📄 কবর : পরকালের প্রথম মঞ্জিল
কবর মানুষের পরকালের সফরের প্রথম স্টেশন। সেখান থেকেই পরকালের যাত্রার বাস্তবতা সামনে আসতে থাকে। পুণ্যবান হলে কবর থেকেই সুফলপ্রাপ্তি শুরু হয়। কাফের বা গুনাহগার হলে কবর থেকেই ভয়ংকর পরিণতির সূচনা ঘটে। এটা কুরআন ও সুন্নাহে বর্ণিত সুস্পষ্ট ও সন্দহাতীত বাস্তবতা। উসমান ইবনে আফফান রাযি. কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় প্রচুর কাঁদতেন। তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। তাকে বলা হলো, আপনি জান্নাত-জাহান্নামের কথা মনে করেও তো এত কাঁদেন না। কবর দেখে এত কাঁদার অর্থ কী? তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘কবর আখেরাতের প্রথম মঞ্জিল। যদি কেউ এখানে রক্ষা পায়, তবে পরবর্তী সকল মঞ্জিল তার জন্য সহজ হয়ে যাবে। আর যদি কেউ এখানে ধরা খায়, তবে পরবর্তী সকল মঞ্জিল তার জন্য কঠিন হয়ে যাবে।’ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেছেন, ‘কবরের চেয়ে ভয়াবহ কোনো দৃশ্য আমি দেখিনি।’১১৭০
কবরে শাস্তি হওয়ার বিষয়টি ইসলামের সুপ্রমাণিত ও স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত মতে কবরের শাস্তি সত্য। এটা সকল কাফের এবং একদল গুনাহগার মুমিনের জন্য প্রযোজ্য। কেবল মুতাযিলা ও জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় এটাকে অস্বীকার করে। সেটা তাদের বিভ্রান্তি। ১১৭১
কুরআনের একাধিক আয়াত এবং অসংখ্য হাদিস দ্বারা কবরের শাস্তির বাস্তবতা প্রমাণিত। যেমন—আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَلَنُذِيقَنَّهُم مِّنَ الْعَدَابِ الْأَدْنَىٰ دُونَ الْعَدَابِ الْأَكْبَرِ ۞ অর্থ : ‘গুরু শাস্তির পূর্বে এদের আমি অবশ্যই লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব।’ [সাজদা : ২১] আল্লাহ আরও বলেন, ۞ فَوَقَاهُ اللَّهُ سَيِّئَاتِ مَا مَكَرُوا ۖ وَحَاقَ بِآلِ فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَدَابِ ۞ ۞ النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا ۖ وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَدَابِ ۞ অর্থ : ‘অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের চক্রান্তের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং ফেরাউন গোত্রকে পরিবেষ্টন করল শোচনীয় শাস্তি। সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন আদেশ করা হবে—ফেরাউন গোত্রকে প্রচণ্ডতম শাস্তিতে দাখিল করো।’ [গাফের: ৪৫-৪৬]
ইমাম আজম বলেন, ‘কবরে বান্দার শরীরে রুহ ফিরিয়ে দেওয়া সত্য। কবরের চাপ ও শাস্তি সত্য। এটা সকল কাফেরের জন্য এবং কিছু গুনাহগার মুমিনের জন্য।’১১৭২ ইমাম আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, কবরের আযাব নিঃসন্দেহে হবেই হবে। কারণ, এ সম্পর্কে একাধিক হাদিস এসেছে।’১১৭৩
টিকাঃ
১১৭০. তিরমিযি (আবওয়াবুয যুহদ: ২৩০৮)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুয যুহদ: ৪২৬৭)। মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুল জানায়েয: ১৩৭৭)।
১১৭১. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১০০৩)।
১১৭২. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।
১১৭৩. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৫৩-৫৪)।
📄 কবরের শাস্তি দৈহিক নাকি আত্মিক?
কবরের শাস্তি রুহ ও শরীর উভয়টির উপর হবে। যদিও ব্যাপারটি নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর স্বাভাবিক বর্ণনায় কবরের আযাব রুহ ও শরীর উভয়টির উপর প্রযোজ্য বোঝা যায়। তাই ইমাম আজম এটাকেই গ্রহণ করেছেন। ইমাম বলেন, ‘কবরে বান্দার শরীরে রুহ ফিরিয়ে দেওয়া সত্য। কবরের চাপ ও শাস্তি সত্য। ১১৭৯ উক্ত বক্তব্যে ইমামের কাছে রুহ ও শরীর দুটোর উপর শাস্তি বা শান্তি হওয়া সুস্পষ্ট। কিন্তু কোনো কারণে যদি দেহ দাফন না করা হয় কিংবা বিলুপ্ত হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে আল্লাহ নতুন দেহ তৈরি করে তাতে আত্মা প্রবেশ করিয়ে শান্তি বা শাস্তি প্রদান করতে পারেন। অথবা স্রেফ আত্মার উপরও শান্তি বা শাস্তি দিতে পারেন। মোটকথা, কবরের শাস্তির ব্যাপারটি প্রমাণিত। কিন্তু সেটা কীভাবে হবে তার রূপরেখা আল্লাহ ভালো জানেন। তিনি সবকিছু করতে সক্ষম।
টিকাঃ
১১৭৯. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।
📄 কবরের চাপ সত্য
যদি মৃত ব্যক্তি পুণ্যবান হয়, তবে কবরে তার কোনো শাস্তি হবে না। শুধু একবার চাপ দেওয়া হবে এবং সেটাও তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক হবে না। যদি গুনাহগার হয়, তবে চাপ এবং আল্লাহ চাইলে শাস্তি দুটোই হবে।
বিষয়টি কিছুটা মতভেদপূর্ণ। তবে আমরা যা উল্লেখ করেছি এটাই শুদ্ধতর বক্তব্য। অর্থাৎ, কবরের শাস্তি সবার জন্য না হলেও চাপ সবার জন্য প্রযোজ্য। মুমিন-কাফের, পুণ্যবান-গুনাহগার কেউ এ চাপ থেকে রক্ষা পাবে না। এটা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহর রাসুল (ﷺ) সাদ বিন মুআজ রাযি.-এর শাহাদাতের পরে তাঁর ব্যাপারে বলেন, ‘কবরে চাপ দেওয়া হয়। যদি কেউ এটা থেকে নিষ্কৃতি পেত, তবে সে হতো সাদ বিন মুআজ।’১১৮০ অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি বলেন, ‘যদি কেউ কবরের চাপ থেকে রক্ষা পেত, তবে সে হতো সাদ বিন মুআজ। কিন্তু তাকেও একটি চাপ দেওয়া হয়েছে, অতঃপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’১১৮১ তৃতীয় আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তার জন্য আরশ কেঁপে উঠেছে। আকাশের দরজা খুলে গিয়েছে। সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জানাযায় উপস্থিত হয়েছে। তবুও কবরে তাকে একটা চাপ দিয়ে এরপর ছাড়া হয়েছে।’১১৮২ অন্য একটি হাদিস দেখলে বোঝা যায়, শিশুরাও এটা থেকে অব্যাহতি পাবে না। আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যদি কেউ কবরের আযাব থেকে নিষ্কৃতি পেত, তবে এই বাচ্চা পেত।’১১৮৩
তবে আবু হুরায়রা রাযি.-এর একটি হাদিস দ্বারা বিপরীত বোঝা যায়। সেখানে মুনকার-নাকির কর্তৃক তিন প্রশ্নের পরে দেখা যায় মুমিনের কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হয়, তাকে ঘুমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। চাপের কোনো কথা নেই। বিপরীতে কাফের ও মুনাফিক প্রশ্নের জবাব দিতে না পারায় তাদের কবরকে চাপ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কবর তাদের এমনভাবে চাপ দেয় যে, তাদের পাঁজরের হাড়গুলো একটি অপরটির মাঝে ঢুকে যায়। ১১৮৪ এ হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, মুমিনকে কবরে চাপ দেওয়া হয় না।
উলামায়ে কেরাম দুই ধরনের হাদিসের সমন্বয় সাধনের জন্য বলেন, উক্ত হাদিসে চাপের কথা উল্লেখ নেই বলে চাপ দেওয়া হবে না এমন নয়। কারণ, অন্যান্য হাদিসে সবার জন্য চাপ প্রমাণিত। সুতরাং উক্ত হাদিসকে সংক্ষিপ্ত ধরতে হবে। দ্বিতীয়ত, চাপ সবার জন্য সমান হলেও এর ফলাফল সবার জন্য সমান হবে না। এটা আল্লাহর ইনসাফের জন্য শোভনীয়ও নয়। ফলে এটা কাফের ও গুনাহগারদের জন্য প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক হবে। বিপরীতে মুমিন ও মুত্তাকিদের জন্য সহনীয় পর্যায়ের হবে। সবাইকে চাপ দেওয়ার রহস্য সম্পর্কে হাকিম তিরমিযি বলেন, ‘পৃথিবীর সকলেই কোনো-না-কোনো পাপ করে থাকে। ফলে কবরে রাখামাত্রই তাকে সেটার একটা বিনিময় দেওয়া হবে। এরপর রহমত শুরু হবে।’১১৮৫ যেহেতু মুমিনের চাপ তার জন্য যন্ত্রণার হবে না, এ জন্য হতে পারে কোনো কোনো বর্ণনায় এটাকে উল্লেখ করা হয়নি।
টিকাঃ
১১৮০. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদে আয়েশা: ২৪৯২১)। সহিহ ইবনে হিব্বান (কিতাবুল জানায়েয: ৩১১২)।
১১৮১. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস : ১০/৩৩৪; হাদিস নং ১০৮২৭)। আল-মুজামুল আওসাত (মুহাম্মাদ ইবনে জাফর: ৬/৩৪৯; হাদিস নং ৬৫৯৩)।
১১৮২. সুনানে কুবরা, নাসায়ি (কিতাবুল জানায়েয: ২১৯৩)। আল-মুজামুল কাবির (বাবুস সিন: ৫৩৩৩)
১১৮৩. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (খালেদ ইবনে যায়দ: ৪/১২১; হাদিস নং ৩৮৫৮)। আল-আহাদিসুল মুখতারাহ, মাকদেসি (মুসনাদে আনাস ইবনে মালেক) (১৮২৪)।
১১৮৪. তিরমিযি (আবওয়াবুল জানায়েয: ১০৭১)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল জানায়েয : ৩১১৭)।
১১৮৫. হাশিয়াতুস সুয়ুতি আলা সুনানিন নাসায়ি (৪/১০২)।
📄 কবরের শাস্তি সবার জন্য নয়
কবরের চাপ (উপরের ব্যাখ্যাসহ) মুমিন-কাফের-মুনাফিক সবার জন্য প্রযোজ্য হলেও কবরের শাস্তি সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। আল্লাহ অনুগ্রহ করে তাঁর প্রিয় বান্দাদের এ শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন। গুনাহগার মুমিন এবং কাফের-মুনাফিকদের তিনি শাস্তি দেবেন। এটা ইমামের কথায়ও স্পষ্ট।
ইমাম রহ. বলেন, ‘কবরের চাপ ও শাস্তি সত্য। এটা সকল কাফেরের জন্য এবং কিছু গুনাহগার মুমিনের জন্য।’১১৮৬ অর্থাৎ, সকল মুমিনের জন্য নয়। ইমাম তহাবি বলেন, ‘আমরা কবরের আযাবে বিশ্বাস করি এর উপযুক্ত লোকদের জন্য।’১১৮৭ ফলে দেখা যাচ্ছে, কবরের শাস্তি সবাইকে পেতে হবে এমনটা জরুরি নয়। বরং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে অনেককেই রক্ষা করবেন। নবি-রাসুলদের কবরে কোনো শাস্তি হবে না। মুমিনদের নাবালেগ সন্তানেরও কবরে কোনো শাস্তি হবে না। একইভাবে সাধারণ পুণ্যবান মুমিনদেরও আল্লাহ চাইলে নিজ অনুগ্রহে কবরের শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সবসময় কবরের শাস্তি থেকে পানাহ চাইতেন। কিন্তু সেটা নিজের জন্য নয়, বরং আল্লাহর সর্বোচ্চ দাসত্ব প্রকাশ, তাঁর প্রতি পূর্ণ নিবেদন, তাঁর অনুগ্রহের প্রতি ওয়াফাদারি এবং মুমিনদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য। ১১৮৮
হাদিসে বেশ কিছু আমলকে কবরের শাস্তির কারণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। প্রত্যেক মুমিনের এসব কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। যেমন—প্রস্রাবের পর সঠিকভাবে পবিত্র না হওয়া, গিবত ও চোগলখুরি করা। ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘তাদের কবরে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো কবিরা গুনাহের কারণে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। (বরং শাস্তির কারণ হলো) তাদের একজন প্রস্রাব থেকে যথাযথভাবে পবিত্র হতো না। আরেকজন পরনিন্দা ও চোগলখুরি রটিয়ে বেড়াত...।’১১৮৯ কবরে শাস্তির আরেকটি কারণ হলো, ঋণ শোধ না করে মৃত্যুবরণ করা। সাদ ইবনুল আতওয়াল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার ভাই মৃত্যুর সময় তিনশত দিনার এবং কিছু সন্তান রেখে গেল। আমি দিনারগুলো তাদের পিছনে খরচ করতে চাইলাম। আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বললেন, ‘তোমার ভাই ঋণের কাছে আটকে আছে। আগে তার ঋণ পরিশোধ করো। তখন আমি ঋণ পরিশোধ করে রাসুলুল্লাহর কাছে এসে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, ঋণ শোধ করেছি...।’ ১১৯০
টিকাঃ
১১৮৬. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।
১১৮৭. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৫)।
১১৮৮. তালখিসুল আদিল্লাহ (৫৬৯)। বাহরুল কালাম (১৯৩)।
১১৮৯. বুখারি (কিতাবুল ওযু: ২১৮; কিতাবুল জানায়েয: ১৩৬১। মুসলিম (কিতাবুত তাহারাত: ২৯২)।
১১৯০. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুশ শামিয়্যিন: ১৭৫০০)। সুনানে কুবরা, বাইহাকি (কিতাবু আদাবিল কাযি : ২০৫৬২)।