📄 মুমিনদের সন্তানের পরিণতি
সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত আকিদা হলো—কোনো মুসলিম শিশু নাবালেগ অবস্থায় মারা গেলে আল্লাহ তাকে জান্নাতিদের অন্তর্ভুক্ত করবেন। কারণ, এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহতে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُمْ مِنْ عَمَلِهِمْ مِنْ شَيْءٍ ۚ كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ ۞ অর্থ : ‘যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তানসন্ততি ঈমানে তাদের অনুগামী হয়, তাদের সঙ্গে মিলিত করব তাদের সন্তানসন্ততিকে এবং তাদের কর্মফল আমি মোটেও হ্রাস করব না; প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।’ [তুর : ২১] হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যে মুমিন নারীর তিনটি সন্তান শিশু অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে পর্দাস্বরূপ হবে।’ এক নারী জিজ্ঞাসা করল, দুজন হলে? তিনি বললেন, ‘দুজন হলেও।’১২৩৭ শিশুরা মায়ের জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হয়ে নিজেরা জাহান্নামে যাবে এটা অসম্ভব। আনাসসহ একাধিক সাহাবি সূত্রে পুরুষ তথা পিতার ব্যাপারেও একই ফযিলত বর্ণিত আছে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যে মুসলিম ব্যক্তির তিনটি সন্তান বালেগ হওয়ার আগে মারা যাবে, আল্লাহ তাকে সেই শিশুদের প্রতি অনুগ্রহের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’১২৩৮
সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে—আবু হাসসান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হুরায়রা রাযি.-কে বললাম, আমার দুটি পুত্র সন্তান মারা গিয়েছে। আপনি কি রাসুলুল্লাহ থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করবেন যাতে আমি কিছু সান্ত্বনা পেতে পারি? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ। ছোট সন্তানরা জান্নাতের প্রজাপতিতুল্য হবে। তারা তাদের পিতা-মাতার সঙ্গে মিলিত হয়ে তাদের কাপড় শক্ত করে ধরে রাখবে। আল্লাহ তাদের মাতা-পিতাসহ তাদের জান্নাতে প্রবেশ করানোর আগ পর্যন্ত কাপড় ছাড়বে না।’১২৩৯
টিকাঃ
১২৩৭. বুখারি (কিতাবুল ইলম: ১০১)। মুসলিম (কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাহ ওয়াল আদাব : ২৬৩৪)।
১২৩৮. বুখারি (কিতাবুল জানায়েয: ১২৪৮)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল জানায়েয: ২৯৪০)।
১২৩৯. মুসলিম (কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাতি ওয়াল আদাব : ২৬৩৫)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবি হুরাইরা : ১০৪৭৫)।
📄 মুশরিকদের সন্তানের পরিণতি
মুশরিকদের নাবালক সন্তানের পরিণতি কী? এ ব্যাপারে আলেমদের মতবিরোধ রয়েছে। একদল মনে করেন, তারা মুমিনদের সন্তানদের মতো জান্নাতে যাবে এবং জান্নাতবাসীর সেবায় নিয়োজিত থাকবে। আরেক দল মনে করেন, তারা ‘আরাফে’ (জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝামাঝি একটি স্থানে) থাকবে। আরেক দল বলেন, তাদের পরীক্ষা করা হবে—যে আল্লাহর নির্দেশ মানবে, তাকে জান্নাত দেওয়া হবে; যে মানবে না, তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।১২৪৪
এই মতভেদের কারণ হলো, এ ব্যাপারে হাদিসে বৈপরীত্যপূর্ণ বক্তব্য পাওয়া যায়। যেমন—একটি হাদিসে তাদের জান্নাতিদের খাদেম বলা হয়েছে। আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে মুশরিকদের সন্তানের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘তাদের পাপ নেই যে কারণে শাস্তি দেওয়া হবে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে। আবার তাদের পুণ্যও নেই যার সুবাদে তাদের জান্নাতের মালিক বানিয়ে দেওয়া হবে। ফলে তারা জান্নাতিদের খাদেম হবে।’১২৪৫
বিপরীতে কিছু হাদিসে এসেছে—তারা তাদের মাতা-পিতার সঙ্গে থাকবে, যেহেতু মাতা-পিতা কাফের হওয়ার কারণে জাহান্নামে থাকবে। বোঝা গেল, তারাও জাহান্নামে যাবে। আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে মুশরিকদের বাচ্চার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘তারা (বেঁচে থাকলে) কী করত আল্লাহ জানেন।’১২৪৬ যদিও এখানে সুস্পষ্টভাবে তাদের জাহান্নামে যাওয়ার কথা বলা হয়নি, তথাপি আয়েশা রাযি.-এর একটি হাদিস থেকে সেটা বোঝা যায়। আয়েশা রাযি.-কে কাফেরদের সন্তানের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: ‘তারা তাদের মাতা-পিতার সঙ্গে থাকবে।’ আয়েশা বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললাম, আমল ছাড়াই (তাদের জাহান্নামে দেওয়া হবে)? তিনি বললেন, ‘তারা কী করত আল্লাহ জানেন।’১২৪৭
আবার কিছু হাদিস দ্বারা বোঝা যায় তাদের পরীক্ষা করা হবে। যেমন আবু সাঈদ খুদরির হাদিস। রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তিকে আনা হবে। এক. ইসলাম পৌঁছানোর আগে মৃত্যুবরণকারী। দুই. পাগল। তিন. শিশু। ইসলাম পৌঁছার আগে মৃত্যুবরণকারী বলবে—প্রভু, আমার কাছে কোনো কিতাব অথবা রাসুল আসেননি...! পাগল বলবে—হে আল্লাহ, আমাকে আপনি ভালোমন্দের মাঝে পার্থক্য করার বিবেক দেননি। শিশু বলবে—হে আল্লাহ, আমি পরিণত বয়সে পৌঁছতে পারিনি। তখন তাদের সামনে জাহান্নাম উপস্থিত করা হবে। তাদের বলা হবে, এখানে প্রবেশ করো। যে ব্যক্তি আল্লাহর জ্ঞানে সৌভাগ্যবান ছিল, সে তাতে প্রবেশ করবে। আর যে আল্লাহর জ্ঞানে দুর্ভাগা ছিল, সে তাতে প্রবেশ করবে না। তখন আল্লাহ বলবেন, তোমরা আমারই অবাধ্য হলে। আমার রাসুলদের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করতে তা তো বোঝাই যাচ্ছে।’১২৪৮
এখানে ‘শিশু’ বলতে মুমিন ও কাফের সকলের শিশু অন্তর্ভুক্ত। কারণ, বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ব্যতীত কোনো শিশুই আসলে মুকাল্লাফ (শরয়ি দায়িত্বপ্রাপ্ত) তথা কাফের বা মুমিন নয়। আবুল ইউসর বাযদাবি উক্ত পদ্ধতির বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, পরকাল পরীক্ষার জায়গা নয়। ফলে তাদের পরীক্ষা করা হবে না।১২৪৯ তার আপত্তির জবাবে বলা যায়, এটা আক্ষরিক অর্থে দুনিয়ার পরীক্ষা নয়, বরং আল্লাহ তো জানেনই তারা দুনিয়ায় বেঁচে থাকলে কী করত। সে জানা অনুযায়ী তাদের তিনি জান্নাত-জাহান্নাম দান করতে পারেন। কিন্তু তাতে তারা আপত্তি করবে। ফলে তাদের আপত্তি নিরসনে তাদের সামনে প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট করার জন্য এ পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে। তাই পরকাল পরীক্ষার জায়গা নয়—স্রেফ এ যুক্তিতে রাসুলুল্লাহর (ﷺ) হাদিসকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত হবে না。
এই একাধিক ও বিপরীতমুখী বর্ণনার কারণেই সম্ভবত এ ব্যাপারেও ইমাম আজমের সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই। ইমাম রহ. নিজস্ব সনদে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে মুশরিকদের (নাবালেগ মৃত) সন্তানের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘তারা (বেঁচে থাকলে) কী আমল করত সেটা আল্লাহ খুব ভালো জানেন। ’১২৫০ নাসাফি বলেন, আবু হানিফা রহ. বলেছেন, ‘আমি জানি না তারা জান্নাতে নাকি জাহান্নামে যাবে।’১২৫১
টিকাঃ
১২৪৪. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২৩৯)।
১২৪৫. মুসনাদে তয়ালেসি (আনাস ইবনে মালেক: ২২২৫)। মুসনাদে বাযযার (মুসনাদে আনাস ইবনে মালেক : ৭৪৬৬)। আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (সামুরাহ ইবনে জুনদুব: ৭/২৪৪; হাদিস নং: ৬৯৯৩)।
১২৪৬. বুখারি (কিতাবুল জানায়েয: ১৩৮৪)। মুসলিম (কিতাবুল কদর: ২৬৫৯)।
১২৪৭. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আয়েশা: ২৫১৮৪)।
১২৪৮. মুসনাদে আবিল জাদ (২০০৮)। শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালাকায়ি (১০৭৬)।
১২৪৯. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২৩৯)।
১২৫০. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৪)।
১২৫১. বাহরুল কালাম (১৭১)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
নাবালেগ অবস্থায় কারও মৃত্যুবরণ করার অর্থ হলো গুনাহবিহীন নিষ্পাপ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা। ফলে এই অবস্থার উপর ভিত্তি করে আল্লাহ কাউকে জাহান্নামে দিতে পারেন না। সেটা তার উপর জুলুম হবে। অথচ আল্লাহ জুলুম থেকে পবিত্র। এমনকি আল্লাহর ইলমে সে বড় হয়ে কাফের হতো এ যুক্তিতেও আল্লাহ তায়ালা তাকে জাহান্নামে দেবেন না। কারণ, তিনি সরাসরি অপরাধ ব্যতীত কাউকে শাস্তি দেন না। এমন হলে রুহের জগতের স্বীকৃতির উপর নির্ভর করেই তিনি আমাদের জান্নাত-জাহান্নামে দিতে পারতেন; দুনিয়াতে পাঠিয়ে পরীক্ষা, নবি-রাসুল প্রেরণ এবং কিতাব অবতীর্ণ করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। ইমাম মুহাম্মাদ রহ. বলেন, ‘আমার বিশ্বাস—আল্লাহ পাপ ছাড়া কাউকে শাস্তি দেবেন না।’১২৫২
একইভাবে আল্লাহ কারও কাছে রাসুল পাঠানো ব্যতীত তাকে শাস্তি দেননি। কুরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ مَنِ اهْتَدَىٰ فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ ۖ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا ۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ۗ وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا ۞ অর্থ : ‘যে সৎপথে চলে, সে নিজের মঙ্গলের জন্যই সৎপথে চলে। আর যে পথভ্রষ্ট হয়, নিজের অমঙ্গলের জন্যই পথভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। রাসুল পাঠানোর আগ পর্যন্ত আমি কাউকে শাস্তি দান করি না।’ [ইসরা : ১৫] শিশুর কাছে দাওয়াত পৌঁছানো সত্ত্বেও না পৌঁছানোর মতোই। কারণ, আল্লাহ তাকে বোঝার মতো ক্ষমতাই দেননি। যে বয়সে সে দাওয়াত এবং আল্লাহর দ্বীন বুঝতে পারবে, সে পর্যন্ত তাকে জীবনই দেননি। ফলে এ যুক্তিতেও ‘আল্লাহ তাকে জাহান্নামে দেবেন না’ বলা যায়。
ফলে মুসলিম কিংবা মুশরিকের সন্তান যে-ই হোক, নাবালেগ অবস্থায় মারা গেলে তাকে জাহান্নামে দেওয়া আল্লাহর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাকি রইল মুসলিম ও মুশরিকদের সন্তানের মাঝে পার্থক্য করা। এটাও ইজতিহাদি বিষয়। কারণ, জন্মের ক্ষেত্রে এবং বাবা-মা বাছাই করার ক্ষেত্রে সন্তানের কোনো হাত নেই। ফলে দুজনই শিশু অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার পরে কেবল একজনের বাবা-মা মুসলিম হওয়ার কারণে জান্নাতি হবে, আরেকজনের বাবা-মা মুশরিক হওয়ার কারণে জাহান্নামি হবে—এটাও ইসলামের চিরন্তন ইনসাফের নীতি (একের পাপের বোঝা অন্য কেউ বহন করবে না)-এর সঙ্গে যায় না। উপরন্তু রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ হাদিসও উক্ত পার্থক্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘প্রত্যেক নবজাতক ফিতরতের উপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার বাবা-মা তাকে ইহুদি বানায়, খ্রিষ্টান বানায়, অগ্নিপুজারী বানায়...।’ ১২৫৩ ফলে শিশু বয়সে কেউ মারা গেলে বাবা-মা তাকে ইহুদি-খ্রিষ্টান বানানোর আগেই ফিতরতের উপর মারা গেল ধর্তব্য হবে। এক্ষেত্রে মুমিন ও কাফেরের শিশু সমান। প্রত্যেকেই সমান ফিতরতের উপর জন্ম নেয়। বরং বুখারির একটি বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা ফিতরতের উপর জন্মের ক্ষেত্রে মুসলিম ও মুশরিকদের শিশুর অভিন্নতা এবং মুশরিকদের শিশু সন্তানের জান্নাতে থাকা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। সামুরাহ ইবনে জুনদুব রাযি.-এর লম্বা হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) স্বপ্নে জান্নাতের বাগানে ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে দেখতে পান। তাঁর চারপাশে ছোট ছোট শিশু খেলাধুলা করছিল। তারা ছিল সেসব শিশু যারা শৈশবে ফিতরতের উপর মৃত্যুবরণ করেছিল। তখন কেউ জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, মুশরিকদের সন্তানও? আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘হ্যাঁ, মুশরিকদের সন্তানও।’১২৫৪ এ হাদিসে মুশরিকদের শিশু সন্তানের জান্নাতি হওয়া সুস্পষ্ট。
বরং ইমামের অন্যান্য বক্তব্য থেকেও এটাই বোঝা যায়। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আদম সন্তানকে তাঁর (আদমের) পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করেছেন। তাদের জ্ঞান দান করেছেন। তাদের সম্বোধন করে ঈমানের নির্দেশ দিয়েছেন। কুফরি থেকে বারণ করেছেন। তখন তারা আল্লাহর রবুবিয়্যাহকে স্বীকার করে নিয়েছিল। আর এভাবেই তারা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছিল। পরবর্তীকালে আদম সন্তান সেই ফিতরত (ঈমানের জন্য প্রস্তুত অবস্থা)-এর উপরই জন্মলাভ করে। সুতরাং পরে যে কুফরি করল, সে মূলত (তার প্রতিশ্রুতি) বদলে ফেলল। আর যে ঈমান আনল এবং সত্যায়ন করল, সে (প্রতিশ্রুতির উপর) অটল ও অবিচল রইল।১২৫৫ তাহলে খোদ ইমামের বক্তব্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, মুমিন কিংবা মুশরিক উভয়ের সন্তান রুহের জগতে করা সেই রবুবিয়্যাতের স্বীকৃতির উপর জন্মগ্রহণ করে, যাকে ইমাম ‘ঈমানের ফিতরত’ বলেছেন। পরবর্তীকালে বড় হয়ে যেহেতু কাফেররা তাদের প্রতিশ্রুতি বদলে ফেলে, এ জন্য শাস্তিযোগ্য। কিন্তু শিশু সন্তান যে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আগেই মৃত্যুবরণ করে, সে শাস্তিযোগ্য হবে কোন্ অপরাধে?
ফলে নাবালেগ অবস্থায় মারা যাওয়া কাফের-মুশরিকদের শিশু সন্তানের জান্নাতি হওয়া এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়াই যৌক্তিক। তবে যেহেতু এ ব্যাপারে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে এবং বিভিন্নভাবে সেসব হাদিস পরস্পরের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ, উপরন্তু এ ব্যাপারে আলেমদের মতামত ও সাংঘর্ষিক, ফলে ইমাম আজমের প্রসিদ্ধ নীতি অবলম্বন করাই উত্তম। সেটা হলো নীরব থাকা। মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল বলখি, ফখরুল ইসলাম বাযদাবি, জামালুদ্দিন গযনবি, গুমুশখানভিসহ অনেক হানাফি আলেম নীরব থাকাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।১২৫৬ তাই আমরাও এ ব্যাপারে নীরব থাকাকে অগ্রাধিকার দিই। এটুকু বিশ্বাস রাখি যে, আল্লাহ কাউকে—যেমনটা ইমাম মুহাম্মাদ বলেছেন—গুনাহ ছাড়া শাস্তি দেবেন না।১২৫৭ উপরন্তু আল্লাহ কাউকেই—যেমনটা তিনি বারবার কুরআনে বলেছেন—বিন্দুপরিমাণ জুলুম করবেন না। [ফুসসিলাত: ৪৬]
টিকাঃ
১২৫২. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২৩৯)।
১২৫৩. বুখারি (কিতাবুল কদর : ৬৫৯৯)। মুসলিম (কিতাবুল কদর : ২৬৫৮)।
১২৫৪. বুখারি (কিতাবুত তাবির : ৭০৪৭)। সুনানে কুবরা, নাসায়ি (কিতাবুত তাবির : ৭৬১১) ইবনে হিব্বান (কিতাবুর রাকায়েক: ৬৫৫)।
১২৫৫. আল-ফিকহুল আকবার (৩-৪)।
১২৫৬. দেখুন: আল-ইতিকাদ, বলখি (১০৯-১১০)। উসুলুদ্দিন, গযনবি (২১০)। জামেউল মুতুন (২৯)।
১২৫৭. বাহরুল কালাম (১৭৭)।