📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 অধমের পর্যবেক্ষণ

📄 অধমের পর্যবেক্ষণ


নাবালেগ অবস্থায় কারও মৃত্যুবরণ করার অর্থ হলো গুনাহবিহীন নিষ্পাপ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা। ফলে এই অবস্থার উপর ভিত্তি করে আল্লাহ কাউকে জাহান্নামে দিতে পারেন না। সেটা তার উপর জুলুম হবে। অথচ আল্লাহ জুলুম থেকে পবিত্র। এমনকি আল্লাহর ইলমে সে বড় হয়ে কাফের হতো এ যুক্তিতেও আল্লাহ তায়ালা তাকে জাহান্নামে দেবেন না। কারণ, তিনি সরাসরি অপরাধ ব্যতীত কাউকে শাস্তি দেন না। এমন হলে রুহের জগতের স্বীকৃতির উপর নির্ভর করেই তিনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামে দিতে পারতেন; দুনিয়াতে পাঠিয়ে পরীক্ষা, নবি-রাসুল প্রেরণ এবং কিতাব অবতীর্ণ করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। ইমাম মুহাম্মাদ রহ. বলেন, ‘আমার বিশ্বাস—আল্লাহ পাপ ছাড়া কাউকে শাস্তি দেবেন না।’১২৫২

একইভাবে আল্লাহ কারও কাছে রাসুল পাঠানো ব্যতীত তাকে শাস্তি দেননি। কুরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ مَنِ اهْتَدَىٰ فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ ۖ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا ۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ۗ وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا ۞ অর্থ : ‘যে সৎপথে চলে, সে নিজের মঙ্গলের জন্যই সৎপথে চলে। আর যে পথভ্রষ্ট হয়, নিজের অমঙ্গলের জন্যই পথভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। রাসুল পাঠানোর আগ পর্যন্ত আমি কাউকে শাস্তি দান করি না।’ [ইসরা : ১৫] শিশুর কাছে দাওয়াত পৌঁছানো সত্ত্বেও না পৌঁছানোর মতোই। কারণ, আল্লাহ তাকে বোঝার মতো ক্ষমতাই দেননি। যে বয়সে সে দাওয়াত এবং আল্লাহর দ্বীন বুঝতে পারবে, সে পর্যন্ত তাকে জীবনই দেননি। ফলে এ যুক্তিতেও ‘আল্লাহ তাকে জাহান্নামে দেবেন না’ বলা যায়。

ফলে মুসলিম কিংবা মুশরিকের সন্তান যে-ই হোক, নাবালেগ অবস্থায় মারা গেলে তাকে জাহান্নামে দেওয়া আল্লাহর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাকি রইল মুসলিম ও মুশরিকদের সন্তানের মাঝে পার্থক্য করা। এটাও ইজতিহাদি বিষয়। কারণ, জন্মের ক্ষেত্রে এবং বাবা-মা বাছাই করার ক্ষেত্রে সন্তানের কোনো হাত নেই। ফলে দুজনই শিশু অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার পরে কেবল একজনের বাবা-মা মুসলিম হওয়ার কারণে জান্নাতি হবে, আরেকজনের বাবা-মা মুশরিক হওয়ার কারণে জাহান্নামি হবে—এটাও ইসলামের চিরন্তন ইনসাফের নীতি (একের পাপের বোঝা অন্য কেউ বহন করবে না)-এর সঙ্গে যায় না। উপরন্তু রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ হাদিসও উক্ত পার্থক্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘প্রত্যেক নবজাতক ফিতরতের উপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার বাবা-মা তাকে ইহুদি বানায়, খ্রিষ্টান বানায়, অগ্নিপুজারী বানায়...।’ ১২৫৩ ফলে শিশু বয়সে কেউ মারা গেলে বাবা-মা তাকে ইহুদি-খ্রিষ্টান বানানোর আগেই ফিতরতের উপর মারা গেল ধর্তব্য হবে। এক্ষেত্রে মুমিন ও কাফেরের শিশু সমান। প্রত্যেকেই সমান ফিতরতের উপর জন্ম নেয়। বরং বুখারির একটি বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা ফিতরতের উপর জন্মের ক্ষেত্রে মুসলিম ও মুশরিকদের শিশুর অভিন্নতা এবং মুশরিকদের শিশু সন্তানের জান্নাতে থাকা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। সামুরাহ ইবনে জুনদুব রাযি.-এর লম্বা হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) স্বপ্নে জান্নাতের বাগানে ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে দেখতে পান। তাঁর চারপাশে ছোট ছোট শিশু খেলাধুলা করছিল। তারা ছিল সেসব শিশু যারা শৈশবে ফিতরতের উপর মৃত্যুবরণ করেছিল। তখন কেউ জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, মুশরিকদের সন্তানও? আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘হ্যাঁ, মুশরিকদের সন্তানও।’১২৫৪ এ হাদিসে মুশরিকদের শিশু সন্তানের জান্নাতি হওয়া সুস্পষ্ট。

বরং ইমামের অন্যান্য বক্তব্য থেকেও এটাই বোঝা যায়। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আদম সন্তানকে তাঁর (আদমের) পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করেছেন। তাদের জ্ঞান দান করেছেন। তাদের সম্বোধন করে ঈমানের নির্দেশ দিয়েছেন। কুফরি থেকে বারণ করেছেন। তখন তারা আল্লাহর রবুবিয়্যাহকে স্বীকার করে নিয়েছিল। আর এভাবেই তারা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছিল। পরবর্তীকালে আদম সন্তান সেই ফিতরত (ঈমানের জন্য প্রস্তুত অবস্থা)-এর উপরই জন্মলাভ করে। সুতরাং পরে যে কুফরি করল, সে মূলত (তার প্রতিশ্রুতি) বদলে ফেলল। আর যে ঈমান আনল এবং সত্যায়ন করল, সে (প্রতিশ্রুতির উপর) অটল ও অবিচল রইল।১২৫৫ তাহলে খোদ ইমামের বক্তব্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, মুমিন কিংবা মুশরিক উভয়ের সন্তান রুহের জগতে করা সেই রবুবিয়্যাতের স্বীকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে, যাকে ইমাম ‘ঈমানের ফিতরত’ বলেছেন। পরবর্তীকালে বড় হয়ে যেহেতু কাফেররা তাদের প্রতিশ্রুতি বদলে ফেলে, এ জন্য শাস্তিযোগ্য। কিন্তু শিশু সন্তান যে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আগেই মৃত্যুবরণ করে, সে শাস্তিযোগ্য হবে কোন্ অপরাধে?

ফলে নাবালেগ অবস্থায় মারা যাওয়া কাফের-মুশরিকদের শিশু সন্তানের জান্নাতি হওয়া এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়াই যৌক্তিক। তবে যেহেতু এ ব্যাপারে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে এবং বিভিন্নভাবে সেসব হাদিস পরস্পরের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ, উপরন্তু এ ব্যাপারে আলেমদের মতামত ও সাংঘর্ষিক, ফলে ইমাম আজমের প্রসিদ্ধ নীতি অবলম্বন করাই উত্তম। সেটা হলো নীরব থাকা। মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল বলখি, ফখরুল ইসলাম বাযদাবি, জামালুদ্দিন গযনবি, গুমুশখানভিসহ অনেক হানাফি আলেম নীরব থাকাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।১২৫৬ তাই আমরাও এ ব্যাপারে নীরব থাকাকে অগ্রাধিকার দিই। এটুকু বিশ্বাস রাখি যে, আল্লাহ কাউকে—যেমনটা ইমাম মুহাম্মাদ বলেছেন—গুনাহ ছাড়া শাস্তি দেবেন না।১২৫৭ উপরন্তু আল্লাহ কাউকেই—যেমনটা তিনি বারবার কুরআনে বলেছেন—বিন্দুপরিমাণ জুলুম করবেন না। [ফুসসিলাত: ৪৬]

টিকাঃ
১২৫২. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২৩৯)।
১২৫৩. বুখারি (কিতাবুল কদর : ৬৫৯৯)। মুসলিম (কিতাবুল কদর : ২৬৫৮)।
১২৫৪. বুখারি (কিতাবুত তাবির : ৭০৪৭)। সুনানে কুবরা, নাসায়ি (কিতাবুত তাবির : ৭৬১১) ইবনে হিব্বান (কিতাবুর রাকায়েক: ৬৫৫)।
১২৫৫. আল-ফিকহুল আকবার (৩-৪)।
১২৫৬. দেখুন: আল-ইতিকাদ, বলখি (১০৯-১১০)। উসুলুদ্দিন, গযনবি (২১০)। জামেউল মুতুন (২৯)।
১২৫৭. বাহরুল কালাম (১৭৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00