📄 হিসাব-নিকাশ
হাশরের দিন প্রত্যেককে হিসাব দিতে হবে। দুনিয়াতে যা করেছে সেটার জন্য সবাইকে জবাবদিহি করতে হবে। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা এ দিনকে ‘হিসাব দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সকল নবি-রাসুল এ দিন এবং এ দিনের হিসাব সম্পর্কে নিজ নিজ জাতিকে সজাগ ও সতর্ক করেছেন। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম দোয়া করেছেন, ۞ رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ ۞ অর্থ : ‘হে আমাদের পালনকর্তা, আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে ক্ষমা করুন যেদিন হিসাব কায়েম হবে।’ [ইবরাহিম : ৪১] আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন আয়াতে নিজেকে হিসাব গ্রহণকারী আখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ۖ وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا ۗ وَكَفَىٰ بِنَا حَاسِبِينَ ۞ অর্থ : ‘কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করব ন্যায়বিচারের মানদণ্ড। সুতরাং কারও প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না এবং কর্ম যদি তিল পরিমাণ ওজনেরও হয়, তবু তা আমি উপস্থিত করব; হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট।’ [আম্বিয়া : ৪৭] অন্যত্র নিজের নামে শপথ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ فَوَرَبِّكَ لَنَسْأَلَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ۞ ۞ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ ۞ অর্থ : ‘আপনার প্রভুর শপথ! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে জিজ্ঞাসা করব, যা তারা করত সে ব্যাপারে।’ [হিজর : ৯২-৯৩]
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগ পর্যন্ত আল্লাহর কাছ থেকে মানুষ এক কদম নড়তে পারবে না। এক. জীবন কোথায় ব্যয় করেছে? দুই. যৌবন কোথায় শেষ করেছে? তিন. সম্পদ কীভাবে উপার্জন করেছে? চার. সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছে? পাঁচ. জানা অনুযায়ী কতটুক আমল করেছে?’১২২৪
ইমাম আজম আবু হানিফা বলেন, ‘আমরা মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানে বিশ্বাস করি। আল্লাহ তায়ালা সকল মৃত প্রাণীকে একদিন একত্র করবেন। সে দিনটি হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। সেদিন আল্লাহ সব কাজের হিসাব নেবেন, প্রতিদান দেবেন, সবার প্রাপ্য পূর্ণ করবেন।’১২২৫ ইমাম তহাবি রহ. বলেন, ‘আমরা কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান এবং আমলের প্রতিদান পাওয়ার বিশ্বাস রাখি।’১২২৬
তবে সবার জন্য হিসাব সমান নয়। যারা পুণ্যবান, আল্লাহ তাদের হিসাব সহজ করবেন। তাদের সামনে কেবল আমলনামা পেশ করে ছেড়ে দেবেন। কিছু জিজ্ঞাসা করবেন না। বিপরীতে কাউকে আল্লাহ প্রত্যেক কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন। কাউকে শাসাবেন, ভর্ৎসনা করবেন। আরেক দলকে আল্লাহ অনুগ্রহ করে বিনা হিসাবে জান্নাত দান করবেন। তাদের কাছে কোনো হিসাবই চাইবেন না। ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের সত্তর হাজার মানুষ বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা সেসব মানুষ যারা অন্যের কাছে ঝাড়ফুঁক প্রার্থনা করে না, শুভাশুভ (ইত্যাদি ভিত্তিহীন) বিশ্বাস রাখে না; বরং তাদের প্রভুর উপর ভরসা করে।’১২২৭ আবু উমামা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘আমার প্রতিপালক আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—তিনি আমার উম্মতের সত্তর হাজার মানুষকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তাদের কোনো হিসাব নেবেন না। কোনো শাস্তি দেবেন না। প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে থাকবে সত্তর হাজার। আরও (অতিরিক্ত) থাকবে তাঁর তিন অঞ্জলি পরিমাণ। ’১২২৮
কিয়ামতের দিন সকল সৃষ্টির মাঝে ফয়সালা করে দেওয়া হবে। মানুষ ও জিন ব্যতীত বাকি সৃষ্টির মাঝে ‘কিসাস’ কায়েম করা হবে। অর্থাৎ, প্রত্যেকে প্রত্যেকের হিসাব নগদ বুঝে নেবে। কোনো পশু বা পাখি যদি অপর পশুপাখির উপর জুলুম করে থাকে, তবে সেটার মাঝে ফয়সালা (কিসাস) করে দেওয়া হবে। অতঃপর তাদের মাটি বানিয়ে দেওয়া হবে। বিপরীতে মানুষের মাঝে হিসাব কায়েম করা হবে। তাদের প্রত্যেককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা হবে। জীবনের সকল কৃতকর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। প্রত্যেকের হাতে নিজ নিজ আমলনামা দেওয়া হবে। তারা সেটা নিজেরা পড়ে দেখবে। আল্লাহ তায়ালা নিজে তাদের কাছে তাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। অতঃপর সে অনুযায়ী কারও জন্য জাহান্নামের ফয়সালা করবেন। কাউকে নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেবেন।
আমলনামা উপস্থাপন ও পাঠের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ۞ فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ ۞ ۞ فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا ۞ ۞ وَيَنْقَلِبُ إِلَىٰ أَهْلِهِ مَسْرُورًا ۞ ۞ وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ وَرَاءَ ظَهْرِهِ ۞ ۞ فَسَوْفَ يَدْعُو ثُبُورًا ۞ অর্থ: ‘যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেওয়া হবে এবং সে তার স্বজনদের নিকট প্রফুল্লচিত্তে ফিরে যাবে। কিন্তু যাকে তার আমলনামা পিঠের পশ্চাদ্দিক থেকে দেওয়া হবে, সে মৃত্যুকে ডাকবে।’ [ইনশিকাক: ৭-১১] অন্যত্র বলেন, ۞ فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهْ ۞ ۞ إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلَاقٍ حِسَابِيَهْ ۞ ۞ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَاضِيَةٍ ۞ ۞ فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ ۞ ۞ قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ ۞ ۞ كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا أَسْلَمْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَةِ ۞ ۞ وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِشِمَالِهِ فَيَقُولُ يَا لَيْتَنِي لَمْ أُوتَ كِتَابِيَهْ ۞ ۞ وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ ۞ ۞ يَا لَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةَ ۞ দেওয়া হবে, সে বলবে: নাও, তোমরাও আমলনামা পড়ে দেখো। আমি জানতাম যে, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং সে যাপন করবে সন্তোষজনক জীবন, সুউচ্চ জান্নাতে, যার ফলরাশি অবনমিত থাকবে। তাদের বলা হবে, পানাহার করো তৃপ্তির সঙ্গে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে। আর যার আমলনামা দেওয়া হবে তার বাম হাতে, সে বলবে, আহা! আমাকে যদি আমলনামা দেওয়াই না হতো! আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব! আহা! মৃত্যুতেই যদি আমার সব শেষ হয়ে যেত!’ [হাক্কাহ: ১৯-২৭]
ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন, ‘কিয়ামতের দিন বাদী-বিবাদীর মাঝে নেক আমলের মাধ্যমে কিসাস (ইনসাফপূর্ণ ফয়সালা) সত্য। যদি অভিযুক্তের কাছে নেক আমল না থাকে, তবে তার উপর গুনাহ চাপিয়ে দেওয়াও সত্য ও সঠিক। ১২২৯
এ কথার দলিল রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর একাধিক হাদিস। আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যদি তার ভাইয়ের ইজ্জত-সম্মান কিংবা যেকোনো কিছুতে জুলুম করে থাকে, তবে সেটা যেন আজই মিটমাট করে নেয়, সেদিন আসার আগে যেদিন কোনো দিনার-দিরহাম থাকবে না (থাকবে কেবল আমল)। সুতরাং তার ভালো আমলগুলো অন্যকে দিয়ে দিতে হবে। আর যদি ভালো আমল না থাকে, তবে অন্যের মন্দ আমলগুলো তার উপর দিয়ে দেওয়া হবে।’১২৩০ ইমাম আজম রহ. ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বিরত থাকো। কারণ, জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে আসবে।’১২৩১
প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা জানো কি আমার উম্মতের মাঝে নিঃস্ব (মুফলিস) কে?’ সাহাবাগণ বললেন, নিঃস্ব হলো যার দিনার-দিরহাম ও মালামাল কিছুই নেই। রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘আমার উম্মতের নিঃস্ব ব্যক্তি হলো যে কিয়ামতের দিন নামায, রোযা, যাকাত নিয়ে আসবে; আবার কাউকে গালি দিয়ে, কাউকে অপবাদ দিয়ে, কারও সম্পদ খেয়ে, কারও রক্তপাত করে, কাউকে মেরে আসবে। তখন প্রত্যেককে তার নেক আমল থেকে দিয়ে দিতে হবে। যদি অপরাধের দায় মেটানোর আগে নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তাহলে অভিযোগকারীদের গুনাহ গ্রহণ করতে হবে। একপর্যায়ে সেগুলো তার মাথায় দিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’১২৩২
প্রশ্ন হতে পারে, যদি কেউ কারও কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকে কিংবা কাউকে জুলুম করে থাকে, অতঃপর সে ব্যক্তি মারা যায় কিংবা অজ্ঞাত থাকে, সেই পাওনা মেটানো বা জুলুমের প্রায়শ্চিত্ত করার কোনো উপায় না থাকে, তাহলে কী করণীয়? উলামায়ে কেরাম লিখেছেন, যেকোনোভাবে হক আদায়ের চেষ্টা করবে। তার আত্মীয়-স্বজন খুঁজে বের করবে। সম্ভব না হলে তার পক্ষ থেকে পাওনা পরিমাণ সদকা করবে। তার জন্য দোয়া করবে। আল্লাহর কাছে তাওবা ও ইস্তিগফার করবে।
টিকাঃ
১২২৪. তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ: ২৪১৬)। মুসনাদে দারেমি (মুকাদ্দিমা : ৫৫৬)।
১২২৫. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৫৮)।
১২২৬. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৬)।
১২২৭. বুখারি (কিতাবুত তিব্ব: ৫৭৫২)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ২২০)।
১২২৮. তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ : ২৪৩৭)।
১২২৯. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।
১২৩০. বুখারি (কিতাবুল মাযালিম: ২৪৪৯)।
১২৩১. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৫)।
১২৩২. মুসলিম (কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাতি ওয়াল আদাব : ২৫৮১)। তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ: ২৪১৮)।
📄 হাউযে কাউসার
এটা কিয়ামতের ভয়ংকর দিনের এক বিশেষ নেয়ামত। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে আল্লাহ তায়ালা এ দিন একটি বিশাল হাউজ দান করবেন, যেটা জান্নাতের কাউসার নদীর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে। এর প্রস্থ হবে কয়েক মাসের পথ। পেয়ালা হবে আকাশের তারকার সমান অগণন। পানি হবে দুধের চেয়ে সাদা, মধুর চেয়ে মিষ্টি। হাশরের ময়দানের প্রচণ্ডতায় যখন মানুষের বুকের ছাতি ফেটে যাবার উপক্রম হবে, তখন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এ কূপ থেকে তাঁর বিশুদ্ধ সুন্নাহর অনুসারীদের শীতল পানি পান করাবেন। যে একবার পান করবে, সে আর কখনো পিপাসায় কষ্ট পাবে না।১২৩৩
ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘নবিজি (ﷺ)-এর হাউজ সত্য।’১২৩৪ ইমাম তহাবি রহ. বলেন, ‘হাউজ সত্য, যা (কিয়ামতের দিন) উম্মাহর পিপাসা নিবারণের জন্য আল্লাহ তায়ালা তাকে দান করে সম্মানিত করেছেন।’১২৩৫
মুতাযিলা ও রাফেযিরা হাউযে কাউসারকে অস্বীকার করে। কারণ, তারা মুতাওয়াতির হাদিস ছাড়া অন্যান্য হাদিস গ্রহণ করে না। তাদের মতে, হাউজে কাউসারের কথা কুরআনে নেই, স্রেফ হাদিসে আছে; কিন্তু সেগুলো মুতাওয়াতির নয়। ফলে এগুলোতে তারা বিশ্বাস করে না।১২৩৬ অথচ এটা সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি। হাউজে কাউসারের বর্ণনা এত অধিক সংখ্যক সাহাবি থেকে বর্ণিত হয়েছে যা মুতাওয়াতিরের পর্যায়ে। প্রায় অর্ধশত সাহাবি এ ব্যাপারে হাদিস বর্ণনা করেছেন। এটা গোটা উম্মাহর সকল মুহাক্কিক আলেমের সর্বসম্মত আকিদা। আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন ধারার মাঝে আকিদার বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও হাউজে বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সবাই একমত। ফলে এটাতে অবিশ্বাস মারাত্মক গোমরাহি।
টিকাঃ
১২৩৩. বুখারি (কিতাবুল ফিতান: ৭০NT০)। মুসলিম (কিতাবুল ফাযায়েল: ২২৯১)। তিরমিযি (আবওয়াবু তাফসিরিল কুরআন : ৩৩৬১)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুয যুহদ: ৪৩৩৪)।
১২৩৪. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।
১২৩৫. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (১৬)।
১২৩৬. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৬৬)।
📄 মুমিনদের সন্তানের পরিণতি
সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত আকিদা হলো—কোনো মুসলিম শিশু নাবালেগ অবস্থায় মারা গেলে আল্লাহ তাকে জান্নাতিদের অন্তর্ভুক্ত করবেন। কারণ, এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহতে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُمْ مِنْ عَمَلِهِمْ مِنْ شَيْءٍ ۚ كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ ۞ অর্থ : ‘যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তানসন্ততি ঈমানে তাদের অনুগামী হয়, তাদের সঙ্গে মিলিত করব তাদের সন্তানসন্ততিকে এবং তাদের কর্মফল আমি মোটেও হ্রাস করব না; প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।’ [তুর : ২১] হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যে মুমিন নারীর তিনটি সন্তান শিশু অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে পর্দাস্বরূপ হবে।’ এক নারী জিজ্ঞাসা করল, দুজন হলে? তিনি বললেন, ‘দুজন হলেও।’১২৩৭ শিশুরা মায়ের জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হয়ে নিজেরা জাহান্নামে যাবে এটা অসম্ভব। আনাসসহ একাধিক সাহাবি সূত্রে পুরুষ তথা পিতার ব্যাপারেও একই ফযিলত বর্ণিত আছে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যে মুসলিম ব্যক্তির তিনটি সন্তান বালেগ হওয়ার আগে মারা যাবে, আল্লাহ তাকে সেই শিশুদের প্রতি অনুগ্রহের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’১২৩৮
সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে—আবু হাসসান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হুরায়রা রাযি.-কে বললাম, আমার দুটি পুত্র সন্তান মারা গিয়েছে। আপনি কি রাসুলুল্লাহ থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করবেন যাতে আমি কিছু সান্ত্বনা পেতে পারি? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ। ছোট সন্তানরা জান্নাতের প্রজাপতিতুল্য হবে। তারা তাদের পিতা-মাতার সঙ্গে মিলিত হয়ে তাদের কাপড় শক্ত করে ধরে রাখবে। আল্লাহ তাদের মাতা-পিতাসহ তাদের জান্নাতে প্রবেশ করানোর আগ পর্যন্ত কাপড় ছাড়বে না।’১২৩৯
টিকাঃ
১২৩৭. বুখারি (কিতাবুল ইলম: ১০১)। মুসলিম (কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাহ ওয়াল আদাব : ২৬৩৪)।
১২৩৮. বুখারি (কিতাবুল জানায়েয: ১২৪৮)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল জানায়েয: ২৯৪০)।
১২৩৯. মুসলিম (কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাতি ওয়াল আদাব : ২৬৩৫)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবি হুরাইরা : ১০৪৭৫)।
📄 মুশরিকদের সন্তানের পরিণতি
মুশরিকদের নাবালক সন্তানের পরিণতি কী? এ ব্যাপারে আলেমদের মতবিরোধ রয়েছে। একদল মনে করেন, তারা মুমিনদের সন্তানদের মতো জান্নাতে যাবে এবং জান্নাতবাসীর সেবায় নিয়োজিত থাকবে। আরেক দল মনে করেন, তারা ‘আরাফে’ (জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝামাঝি একটি স্থানে) থাকবে। আরেক দল বলেন, তাদের পরীক্ষা করা হবে—যে আল্লাহর নির্দেশ মানবে, তাকে জান্নাত দেওয়া হবে; যে মানবে না, তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।১২৪৪
এই মতভেদের কারণ হলো, এ ব্যাপারে হাদিসে বৈপরীত্যপূর্ণ বক্তব্য পাওয়া যায়। যেমন—একটি হাদিসে তাদের জান্নাতিদের খাদেম বলা হয়েছে। আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে মুশরিকদের সন্তানের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘তাদের পাপ নেই যে কারণে শাস্তি দেওয়া হবে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে। আবার তাদের পুণ্যও নেই যার সুবাদে তাদের জান্নাতের মালিক বানিয়ে দেওয়া হবে। ফলে তারা জান্নাতিদের খাদেম হবে।’১২৪৫
বিপরীতে কিছু হাদিসে এসেছে—তারা তাদের মাতা-পিতার সঙ্গে থাকবে, যেহেতু মাতা-পিতা কাফের হওয়ার কারণে জাহান্নামে থাকবে। বোঝা গেল, তারাও জাহান্নামে যাবে। আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে মুশরিকদের বাচ্চার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘তারা (বেঁচে থাকলে) কী করত আল্লাহ জানেন।’১২৪৬ যদিও এখানে সুস্পষ্টভাবে তাদের জাহান্নামে যাওয়ার কথা বলা হয়নি, তথাপি আয়েশা রাযি.-এর একটি হাদিস থেকে সেটা বোঝা যায়। আয়েশা রাযি.-কে কাফেরদের সন্তানের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: ‘তারা তাদের মাতা-পিতার সঙ্গে থাকবে।’ আয়েশা বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললাম, আমল ছাড়াই (তাদের জাহান্নামে দেওয়া হবে)? তিনি বললেন, ‘তারা কী করত আল্লাহ জানেন।’১২৪৭
আবার কিছু হাদিস দ্বারা বোঝা যায় তাদের পরীক্ষা করা হবে। যেমন আবু সাঈদ খুদরির হাদিস। রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তিকে আনা হবে। এক. ইসলাম পৌঁছানোর আগে মৃত্যুবরণকারী। দুই. পাগল। তিন. শিশু। ইসলাম পৌঁছার আগে মৃত্যুবরণকারী বলবে—প্রভু, আমার কাছে কোনো কিতাব অথবা রাসুল আসেননি...! পাগল বলবে—হে আল্লাহ, আমাকে আপনি ভালোমন্দের মাঝে পার্থক্য করার বিবেক দেননি। শিশু বলবে—হে আল্লাহ, আমি পরিণত বয়সে পৌঁছতে পারিনি। তখন তাদের সামনে জাহান্নাম উপস্থিত করা হবে। তাদের বলা হবে, এখানে প্রবেশ করো। যে ব্যক্তি আল্লাহর জ্ঞানে সৌভাগ্যবান ছিল, সে তাতে প্রবেশ করবে। আর যে আল্লাহর জ্ঞানে দুর্ভাগা ছিল, সে তাতে প্রবেশ করবে না। তখন আল্লাহ বলবেন, তোমরা আমারই অবাধ্য হলে। আমার রাসুলদের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করতে তা তো বোঝাই যাচ্ছে।’১২৪৮
এখানে ‘শিশু’ বলতে মুমিন ও কাফের সকলের শিশু অন্তর্ভুক্ত। কারণ, বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ব্যতীত কোনো শিশুই আসলে মুকাল্লাফ (শরয়ি দায়িত্বপ্রাপ্ত) তথা কাফের বা মুমিন নয়। আবুল ইউসর বাযদাবি উক্ত পদ্ধতির বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, পরকাল পরীক্ষার জায়গা নয়। ফলে তাদের পরীক্ষা করা হবে না।১২৪৯ তার আপত্তির জবাবে বলা যায়, এটা আক্ষরিক অর্থে দুনিয়ার পরীক্ষা নয়, বরং আল্লাহ তো জানেনই তারা দুনিয়ায় বেঁচে থাকলে কী করত। সে জানা অনুযায়ী তাদের তিনি জান্নাত-জাহান্নাম দান করতে পারেন। কিন্তু তাতে তারা আপত্তি করবে। ফলে তাদের আপত্তি নিরসনে তাদের সামনে প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট করার জন্য এ পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে। তাই পরকাল পরীক্ষার জায়গা নয়—স্রেফ এ যুক্তিতে রাসুলুল্লাহর (ﷺ) হাদিসকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত হবে না。
এই একাধিক ও বিপরীতমুখী বর্ণনার কারণেই সম্ভবত এ ব্যাপারেও ইমাম আজমের সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই। ইমাম রহ. নিজস্ব সনদে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে মুশরিকদের (নাবালেগ মৃত) সন্তানের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘তারা (বেঁচে থাকলে) কী আমল করত সেটা আল্লাহ খুব ভালো জানেন। ’১২৫০ নাসাফি বলেন, আবু হানিফা রহ. বলেছেন, ‘আমি জানি না তারা জান্নাতে নাকি জাহান্নামে যাবে।’১২৫১
টিকাঃ
১২৪৪. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২৩৯)।
১২৪৫. মুসনাদে তয়ালেসি (আনাস ইবনে মালেক: ২২২৫)। মুসনাদে বাযযার (মুসনাদে আনাস ইবনে মালেক : ৭৪৬৬)। আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (সামুরাহ ইবনে জুনদুব: ৭/২৪৪; হাদিস নং: ৬৯৯৩)।
১২৪৬. বুখারি (কিতাবুল জানায়েয: ১৩৮৪)। মুসলিম (কিতাবুল কদর: ২৬৫৯)।
১২৪৭. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আয়েশা: ২৫১৮৪)।
১২৪৮. মুসনাদে আবিল জাদ (২০০৮)। শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালাকায়ি (১০৭৬)।
১২৪৯. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২৩৯)।
১২৫০. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৪)।
১২৫১. বাহরুল কালাম (১৭১)।