📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 মিযান অস্বীকারকারীদের সংশয়ের অপনোদন

📄 মিযান অস্বীকারকারীদের সংশয়ের অপনোদন


কুরআন-সুন্নাহর এসব বর্ণনার ভিত্তিতে আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত আকিদা হলো, মিযান সত্য ও বাস্তব। কিন্তু প্রাচীন মুতাযিলা এবং তাদের বর্তমান অনুসারী বুদ্ধিজীবী দাবিদারগণ এটাতে সন্দেহ পোষণ করে। তাদের যুক্তি হলো, আমলকে ওজন করা অসম্ভব। কেননা আমল হলো বায়বীয় ও বিমূর্ত ব্যাপার। অথচ ওজন করতে হলে মূর্ত ও শরীরী হতে হয়। ফলে আমলের অবস্থা হিসেবে জান্নাত ও জাহান্নাম দেওয়া হবে। পরিমাপ নিষ্প্রয়োজন। মুতাযিলাদের এটা অস্বীকারের আরও একটা কারণ আছে। আমাদের আকিদা—মিযানে পুণ্য ও পাপের হিসাব করা হবে। অথচ মুতাযিলাদের মতে এই দুটো এক হয় না। কেউ কবিরা গুনাহ করলে তাদের মতে সে ঈমান থেকে বেরিয়ে যায়। কোনো পুণ্য থাকে না। ফলে তার পাপ-পুণ্যের পরিমাপ নিষ্প্রয়োজন। ১২৭৬

তাদের এই বিভ্রান্তির কারণ হলো যুক্তি ও সীমাবদ্ধ ব্রেইনের উপর নির্ভরশীলতা। তারা যদি তাদের ত্রুটিপূর্ণ ব্রেইনের উপর নির্ভর না করে মহান আল্লাহ তায়ালার বক্তব্যের দিকে দৃষ্টি দিত, তবে মিযান অস্বীকার করতে পারত না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের অনেক জায়গায় সুস্পষ্ট ভাষায় দাঁড়িপাল্লা স্থাপন এবং আমল ওজন করার কথা বলেছেন। যদি মিযান না থাকত, তবে তিনি এগুলো কেন বলতে যাবেন? তা ছাড়া, তাদের যুক্তি আল্লাহর উপর অপবাদ আরোপের নামান্তর। আল্লাহ তায়ালা সবকিছু করতে পারেন। তিনি সর্বশক্তিমান। তাকে কোনোকিছু অক্ষম করতে পারে না। তাহলে তিনি আমলকে কেন মাপতে পারবেন না? বিভিন্ন হাদিসে কবর এবং কবর থেকে বের হওয়ার সময় আমলকে শরীরী রূপ দিয়ে মানুষের সামনে উপস্থাপনের কথা এসেছে। সুতরাং ওজন করার সময়ও যে আল্লাহ এমন করতে পারবেন সেটা তো সহজবোধ্য। ১২৭৭

মোটকথা, কিছু হাদিস দিয়ে বোঝা যায় স্বয়ং আমলটাকেই মাপা হবে। যেমন—হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘দুটি বাক্য এমন রয়েছে, মুখে যার উচ্চারণ অতি সহজ, কিন্তু মিযানের পাল্লায় অনেক ভারী এবং আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। তা হলো : সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আযিম।’ ১২৭৮ আবুদ দারদা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন মিযানের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে উত্তম চরিত্র।’ ১২৭৯ আবার কিছু হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, আমলনামা মাপা হবে। যেমন ‘হাদিসুল বিতাকাহ’ নামক প্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে, একব্যক্তির সকল অন্যায়ের ফিরিস্ত (সিজিল্ল) এক পাল্লায় রাখা হবে, আরেক পাল্লায় কালিমা শাহাদাত লেখা একটা চিরকুট (বিতাকাহ) রাখা হবে, সেই কালিমার পাল্লা ভারী হয়ে যাবে। ১২৮০ আবার কিছু হাদিস দ্বারা বোঝা যায় ব্যক্তিকে মাপা হবে; কিন্তু ব্যক্তির শরীর হিসেবে ওজন নয়, বরং ঈমান ও আমল হিসেবে হবে। যেমন—একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের দুই পায়ের ব্যাপারে (যা বেশ শীর্ণ ছিল) বলেন, ‘এ দুটো মিযানের পাল্লায় উহুদ পাহাড়ের চেয়ে বেশি ভারী হবে।’ ১২৮১ অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তায়ালা সবগুলোই মাপবেন।

তা ছাড়া, মুতাযিলাদের অথর্ব যুক্তি ও নির্বুদ্ধিতার আরেক প্রমাণ হলো আধুনিক বিজ্ঞান। বর্তমান যুগে এসে আমরা কেবল শরীরী বিষয় নয়, বিমূর্ত ও শরীরী সবকিছুকে মাপছি। শরীরের তাপমাত্রা মাপছি, ভূমিকম্প মাপছি, শব্দ মাপছি, গতি মাপছি, আলো মাপছি। অর্থাৎ, পৃথিবীর সবকিছুই এখন মাপা হচ্ছে এবং এ সবকিছু মানুষ করছে। তাহলে সর্বশক্তিমান আল্লাহ মানুষের আমল মাপতে পারবেন না? অদূর ভবিষ্যতে হয়তো মানবসংশ্লিষ্ট আরও অনেক আপাত অপরিমাপ্য বিষয় পৃথিবীতেই মাপা যাবে। তাই মানুষের উচিত নিজের সীমাবদ্ধ মস্তিষ্ক ও বিবেককে সব কিছুর মানদণ্ড না বানানো। বিবেকের সীমার বাইরে তাকে সালিশ নিযুক্ত না করা।

পৃথিবীর সবকিছুর পরিমাপক যেমন একরকম নয়, কিয়ামতের দাঁড়িপাল্লাও পৃথিবীর চাল-ডাল মাপার দাঁড়িপাল্লা কিংবা জ্বর মাপার যন্ত্রের মতো হবে এমন চিন্তা করা সঠিক নয়। কারণ, এগুলো অদৃশ্যের বিষয় যা আমরা আমাদের মস্তিষ্ক দিয়ে অনুভব করতে পারব না। ফলে এ ব্যাপারে নীরব থাকতে হবে। কুরআন-সুন্নাহতে মিযান থাকার কথা, সকল ভালো ও মন্দ আমল মাপার কথা বলা হয়েছে। আমাদের কর্তব্য হলো সেগুলোতে দৃঢ় ঈমান রাখা। আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন আমাদের আমল মাপতে সক্ষম—এটুকু বিশ্বাস রাখাই যথেষ্ট এবং যুক্তির দাবি। সাবুনি বলেন, ‘কবিগণ কবিতার জন্যও মিযান (ওজন/ছন্দ) নির্ধারণ করেছেন। সময় জানার জন্য কাঠ দিয়ে তৈরি একটি (প্রাচীন) যন্ত্রের নামও মিযান, যা দিয়ে সূর্যের অবস্থান, নামাযের সময় ইত্যাদি নির্ধারণ করা যায়। এগুলো কেউ না দেখলে এগুলোর রূপরেখা বুঝতে পারবে না; যব ও শস্য মাপার পাল্লা মনে করবে। অথচ এগুলো সব দুনিয়ার দাঁড়িপাল্লা। তাহলে আখেরাতের দাঁড়িপাল্লার ব্যাপারে মাথা ঘামানো কতটুকু সঠিক?১২৮২

টিকাঃ
১২৭৬. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৬৩)।
১২৭৭. দেখুন : মুসনাদে আহমদ (আউয়ালু মুসনাদিল কুফিয়্যিন: ১৮৮৩২)। মুসান্নাফে আবদির রাযযাক (কিতাবুল জানায়েয : ৬৭৩৭)।
১২৭৮. বুখারি (কিতাবুদ দাআওয়াত: ৬৪০৬)। মুসলিম (কিতাবুয যিকরি ওয়াদ দোয়া: ২৬৯৪)।
১২৭৯. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুল কাবায়িল: ২৮২০৩)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল বিররি ওয়াল ইহসান: ৪৮১)।
১২৮০. তিরমিযি (আবওয়াবুল ঈমান: ২৬৩৯)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুয যুহদ: ৪৩০০)।
১২৮১. ইবনে হিব্বান (মানাকিবুস সাহাবাহ: ৭০৬৯)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবদিল্লাহ ইবনে মাসউদ: ৪০৭২)।
১২৮২. আল-কিফায়াহ, সাবুনি (৩৭৮)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 পুলসিরাত

📄 পুলসিরাত


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পরকালসংক্রান্ত আরেকটি আকিদা হলো ‘পুলসিরাত।’ এটা জাহান্নামের উপর স্থাপিত একটি পুল। চুলের চেয়ে চিকন, তরবারির চেয়ে ধারালো। এর চারপাশে লোহার কাঁটা রয়েছে। সবাইকে এটা অতিক্রম করতে হবে। একদল এটা অতিক্রম করে জান্নাতে পৌঁছে যাবে। আরেক দল এর উপর থেকে নিচে জাহান্নামের ভিতরে পতিত হবে।১২৮৩ কুরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং অগণিত হাদিস দ্বারা পুলসিরাতের সত্যতা প্রমাণিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا ۚ كَانَ عَلَىٰ رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا ۞ ۞ ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا ۞ অর্থ : ‘তোমাদের প্রত্যেকেই তা অতিক্রম করবে। এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। অতঃপর আমি মুত্তাকিদের নিষ্কৃতি দেবো আর জালেমদের সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দেবো।’ [মারইয়াম : ৭১-৭২] এখানে সবাইকে জাহান্নামে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে। অতঃপর সেখান থেকে মুমিনদের মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর এটা পুলসিরাতের মাধ্যমেই সম্ভব। অর্থাৎ, পুলসিরাত জাহান্নামের উপর স্থাপিত থাকবে। পুলসিরাতের উপর থেকে জান্নাতিরা জান্নাতে চলে যাবে। জাহান্নামিরা নিচে জাহান্নামে পড়ে যাবে।

আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে কুরআনের বাণী : ۞ يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ ۖ وَبَرَزُوا لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ ۞ ‘যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমণ্ডলীও। মানুষ উপস্থিত হবে আল্লাহর সামনে, যিনি এক, পরাক্রমশালী।’ [ইবরাহিম : ৪৮] সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, (যদি পৃথিবী পুরোপুরি বদলে যায়) তবে সেদিন মানুষ কোথায় থাকবে? তিনি বললেন, ‘পুলসিরাতের উপর।’১২৮৪

আনাস ইবনে মালেক রাযি. রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে কিয়ামতের দিনের শাফায়াত প্রার্থনা করলেন। রাসুল (ﷺ) বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি করব।’ আনাস বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনাকে আমি কোথায় খুঁজব?’ তিনি বললেন : ‘পুলসিরাতের কাছে খুঁজবে।’ আমি বললাম, যদি পুলসিরাতে আপনার সাক্ষাৎ না পাই? তিনি বললেন: ‘মিযানের কাছে।’ আমি বললাম, যদি মিযানের কাছে আপনাকে না পাই? তিনি বললেন: ‘হাউজে কাউসারের কাছে। এই তিনটি জায়গার কোথাও-না-কোথাও পাবেই।’১২৮৫

আবু হুরায়রা রাযি.-এর শাফায়াতসংক্রান্ত দীর্ঘ ও প্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে, “...(কিয়ামতের দিন) রাসুলুল্লাহ (ﷺ) দোয়ার জন্য দাঁড়াবেন। তাঁকে অনুমতি দেওয়া হবে। আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক পুলসিরাতের ডানে ও বামে এসে দাঁড়াবে। (তিনি বলেন) ‘তোমাদের প্রথম দলটি বিদ্যুদ্গতিতে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে।’ সাহাবি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘বিদ্যুদ্গতিতে’ কথাটির মর্ম কী আমাকে বলুন। আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান! রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন : ‘আকাশে কখনো বিদ্যুচ্চমক দেখোনি? চোখের পলকে আসে আর চলে যায়।’ (তারাও সেভাবে দ্রুত পুলসিরাত পার হয়ে যাবে)। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন : ‘পরবর্তী দলগুলো যথাক্রমে বাতাসের বেগে, পাখির গতিতে এবং সর্বশেষে দৌড়ের গতিতে পার হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই তার আমল হিসেবে পুলসিরাত অতিক্রম করবে। তোমাদের নবি (ﷺ) তখন পুলসিরাতের উপর দাঁড়িয়ে এ দোয়া করতে থাকবেন: আল্লাহ, আপনি রক্ষা করুন! আল্লাহ, আপনি রক্ষা করুন! আল্লাহ, আপনি নিরাপদে পৌঁছিয়ে দিন। এভাবে আমল যত কমতে থাকবে গতি কমতে থাকবে এবং প্রত্যেকে ধীর থেকে ধীরে পুলসিরাত পার হতে থাকবে। শেষে একব্যক্তি নিতম্ব হিঁচড়ে পুলসিরাত পার হবে।’ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘পুলসিরাতের উভয় পাশে কাঁটাযুক্ত লৌহশলাকা ঝুলন্ত রয়েছে। এগুলো আল্লাহর নির্দেশক্রমে নির্ধারিত পাপীদের ধরে ফেলবে। কেউ তাতে গুঁতো খেয়েও মুক্তি পাবে। কেউ তাতে জড়িয়ে জাহান্নামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হবে...।”১২৮৬

মুগিরা ইবনে শুবা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘পুলসিরাতের উপর মুমিনদের নিদর্শন হবে (এই দোয়া) : رَبِّ سَلَّم سَلَّم অর্থাৎ, হে আল্লাহ, রক্ষা করুন, রক্ষা করুন! ’১২৮৭

মুতাযিলা, রাফেযি এবং বিভিন্ন বিদআতি সম্প্রদায় পুলসিরাতকে অস্বীকার করে। তারা উপরের আয়াতকে ‘জাহান্নামের কাছাকাছি’ বা ‘পাশ দিয়ে যাওয়া’র মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু এমন ব্যাখ্যা পরিত্যাজ্য। খোদ রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য দ্বারা তাদের অপব্যাখ্যা প্রমাণিত হয়।

টিকাঃ
১২৮৩. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ১৮৩)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আয়েশা: ২৫৪৩২)। উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৬৪)।
১২৮৪. মুসলিম (কিতাবু সিফাতিল কিয়ামাহ ওয়াল জান্নাহ ওয়ান নার: ২৭৯১)। তিরমিযি (আবওয়াবু তাফসিরিল কুরআন: ৩১২১)।
১২৮৫. তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ: ২৪৩৩)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আনাস ইবনে মালেক: ১৩০২২)। বাযযার (৭৩০৭)।
১২৮৬. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ১৯৫)। মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুত তাফসির : ৩৪৪৪)।
১২৮৭. তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ : ২৪৩২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00