📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 আখেরাতের পরিচয় ও প্রয়োজনীয়তা

📄 আখেরাতের পরিচয় ও প্রয়োজনীয়তা


একদিন এই বিশ্বজগতের সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। সকল প্রাণী মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বে। পচেগলে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তায়ালা নিঃশেষিত হয়ে যাওয়া সৃষ্টির অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো আবারও একত্রে জড়ো করবেন। তাতে রুহ ফিরিয়ে দেবেন। এভাবে সকলে পুনর্জীবিত হয়ে উঠবে। সূচনা হবে এক নতুন জীবনের, এক অনন্ত কালের যাত্রার, যাকে আমরা আখেরাত বা পরকাল নামে জানি। পরকালে বিশ্বাস ঈমানের ছয়টি ভিত্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে কেউ যদি এটা অস্বীকার করে, তবে তাফের হয়ে যাবে।

কুরআনের অসংখ্য আয়াত ও হাদিস দ্বারা পরকাল প্রমাণিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ قَالُوا يَا وَيْلَنَا مَنْ بَعَثَنَا مِنْ مَرْقَدِنَا ۜ ۗ هَٰذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ ۞ অর্থ : ‘ (শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হলে) তারা বলবে, হায় আমাদের দুর্ভোগ! কে আমাদের নিদ্রাস্থল থেকে উত্থিত করল? বস্তুত রহমান আল্লাহ তো এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং রাসুলগণ সত্য বলেছিলেন।’ [ইয়াসিন : ৫২] অন্যত্র বলেন, ۞ وَضَرَبَ لَنَا مَثَلًا وَنَسِيَ خَلْقَهُ ۖ قَالَ مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ ۞ ۞ قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ ۖ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ ۞ অর্থ : ‘সে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে, অথচ নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়। সে বলে, কে অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে যখন তা পচেগলে যাবে? বলুন, যিনি প্রথমবার সেগুলোকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জীবিত করবেন। তিনি সর্বপ্রকার সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক অবগত।’ [ইয়াসিন : ৭৮-৭৯] আল্লাহ বলেন, ۞ ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ ۞ অর্থ : ‘অতঃপর নিশ্চয়ই তোমাদের কিয়ামতের দিন পুনরুত্থিত করা হবে।’ [মুমিনুন : ১৬] আরও বলেন, ۞ وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَالْإِيمَانَ لَقَدْ لَبِثْتُمْ فِي كِتَابِ اللَّهِ إِلَىٰ يَوْمِ الْبَعْثِ ۖ فَهَٰذَا يَوْمُ الْبَعْثِ وَلَٰكِنَّكُمْ كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ ۞ অর্থ : ‘কিন্তু যাদের জ্ঞান ও ঈমান দেওয়া হয়েছে তারা বলবে, তোমরা আল্লাহর বিধান অনুসারে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবস্থান করেছ। এটাই তো পুনরুত্থান দিবস, কিন্তু তোমরা জানতে না।’ [রুম : ৫৬]

যুক্তিরও দাবি—পরকাল থাকা উচিত। নতুবা পৃথিবীতে মানবজীবনের কোনো অর্থ থাকে না। জগতের এত ব্যস্ততা এত কর্মযজ্ঞ অর্থবহ হয় না। এখানকার জীবন ক্ষণস্থায়ী। অথচ এই স্থণস্থায়ী জীবনও নানা জুলুম, জটিলতা, বিশৃঙ্খলা, মারামারি-হানাহানি, স্বার্থপরতা, অন্যায় ও বঞ্চনা দিয়ে ভরপুর। ফলে আরেকটা জীবন প্রয়োজন। অন্তত জগতের সকল জুলুম ও বঞ্চনা মেটানোর জন্য, ভালো ও মন্দের প্রতি, সৎকর্মশীল আর অসৎ লোকদের মাঝে ইনসাফ করার জন্য হলেও পরকাল প্রয়োজন। এই ইনসাফটুকু না হলে পৃথিবীতে ভালো আর মন্দ, নৈতিকতা-অনৈতিকতা এবং পাপ-পুণ্যের মাঝে কোনো ফারাক থাকে না। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এই যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ۞ أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءً مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ ۚ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ ۞ অর্থ : ‘দুষ্কৃতিকারীরা কি মনে করে যে, আমি জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে এদের মুমিন ও সৎকর্মশীলদের সমান গণ্য করব? তাদের সিদ্ধান্ত কত মন্দ।’ [যাসিয়াহ : ২১] পরকাল না থাকলে পৃথিবীর সবকিছু অর্থহীন বিষয়ে পরিণত হয়। অথচ আল্লাহ এ সবকিছু অর্থপূর্ণ করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ ۞ ۞ مَا خَلَقْنَاهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ ۞ ۞ إِنَّ يَوْمَ الْفَصْلِ مِيقَاتُهُمْ أَجْمَعِينَ ۞ অর্থ : ‘আমি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী কোনোকিছু ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। আমি এগুলো যথাযথ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছি; কিন্তু তাদের অধিকাংশ বোঝে না। নিশ্চয়ই ফয়সালার দিন তাদের সবার জন্য অপেক্ষমাণ।’ [দুখান : ৩৮-৪০]

জ্ঞানগত ও যৌক্তিক পন্থায় পরকাল থাকার প্রমাণ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ۞ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِنَ الْبَعْثِ فَإِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ مِنْ مُضْغَةٍ مُخَلَّقَةٍ وَغَيْرِ مُخَلَّقَةٍ لِنُبَيِّنَ لَكُمْ ۚ وَنُقِرُّ فِي الْأَرْحَامِ مَا نَشَاءُ إِلَىٰ أَجَلٍ مُسَمًّى ثُمَّ نُخْرِجُكُمْ طِفْلًا ثُمَّ لِتَبْلُগুا أَشُدَّكُمْ ۖ وَمِنْكُمْ مَنْ يُتَوَفَّىٰ وَمِنْكُمْ مَنْ يُرَدُّ إِلَىٰ أَرْذَلِ الْعُمُرِ لِكَيْلَا يَعْلَمَ مِنْ بَعْدِ عِلْمٍ شَيْئًا ۚ وَتَرَى الْأَرْضَ هَامِدَةً فَإِذَا أَنْزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ وَأَنْبَتَتْ مِنْ كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ ۞ ۞ ذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّهُ يُحْيِي الْمَوْتَىٰ وَأَنَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ۞ ۞ وَأَنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ لَا رَيْبَ فِيهَا وَأَنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ مَنْ فِي الْقُبُورِ ۞ অর্থ : ‘হে মানুষ, পুনরুত্থান সম্বন্ধে যদি তোমরা সন্দিগ্ধ হও, তবে অবধান করো—আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকা থেকে, তারপর শুক্র থেকে, তারপর জমাটবদ্ধ রক্ত থেকে, তারপর পূর্ণাকৃতি বা অপূর্ণাকৃতির মাংসপিণ্ড থেকে—তোমাদের নিকট ব্যক্ত করার জন্য। আমি যা ইচ্ছা করি তা এক নির্দিষ্ট কালের জন্য মাতৃগর্ভে স্থিত রাখি, তারপর আমি তোমাদের শিশুরূপে বের করি, পরে তোমরা পরিণত বয়সে উপনীত হও। তোমাদের মধ্যে কারও কারও মৃত্যু ঘটানো হয় আর কাউকে পৌঁছে দেওয়া হয় হীনতম বয়সে, যাতে মানুষ আগের জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তুমি ভূমিকে দেখো শুষ্ক। এতে আমি বারি বর্ষণ করলে তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদ্‌গত করে সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ। এগুলো এ কারণে যে, আল্লাহ সত্য এবং তিনি মৃতকে জীবিত করেন আর তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। নিশ্চয়ই কিয়ামত আসবেই। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর নিশ্চয়ই কবরে যারা আছে আল্লাহ তাদের উত্থিত করবেন।’ [হজ : ৫-৭]

ইমাম রাযি রহ. বলেন, ধরুন পরকাল বলতে কিছু নেই। তবুও আমরা এর উপর ঈমান আনলাম। যথাযথ প্রস্তুতি নিলাম। এরপর যদি সত্যি সত্যিই পরকাল চলে আসে, তবে তো আমরা বেঁচে যাব। অস্বীকারকারীরা ধ্বংস হবে। আর যদি পরকাল কখনো না আসে, তবে এ বিশ্বাসে আমাদের কোনো ক্ষতি নেই। হ্যাঁ, এতটুকু যে, দুনিয়ার ভোগবিলাস মন ভরে উপভোগ করতে পারলাম না। কিন্তু এটা কোনো ক্ষতির বিষয় নয়। বরং এই সাময়িক ভোগবিলাসের জন্য চিরস্থায়ী ভবিষ্যৎকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া নির্বুদ্ধিতা। ভোগের ক্ষেত্রে মানুষ, পশুপাখি, কুকুর-বিড়াল সব সমান। ফলে এটাকে বড় করে না দেখে পরকালে ঈমান আনাই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ।

টিকাঃ
১১৬৯. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৯২)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কবর : পরকালের প্রথম মঞ্জিল

📄 কবর : পরকালের প্রথম মঞ্জিল


কবর মানুষের পরকালের সফরের প্রথম স্টেশন। সেখান থেকেই পরকালের যাত্রার বাস্তবতা সামনে আসতে থাকে। পুণ্যবান হলে কবর থেকেই সুফলপ্রাপ্তি শুরু হয়। কাফের বা গুনাহগার হলে কবর থেকেই ভয়ংকর পরিণতির সূচনা ঘটে। এটা কুরআন ও সুন্নাহে বর্ণিত সুস্পষ্ট ও সন্দহাতীত বাস্তবতা। উসমান ইবনে আফফান রাযি. কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় প্রচুর কাঁদতেন। তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। তাকে বলা হলো, আপনি জান্নাত-জাহান্নামের কথা মনে করেও তো এত কাঁদেন না। কবর দেখে এত কাঁদার অর্থ কী? তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘কবর আখেরাতের প্রথম মঞ্জিল। যদি কেউ এখানে রক্ষা পায়, তবে পরবর্তী সকল মঞ্জিল তার জন্য সহজ হয়ে যাবে। আর যদি কেউ এখানে ধরা খায়, তবে পরবর্তী সকল মঞ্জিল তার জন্য কঠিন হয়ে যাবে।’ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেছেন, ‘কবরের চেয়ে ভয়াবহ কোনো দৃশ্য আমি দেখিনি।’১১৭০

কবরে শাস্তি হওয়ার বিষয়টি ইসলামের সুপ্রমাণিত ও স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত মতে কবরের শাস্তি সত্য। এটা সকল কাফের এবং একদল গুনাহগার মুমিনের জন্য প্রযোজ্য। কেবল মুতাযিলা ও জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় এটাকে অস্বীকার করে। সেটা তাদের বিভ্রান্তি। ১১৭১

কুরআনের একাধিক আয়াত এবং অসংখ্য হাদিস দ্বারা কবরের শাস্তির বাস্তবতা প্রমাণিত। যেমন—আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَلَنُذِيقَنَّهُم مِّنَ الْعَدَابِ الْأَدْنَىٰ دُونَ الْعَدَابِ الْأَكْبَرِ ۞ অর্থ : ‘গুরু শাস্তির পূর্বে এদের আমি অবশ্যই লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব।’ [সাজদা : ২১] আল্লাহ আরও বলেন, ۞ فَوَقَاهُ اللَّهُ سَيِّئَاتِ مَا مَكَرُوا ۖ وَحَاقَ بِآلِ فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَدَابِ ۞ ۞ النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا ۖ وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَدَابِ ۞ অর্থ : ‘অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের চক্রান্তের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং ফেরাউন গোত্রকে পরিবেষ্টন করল শোচনীয় শাস্তি। সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন আদেশ করা হবে—ফেরাউন গোত্রকে প্রচণ্ডতম শাস্তিতে দাখিল করো।’ [গাফের: ৪৫-৪৬]

ইমাম আজম বলেন, ‘কবরে বান্দার শরীরে রুহ ফিরিয়ে দেওয়া সত্য। কবরের চাপ ও শাস্তি সত্য। এটা সকল কাফেরের জন্য এবং কিছু গুনাহগার মুমিনের জন্য।’১১৭২ ইমাম আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, কবরের আযাব নিঃসন্দেহে হবেই হবে। কারণ, এ সম্পর্কে একাধিক হাদিস এসেছে।’১১৭৩

টিকাঃ
১১৭০. তিরমিযি (আবওয়াবুয যুহদ: ২৩০৮)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুয যুহদ: ৪২৬৭)। মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুল জানায়েয: ১৩৭৭)।
১১৭১. তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/১০০৩)।
১১৭২. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।
১১৭৩. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৫৩-৫৪)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কবরের শাস্তি দৈহিক নাকি আত্মিক?

📄 কবরের শাস্তি দৈহিক নাকি আত্মিক?


কবরের শাস্তি রুহ ও শরীর উভয়টির উপর হবে। যদিও ব্যাপারটি নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর স্বাভাবিক বর্ণনায় কবরের আযাব রুহ ও শরীর উভয়টির উপর প্রযোজ্য বোঝা যায়। তাই ইমাম আজম এটাকেই গ্রহণ করেছেন। ইমাম বলেন, ‘কবরে বান্দার শরীরে রুহ ফিরিয়ে দেওয়া সত্য। কবরের চাপ ও শাস্তি সত্য। ১১৭৯ উক্ত বক্তব্যে ইমামের কাছে রুহ ও শরীর দুটোর উপর শাস্তি বা শান্তি হওয়া সুস্পষ্ট। কিন্তু কোনো কারণে যদি দেহ দাফন না করা হয় কিংবা বিলুপ্ত হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে আল্লাহ নতুন দেহ তৈরি করে তাতে আত্মা প্রবেশ করিয়ে শান্তি বা শাস্তি প্রদান করতে পারেন। অথবা স্রেফ আত্মার উপরও শান্তি বা শাস্তি দিতে পারেন। মোটকথা, কবরের শাস্তির ব্যাপারটি প্রমাণিত। কিন্তু সেটা কীভাবে হবে তার রূপরেখা আল্লাহ ভালো জানেন। তিনি সবকিছু করতে সক্ষম।

টিকাঃ
১১৭৯. আল-ফিকহুল আকবার (৭)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কবরের চাপ সত্য

📄 কবরের চাপ সত্য


যদি মৃত ব্যক্তি পুণ্যবান হয়, তবে কবরে তার কোনো শাস্তি হবে না। শুধু একবার চাপ দেওয়া হবে এবং সেটাও তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক হবে না। যদি গুনাহগার হয়, তবে চাপ এবং আল্লাহ চাইলে শাস্তি দুটোই হবে।

বিষয়টি কিছুটা মতভেদপূর্ণ। তবে আমরা যা উল্লেখ করেছি এটাই শুদ্ধতর বক্তব্য। অর্থাৎ, কবরের শাস্তি সবার জন্য না হলেও চাপ সবার জন্য প্রযোজ্য। মুমিন-কাফের, পুণ্যবান-গুনাহগার কেউ এ চাপ থেকে রক্ষা পাবে না। এটা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহর রাসুল (ﷺ) সাদ বিন মুআজ রাযি.-এর শাহাদাতের পরে তাঁর ব্যাপারে বলেন, ‘কবরে চাপ দেওয়া হয়। যদি কেউ এটা থেকে নিষ্কৃতি পেত, তবে সে হতো সাদ বিন মুআজ।’১১৮০ অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি বলেন, ‘যদি কেউ কবরের চাপ থেকে রক্ষা পেত, তবে সে হতো সাদ বিন মুআজ। কিন্তু তাকেও একটি চাপ দেওয়া হয়েছে, অতঃপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’১১৮১ তৃতীয় আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তার জন্য আরশ কেঁপে উঠেছে। আকাশের দরজা খুলে গিয়েছে। সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জানাযায় উপস্থিত হয়েছে। তবুও কবরে তাকে একটা চাপ দিয়ে এরপর ছাড়া হয়েছে।’১১৮২ অন্য একটি হাদিস দেখলে বোঝা যায়, শিশুরাও এটা থেকে অব্যাহতি পাবে না। আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যদি কেউ কবরের আযাব থেকে নিষ্কৃতি পেত, তবে এই বাচ্চা পেত।’১১৮৩

তবে আবু হুরায়রা রাযি.-এর একটি হাদিস দ্বারা বিপরীত বোঝা যায়। সেখানে মুনকার-নাকির কর্তৃক তিন প্রশ্নের পরে দেখা যায় মুমিনের কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হয়, তাকে ঘুমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। চাপের কোনো কথা নেই। বিপরীতে কাফের ও মুনাফিক প্রশ্নের জবাব দিতে না পারায় তাদের কবরকে চাপ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কবর তাদের এমনভাবে চাপ দেয় যে, তাদের পাঁজরের হাড়গুলো একটি অপরটির মাঝে ঢুকে যায়। ১১৮৪ এ হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, মুমিনকে কবরে চাপ দেওয়া হয় না।

উলামায়ে কেরাম দুই ধরনের হাদিসের সমন্বয় সাধনের জন্য বলেন, উক্ত হাদিসে চাপের কথা উল্লেখ নেই বলে চাপ দেওয়া হবে না এমন নয়। কারণ, অন্যান্য হাদিসে সবার জন্য চাপ প্রমাণিত। সুতরাং উক্ত হাদিসকে সংক্ষিপ্ত ধরতে হবে। দ্বিতীয়ত, চাপ সবার জন্য সমান হলেও এর ফলাফল সবার জন্য সমান হবে না। এটা আল্লাহর ইনসাফের জন্য শোভনীয়ও নয়। ফলে এটা কাফের ও গুনাহগারদের জন্য প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক হবে। বিপরীতে মুমিন ও মুত্তাকিদের জন্য সহনীয় পর্যায়ের হবে। সবাইকে চাপ দেওয়ার রহস্য সম্পর্কে হাকিম তিরমিযি বলেন, ‘পৃথিবীর সকলেই কোনো-না-কোনো পাপ করে থাকে। ফলে কবরে রাখামাত্রই তাকে সেটার একটা বিনিময় দেওয়া হবে। এরপর রহমত শুরু হবে।’১১৮৫ যেহেতু মুমিনের চাপ তার জন্য যন্ত্রণার হবে না, এ জন্য হতে পারে কোনো কোনো বর্ণনায় এটাকে উল্লেখ করা হয়নি।

টিকাঃ
১১৮০. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদে আয়েশা: ২৪৯২১)। সহিহ ইবনে হিব্বান (কিতাবুল জানায়েয: ৩১১২)।
১১৮১. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস : ১০/৩৩৪; হাদিস নং ১০৮২৭)। আল-মুজামুল আওসাত (মুহাম্মাদ ইবনে জাফর: ৬/৩৪৯; হাদিস নং ৬৫৯৩)।
১১৮২. সুনানে কুবরা, নাসায়ি (কিতাবুল জানায়েয: ২১৯৩)। আল-মুজামুল কাবির (বাবুস সিন: ৫৩৩৩)
১১৮৩. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (খালেদ ইবনে যায়দ: ৪/১২১; হাদিস নং ৩৮৫৮)। আল-আহাদিসুল মুখতারাহ, মাকদেসি (মুসনাদে আনাস ইবনে মালেক) (১৮২৪)।
১১৮৪. তিরমিযি (আবওয়াবুল জানায়েয: ১০৭১)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল জানায়েয : ৩১১৭)।
১১৮৫. হাশিয়াতুস সুয়ুতি আলা সুনানিন নাসায়ি (৪/১০২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00