📄 মুনকার-নাকিরের প্রশ্ন
কবরের শাস্তির মতো মুনকার নাকিরের প্রশ্নও সত্য। আহলে সুন্নাতের সকল ইমামের এটা সর্বসম্মত আকিদা। কেবল মুতাযিলা ও রাফেযিদের একটি অংশ এটাকে অস্বীকার করে। ১২০৫ ইমাম আজম বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, কবরে মুনকার-নাকিরের প্রশ্নও সত্য। কারণ, এ সম্পর্কে একাধিক হাদিস এসেছে।১২০৬ ইমাম আরও বলেন, ‘কবরে মুনকার-নাকিরের প্রশ্ন সত্য।’১২০৭
সাহল ইবনে মুযাহিম (২১১ হি.) বলেন, এক ব্যক্তি ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর কাছে এসে বলল, আমি ঈমান নিয়ে সন্দেহে আছি। ইমাম তাকে বললেন, ‘যখন কবরে যাবে, মুনকার ও নাকির তোমাকে এসে প্রশ্ন করবে—তোমার দ্বীন কী? তখনও সন্দেহ করবে?’ লোকটি তখন অত্যন্ত কাঁদল।১২০৮
ইমাম তহাবি রহ. বলেন, “আমরা আল্লাহর রাসুল এবং সাহাবায়ে কেরাম থেকে একাধিক হাদিসে বর্ণিত কবরে মুনকার-নাকিরের ‘তোমার রব কে’, ‘তোমার দ্বীন কী’ এবং ‘তোমার নবি কে’ উক্ত তিনটি প্রশ্নে ঈমান রাখি।”১২০৯
ইমাম আজম রহ. নিজস্ব সনদে বারা ইবনে আযেব রাযি. সূত্রে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিস বর্ণনা করেন: ‘মুমিনকে যখন কবরে রাখা হয়, ফেরেশতা এসে তাকে উঠিয়ে বসান এবং জিজ্ঞাসা করেন, তোমার রব কে? সে বলে, আল্লাহ। তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার নবি কে? সে জবাবে বলে, মুহাম্মাদ। তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার দ্বীন কী? সে বলে, ইসলাম। তখন তার কবরকে প্রশস্ত করে দেওয়া হয় এবং সে জান্নাতে তার অবস্থানস্থল দেখতে পায়। আর যখন কোনো কাফেরকে রাখা হয়, ফেরেশতা এসে তাকে উঠিয়ে বসান এবং প্রশ্ন করেন, তোমার রব কে? সে বলে, হায়! জানি না। যেন কিছু হারিয়ে ফেলেছে এমন। তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার নবি কে? সে বলে, জানি না। তাকে জিজ্ঞাসা করেন তোমার দ্বীন কী? সে এবারও আফসোস করে বলে, হায়! আমি জানি না। তখন তার কবরকে সংকীর্ণ করে দেওয়া হয় এবং সে জাহান্নামে তার আবাস দেখতে পায়। অতঃপর তাকে প্রচণ্ড এক আঘাত করা হয় যার চিৎকার জিন ও মানুষ ছাড়া সবাই শুনতে পায়। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তেলাওয়াত করেন, ۞ يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۖ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّالِمِينَ ۚ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ ۞ অর্থ : ‘আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের মজবুত বাক্য দ্বারা শক্তিশালী করে, পার্থিব জীবনে এবং পরকালে। আল্লাহ জালেমদের পথভ্রষ্ট করেন। আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করেন।’ [ইবরাহিম: ২৭]১২১০
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেন, ‘আমার কাছে ওহি পাঠানো হয়েছে যে, তোমাদের কবরে পরীক্ষা করা হবে।’১২১১ এখানে পরীক্ষা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে কবরে মুনকার ও নাকির নামক দুই ফেরেশতা কর্তৃক তিনটি প্রশ্ন: ‘তোমার রব কে?’ ‘তোমার দ্বীন কী?’ ‘তোমার রাসুল কে’ অথবা ‘ইনি কে?’
বারা ইবনে আযেব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে এক আনসারের জানাযার জন্য বের হলাম। ...রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ‘তোমরা কবরের শাস্তি থেকে পানাহ চাও।’ কথাটি তিনি দুইবার অথবা তিনবার বললেন। অতঃপর বললেন, ‘যখন মানুষ দাফন কাজ শেষ করে ফিরে যায়, মৃত ব্যক্তি তাদের জুতোর ঠকঠক আওয়াজ শুনতে পায়। তখন দুজন ফেরেশতা তার কবরে আসেন। তাকে উঠিয়ে বসান। অতঃপর প্রশ্ন করেন, তোমার রব কে? সে বলে, আমার রব আল্লাহ! তারা বলেন, তোমার দ্বীন কী? সে বলে, আমার দ্বীন ইসলাম। তারা জিজ্ঞাসা করেন, যাকে তোমাদের কাছে রাসুল হিসেবে পাঠানো হয়েছিল তিনি কে? সে বলে, তিনি আল্লাহর রাসুল (ﷺ)। তখন তারা বলে, তুমি কীভাবে জানলে? সে বলে, আমি আল্লাহর কুরআন পড়েছি, তাতে ঈমান এনেছি। সত্যায়ন করেছি। ...কাফেরের কবরেও দুজন ফেরেশতা আসেন। তাকে উঠিয়ে বসান। অতঃপর প্রশ্ন করেন, তোমার রব কে? সে বলে, হায়! আমি জানি না। তারা বলেন, তোমার দ্বীন কী? সে বলে, হায়! আমি জানি না। তারা বলেন, যাকে তোমাদের মাঝে রাসুল হিসেবে পাঠানো হয়েছিল তিনি কে? সে বলে, হায়! আমি জানি না।’১২১২
আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যখন মানুষকে কবর দেওয়া হয়, তখন নীল চক্ষুবিশিষ্ট দুজন কৃষ্ণবর্ণের ফেরেশতা কবরে আগমন করেন। তাদের একজনকে বলা হয় মুনকার অন্যজনকে বলা হয় নাকির। তারা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, মুহাম্মাদ কে যাকে তোমাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল? তখন সে দুনিয়ায় যা বলত সেটাই বলে। যদি মুমিন হয় তবে বলে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আর মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। তখন ফেরেশতাদ্বয় তাকে বলেন, আমরা জানতাম তুমি এটাই বলবে। অতঃপর তার কবর সত্তর হাত দীর্ঘ এবং সত্তর হাত প্রশস্ত করে দেওয়া হয়। কবরে আলো দান করা হয়। তাকে বলা হয়, নতুন বরের মতো ঘুমাও যাকে তার সবচেয়ে প্রিয়জনই সজাগ করে। ঘুমাও সেদিন পর্যন্ত যেদিন আল্লাহ তোমাকে পুনরুত্থিত করবেন। আর যদি মুনাফিক হয় তবে বলে, হায়! আমি জানি না। মানুষকে বলতে শুনতাম, আমিও বলতাম। তখন ফেরেশতাদ্বয় বলেন, আমরা জানতাম তুমি এটাই বলবে। তখন মাটিকে বলা হয়, তাকে চাপ দাও। মাটি তাকে এমনভাবে চাপ দেয় যে, তার পাঁজরের হাড়গুলো একটি অপরটির সাথে মিশে যায়। এভাবে তাকে কিয়ামত পর্যন্ত শাস্তি দেওয়া হবে।১২১৩
তবে কিছু কিছু হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, একদল মানুষকে আল্লাহ তায়ালা তাদের কর্ম এবং নিজ অনুগ্রহের ফলে কবরের প্রশ্নের মতো জটিল পরীক্ষা থেকে রক্ষা করবেন। তারা হলেন :
* নবি-রাসুলগণ। তাদের কবরে কোনো প্রশ্ন করা হবে না। কারণ, তাঁরাই মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তাঁরাই পৃথিবীতে ইসলাম নিয়ে এসেছেন, প্রচার করেছেন, ইসলামের জন্য সবকিছু কুরবানি করেছেন। কবরে উম্মতকে তাদের ব্যাপারেই প্রশ্ন করা হবে। তাহলে তাদের প্রশ্ন করার কোনো তাৎপর্য থাকে না।১২১৪
* আল্লাহর পথে শহিদগণ। আল্লাহ তায়ালা কবরে তাদের প্রশ্ন করবেন না। কারণ, কবরে প্রশ্ন মূলত মুমিন ও কাফের/মুনাফিকের মাঝে পার্থক্য করার জন্য করা হয়। শহিদ যেখানে ঈমানের পক্ষে কুফরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জীবন দিয়ে কবরে এসেছে, তার ঈমানের পরীক্ষা নেওয়া নিষ্প্রয়োজন। এটা বিভিন্ন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো—হে আল্লাহর রাসুল, সকল মানুষকে কবরে প্রশ্ন করা হবে, কিন্তু শহিদকে প্রশ্ন করা হবে না। কারণ কী? রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘তার মাথায় তরবারির আঘাত তাকে কবরের ফেতনা (প্রশ্ন) থেকে রক্ষা করবে’।১২১৫
* আল্লাহর পথে পাহারাদারগণ কবরের প্রশ্ন থেকে রক্ষা পাবেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তার আমল শেষ হয়ে যায়। আল্লাহর পথে পাহারারত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি ব্যতিক্রম। কেননা, কিয়ামত পর্যন্ত তার আমল বৃদ্ধি পেতে থাকে। সে কবরের ফেতনা (প্রশ্ন) থেকে নিরাপদ থাকে।’১২১৬ আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “আল্লাহর রাস্তায় এক রাত পাহারা দেওয়া এক মাস দিনে রোযা এবং রাত জেগে ইবাদতের চেয়ে উত্তম। যদি সে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তবে মৃত্যুর পরও তার এই আমল অব্যাহত থাকবে। তাকে রিযিক প্রদান করা হবে। কবরের ‘ফাত্তান’ (তথা প্রশ্নকারী ফেরেশতা) থেকে নিরাপদে থাকবে।”১২১৭
* জুমার দিন অথবা রাতে মৃত্যুবরণ করা। আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেছেন, ‘যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তি জুমার দিন অথবা রাতে মারা যায়, আল্লাহ তাকে কবরের ফেতনা (প্রশ্ন) থেকে রক্ষা করেন।১২১৮
টিকাঃ
১২০৫. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৬৯)।
১২০৬. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৫৩-৫৪)।
১২০৭. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।
১২০৮. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১০৯)।
১২০৯. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৫)।
১২১০. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৪-৫৫)। এ ধরনের হাদিস আরও দেখুন: মুসনাদে আবি হানিফা, হারেসির বর্ণনা (হাদিস নং ৫৮২, ৫৮৩, ৫৮৪)। ইমাম আবু ইউসুফও এটা বর্ণনা করেছেন। দেখুন: আল-আসার (হাদিস নং ৯১২)।
১২১১. বুখারি (কিতাবুল ইলম : ৮৬)।
১২১২. দেখুন: আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৭৫৩)। মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুল ঈমান: ১০৮)। মুসনাদে আহমদ (আওয়ালু মুসনাদিল কুফিয়্যিন: ১৮৮৩২)। মুসান্নাফে আবদির রাযযাক (কিতাবুল জানায়েয: ৬৭৩৭)। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (কিতাবুল জানায়েয: ১২১৮৫)।
১২১৩. তিরমিযি (আবওয়াবুল জানায়েয : ১০৭১)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল জানায়েয : ৩১১৭)
১২১৪. দেখুন: তালখিসুল আদিল্লাহ (৫৬৯)।
১২১৫. সুনানে নাসায়ি (কিতাবুল জানায়েয: ১/২০NT২)।
১২১৬. তিরমিযি (আবওয়াবু ফাযায়িলিল জিহাদ: ১৬২১)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল জিহাদ: ২৭৬৭)।
১২১৭. সহিহ মুসলিম (কিতাবুল ইমারাহ: ১৯১৩)। তিরমিযি (আবওয়াবু ফাযায়িলিল জিহাদ: ১৬৬৫)।
১২১৮. তিরমিযি (আবওয়াবুল জানায়েয: ১০৭৪)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস: ৬৬৯৩)।
📄 পুনরুত্থান ও হাশর
কবরের প্রশ্ন, চাপ, শাস্তি—এ সবকিছুই কেবল সূচনা, গন্তব্য নয়। এটা পথের শুরু, শেষ নয়। মানুষ কিছুদিন এখানে অবস্থান করবে। প্রস্তুতি নেবে চূড়ান্ত গন্তব্যের জন্য, হিসাবের জন্য, জান্নাত ও জাহান্নামের জন্য। ফলে তার কর্মের ভিত্তিতে কবরে শান্তি বা শাস্তি যা দেওয়া হবে সেগুলো নিতান্তই সামান্য ও সাময়িক। চূড়ান্ত ও স্থায়ী শান্তি বা শান্তির তুলনায় সেগুলো কিছুই নয়।
জগতের সকল মুসলিম এ ব্যাপারে একমত যে, কবরের জগৎ শেষ নয়। এটা পরকালীন জীবনের প্রথম মঞ্জিল মাত্র। কবরের জীবনে গোটা সৃষ্টির শরীরগুলো পচেগলে যাওয়ার পরে আল্লাহ তায়ালা সেগুলো আবার পুনরুত্থিত করবেন। সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত ও নিঃশেষিত হয়ে যাওয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো নতুন করে সংযুক্ত করবেন এবং তাতে রুহ ফুঁকে দেবেন। এটাকে বলা হয় ‘নাশর।’ অতঃপর সকল সৃষ্টিকে একটা স্থানে সমবেত করবেন। এটাকে বলা হয় ‘হাশর।’ সেখানে আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের ভালোমন্দ কর্মের হিসাব নেবেন এবং বিনিময় দেবেন।
মানুষ ও জিন এবং তাদের সঙ্গে সকল পশুপাখি ও প্রাণীকুলও সেখানে একত্র হবে। আল্লাহ বলেন, ۞ قُلْ إِنَّ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ ۞ ۞ لَمَجْمُوعُونَ إِلَىٰ مِيقَاتِ يَوْمٍ مَعْلُومٍ ۞ অর্থ : ‘আপনি বলুন, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মানুষজন। সকলকে একত্র করা হবে এক নির্ধারিত দিনের নির্দিষ্ট সময়ে।’ [ওয়াকিয়াহ : ৪৯-৫০] হাশরের ময়দান থেকে কেউ বাদ যাবে না। কারও লুকিয়ে থাকার সুযোগ নেই কোথাও। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ إِنْ كُلُّ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا ۞ ۞ لَقَدْ أَحْصَاهُمْ وَعَدَّهُمْ عَدًّا ۞ ۞ وَكُلُّهُمْ آتِيهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَرْدًا ۞ অর্থ : ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকট বান্দারূপে উপস্থিত না হয়ে পারবে। নিশ্চয়ই তিনি সকলকে বেষ্টন করে রেখেছেন এবং তাদের ভালোভাবে গুনে রেখেছেন। কিয়ামত দিবসে এদের সকলেই তাঁর নিকট আসবে একাকী অবস্থায়।’ [মারইয়াম: ৯৩-৯৪]
পশুপাখিকে একত্র করার বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ۞ وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلَّا أُمَمٌ أَمْثَالُكُمْ ۚ مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ ۚ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّهِمْ يُحْشَرُونَ ۞ অর্থ : ‘ভূগর্ভে বিচরণশীল জীব এবং নিজ ডানার সাহায্যে উড়ন্ত পাখি—তারা সকলে তোমাদের মতোই একেকটি জাতি। কিতাবে কোনোকিছুই আমি বাদ দিইনি; এরপর স্বীয় প্রতিপালকের দিকে তাদের একত্র করা হবে।’ [আনআম : ৩৮] হিংস্র শ্বাপদও বাদ যাবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَإِذَا الْوُحُوشُ حُشِرَتْ ۞ অর্থ : ‘যখন বন্য পশুসমূহ একত্র করা হবে।’ [তাকভির : ৫]
তাদের মাঝের দেনা-পাওনা সমান সমান করার পর তাদের মাটিতে পরিণত করা হবে। বিপরীতে মানুষ ও জিনকে জান্নাত অথবা জাহান্নামের অনন্ত জীবনের দিকে পাঠানো হবে। আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন সবার অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া হবে। শিংবিহীন ছাগলকে শিংবিশিষ্ট ছাগল থেকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’১২১৯ আরেকটি বর্ণনায় আবু হুরায়রা রাযি. বলেন, ‘কিয়ামতের দিন গোটা সৃষ্টিকে একত্র করা হবে। সকল প্রাণী, চতুষ্পদ জন্তু, পশুপাখি—সবকিছু। আল্লাহ তায়ালা সবার প্রতি ইনসাফ করবেন। শিংবিহীন ছাগল শিংবিশিষ্ট ছাগল থেকে নিজ পাওনা বুঝে নেবে। অতঃপর আল্লাহ সবাইকে মাটি হয়ে যাওয়ার আদেশ দেবেন। কাফেররা আফসোস করে বলতে থাকবে, ‘হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম।’১২২০
ইমাম আজম বলেন, ‘আমরা মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানে বিশ্বাস করি। আল্লাহ তায়ালা সকল মৃত প্রাণীকে একদিন একত্র করবেন। সে দিনটি হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। ... আল্লাহ বলেন, ۞ وَأَنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ لَا رَيْبَ فِيهَا وَأَنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ مَنْ فِي الْقُبُورِ ۞ অর্থ : ‘কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী; এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর নিশ্চয়ই কবরে যারা আছে আল্লাহ তাদের পুনরুত্থিত করবেন।’ [হজ: ৭] ১২২১ ইমাম তহাবি রহ. বলেন, ‘আমরা কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান এবং আমলের প্রতিদান পাওয়ার বিশ্বাস রাখি। বিশ্বাস রাখি আমলনামা উপস্থাপন, হিসাব-নিকাশ, আমলনামা পাঠ, সওয়াব, শাস্তি, পুলসিরাত ও মিযানের ব্যাপারে। ’১২২২
টিকাঃ
১২১৯. মুসলিম (কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাহ: ২৫৮২)। তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ : ২৪২০)।
১২২০. মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুত তাফসির : ৩২৫০)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু উসমান ইবনে আফফান : ৫২৭)।
১২২১. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৫৮)।
১২২২. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৬)।
📄 পুনরুত্থান পুনর্জন্ম নয়
কেউ কেউ ইসলামের পরকালবিষয়ক আকিদাকে পৌত্তলিক ধর্মের ‘পুনর্জন্ম’ বিশ্বাসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। তাদের যুক্তি, পুনর্জন্মবাদের বক্তব্য হলো—মানুষের আত্মা এক দেহ থেকে আরেক দেহে স্থানান্তরিত হওয়া। ইসলামও তা-ই বলছে—মৃত্যুর পরে মানুষের দেহ পচে যাবে। আল্লাহ নতুন দেহে প্রাণ সঞ্চার করে মানুষকে পুনরুত্থিত করবেন। এভাবে ইসলামের পুনরুত্থান আকিদা জন্মান্তরবাদের বিশ্বাসের মতোই।
এটা ভিত্তিহীন কথা। ইসলামি আকিদায় এর কোনো অস্তিত্ব নেই, স্থান নেই। কয়েকভাবে এ সংশয়ের জবাব দেওয়া যায়। এক. জন্মান্তরবাদের আকিদামতে, মানুষের দেহ আরেকটি সম্পূর্ণ নতুন দেহে স্থানান্তরিত হয়। বিপরীতে ইসলামের আকিদা হলো, মানুষের বর্তমান শরীরের কিছু মৌলিক অংশ দিয়েই আল্লাহ তায়ালা মানুষের শরীর পুনর্গঠন বা পুনর্বার সৃষ্টি করবেন। আর আল্লাহ তায়ালা সর্বশক্তিমান। ফলে এটা তার জন্য কঠিন নয়। সুতরাং পুনরুত্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন দেহে হবে না; পুনর্গঠিত দেহে হবে। দুই. পুনর্জন্মে বিশ্বাসীরা এক দেহ থেকে আরেক দেহে স্থানান্তরের বিষয়টি পৃথিবীতে মনে করে; অন্য কোনো জীবন বা অন্য কোনো জগতে নয়। বিপরীতে ইসলামের পুনরুত্থানের আকিদা পরকালের সঙ্গে নির্ধারিত; ইহকালে প্রযোজ্য নয়। সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবন ও জগৎ। তিন. পুনর্জন্মে বিশ্বাসীরা পরকাল, হিসাব-নিকাশ, জান্নাত ও জাহান্নাম—সবকিছু অস্বীকার করে। ইসলামের দৃষ্টিতে তারা কাফের। ফলে তাদের আকিদার সঙ্গে ইসলামের আকিদা মিলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।১২২৩
টিকাঃ
১২২৩. দেখুন : আল মাওয়াকিফ, ইজি (৩৭২-৩৭৩)। শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (১২)।
📄 হিসাব-নিকাশ
হাশরের দিন প্রত্যেককে হিসাব দিতে হবে। দুনিয়াতে যা করেছে সেটার জন্য সবাইকে জবাবদিহি করতে হবে। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা এ দিনকে ‘হিসাব দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সকল নবি-রাসুল এ দিন এবং এ দিনের হিসাব সম্পর্কে নিজ নিজ জাতিকে সজাগ ও সতর্ক করেছেন। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম দোয়া করেছেন, ۞ رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ ۞ অর্থ : ‘হে আমাদের পালনকর্তা, আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে ক্ষমা করুন যেদিন হিসাব কায়েম হবে।’ [ইবরাহিম : ৪১] আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন আয়াতে নিজেকে হিসাব গ্রহণকারী আখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ۖ وَإِنْ كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا ۗ وَكَفَىٰ بِنَا حَاسِبِينَ ۞ অর্থ : ‘কিয়ামত দিবসে আমি স্থাপন করব ন্যায়বিচারের মানদণ্ড। সুতরাং কারও প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না এবং কর্ম যদি তিল পরিমাণ ওজনেরও হয়, তবু তা আমি উপস্থিত করব; হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট।’ [আম্বিয়া : ৪৭] অন্যত্র নিজের নামে শপথ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ فَوَرَبِّكَ لَنَسْأَلَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ۞ ۞ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ ۞ অর্থ : ‘আপনার প্রভুর শপথ! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে জিজ্ঞাসা করব, যা তারা করত সে ব্যাপারে।’ [হিজর : ৯২-৯৩]
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগ পর্যন্ত আল্লাহর কাছ থেকে মানুষ এক কদম নড়তে পারবে না। এক. জীবন কোথায় ব্যয় করেছে? দুই. যৌবন কোথায় শেষ করেছে? তিন. সম্পদ কীভাবে উপার্জন করেছে? চার. সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছে? পাঁচ. জানা অনুযায়ী কতটুক আমল করেছে?’১২২৪
ইমাম আজম আবু হানিফা বলেন, ‘আমরা মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানে বিশ্বাস করি। আল্লাহ তায়ালা সকল মৃত প্রাণীকে একদিন একত্র করবেন। সে দিনটি হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। সেদিন আল্লাহ সব কাজের হিসাব নেবেন, প্রতিদান দেবেন, সবার প্রাপ্য পূর্ণ করবেন।’১২২৫ ইমাম তহাবি রহ. বলেন, ‘আমরা কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান এবং আমলের প্রতিদান পাওয়ার বিশ্বাস রাখি।’১২২৬
তবে সবার জন্য হিসাব সমান নয়। যারা পুণ্যবান, আল্লাহ তাদের হিসাব সহজ করবেন। তাদের সামনে কেবল আমলনামা পেশ করে ছেড়ে দেবেন। কিছু জিজ্ঞাসা করবেন না। বিপরীতে কাউকে আল্লাহ প্রত্যেক কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন। কাউকে শাসাবেন, ভর্ৎসনা করবেন। আরেক দলকে আল্লাহ অনুগ্রহ করে বিনা হিসাবে জান্নাত দান করবেন। তাদের কাছে কোনো হিসাবই চাইবেন না। ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের সত্তর হাজার মানুষ বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা সেসব মানুষ যারা অন্যের কাছে ঝাড়ফুঁক প্রার্থনা করে না, শুভাশুভ (ইত্যাদি ভিত্তিহীন) বিশ্বাস রাখে না; বরং তাদের প্রভুর উপর ভরসা করে।’১২২৭ আবু উমামা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘আমার প্রতিপালক আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—তিনি আমার উম্মতের সত্তর হাজার মানুষকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তাদের কোনো হিসাব নেবেন না। কোনো শাস্তি দেবেন না। প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে থাকবে সত্তর হাজার। আরও (অতিরিক্ত) থাকবে তাঁর তিন অঞ্জলি পরিমাণ। ’১২২৮
কিয়ামতের দিন সকল সৃষ্টির মাঝে ফয়সালা করে দেওয়া হবে। মানুষ ও জিন ব্যতীত বাকি সৃষ্টির মাঝে ‘কিসাস’ কায়েম করা হবে। অর্থাৎ, প্রত্যেকে প্রত্যেকের হিসাব নগদ বুঝে নেবে। কোনো পশু বা পাখি যদি অপর পশুপাখির উপর জুলুম করে থাকে, তবে সেটার মাঝে ফয়সালা (কিসাস) করে দেওয়া হবে। অতঃপর তাদের মাটি বানিয়ে দেওয়া হবে। বিপরীতে মানুষের মাঝে হিসাব কায়েম করা হবে। তাদের প্রত্যেককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা হবে। জীবনের সকল কৃতকর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। প্রত্যেকের হাতে নিজ নিজ আমলনামা দেওয়া হবে। তারা সেটা নিজেরা পড়ে দেখবে। আল্লাহ তায়ালা নিজে তাদের কাছে তাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। অতঃপর সে অনুযায়ী কারও জন্য জাহান্নামের ফয়সালা করবেন। কাউকে নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেবেন।
আমলনামা উপস্থাপন ও পাঠের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ۞ فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ ۞ ۞ فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا ۞ ۞ وَيَنْقَلِبُ إِلَىٰ أَهْلِهِ مَسْرُورًا ۞ ۞ وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ وَرَاءَ ظَهْرِهِ ۞ ۞ فَسَوْفَ يَدْعُو ثُبُورًا ۞ অর্থ: ‘যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেওয়া হবে এবং সে তার স্বজনদের নিকট প্রফুল্লচিত্তে ফিরে যাবে। কিন্তু যাকে তার আমলনামা পিঠের পশ্চাদ্দিক থেকে দেওয়া হবে, সে মৃত্যুকে ডাকবে।’ [ইনশিকাক: ৭-১১] অন্যত্র বলেন, ۞ فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهْ ۞ ۞ إِنِّي ظَنَنْتُ أَنِّي مُلَاقٍ حِسَابِيَهْ ۞ ۞ فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَاضِيَةٍ ۞ ۞ فِي جَنَّةٍ عَالِيَةٍ ۞ ۞ قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ ۞ ۞ كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا أَسْلَمْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَةِ ۞ ۞ وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِشِمَالِهِ فَيَقُولُ يَا لَيْتَنِي لَمْ أُوتَ كِتَابِيَهْ ۞ ۞ وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ ۞ ۞ يَا لَيْتَهَا كَانَتِ الْقَاضِيَةَ ۞ দেওয়া হবে, সে বলবে: নাও, তোমরাও আমলনামা পড়ে দেখো। আমি জানতাম যে, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং সে যাপন করবে সন্তোষজনক জীবন, সুউচ্চ জান্নাতে, যার ফলরাশি অবনমিত থাকবে। তাদের বলা হবে, পানাহার করো তৃপ্তির সঙ্গে, তোমরা অতীত দিনে যা করেছিলে তার বিনিময়ে। আর যার আমলনামা দেওয়া হবে তার বাম হাতে, সে বলবে, আহা! আমাকে যদি আমলনামা দেওয়াই না হতো! আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব! আহা! মৃত্যুতেই যদি আমার সব শেষ হয়ে যেত!’ [হাক্কাহ: ১৯-২৭]
ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন, ‘কিয়ামতের দিন বাদী-বিবাদীর মাঝে নেক আমলের মাধ্যমে কিসাস (ইনসাফপূর্ণ ফয়সালা) সত্য। যদি অভিযুক্তের কাছে নেক আমল না থাকে, তবে তার উপর গুনাহ চাপিয়ে দেওয়াও সত্য ও সঠিক। ১২২৯
এ কথার দলিল রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর একাধিক হাদিস। আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যদি তার ভাইয়ের ইজ্জত-সম্মান কিংবা যেকোনো কিছুতে জুলুম করে থাকে, তবে সেটা যেন আজই মিটমাট করে নেয়, সেদিন আসার আগে যেদিন কোনো দিনার-দিরহাম থাকবে না (থাকবে কেবল আমল)। সুতরাং তার ভালো আমলগুলো অন্যকে দিয়ে দিতে হবে। আর যদি ভালো আমল না থাকে, তবে অন্যের মন্দ আমলগুলো তার উপর দিয়ে দেওয়া হবে।’১২৩০ ইমাম আজম রহ. ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বিরত থাকো। কারণ, জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে আসবে।’১২৩১
প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা জানো কি আমার উম্মতের মাঝে নিঃস্ব (মুফলিস) কে?’ সাহাবাগণ বললেন, নিঃস্ব হলো যার দিনার-দিরহাম ও মালামাল কিছুই নেই। রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘আমার উম্মতের নিঃস্ব ব্যক্তি হলো যে কিয়ামতের দিন নামায, রোযা, যাকাত নিয়ে আসবে; আবার কাউকে গালি দিয়ে, কাউকে অপবাদ দিয়ে, কারও সম্পদ খেয়ে, কারও রক্তপাত করে, কাউকে মেরে আসবে। তখন প্রত্যেককে তার নেক আমল থেকে দিয়ে দিতে হবে। যদি অপরাধের দায় মেটানোর আগে নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তাহলে অভিযোগকারীদের গুনাহ গ্রহণ করতে হবে। একপর্যায়ে সেগুলো তার মাথায় দিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’১২৩২
প্রশ্ন হতে পারে, যদি কেউ কারও কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকে কিংবা কাউকে জুলুম করে থাকে, অতঃপর সে ব্যক্তি মারা যায় কিংবা অজ্ঞাত থাকে, সেই পাওনা মেটানো বা জুলুমের প্রায়শ্চিত্ত করার কোনো উপায় না থাকে, তাহলে কী করণীয়? উলামায়ে কেরাম লিখেছেন, যেকোনোভাবে হক আদায়ের চেষ্টা করবে। তার আত্মীয়-স্বজন খুঁজে বের করবে। সম্ভব না হলে তার পক্ষ থেকে পাওনা পরিমাণ সদকা করবে। তার জন্য দোয়া করবে। আল্লাহর কাছে তাওবা ও ইস্তিগফার করবে।
টিকাঃ
১২২৪. তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ: ২৪১৬)। মুসনাদে দারেমি (মুকাদ্দিমা : ৫৫৬)।
১২২৫. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৫৮)।
১২২৬. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৬)।
১২২৭. বুখারি (কিতাবুত তিব্ব: ৫৭৫২)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ২২০)।
১২২৮. তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ : ২৪৩৭)।
১২২৯. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।
১২৩০. বুখারি (কিতাবুল মাযালিম: ২৪৪৯)।
১২৩১. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৫)।
১২৩২. মুসলিম (কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাতি ওয়াল আদাব : ২৫৮১)। তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ: ২৪১৮)।