📘 ইমাম আজমের আকিদা 📄 ভালোমন্দ দুটোই আল্লাহর ইচ্ছার অধীন

📄 ভালোমন্দ দুটোই আল্লাহর ইচ্ছার অধীন


ভালোমন্দের সম্পর্ক নিয়ে কাদারিয়্যাহ, ফালাসিফাহ ও মুতাযিলা সম্প্রদায়ের আরও একটা বিচ্যুতি হলো—তারা মনে করে, বান্দার মন্দ কাজে আল্লাহর কোনো ইচ্ছা (ইরাদা ও মাশিয়াহ) নেই। ফলে ফাসেক ব্যক্তি যখন গুনাহ করে কিংবা কোনো কাফের যখন কুফর করে, তাতে আল্লাহর ইচ্ছা থাকে না; বরং সে নিজের ইচ্ছায় করে। কারণ, আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী হলে তাকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ থাকত না। বরং শাস্তি দিলে জুলুম হিসেবে গণ্য হতো। অথচ আল্লাহ গুনাহের শাস্তি দেবেন। বোঝা গেল, গুনাহ ও কুফর আল্লাহর ইচ্ছার অধীন নয়। উলটো আহলে সুন্নাত যেহেতু পুণ্য ও পাপ সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছার অধীন বলেন, এ জন্য তারা আহলে সুন্নাতকে ‘জালেম’ (أهل الجور) আখ্যা দিয়ে নিজেদের ‘ইনসাফগার’ (أهل العدل) দাবি করে।

এটা সুস্পষ্ট বিচ্যুতি। কারণ, আল্লাহর ইচ্ছার উপর কারও ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয় না। ফলে আল্লাহ কারও গুনাহ বা কুফরের ইচ্ছা না করা সত্ত্বেও কেউ সেটা করতে পারবে এমন কোনো সুযোগ নেই। বরং গুনাহ ও কুফরও আল্লাহর ইচ্ছাতেই সংঘটিত হচ্ছে। তাকদিরের ভালোমন্দ দুটোই আল্লাহর জ্ঞান, ইচ্ছা, সৃষ্টি ও নির্ধারণে সম্পন্ন হয়। কিন্তু আল্লাহ কাউকে বাধ্য করেন না। ফলে এর দায়ভারও মানুষের কাঁধে। ১১৫৫

টিকাঃ
১১৫৫. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (৮)। আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ (১৬৭-১৬৮, ২৮৬)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা 📄 আল্লাহর উপর কোনোকিছু আবশ্যক নয়

📄 আল্লাহর উপর কোনোকিছু আবশ্যক নয়


উপরের বিচ্যুতি এসব সম্প্রদায়কে আরেক বিচ্যুতির দিকে ঠেলে দেয়। তারা মনে করে, আল্লাহর উপর বান্দার জন্য কল্যাণকর ফয়সালা করা আবশ্যক (ওয়াজিব)। অর্থাৎ, তাকদির শুধু ভালো ও ইতিবাচক। ভালো কিছু ঘটলে মনে করতে হবে তাকদিরের ফল। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত অনুগ্রহ। বিপরীতে তাকদিরে মন্দের উপস্থিতি নেই। আল্লাহ মানুষের জন্য খারাপ কিছু নির্ধারণ করেন না। ফলে মন্দ কিছু হলে সেটা মানুষের সৃষ্টি, আল্লাহর নয়। আল্লাহর উপর স্রেফ ভালোটা করা আবশ্যক!

তারা মূলত কুরআন-সুন্নাহর কিছু বক্তব্য ভুল বুঝে সেগুলোকে নিজেদের দলিল মনে করে। অথচ বাস্তবে সেগুলো আদৌ তাদের মতবাদের দলিল নয়। তারা আল্লাহ তায়ালার এই বাণী তাদের দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে: ۞ وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا ۚ كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُبِينٍ ۞ ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকলের জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহরই। তিনি এদের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত; সুস্পষ্ট কিতাবে সবকিছুই আছে।’ [হুদ : ৬] এখানে আল্লাহ নিজের উপর গোটা সৃষ্টির রিযিককে আবশ্যক (ওয়াজিব) করে নিয়েছেন। এ জন্য তারা মনে করে ভালোটা করাও আল্লাহর উপর আবশ্যক। মন্দটা তাঁর পক্ষ থেকে নয়।

আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো, উপরের আয়াত আল্লাহর উপর আবশ্যক বোঝায় না; বরং উলটো তাঁর অনুগ্রহ বোঝায়। তিনি নিজ অনুগ্রহে সবার রিযিকের দায়িত্ব নিয়েছেন। কারণ, তাঁর দায়িত্ব নেওয়া ছাড়া সৃষ্টি রিযিক লাভ করতে পারবে না। বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।

বিপরীতে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে নিজের পূর্ণ স্বাধীনতা ও এখতিয়ারের জানান দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَٰكِن يُضِلُّ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ ۚ وَلَتُسْأَلُنَّ عَمَّا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ ۞ অর্থ ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদের সবাইকে এক জাতি করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। তোমরা যা করো সে বিষয়ে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।’ [নাহল : ৯৩] আল্লাহ অন্যত্র বলেন, ۞ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ ۚ وَيَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ ۞ অর্থ ‘আল্লাহ যাকে বিপথগামী করেন তাকে কেউ হেদায়াত দিতে পারে না। আর আল্লাহ তাদের ছেড়ে দেন। ফলে তারা তাদের অবাধ্যতার ভিতর উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।’ [আরাফ : ১৮৬] এসব আয়াতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আল্লাহ মানুষকে বিভ্রান্ত করার কথা বলছেন। অথচ সেটা তাদের জন্য কল্যাণকর নয়। বোঝা গেল, বান্দার কল্যাণটাই করতে হবে। আল্লাহর উপর এটা আবশ্যক নয়। তা ছাড়া, আল্লাহর উপর কোনোকিছু আবশ্যক করার অর্থ হলো তাকে ‘বাধ্য’ ও ‘পরাধীন’ করে ফেলা; অথচ এটা ঈমান বিধ্বংসী কথা। ১১৫৬

টিকাঃ
১১৫৬. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১২২-১২১)। আল-বিদায়াহ মিনাল কিফায়াহ (১২৯-১২৮)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা 📄 ‘যা হয়েছে ভালোর জন্য হয়েছে

📄 ‘যা হয়েছে ভালোর জন্য হয়েছে


উপরের আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি বিষয় হলো—মুসলিম সর্বসাধারণের মাঝে একটি বহুল প্রচলিত বক্তব্য : ‘তাকদিরে আল্লাহ যা লিখেছেন ভালোর জন্যই লিখেছেন’ কিংবা ‘যা হয়েছে ভালোর জন্যই হয়েছে।’ শরিয়তে এই কথার ভিত্তি কী? বান্দা বিভিন্ন মুসিবত-সংকট দ্বারা আক্রান্ত হলেও কি সবসময় সেটা তার ভালোর জন্য হয়েছে এমনটা মানতে হবে?

আবুল ইউসর বাযদাবি বলেন, ‘এটা সাধারণ মানুষের কথা। তারা আল্লাহর প্রতি সম্মান রেখে এমন কথা বলে এবং এমন বিশ্বাস রাখে। কিন্তু আমরা এর সঙ্গে একমত নই। কাউকে এমন বলতে দেখলে নিষেধ করি।১১৫৭ কারণ, এটার অর্থ অনেকটা এমন হয় যে, বান্দার ভালোটা করা আল্লাহর উপর আবশ্যক। অথচ উপরে এ ধরনের বক্তব্যকে আমরা নাকচ করেছি। তা ছাড়া, মানুষ অনেক সময় নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনে। ফলে তার কর্মফলস্বরূপ বিপদ আসে। এখানে বিপদটা তার ভালোর জন্য এসেছে এমন নয়; তার কর্মের কারণে এসেছে। ফলে এটা তার জন্য মঙ্গলময় নয়; বরং এটা তার মন্দ কর্মের মন্দ পরিণতি। সে যদি ভালো কাজ করত, চিন্তাভাবনা করে কাজ করত এবং আরও সাবধান হতো, হয়তো তাকে এ বিপদে পড়তেই হতো না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ﴿ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ ﴾ অর্থ : ‘তোমাদের উপর যেসব বিপদাপদ পতিত হয় তা তোমাদের কর্মের ফল। উপরন্তু তিনি তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেন।’ [শুরা : ৩০] এখানে মুসিবতকে মানুষের কর্মফল সাব্যস্ত করা হয়েছে। অন্য আয়াতে আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেন, ﴿وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ ﴾

‘স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে মানুষের কৃতকর্মের ফলে, যাতে তিনি তাদের কর্মের কিছু শাস্তি তিনি তাদের আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ [রুম : ৪১] এখানে মানুষের কর্মফলকে ‘ফ্যাসাদ’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যা কল্যাণের বিপরীত। আয়াতের শেষে তাদের ‘কর্মফল ভোগ’ করার কথা বলা হয়েছে, যেটা কল্যাণের বিপরীত; অকল্যাণ। ফলে মন্দ কাজের মন্দ ফল কিংবা ভুলের পরিণতি সবসময় ভালো কিংবা মঙ্গল দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কাসানি লিখেন, ‘বান্দার জন্য ভালোটা করা আল্লাহর উপর আবশ্যক নয়; বরং আল্লাহ যেভাবে চান সেভাবে করেন। ফলে যদি কিছু বান্দার জন্য কল্যাণকর হয় সেটা আল্লাহর অনুগ্রহ। আর যদি কল্যাণকর না হয় তবে সেটা তাঁর ইনসাফ।’১১৫৮

তবে অধমের পর্যবেক্ষণ হলো, যদি মানুষ নিজের সর্বাত্মক চেষ্টা-প্রচেষ্টা ব্যয় করেও, সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও বিপদে আক্রান্ত হয়, তখন সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণের ফয়সালা হিসেবে মেনে নিতে হবে। এর সঙ্গে আল্লাহর উপর কিছু আবশ্যক করার সম্পর্ক নেই। কারণ, বিপদ যেমন অনেক সময় কর্মফলস্বরূপ হয়, অনেক সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ, কল্যাণস্বরূপ, ছোট বিপদের মাধ্যমে বড় বিপদ থেকে সুরক্ষা এবং দুনিয়ায় বিপদ দিয়ে আখেরাতে আল্লাহর কাছে মর্যাদা উচু করার মতো মঙ্গলময়ও হয়। আল্লাহ বলেন, ۞ وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ ۞ অর্থ : ‘আমি তোমাদের কিছু ভয়, ক্ষুধা ও ধনসম্পদ, জীবন ও ফলফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে অবশ্যই পরীক্ষা করব। সুতরাং সুসংবাদও দাও ধৈর্যশীলদের।’ [বাকারা: ১৫৫] ফলে কোন বিপদ পরীক্ষাস্বরূপ আর কোনটা কর্মফলস্বরূপ এটা যেহেতু পার্থক্য করা সবসময় সম্ভব হয় না, তাই যদি সাধারণ মানুষ তাকদিরের সকল ফয়সালাকে কল্যাণকর মনে করে সান্ত্বনা পায়, তবে তাতে দোষের কিছু নেই। অধিকন্তু কর্মফলস্বরূপ বিপদ এলেও মানুষ যদি সতর্ক হয়ে যায়, সেটাও তার জন্য শেষ পর্যন্ত কল্যাণকরই। তাই সাধারণ মানুষের এমন বিশ্বাসকে একেবারে ভুল কিংবা ভিত্তিহীন বলার অবকাশ নেই।

টিকাঃ
১১৫৭. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৩৩).
১১৫৮. আল-মুতামাদ ফিল মুতাকাদ (৬)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px