📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ‘যা হয়েছে ভালোর জন্য হয়েছে

📄 ‘যা হয়েছে ভালোর জন্য হয়েছে


উপরের আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি বিষয় হলো—মুসলিম সর্বসাধারণের মাঝে একটি বহুল প্রচলিত বক্তব্য : ‘তাকদিরে আল্লাহ যা লিখেছেন ভালোর জন্যই লিখেছেন’ কিংবা ‘যা হয়েছে ভালোর জন্যই হয়েছে।’ শরিয়তে এই কথার ভিত্তি কী? বান্দা বিভিন্ন মুসিবত-সংকট দ্বারা আক্রান্ত হলেও কি সবসময় সেটা তার ভালোর জন্য হয়েছে এমনটা মানতে হবে?

আবুল ইউসর বাযদাবি বলেন, ‘এটা সাধারণ মানুষের কথা। তারা আল্লাহর প্রতি সম্মান রেখে এমন কথা বলে এবং এমন বিশ্বাস রাখে। কিন্তু আমরা এর সঙ্গে একমত নই। কাউকে এমন বলতে দেখলে নিষেধ করি।১১৫৭ কারণ, এটার অর্থ অনেকটা এমন হয় যে, বান্দার ভালোটা করা আল্লাহর উপর আবশ্যক। অথচ উপরে এ ধরনের বক্তব্যকে আমরা নাকচ করেছি। তা ছাড়া, মানুষ অনেক সময় নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনে। ফলে তার কর্মফলস্বরূপ বিপদ আসে। এখানে বিপদটা তার ভালোর জন্য এসেছে এমন নয়; তার কর্মের কারণে এসেছে। ফলে এটা তার জন্য মঙ্গলময় নয়; বরং এটা তার মন্দ কর্মের মন্দ পরিণতি। সে যদি ভালো কাজ করত, চিন্তাভাবনা করে কাজ করত এবং আরও সাবধান হতো, হয়তো তাকে এ বিপদে পড়তেই হতো না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ﴿ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ ﴾ অর্থ : ‘তোমাদের উপর যেসব বিপদাপদ পতিত হয় তা তোমাদের কর্মের ফল। উপরন্তু তিনি তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেন।’ [শুরা : ৩০] এখানে মুসিবতকে মানুষের কর্মফল সাব্যস্ত করা হয়েছে। অন্য আয়াতে আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেন, ﴿وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ ﴾

‘স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে মানুষের কৃতকর্মের ফলে, যাতে তিনি তাদের কর্মের কিছু শাস্তি তিনি তাদের আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ [রুম : ৪১] এখানে মানুষের কর্মফলকে ‘ফ্যাসাদ’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যা কল্যাণের বিপরীত। আয়াতের শেষে তাদের ‘কর্মফল ভোগ’ করার কথা বলা হয়েছে, যেটা কল্যাণের বিপরীত; অকল্যাণ। ফলে মন্দ কাজের মন্দ ফল কিংবা ভুলের পরিণতি সবসময় ভালো কিংবা মঙ্গল দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কাসানি লিখেন, ‘বান্দার জন্য ভালোটা করা আল্লাহর উপর আবশ্যক নয়; বরং আল্লাহ যেভাবে চান সেভাবে করেন। ফলে যদি কিছু বান্দার জন্য কল্যাণকর হয় সেটা আল্লাহর অনুগ্রহ। আর যদি কল্যাণকর না হয় তবে সেটা তাঁর ইনসাফ।’১১৫৮

তবে অধমের পর্যবেক্ষণ হলো, যদি মানুষ নিজের সর্বাত্মক চেষ্টা-প্রচেষ্টা ব্যয় করেও, সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও বিপদে আক্রান্ত হয়, তখন সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণের ফয়সালা হিসেবে মেনে নিতে হবে। এর সঙ্গে আল্লাহর উপর কিছু আবশ্যক করার সম্পর্ক নেই। কারণ, বিপদ যেমন অনেক সময় কর্মফলস্বরূপ হয়, অনেক সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ, কল্যাণস্বরূপ, ছোট বিপদের মাধ্যমে বড় বিপদ থেকে সুরক্ষা এবং দুনিয়ায় বিপদ দিয়ে আখেরাতে আল্লাহর কাছে মর্যাদা উচু করার মতো মঙ্গলময়ও হয়। আল্লাহ বলেন, ۞ وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ ۞ অর্থ : ‘আমি তোমাদের কিছু ভয়, ক্ষুধা ও ধনসম্পদ, জীবন ও ফলফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে অবশ্যই পরীক্ষা করব। সুতরাং সুসংবাদও দাও ধৈর্যশীলদের।’ [বাকারা: ১৫৫] ফলে কোন বিপদ পরীক্ষাস্বরূপ আর কোনটা কর্মফলস্বরূপ এটা যেহেতু পার্থক্য করা সবসময় সম্ভব হয় না, তাই যদি সাধারণ মানুষ তাকদিরের সকল ফয়সালাকে কল্যাণকর মনে করে সান্ত্বনা পায়, তবে তাতে দোষের কিছু নেই। অধিকন্তু কর্মফলস্বরূপ বিপদ এলেও মানুষ যদি সতর্ক হয়ে যায়, সেটাও তার জন্য শেষ পর্যন্ত কল্যাণকরই। তাই সাধারণ মানুষের এমন বিশ্বাসকে একেবারে ভুল কিংবা ভিত্তিহীন বলার অবকাশ নেই।

টিকাঃ
১১৫৭. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৩৩).
১১৫৮. আল-মুতামাদ ফিল মুতাকাদ (৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00