📄 কবরের চাপ সত্য
যদি মৃত ব্যক্তি পুণ্যবান হয়, তবে কবরে তার কোনো শাস্তি হবে না। শুধু একবার চাপ দেওয়া হবে এবং সেটাও তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক হবে না। যদি গুনাহগার হয়, তবে চাপ এবং আল্লাহ চাইলে শাস্তি দুটোই হবে।
বিষয়টি কিছুটা মতভেদপূর্ণ। তবে আমরা যা উল্লেখ করেছি এটাই শুদ্ধতর বক্তব্য। অর্থাৎ, কবরের শাস্তি সবার জন্য না হলেও চাপ সবার জন্য প্রযোজ্য। মুমিন-কাফের, পুণ্যবান-গুনাহগার কেউ এ চাপ থেকে রক্ষা পাবে না। এটা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহর রাসুল (ﷺ) সাদ বিন মুআজ রাযি.-এর শাহাদাতের পরে তাঁর ব্যাপারে বলেন, ‘কবরে চাপ দেওয়া হয়। যদি কেউ এটা থেকে নিষ্কৃতি পেত, তবে সে হতো সাদ বিন মুআজ।’১১৮০ অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি বলেন, ‘যদি কেউ কবরের চাপ থেকে রক্ষা পেত, তবে সে হতো সাদ বিন মুআজ। কিন্তু তাকেও একটি চাপ দেওয়া হয়েছে, অতঃপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’১১৮১ তৃতীয় আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তার জন্য আরশ কেঁপে উঠেছে। আকাশের দরজা খুলে গিয়েছে। সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জানাযায় উপস্থিত হয়েছে। তবুও কবরে তাকে একটা চাপ দিয়ে এরপর ছাড়া হয়েছে।’১১৮২ অন্য একটি হাদিস দেখলে বোঝা যায়, শিশুরাও এটা থেকে অব্যাহতি পাবে না। আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যদি কেউ কবরের আযাব থেকে নিষ্কৃতি পেত, তবে এই বাচ্চা পেত।’১১৮৩
তবে আবু হুরায়রা রাযি.-এর একটি হাদিস দ্বারা বিপরীত বোঝা যায়। সেখানে মুনকার-নাকির কর্তৃক তিন প্রশ্নের পরে দেখা যায় মুমিনের কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হয়, তাকে ঘুমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। চাপের কোনো কথা নেই। বিপরীতে কাফের ও মুনাফিক প্রশ্নের জবাব দিতে না পারায় তাদের কবরকে চাপ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কবর তাদের এমনভাবে চাপ দেয় যে, তাদের পাঁজরের হাড়গুলো একটি অপরটির মাঝে ঢুকে যায়। ১১৮৪ এ হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, মুমিনকে কবরে চাপ দেওয়া হয় না।
উলামায়ে কেরাম দুই ধরনের হাদিসের সমন্বয় সাধনের জন্য বলেন, উক্ত হাদিসে চাপের কথা উল্লেখ নেই বলে চাপ দেওয়া হবে না এমন নয়। কারণ, অন্যান্য হাদিসে সবার জন্য চাপ প্রমাণিত। সুতরাং উক্ত হাদিসকে সংক্ষিপ্ত ধরতে হবে। দ্বিতীয়ত, চাপ সবার জন্য সমান হলেও এর ফলাফল সবার জন্য সমান হবে না। এটা আল্লাহর ইনসাফের জন্য শোভনীয়ও নয়। ফলে এটা কাফের ও গুনাহগারদের জন্য প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক হবে। বিপরীতে মুমিন ও মুত্তাকিদের জন্য সহনীয় পর্যায়ের হবে। সবাইকে চাপ দেওয়ার রহস্য সম্পর্কে হাকিম তিরমিযি বলেন, ‘পৃথিবীর সকলেই কোনো-না-কোনো পাপ করে থাকে। ফলে কবরে রাখামাত্রই তাকে সেটার একটা বিনিময় দেওয়া হবে। এরপর রহমত শুরু হবে।’১১৮৫ যেহেতু মুমিনের চাপ তার জন্য যন্ত্রণার হবে না, এ জন্য হতে পারে কোনো কোনো বর্ণনায় এটাকে উল্লেখ করা হয়নি।
টিকাঃ
১১৮০. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদে আয়েশা: ২৪৯২১)। সহিহ ইবনে হিব্বান (কিতাবুল জানায়েয: ৩১১২)।
১১৮১. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস : ১০/৩৩৪; হাদিস নং ১০৮২৭)। আল-মুজামুল আওসাত (মুহাম্মাদ ইবনে জাফর: ৬/৩৪৯; হাদিস নং ৬৫৯৩)।
১১৮২. সুনানে কুবরা, নাসায়ি (কিতাবুল জানায়েয: ২১৯৩)। আল-মুজামুল কাবির (বাবুস সিন: ৫৩৩৩)
১১৮৩. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (খালেদ ইবনে যায়দ: ৪/১২১; হাদিস নং ৩৮৫৮)। আল-আহাদিসুল মুখতারাহ, মাকদেসি (মুসনাদে আনাস ইবনে মালেক) (১৮২৪)।
১১৮৪. তিরমিযি (আবওয়াবুল জানায়েয: ১০৭১)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল জানায়েয : ৩১১৭)।
১১৮৫. হাশিয়াতুস সুয়ুতি আলা সুনানিন নাসায়ি (৪/১০২)।
📄 কবরের শাস্তি সবার জন্য নয়
কবরের চাপ (উপরের ব্যাখ্যাসহ) মুমিন-কাফের-মুনাফিক সবার জন্য প্রযোজ্য হলেও কবরের শাস্তি সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। আল্লাহ অনুগ্রহ করে তাঁর প্রিয় বান্দাদের এ শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন। গুনাহগার মুমিন এবং কাফের-মুনাফিকদের তিনি শাস্তি দেবেন। এটা ইমামের কথায়ও স্পষ্ট।
ইমাম রহ. বলেন, ‘কবরের চাপ ও শাস্তি সত্য। এটা সকল কাফেরের জন্য এবং কিছু গুনাহগার মুমিনের জন্য।’১১৮৬ অর্থাৎ, সকল মুমিনের জন্য নয়। ইমাম তহাবি বলেন, ‘আমরা কবরের আযাবে বিশ্বাস করি এর উপযুক্ত লোকদের জন্য।’১১৮৭ ফলে দেখা যাচ্ছে, কবরের শাস্তি সবাইকে পেতে হবে এমনটা জরুরি নয়। বরং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে অনেককেই রক্ষা করবেন। নবি-রাসুলদের কবরে কোনো শাস্তি হবে না। মুমিনদের নাবালেগ সন্তানেরও কবরে কোনো শাস্তি হবে না। একইভাবে সাধারণ পুণ্যবান মুমিনদেরও আল্লাহ চাইলে নিজ অনুগ্রহে কবরের শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সবসময় কবরের শাস্তি থেকে পানাহ চাইতেন। কিন্তু সেটা নিজের জন্য নয়, বরং আল্লাহর সর্বোচ্চ দাসত্ব প্রকাশ, তাঁর প্রতি পূর্ণ নিবেদন, তাঁর অনুগ্রহের প্রতি ওয়াফাদারি এবং মুমিনদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য। ১১৮৮
হাদিসে বেশ কিছু আমলকে কবরের শাস্তির কারণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। প্রত্যেক মুমিনের এসব কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। যেমন—প্রস্রাবের পর সঠিকভাবে পবিত্র না হওয়া, গিবত ও চোগলখুরি করা। ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘তাদের কবরে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো কবিরা গুনাহের কারণে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। (বরং শাস্তির কারণ হলো) তাদের একজন প্রস্রাব থেকে যথাযথভাবে পবিত্র হতো না। আরেকজন পরনিন্দা ও চোগলখুরি রটিয়ে বেড়াত...।’১১৮৯ কবরে শাস্তির আরেকটি কারণ হলো, ঋণ শোধ না করে মৃত্যুবরণ করা। সাদ ইবনুল আতওয়াল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার ভাই মৃত্যুর সময় তিনশত দিনার এবং কিছু সন্তান রেখে গেল। আমি দিনারগুলো তাদের পিছনে খরচ করতে চাইলাম। আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বললেন, ‘তোমার ভাই ঋণের কাছে আটকে আছে। আগে তার ঋণ পরিশোধ করো। তখন আমি ঋণ পরিশোধ করে রাসুলুল্লাহর কাছে এসে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, ঋণ শোধ করেছি...।’ ১১৯০
টিকাঃ
১১৮৬. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।
১১৮৭. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৫)।
১১৮৮. তালখিসুল আদিল্লাহ (৫৬৯)। বাহরুল কালাম (১৯৩)।
১১৮৯. বুখারি (কিতাবুল ওযু: ২১৮; কিতাবুল জানায়েয: ১৩৬১। মুসলিম (কিতাবুত তাহারাত: ২৯২)।
১১৯০. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুশ শামিয়্যিন: ১৭৫০০)। সুনানে কুবরা, বাইহাকি (কিতাবু আদাবিল কাযি : ২০৫৬২)।
📄 কবরের শাস্তি থেকে রক্ষাকারী আমল
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কবরের শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বেশ কিছু আমল শিখিয়ে গিয়েছেন। ফলে দ্বীন ও ঈমানের উপর অবিচল থাকার পাশাপাশি নিম্নের আমলগুলোর প্রতিও যত্নবান হতে পারলে আশা করা যায় আল্লাহ কবরের আযাব থেকে রক্ষা করবেন। কবরের আযাব থেকে রক্ষাকারী কিছু বিষয় হলো :
* আল্লাহর পথে শাহাদাত বরণ করা: মিকদাম ইবনে মাদিকারিব রাযি. বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে শহিদের ছয়টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। (এক.) তাকে প্রথমেই ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (দুই.) সে কবরে থেকে জান্নাতে তার বাসস্থান দেখতে পায়। (তিন.) কবরের ফেতনা (প্রশ্ন) থেকে নিষ্কৃতি পায়। (চার.) কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে নিরাপদে থাকবে। (পাঁচ) তার মাথায় মুকুট পরিয়ে দেওয়া হবে, যার একটি ইয়াকুত গোটা পৃথিবী ও তার ভিতরে যা-কিছু আছে সবকিছুর চেয়ে উত্তম। (ছয়.) তাকে জান্নাতের বাহাত্তর জন হুরের সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হবে। সত্তর জন নিকটাত্মীয়ের ব্যাপারে তার শাফায়াত কবুল করা হবে।’১১৯১
* পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণ করা: রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণ করবে, কবরে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে না।’১১৯২
* সদকা প্রদান করা: উকবা ইবনে আমের রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সদকা কবরের আগুনকে নিভিয়ে দেয়।’১১৯৩
* নিয়মিত সুরা মুলক পড়া এবং তদনুযায়ী আমল করা: ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুলের এক সাহাবি অসতর্ক অবস্থায় একটি কবরের উপর তাঁবু গাড়লেন। হঠাৎ শুনতে পেলেন, সেখানে এক ব্যক্তি সুরা মুলক তেলাওয়াত করছে। সাহাবি রাসুলের কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি না জেনে একটি কবরের উপর তাঁবু স্থাপন করি। তখন কবরে থাকা ব্যক্তিকে সুরা মুলক তেলাওয়াত করতে শুনি। আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘এটা আপদ প্রতিহতকারী, বিপদ থেকে হেফাজতকারী, কবরের আযাব থেকে সুরক্ষা দানকারী।’ ১১৯৪
* জুমার দিন অথবা জুমার রাতে মৃত্যুবরণ করা: ইমাম আজম রহ. নিজস্ব সূত্রে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন মারা যাবে, তাকে কবরের আযাব থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।’১১৯৫
* জীবিত কর্তৃক মৃতের জন্য দোয়া ও ক্ষমাপ্রার্থনা করা: আউফ ইবনে মালেক আশজায়ি বলেন, আমি একটি জানাযার পরে আল্লাহর রাসুলকে মৃতের জন্য এই দোয়া করতে শুনলাম : ‘হে আল্লাহ, আপনি তাকে ক্ষমা করুন। তাকে দয়া করুন। তার গুনাহ মাফ করে দিন। তাকে নিরাপদে রাখুন। তার আগমনকে মহানুভবতার সঙ্গে গ্রহণ করুন। কবরকে তার জন্য প্রশস্ত করে দিন। তাকে আপনি পানি, বরফ ও শিলা দ্বারা ধৌত করুন। তাকে আপনি সেভাবে পবিত্র করে দিন যেভাবে সাদা কাপড় ময়লা থেকে পবিত্র করা হয়। আপনি তাকে তার দুনিয়ার গৃহের চেয়ে উত্তম গৃহ দান করুন, দুনিয়ার পরিবারের চেয়ে উত্তম পরিবার দান করুন। তার স্ত্রীর চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করুন। আর তাকে কবরের ফেতনা এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।’ আউফ বলেন, রাসুলের দোয়া শুনে আমার মন বলে উঠল, হায়! আমি যদি সেই মৃতের জায়গায় থাকতাম। ১১৯৬
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) প্রত্যেক নামাযে কবরের আযাব থেকে মুক্তি চাইতেন। আল্লাহর রাসুলের স্ত্রী আয়েশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) (নামাযের শেষ তাশাহহুদে বলতেন):
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِতْنَةِ الْمَحْيَا وَفِتْنَةِ الْمَمَاتِ ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْمَأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ
অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনার কাছে মিথ্যুক কানা দাজ্জালের ফেতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি আপনার কাছে জীবন ও মৃত্যুর ফেতনা থেকে শরণ চাইছি। আমি আপনার কাছে গুনাহ ও ঋণের বোঝা থেকে আশ্রয় কামনা করছি।’১১৯৭
টিকাঃ
১১৯১. তিরমিযি (আবওয়াবু ফাযায়িলিল জিহাদ: ১৬৬৩)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল জিহাদ: ২৭৯৯)।
১১৯২. সুনানে কুবরা, নাসায়ি (কিতাবুল জানায়েয: ২১৯০)। মুসনাদে আহমদ (আওয়ালু মুসনাদিল কুফিযিান: ১৮৬০০)।
১১৯৩. আল-মুজামুল কাবির, তাবরানি (আকিল: ১৭/২৮৬; হাদিস নং ৭৮৭)। বর্ণনাটি যয়িফ।
১১৯৪. তিরমিযি (আবওয়াবু ফাযায়িলিল কুরআন: ২৮৯০)। আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস: ১২/১৭৫; হাদিস নং ১২৮০১)। তবে হাদিসটির একজন রাবি ইয়াহইয়া ইবনে আমর ইবনে মালেক দুর্বল। এ কারণে আলেমগণ হাদিসটিকে যয়িফ বলেছেন।
১১৯৫. আল-উসুলুল মুনিফাহ (৫৫)। শরহু মুসনাদি আবি হানিফা (৪২৪)।
১১৯৬. মুসলিম (কিতাবুল জানায়েয : ৯৬৩)। তিরমিযি (আবওয়াবুল জানায়েয : ১০২৫)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল জানায়েয: ১৫০০)।
১১৯৭. বুখারি (কিতাবুল আযান : ৮৩২)। মুসলিম (কিতাবুল মাসাজিদ ওয়া মাওয়াজিউস সালাত : ৫৮৬)।
📄 কাফেরদের কবরের শাস্তি বন্ধ থাকে কি?
আল-ওয়াসিয়্যাহ গ্রন্থের ব্যাখ্যাতা মোল্লা হাসান ইবনে ইস্কান্দার হানাফি ‘বাহরুল কালাম’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেন, ‘যদি কেউ কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তবে কিয়ামত পর্যন্ত তার শাস্তি হতে থাকে। কেবল জুমার দিন ও রমজানে আল্লাহর রাসুলের সম্মানের কারণে শাস্তি দেওয়া হয় না।’১১৯৮ নাসাফি ‘বাহরুল কালাম’-এ কোনো সূত্র ছাড়া এটি বর্ণনা করেছেন। ১১৯৯ আকিদাহ তহাবিয়্যাহর ব্যাখ্যাতা মাহমুদ কওনভিও তাঁর ‘আল-কালাইদ’ গ্রন্থে এটাকে উল্লেখ করেছেন। ১২০০ উক্ত বক্তব্যটি সম্ভবত কাযি জগন হানাফি গুজরাটির ‘খিযানাতুর রিওয়ায়াত’-শীর্ষক ফিকহি সংকলন থেকে অবচয়িত। ১২০১ ‘খিযানাতুর রিওয়ায়াত’-এর দুটি পাণ্ডুলিপি অধমের হস্তগত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে—কেবল উপরের বক্তব্য নয়, পুরো বইয়ের বিভিন্ন জায়গাতে এমন অসংখ্য অদ্ভুত বক্তব্য রয়েছে। খুব সম্ভবত লেখক এসব বিষয় উল্লেখের ক্ষেত্রে তাহকিক ও তামহিসের উপর যথাযথ গুরুত্ব দেননি। যা-ই হোক, লেখক গুজরাটি জুমার দিন ও রমযান মাসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সম্মানের কারণে কাফেরদের শাস্তি স্থগিত রাখার বিষয়টি ‘আল-আকিদাতুল মুঈনিয়্যাহ আন নাসাফিয়্যাহ’র উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন। অন্য কোনো হাদিস বা যৌক্তিক দলিল বর্ণনা করেননি। কিন্তু আমরা কুরআন-সুন্নাহ কিংবা নাসাফি রহ.-এর আকিদাগ্রন্থ কোথাও এ ধরনের বক্তব্য খুঁজে পাইনি। হতে পারে লেখক সহিহাইনের প্রসিদ্ধ হাদিসটিকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যেখানে আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেছেন, ‘যখন রমযানের আগমন ঘটে, তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় আর শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়’।১২০২
কিন্তু উক্ত হাদিস বিশুদ্ধ হলেও লেখকের বক্তব্যের দলিল নয়। কারণ, হাদিসটি দ্বারা রমজানে কাফের বা মুমিনদের কবরের শাস্তি বন্ধ রাখা হয় এটা প্রমাণিত হয় না। স্রেফ জাহান্নামের দরজা বন্ধ করার কথা প্রমাণিত হয়। আর কবরের শাস্তি জাহান্নামের বাইরের অতিরিক্ত বিষয়। এ কারণে নববি, ইবনে হাজার আসকালানি, আইনিসহ বড় বড় মুহাদ্দিসের প্রায় প্রত্যেকে উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যা করেছেন রূপক অর্থে। অর্থাৎ, রমজানে নেক কাজে আগ্রহ জন্মে, মন্দ কাজ থেকে দিল সরে যায়। তাদের আযাব বন্ধ থাকে এমন নয়। তথাপি যদি বাহ্যিক অর্থে ধরা হয়, তবুও কাফেররা এর বাইরে থাকবে। ১২০৩
তা ছাড়া, যৌক্তিকভাবেও জুমা ও রমযান মাসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সম্মানে কাফেরের কবরের শাস্তি স্থগিত থাকার বিষয়টি অদ্ভুত। কাফের ব্যক্তি যে দুনিয়ার জীবনে জুমা ও রমযান বলে কিছু জানত না, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে নবি বলে স্বীকার করত না, সেই জুমা ও রমযানের শ্রেষ্ঠত্ব এবং নবিজির সম্মানের কারণে তার কবরের আযাব কীভাবে বন্ধ থাকবে? এমন হলে তো পরকালে নবির সম্মানে কাফেরদের জাহান্নামের শাস্তি স্থগিত রাখতে হবে। বরং নবির সুপারিশে কাফেরদেরও জান্নাত দিতে হবে। এ জন্য এ ধরনের বক্তব্য সঠিক নয়। ইমাম রহ. বলেন, কবরের চাপ ও শাস্তি সত্য। এটা সকল কাফেরের জন্য। ১২০৪
টিকাঃ
১১৯৮. আল-জাওহারাতুল মুনিফাহ, মোল্লা হুসাইন হানাফি (৭৯)।
১১৯৯. দেখুন: বাহরুল কালাম (২৫০)।
১২০০. দেখুন: আল-কালাইদ (১২৭)।
১২০১. দেখুন : খিযানাতুর রিওয়ায়াত (পাণ্ডুলিপি), কাযি জগন গুজরাটি (৩৪২-৩৪৩) (দ্বিতীয় পাণ্ডুলিপি ১২৩)।
১২০২. বুখারি (কিতাবু বাদয়িল খালক: ৩২৭৭)। মুসলিম (কিতাবুস সিয়াম: ১০৭৯)।
১২০৩. দেখুন: শরহে মুসলিম, নববি (৭/১৮৮)। উমদাতুল কারি (১০/২৭০)।
১২০৪. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।