📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 তাকদির নিয়ে বিতর্ক ও ঘাঁটাঘাঁটি নিষিদ্ধ

📄 তাকদির নিয়ে বিতর্ক ও ঘাঁটাঘাঁটি নিষিদ্ধ


তাকদির নিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভ্রান্তি ও সংশয়ের ফলেই ইমাম আজম এ ব্যাপারে মোটামুটি লম্বা আলোচনা করেছেন। নতুবা এক্ষেত্রে সাধারণ নীতি হলো নীরব থাকা, ইজমালি ঈমান আনা। অতিরিক্ত ঘাঁটাঘাঁটি না করা।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘যখন তাকদির নিয়ে আলোচনা হয়, তখন সেটা থেকে বিরত থাকো।’ ১১৬১ আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তাকদির নিয়ে কথা বলবে, কিয়ামতের দিন তাকে জবাবদিহি করতে হবে। আর যে কথা বলবে না, তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে না।’১১৬২ আলি রাযি.-কে তাকদির সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘অন্ধকার পথ, এ পথে যেয়ো না।’ তাকে আবারও জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘গভীর সমুদ্র, এতে নেমো না।’ তৃতীয়বার জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর গোপন রহস্য, খুঁড়তে যেয়ো না।’১১৬৩ ফলে বিনা প্রয়োজনে তাকদির নিয়ে বিতর্ক ও অনুসন্ধান বর্জন গোটা উম্মাহর সর্বসম্মত আকিদা।

ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ বলেন, ‘আমি তাকদির নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছি। এতে আমার অস্থিরতা বেড়েছে। আবার চিন্তা করেছি, তখন অস্থিরতা-পেরেশানি আরও বেড়েছে। শেষে আমি উপলব্ধি করেছি—তাকদির সম্পর্কে সে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী যে এটা নিয়ে চিন্তাভাবনা থেকে সবচেয়ে দূরে। আর তাকদির সম্পর্কে সে সবচেয়ে বড় মূর্খ, যে এটা নিয়ে বেশি ব্যস্ত।’ আমর ইবনুল আলা বলেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ হেদায়াত দেন, আল্লাহই গোমরাহ করেন। যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করে, কীভাবে? আমি তাকে বলব, আমার কাছ থেকে দূর হও।’১১৬৪

ইমাম আজম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (তাকদিরের ক্ষেত্রে) ‘আমি তা-ই বলি যা বলেছেন আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবনে আলি (মুহাম্মাদ আল বাকের মৃত: ১১৪ হি.) : ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বাধ্যবাধকতা (জবর) নেই। আবার মানুষের পূর্ণ স্বাধীনতাও (তাফবিজ) নেই। চাপাচাপি নেই, ছাড়াছাড়িও নেই। আল্লাহ মানুষের সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেন না। মানুষের যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তথা তাকদির নিয়ে অনুসন্ধান তিনি পছন্দ করেন না।’১১৬৫

আবু হাফস বুখারি ইমাম মুহাম্মাদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন; তিনি বলেছেন, ‘জগতের ভালোমন্দ সবকিছু নির্ধারিত। আহলে সুন্নাতের সকল ফকিহ এ ব্যাপারে একমত। ফলে তোমরা তাকদির নিয়ে বিতর্ক করো না।’১১৬৬

ইমাম তহাবি রহ. বলেন, ‘তাকদির সৃষ্টিজগতের ব্যাপারে আল্লাহর এক গোপন রহস্য। আল্লাহর নিকটবর্তী কোনো ফেরেশতা কিংবা প্রেরিত নবিরও এ সম্পর্কে জ্ঞান নেই। বরং এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি এবং অধিক চিন্তাভাবনা দুর্ভাগ্য বয়ে আনে, বঞ্চিত করে, অবাধ্যতার পথে নিয়ে যায়। সুতরাং তাকদির নিয়ে বেশি চিন্তাভাবনা এবং মনের কুমন্ত্রণার ব্যাপারে পূর্ণ সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিজগতের কাছ থেকে তাকদিরের জ্ঞান ঢেকে রেখেছেন। এর পিছনে পড়তে নিষেধ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, ‘তিনি যা করেন সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হন না, কিন্তু তারা যা করে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ সুতরাং কেউ যদি বলে, ‘তিনি কেন এটা করলেন,’ তবে সে আল্লাহর কিতাবের আইনকে অমান্য করল। আর যে আল্লাহর কিতাবের আইন অমান্য করে সে কাফের।১১৬৭

ইমাম তহাবি আরও বলেন, ‘বান্দার জানা কর্তব্য, শুরু থেকেই সৃষ্টির প্রত্যেকটি বিষয়ে আল্লাহ তায়ালার সর্বাঙ্গীণ জ্ঞান রয়েছে। তাই তিনি সুচারুরূপে এবং সুদৃঢ়ভাবে সকলের তাকদির নির্ধারণ করেছেন। আসমান ও যমিনের কারও পক্ষে এটা রদ কিংবা বাতিল করার সাধ্য নেই। এটার বিরুদ্ধাচরণ কিংবা পরিবর্তন-পরিবর্ধন, সংযোজন-বিয়োজনের সামর্থ্য নেই। এটাই দৃঢ় ঈমান এবং প্রকৃত জ্ঞান। আল্লাহ তায়ালার তাওহিদ এবং রবুবিয়্যাতের স্বীকৃতি। ...সুতরাং ধ্বংস সে ব্যক্তির জন্য যে তাকদির নিয়ে আল্লাহর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়; অসুস্থ অন্তর দিয়ে এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করে। এভাবে নিছক অনুমানের বশবর্তী হয়ে সুপ্ত জ্ঞানের সন্ধানে ঘোরে। শেষে পরিণত হয় মিথ্যুক পাপাচারীতে।১১৬৮

টিকাঃ
১১৬১. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (সাওবান: ২/৯৬; হাদিস নং ১৪২৭)। আল মাতালিবুল আলিয়াহ (কিতাবুল ঈমান ওয়াত তাওহিদ: ২৯৫৬).
১১৬২. সুনানে ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সুন্নাহ: ৮৪).
১১৬৩. তালখিসুল আদিল্লাহ (৫১)। আশ-শরিয়াহ, আজুররি (২/৮৪৪).
১১৬৪. আত-তামহিদ, ইবনে আবদিল বার (৬/৬৭).
১১৬৫. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১১৯).
১১৬৬. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১২২).
১১৬৭. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (১৭).
১১৬৮. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (১৮-১৯)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00