা জাহান্নামের উপর স্থাপিত একটি পুল। চুলের চেয়ে চিকন, তরবারির চেয়ে ধারালো। এর চারপাশে লোহার কাঁটা রয়েছে। সবাইকে এটা অতিক্রম করতে হবে। একদল এটা অতিক্রম করে জান্নাতে পৌঁছে যাবে। আরেক দল এর উপর থেকে নিচে জাহান্নামের ভিতরে পতিত হবে।১২৮৩ কুরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং অগণিত হাদিস দ্বারা পুলসিরাতের সত্যতা প্রমাণিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا ۚ كَانَ عَلَىٰ رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا ۞ ۞ ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا ۞ অর্থ : ‘তোমাদের প্রত্যেকেই তা অতিক্রম করবে। এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। অতঃপর আমি মুত্তাকিদের নিষ্কৃতি দেবো আর জালেমদের সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দেবো।’ [মারইয়াম : ৭১-৭২] এখানে সবাইকে জাহান্নামে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে। অতঃপর সেখান থেকে মুমিনদের মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর এটা পুলসিরাতের মাধ্যমেই সম্ভব। অর্থাৎ, পুলসিরাত জাহান্নামের উপর স্থাপিত থাকবে। পুলসিরাতের উপর থেকে জান্নাতিরা জান্নাতে চলে যাবে। জাহান্নামিরা নিচে জাহান্নামে পড়ে যাবে।
আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে কুরআনের বাণী : ۞ يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ ۖ وَبَرَزُوا لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ ۞ ‘যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমণ্ডলীও। মানুষ উপস্থিত হবে আল্লাহর সামনে, যিনি এক, পরাক্রমশালী।’ [ইবরাহিম : ৪৮] সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, (যদি পৃথিবী পুরোপুরি বদলে যায়) তবে সেদিন মানুষ কোথায় থাকবে? তিনি বললেন, ‘পুলসিরাতের উপর।’১২৮৪
আনাস ইবনে মালেক রাযি. রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে কিয়ামতের দিনের শাফায়াত প্রার্থনা করলেন। রাসুল (ﷺ) বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি করব।’ আনাস বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনাকে আমি কোথায় খুঁজব?’ তিনি বললেন : ‘পুলসিরাতের কাছে খুঁজবে।’ আমি বললাম, যদি পুলসিরাতে আপনার সাক্ষাৎ না পাই? তিনি বললেন: ‘মিযানের কাছে।’ আমি বললাম, যদি মিযানের কাছে আপনাকে না পাই? তিনি বললেন: ‘হাউজে কাউসারের কাছে। এই তিনটি জায়গার কোথাও-না-কোথাও পাবেই।’১২৮৫
আবু হুরায়রা রাযি.-এর শাফায়াতসংক্রান্ত দীর্ঘ ও প্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে, “...(কিয়ামতের দিন) রাসুলুল্লাহ (ﷺ) দোয়ার জন্য দাঁড়াবেন। তাঁকে অনুমতি দেওয়া হবে। আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক পুলসিরাতের ডানে ও বামে এসে দাঁড়াবে। (তিনি বলেন) ‘তোমাদের প্রথম দলটি বিদ্যুদ্গতিতে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে।’ সাহাবি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘বিদ্যুদ্গতিতে’ কথাটির মর্ম কী আমাকে বলুন। আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান! রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন : ‘আকাশে কখনো বিদ্যুচ্চমক দেখোনি? চোখের পলকে আসে আর চলে যায়।’ (তারাও সেভাবে দ্রুত পুলসিরাত পার হয়ে যাবে)। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন : ‘পরবর্তী দলগুলো যথাক্রমে বাতাসের বেগে, পাখির গতিতে এবং সর্বশেষে দৌড়ের গতিতে পার হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই তার আমল হিসেবে পুলসিরাত অতিক্রম করবে। তোমাদের নবি (ﷺ) তখন পুলসিরাতের উপর দাঁড়িয়ে এ দোয়া করতে থাকবেন: আল্লাহ, আপনি রক্ষা করুন! আল্লাহ, আপনি রক্ষা করুন! আল্লাহ, আপনি নিরাপদে পৌঁছিয়ে দিন। এভাবে আমল যত কমতে থাকবে গতি কমতে থাকবে এবং প্রত্যেকে ধীর থেকে ধীরে পুলসিরাত পার হতে থাকবে। শেষে একব্যক্তি নিতম্ব হিঁচড়ে পুলসিরাত পার হবে।’ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘পুলসিরাতের উভয় পাশে কাঁটাযুক্ত লৌহশলাকা ঝুলন্ত রয়েছে। এগুলো আল্লাহর নির্দেশক্রমে নির্ধারিত পাপীদের ধরে ফেলবে। কেউ তাতে গুঁতো খেয়েও মুক্তি পাবে। কেউ তাতে জড়িয়ে জাহান্নামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হবে...।”১২৮৬
মুগিরা ইবনে শুবা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘পুলসিরাতের উপর মুমিনদের নিদর্শন হবে (এই দোয়া) : رَبِّ سَلَّم سَلَّم অর্থাৎ, হে আল্লাহ, রক্ষা করুন, রক্ষা করুন! ’১২৮৭
মুতাযিলা, রাফেযি এবং বিভিন্ন বিদআতি সম্প্রদায় পুলসিরাতকে অস্বীকার করে। তারা উপরের আয়াতকে ‘জাহান্নামের কাছাকাছি’ বা ‘পাশ দিয়ে যাওয়া’র মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু এমন ব্যাখ্যা পরিত্যাজ্য। খোদ রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য দ্বারা তাদের অপব্যাখ্যা প্রমাণিত হয়।
টিকাঃ
১২৮৩. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ১৮৩)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আয়েশা: ২৫৪৩২)। উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৬৪)।
১২৮৪. মুসলিম (কিতাবু সিফাতিল কিয়ামাহ ওয়াল জান্নাহ ওয়ান নার: ২৭৯১)। তিরমিযি (আবওয়াবু তাফসিরিল কুরআন: ৩১২১)।
১২৮৫. তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ: ২৪৩৩)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আনাস ইবনে মালেক: ১৩০২২)। বাযযার (৭৩০৭)।
১২৮৬. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ১৯৫)। মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুত তাফসির : ৩৪৪৪)।
১২৮৭. তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ : ২৪৩২)।