📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 শাফায়াত অস্বীকারকারীদের খণ্ডন

📄 শাফায়াত অস্বীকারকারীদের খণ্ডন


খারেজি ও মুতাযিলা সম্প্রদায় কবিরা গুনাহকারীদের জন্য শাফায়াতকে অস্বীকার করে (সকল প্রকারের শাফায়াত নয়)। কারণ, তারা সগিরা গুনাহকে এমনিতেই ক্ষমাপ্রাপ্ত মনে করে, ফলে শাফায়াত নিষ্প্রয়োজন। আর কবিরা গুনাহকারীকে চিরস্থায়ী জাহান্নামি মনে করে; ফলে সেখানে শাফায়াত অর্থহীন।১২৬৭

তারা তাদের ভ্রান্ত মাযহাব সঠিক প্রমাণের জন্য রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিভিন্ন হাদিসের আক্ষরিক অর্থ দিয়ে দলিল দেয়। যেমন বুখারি ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাযি.-এর একটি হাদিস। আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি ব্যভিচার করে, তখন সে মুমিন থাকে না। যখন কোনো ব্যক্তি চুরি করে, তখন সে মুমিন থাকে না। যখন কোনো ব্যক্তি মদ্যপান করে, তখন সে মুমিন থাকে না। হ্যাঁ, তাওবার সুযোগ থাকবে।’১২৬৮ সুতরাং ব্যভিচারী বা চোর যদি তাওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করে, তবে তারা মুমিন নয়। তাই পরকালে তার জন্য শাফায়াতের মাধ্যমে মুক্তির কোনো পথ নেই।

আহলে সুন্নাত তাদের এ বক্তব্যকে ভুল সাব্যস্ত করেন। আহলে সুন্নাতের মতে, খারেজি ও মুতাযিলারা হাদিসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করেছে; মর্মকে গ্রহণ করেনি। তাই বিচ্যুতির শিকার হয়েছে। অথচ হাদিস পেলেই সেটাকে বাহ্যিক অর্থে গ্রহণের সুযোগ নেই। উদাহরণ হিসেবে আমরা এখানে একটি হাদিস উল্লেখ করব, যেটা তাদের উল্লেখ করা হাদিসের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। আবু যর গিফারি রাযি. বলেন, আমি একদিন রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এলাম। তিনি একটি শুভ্র কাপড় পরে ঘুমাচ্ছিলেন। আমি এলে তিনি উঠে গেলেন। বললেন, “যেকোনো ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে সাক্ষ্য দেওয়ার পর সে অবস্থায় মারা গেলে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” আবু যর বলেন, আমি বললাম, ব্যভিচার ও চুরি করলেও? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, ব্যভিচার ও চুরি করলেও।’ আমি আবার বললাম, সে ব্যক্তি ব্যভিচার ও চুরি করলেও? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, ব্যভিচার ও চুরি করলেও।’ আমি আবারও বললাম, ব্যভিচার ও চুরি করা সত্ত্বেও (কেবল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার কারণে জান্নাতে যাবে)? রাসুল (ﷺ) বললেন, ‘হ্যাঁ, ব্যভিচার ও চুরি করা সত্ত্বেও। আবু যর না চাইলেও।’১২৬৯

এখান থেকে প্রশ্ন জাগে, তাহলে দুই হাদিসের সমন্বয় কী? সমন্বয়ের জন্য আমাদের হাদিসের বাহ্যিক অর্থ ছেড়ে গভীর মর্মে প্রবেশ করতে হবে। প্রথম হাদিসটি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। অর্থাৎ, কেউ যদি চুরি ও ব্যভিচারকে হালাল মনে করে, তবে সে মুমিন থাকবে না। হালাল মনে না করে লিপ্ত হলে গুনাহগার হবে। দ্বিতীয় হাদিসে সেটাকেই সমর্থন করা হয়েছে। অর্থাৎ, কেউ হারাম জেনে ব্যভিচার কিংবা চুরিতে লিপ্ত হয়ে গেলেও যদি আল্লাহর উপর ঈমান থাকে এবং ঈমানের উপর মৃত্যুবরণ করে, তবে সে ঈমানের বিনিময়ে জান্নাতে যাবে।

ইমাম আজম রহ. আতিয়্যাহ সূত্রে হুযাইফা, ইবনে আব্বাসসহ একাধিক সাহাবি থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর বাণী ۞ وَعَسَىٰ أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا ۞ অর্থ : ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা আপনাকে মাকামে মাহমুদে পৌঁছাবেন।’ [ইসরা : ৭৯]-এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘মাকামে মাহমুদ শাফায়াত। আল্লাহ তায়ালা গুনাহের কারণে একদল মুমিনকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। পরবর্তীকালে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর শাফায়াতের মাধ্যমে তাদের জাহান্নাম থেকে বের করবেন। ‘হায়াওয়ান’ (জীবন) নামক এক নদীতে তাদের অবগাহন করাবেন। অতঃপর তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। জান্নাতে তারা ‘জাহান্নামি’ হিসেবে পরিচয় লাভ করবে। তাই তারা আল্লাহর কাছে (নাম পরিবর্তনের) মিনতি করবে। আল্লাহ তাদের সে নামের পরিবর্তে ‘আল্লাহ কর্তৃক মুক্তিপ্রাপ্ত’ নাম দান করবেন এবং তারা সে নামে পরিচিত হবে।’১২৭০

ইমাম মাতুরিদি রহ. বলেন, ‘কবিরা গুনাহকারীদের জন্য শাফায়াত কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। সগিরা গুনাহ এমনিতেই ক্ষমা হয়ে যায়। এর জন্য তাওবা বা শাফায়াত দরকার হয় না। কুফর ও শিরকের ক্ষেত্রে শাফায়াত কোনো উপকারে আসে না। বোঝা গেল, শাফায়াত কেবল শাস্তিযোগ্য গুনাহগার মুমিনদের জন্যই।’১২৭১

টিকাঃ
১২৬৭. দেখুন: তালখিসুল আদিল্লাহ (৮৭২)।
১২৬৮. বুখারি (কিতাবুল মাযালিম: ২৪৭৫)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ৫৭)।
১২৬৯. বুখারি (কিতাবুল লিবাস: ৫৮২৭)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ৯৪)।
১২৭০. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৬)।
১২৭১. আত-তাওহিদ (২৬৩)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 মিযান (দাঁড়িপাল্লা)

📄 মিযান (দাঁড়িপাল্লা)


কিয়ামতের দিন দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে। তাতে সকল পুণ্য ও পাপ, ভালো ও মন্দ আমল মাপা হবে। এটা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত সকল আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে গৃহীত একটি জরুরি আকিদা। কাফের-মুমিন সবার জন্য এ দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে। আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন আয়াতে এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ وَالْوَزْنُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ ۚ فَمَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ۞ ۞ وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَٰئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ بِمَا كَانُوا بِآيَاتِنَا يَظْلِمُونَ ۞ ‘সেদিনের ওজন করা সত্য। যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই সফলকাম হবে; আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারা সেসব লোক যারা আমার আয়াতসমূহের ব্যাপারে সীমালংঘন করে নিজেরা নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’ [আরাফ : ৮-৯] অন্য আয়াতে ۞ فَمَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ۞ ۞ وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَٰئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ فِي جَهَنَّمَ خَالِدُونَ ۞ অর্থ : ‘যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই হবে সফলকাম; আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে। তারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে।’ [মুমিনুন : ১০২-১০৩] আল্লাহ আরও বলেন, ۞ وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ۖ وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا ۗ وَكَفَىٰ بِنَا حَاسِبِينَ ۞ অর্থ : ‘আমি কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম হবে না। যদি কোনো আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব। হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট।’ [আম্বিয়া : ৪৭] অন্যত্র বলেন, ۞ فَأَمَّا مَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ ۞ ۞ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَاضِيَةٍ ۞ ۞ وَأَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ ۞ ۞ فَأُمُّهُ هَاوِيَةٌ ۞ ۞ وَمَا أَدْرَاكَ مَا هِيَهْ ۞ ۞ نَارٌ حَامِيَةٌ ۞ অর্থ : “তখন যার পাল্লা ভারী হবে, সে সন্তোষজনক জীবন লাভ করবে। কিন্তু যার পাল্লা হালকা হবে, তার ঠিকানা হবে ‘হাবিয়া।’ আপনি কি জানেন ‘হাবিয়া’ কী? অতি উত্তপ্ত অগ্নি।” [কারিয়াহ : ৬-৭]

পরকালের এ দাঁড়িপাল্লার রূপরেখা কী হবে সে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান নেই। তবে এটা দুনিয়ার দাঁড়িপাল্লার চেয়ে ভিন্ন হবে। কারণ, দুনিয়ার দাঁড়িপাল্লা ভারী ও বড় হলে তাতে ছোট ও হালকা জিনিস মাপা যায় না বা হালকা বস্তুর অস্তিত্ব থাকে না। আবার ছোট ও হালকা হলে তাতে বড় ও ভারী জিনিস মাপা যায় না। কিন্তু আখেরাতের মিযানে হালকা-ভারী, ছোট-বড় সবকিছু মাপা যাবে। তবে মিযান তথা দাঁড়িপাল্লার স্বরূপ (কাইফিয়্যাত) আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। এটুকু নিশ্চিত যে, এটা দ্বারা মানুষের আমল পরিমাপ করা হবে। কিন্তু কীরূপে হবে সেটা আল্লাহ ভালো জানেন।

ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘কিয়ামতের দিন মিযানে আমল ওজন করা সত্য। ১২৭২ ইমাম ‘আল-ওয়াসিয়্যাহ’ গ্রন্থে বলেন, ‘মিযান সত্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْমِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ۞ অর্থ : ‘আমি কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের তুলাদণ্ড স্থাপন করব। সুতরাং কাউকে বিন্দুপরিমাণ জুলুম করা হবে না।’ [আম্বিয়া: ৪৭] আমলনামা পড়া সত্য। কারণ, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ۞ اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَىٰ بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا ۞ অর্থ : ‘পাঠ করো তুমি তোমার আমলনামা। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট।’ [ইসরা: ১৪]১২৭৩

ইমাম তহাবি রহ. বলেন, ‘আমরা কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান এবং আমলের প্রতিদান পাওয়ার বিশ্বাস রাখি। বিশ্বাস রাখি... মিযানের ব্যাপারে। মিযানে মুমিনের ভালোমন্দ, পাপ-পুণ্য সব ধরনের আমল রাখা হবে।’ ১২৭৪

ইমাম আজম রহ. তাঁর শায়খ হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান থেকে ইবরাহিম নাখায়ি সূত্রে বর্ণনা করেন, ‘কিয়ামতের দিন একব্যক্তির আমল মিযানের এক পাল্লায় রাখা হবে। কিন্তু তা অত্যন্ত হালকা হবে। তখন মেঘের মতো কিছু একটা পাল্লায় যোগ করা হলে সেটা ভারী হয়ে যাবে। তাকে বলা হবে, তুমি জানো এটা কী? সে বলবে, না। তাকে বলা হবে, এটা সেই ইলম যা তুমি শিখেছ এরপর মানুষকে শিখিয়েছ। তারা সেগুলো শিখে সে অনুযায়ী আমল করেছে।’১২৭৫

টিকাঃ
১২৭২. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।
১২৭৩. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৫৬-৫৭)।
১২৭৪. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৬)।
১২৭৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১৪৬)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 মিযান অস্বীকারকারীদের সংশয়ের অপনোদন

📄 মিযান অস্বীকারকারীদের সংশয়ের অপনোদন


কুরআন-সুন্নাহর এসব বর্ণনার ভিত্তিতে আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত আকিদা হলো, মিযান সত্য ও বাস্তব। কিন্তু প্রাচীন মুতাযিলা এবং তাদের বর্তমান অনুসারী বুদ্ধিজীবী দাবিদারগণ এটাতে সন্দেহ পোষণ করে। তাদের যুক্তি হলো, আমলকে ওজন করা অসম্ভব। কেননা আমল হলো বায়বীয় ও বিমূর্ত ব্যাপার। অথচ ওজন করতে হলে মূর্ত ও শরীরী হতে হয়। ফলে আমলের অবস্থা হিসেবে জান্নাত ও জাহান্নাম দেওয়া হবে। পরিমাপ নিষ্প্রয়োজন। মুতাযিলাদের এটা অস্বীকারের আরও একটা কারণ আছে। আমাদের আকিদা—মিযানে পুণ্য ও পাপের হিসাব করা হবে। অথচ মুতাযিলাদের মতে এই দুটো এক হয় না। কেউ কবিরা গুনাহ করলে তাদের মতে সে ঈমান থেকে বেরিয়ে যায়। কোনো পুণ্য থাকে না। ফলে তার পাপ-পুণ্যের পরিমাপ নিষ্প্রয়োজন। ১২৭৬

তাদের এই বিভ্রান্তির কারণ হলো যুক্তি ও সীমাবদ্ধ ব্রেইনের উপর নির্ভরশীলতা। তারা যদি তাদের ত্রুটিপূর্ণ ব্রেইনের উপর নির্ভর না করে মহান আল্লাহ তায়ালার বক্তব্যের দিকে দৃষ্টি দিত, তবে মিযান অস্বীকার করতে পারত না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের অনেক জায়গায় সুস্পষ্ট ভাষায় দাঁড়িপাল্লা স্থাপন এবং আমল ওজন করার কথা বলেছেন। যদি মিযান না থাকত, তবে তিনি এগুলো কেন বলতে যাবেন? তা ছাড়া, তাদের যুক্তি আল্লাহর উপর অপবাদ আরোপের নামান্তর। আল্লাহ তায়ালা সবকিছু করতে পারেন। তিনি সর্বশক্তিমান। তাকে কোনোকিছু অক্ষম করতে পারে না। তাহলে তিনি আমলকে কেন মাপতে পারবেন না? বিভিন্ন হাদিসে কবর এবং কবর থেকে বের হওয়ার সময় আমলকে শরীরী রূপ দিয়ে মানুষের সামনে উপস্থাপনের কথা এসেছে। সুতরাং ওজন করার সময়ও যে আল্লাহ এমন করতে পারবেন সেটা তো সহজবোধ্য। ১২৭৭

মোটকথা, কিছু হাদিস দিয়ে বোঝা যায় স্বয়ং আমলটাকেই মাপা হবে। যেমন—হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘দুটি বাক্য এমন রয়েছে, মুখে যার উচ্চারণ অতি সহজ, কিন্তু মিযানের পাল্লায় অনেক ভারী এবং আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। তা হলো : সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আযিম।’ ১২৭৮ আবুদ দারদা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন মিযানের পাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে উত্তম চরিত্র।’ ১২৭৯ আবার কিছু হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, আমলনামা মাপা হবে। যেমন ‘হাদিসুল বিতাকাহ’ নামক প্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে, একব্যক্তির সকল অন্যায়ের ফিরিস্ত (সিজিল্ল) এক পাল্লায় রাখা হবে, আরেক পাল্লায় কালিমা শাহাদাত লেখা একটা চিরকুট (বিতাকাহ) রাখা হবে, সেই কালিমার পাল্লা ভারী হয়ে যাবে। ১২৮০ আবার কিছু হাদিস দ্বারা বোঝা যায় ব্যক্তিকে মাপা হবে; কিন্তু ব্যক্তির শরীর হিসেবে ওজন নয়, বরং ঈমান ও আমল হিসেবে হবে। যেমন—একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের দুই পায়ের ব্যাপারে (যা বেশ শীর্ণ ছিল) বলেন, ‘এ দুটো মিযানের পাল্লায় উহুদ পাহাড়ের চেয়ে বেশি ভারী হবে।’ ১২৮১ অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তায়ালা সবগুলোই মাপবেন।

তা ছাড়া, মুতাযিলাদের অথর্ব যুক্তি ও নির্বুদ্ধিতার আরেক প্রমাণ হলো আধুনিক বিজ্ঞান। বর্তমান যুগে এসে আমরা কেবল শরীরী বিষয় নয়, বিমূর্ত ও শরীরী সবকিছুকে মাপছি। শরীরের তাপমাত্রা মাপছি, ভূমিকম্প মাপছি, শব্দ মাপছি, গতি মাপছি, আলো মাপছি। অর্থাৎ, পৃথিবীর সবকিছুই এখন মাপা হচ্ছে এবং এ সবকিছু মানুষ করছে। তাহলে সর্বশক্তিমান আল্লাহ মানুষের আমল মাপতে পারবেন না? অদূর ভবিষ্যতে হয়তো মানবসংশ্লিষ্ট আরও অনেক আপাত অপরিমাপ্য বিষয় পৃথিবীতেই মাপা যাবে। তাই মানুষের উচিত নিজের সীমাবদ্ধ মস্তিষ্ক ও বিবেককে সব কিছুর মানদণ্ড না বানানো। বিবেকের সীমার বাইরে তাকে সালিশ নিযুক্ত না করা।

পৃথিবীর সবকিছুর পরিমাপক যেমন একরকম নয়, কিয়ামতের দাঁড়িপাল্লাও পৃথিবীর চাল-ডাল মাপার দাঁড়িপাল্লা কিংবা জ্বর মাপার যন্ত্রের মতো হবে এমন চিন্তা করা সঠিক নয়। কারণ, এগুলো অদৃশ্যের বিষয় যা আমরা আমাদের মস্তিষ্ক দিয়ে অনুভব করতে পারব না। ফলে এ ব্যাপারে নীরব থাকতে হবে। কুরআন-সুন্নাহতে মিযান থাকার কথা, সকল ভালো ও মন্দ আমল মাপার কথা বলা হয়েছে। আমাদের কর্তব্য হলো সেগুলোতে দৃঢ় ঈমান রাখা। আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন আমাদের আমল মাপতে সক্ষম—এটুকু বিশ্বাস রাখাই যথেষ্ট এবং যুক্তির দাবি। সাবুনি বলেন, ‘কবিগণ কবিতার জন্যও মিযান (ওজন/ছন্দ) নির্ধারণ করেছেন। সময় জানার জন্য কাঠ দিয়ে তৈরি একটি (প্রাচীন) যন্ত্রের নামও মিযান, যা দিয়ে সূর্যের অবস্থান, নামাযের সময় ইত্যাদি নির্ধারণ করা যায়। এগুলো কেউ না দেখলে এগুলোর রূপরেখা বুঝতে পারবে না; যব ও শস্য মাপার পাল্লা মনে করবে। অথচ এগুলো সব দুনিয়ার দাঁড়িপাল্লা। তাহলে আখেরাতের দাঁড়িপাল্লার ব্যাপারে মাথা ঘামানো কতটুকু সঠিক?১২৮২

টিকাঃ
১২৭৬. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৬৩)।
১২৭৭. দেখুন : মুসনাদে আহমদ (আউয়ালু মুসনাদিল কুফিয়্যিন: ১৮৮৩২)। মুসান্নাফে আবদির রাযযাক (কিতাবুল জানায়েয : ৬৭৩৭)।
১২৭৮. বুখারি (কিতাবুদ দাআওয়াত: ৬৪০৬)। মুসলিম (কিতাবুয যিকরি ওয়াদ দোয়া: ২৬৯৪)।
১২৭৯. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুল কাবায়িল: ২৮২০৩)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল বিররি ওয়াল ইহসান: ৪৮১)।
১২৮০. তিরমিযি (আবওয়াবুল ঈমান: ২৬৩৯)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুয যুহদ: ৪৩০০)।
১২৮১. ইবনে হিব্বান (মানাকিবুস সাহাবাহ: ৭০৬৯)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবদিল্লাহ ইবনে মাসউদ: ৪০৭২)।
১২৮২. আল-কিফায়াহ, সাবুনি (৩৭৮)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 পুলসিরাত

📄 পুলসিরাত


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পরকালসংক্রান্ত আরেকটি আকিদা হলো ‘পুলসিরাত।’ এটা জাহান্নামের উপর স্থাপিত একটি পুল। চুলের চেয়ে চিকন, তরবারির চেয়ে ধারালো। এর চারপাশে লোহার কাঁটা রয়েছে। সবাইকে এটা অতিক্রম করতে হবে। একদল এটা অতিক্রম করে জান্নাতে পৌঁছে যাবে। আরেক দল এর উপর থেকে নিচে জাহান্নামের ভিতরে পতিত হবে।১২৮৩ কুরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং অগণিত হাদিস দ্বারা পুলসিরাতের সত্যতা প্রমাণিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَإِنْ مِنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا ۚ كَانَ عَلَىٰ رَبِّكَ حَتْمًا مَقْضِيًّا ۞ ۞ ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوْا وَنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيًّا ۞ অর্থ : ‘তোমাদের প্রত্যেকেই তা অতিক্রম করবে। এটা তোমার প্রতিপালকের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। অতঃপর আমি মুত্তাকিদের নিষ্কৃতি দেবো আর জালেমদের সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দেবো।’ [মারইয়াম : ৭১-৭২] এখানে সবাইকে জাহান্নামে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে। অতঃপর সেখান থেকে মুমিনদের মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর এটা পুলসিরাতের মাধ্যমেই সম্ভব। অর্থাৎ, পুলসিরাত জাহান্নামের উপর স্থাপিত থাকবে। পুলসিরাতের উপর থেকে জান্নাতিরা জান্নাতে চলে যাবে। জাহান্নামিরা নিচে জাহান্নামে পড়ে যাবে।

আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে কুরআনের বাণী : ۞ يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ ۖ وَبَرَزُوا لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ ۞ ‘যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমণ্ডলীও। মানুষ উপস্থিত হবে আল্লাহর সামনে, যিনি এক, পরাক্রমশালী।’ [ইবরাহিম : ৪৮] সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, (যদি পৃথিবী পুরোপুরি বদলে যায়) তবে সেদিন মানুষ কোথায় থাকবে? তিনি বললেন, ‘পুলসিরাতের উপর।’১২৮৪

আনাস ইবনে মালেক রাযি. রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে কিয়ামতের দিনের শাফায়াত প্রার্থনা করলেন। রাসুল (ﷺ) বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি করব।’ আনাস বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনাকে আমি কোথায় খুঁজব?’ তিনি বললেন : ‘পুলসিরাতের কাছে খুঁজবে।’ আমি বললাম, যদি পুলসিরাতে আপনার সাক্ষাৎ না পাই? তিনি বললেন: ‘মিযানের কাছে।’ আমি বললাম, যদি মিযানের কাছে আপনাকে না পাই? তিনি বললেন: ‘হাউজে কাউসারের কাছে। এই তিনটি জায়গার কোথাও-না-কোথাও পাবেই।’১২৮৫

আবু হুরায়রা রাযি.-এর শাফায়াতসংক্রান্ত দীর্ঘ ও প্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে, “...(কিয়ামতের দিন) রাসুলুল্লাহ (ﷺ) দোয়ার জন্য দাঁড়াবেন। তাঁকে অনুমতি দেওয়া হবে। আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক পুলসিরাতের ডানে ও বামে এসে দাঁড়াবে। (তিনি বলেন) ‘তোমাদের প্রথম দলটি বিদ্যুদ্গতিতে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে।’ সাহাবি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘বিদ্যুদ্গতিতে’ কথাটির মর্ম কী আমাকে বলুন। আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান! রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন : ‘আকাশে কখনো বিদ্যুচ্চমক দেখোনি? চোখের পলকে আসে আর চলে যায়।’ (তারাও সেভাবে দ্রুত পুলসিরাত পার হয়ে যাবে)। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন : ‘পরবর্তী দলগুলো যথাক্রমে বাতাসের বেগে, পাখির গতিতে এবং সর্বশেষে দৌড়ের গতিতে পার হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই তার আমল হিসেবে পুলসিরাত অতিক্রম করবে। তোমাদের নবি (ﷺ) তখন পুলসিরাতের উপর দাঁড়িয়ে এ দোয়া করতে থাকবেন: আল্লাহ, আপনি রক্ষা করুন! আল্লাহ, আপনি রক্ষা করুন! আল্লাহ, আপনি নিরাপদে পৌঁছিয়ে দিন। এভাবে আমল যত কমতে থাকবে গতি কমতে থাকবে এবং প্রত্যেকে ধীর থেকে ধীরে পুলসিরাত পার হতে থাকবে। শেষে একব্যক্তি নিতম্ব হিঁচড়ে পুলসিরাত পার হবে।’ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘পুলসিরাতের উভয় পাশে কাঁটাযুক্ত লৌহশলাকা ঝুলন্ত রয়েছে। এগুলো আল্লাহর নির্দেশক্রমে নির্ধারিত পাপীদের ধরে ফেলবে। কেউ তাতে গুঁতো খেয়েও মুক্তি পাবে। কেউ তাতে জড়িয়ে জাহান্নামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হবে...।”১২৮৬

মুগিরা ইবনে শুবা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘পুলসিরাতের উপর মুমিনদের নিদর্শন হবে (এই দোয়া) : رَبِّ سَلَّم سَلَّم অর্থাৎ, হে আল্লাহ, রক্ষা করুন, রক্ষা করুন! ’১২৮৭

মুতাযিলা, রাফেযি এবং বিভিন্ন বিদআতি সম্প্রদায় পুলসিরাতকে অস্বীকার করে। তারা উপরের আয়াতকে ‘জাহান্নামের কাছাকাছি’ বা ‘পাশ দিয়ে যাওয়া’র মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু এমন ব্যাখ্যা পরিত্যাজ্য। খোদ রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য দ্বারা তাদের অপব্যাখ্যা প্রমাণিত হয়।

টিকাঃ
১২৮৩. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ১৮৩)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আয়েশা: ২৫৪৩২)। উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৬৪)।
১২৮৪. মুসলিম (কিতাবু সিফাতিল কিয়ামাহ ওয়াল জান্নাহ ওয়ান নার: ২৭৯১)। তিরমিযি (আবওয়াবু তাফসিরিল কুরআন: ৩১২১)।
১২৮৫. তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ: ২৪৩৩)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আনাস ইবনে মালেক: ১৩০২২)। বাযযার (৭৩০৭)।
১২৮৬. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ১৯৫)। মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুত তাফসির : ৩৪৪৪)।
১২৮৭. তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ : ২৪৩২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00