📄 সামর্থ্যের প্রকারভেদ
প্রশ্ন হতে পারে, যেহেতু মানুষ আল্লাহর দেওয়া শক্তি-সামর্থ্য দিয়েই গুনাহের কাজ করে, তিনি গুনাহের শক্তি না দিলে মানুষ গুনাহ করতে পারত না, তাহলে এর জন্যও তো প্রকারান্তরে আল্লাহই দায়ী হচ্ছেন!
প্রাথমিকভাবে এটা সত্য ও সঠিক। অর্থাৎ, মানুষের সব ধরনের সামর্থ্য আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। এটাকে অস্বীকার করা যাবে না যেমনটা কাদারিয়্যাহ ও মুতাযিলারা করেছে। কারণ, তাতে আল্লাহ থেকে মানুষের অমুখাপেক্ষীতা ফুটে ওঠে। ইমাম আজম আল্লাহপ্রদত্ত সামর্থ্য প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে দেওয়া সামর্থ্য (ইস্তিতাআহ) কাজ করার সময় আসে; কাজের আগেও না পরেও না। কারণ, কাজটি করার আগেই যদি তার সামর্থ্য থাকে, তবে তো কাজটি করার সময় সে আল্লাহর মুখাপেক্ষী থাকল না। অথচ কুরআন বলছে, ۞ وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَأَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ ۞ অর্থ : ‘আল্লাহ অমুখাপেক্ষী আর তোমরা সবাই মুখাপেক্ষী।’ [মুহাম্মাদ : ৩৮] একইভাবে কাজটি সম্পন্ন করার পরে সামর্থ্য আসবে সেটাও অসম্ভব। কারণ, আল্লাহর দেওয়া সামর্থ্য ছাড়া মানুষের কোনো কাজ করা সম্ভব নয়।”১১৫১
প্রশ্ন হতে পারে, সামর্থ্য যদি আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়, তবে মানুষকে দায়ী করার কী যুক্তি? আল্লাহ সামর্থ্য না দিলে তো কাজটিই হতো না। দুইভাবে ইমামগণ এর জবাব দিয়েছেন :
এক. আল্লাহ মানুষকে স্বাধীনতার উদ্দেশ্যেই সামর্থ্য দিয়েছেন। তাকে যদি কোনো ধরনের সামর্থ্য না দিতেন, তবে সে তো সম্পূর্ণ পরাধীন হয়ে পড়ত। ফলে তাকে সামর্থ্য দেওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু যেহেতু সে সামর্থ্য নিজ স্বাধীনতা অনুযায়ী ব্যয় করতে পারছে, ফলে এর পাপ-পুণ্যের দায়ভারও তার কাঁধে। ইমাম আজম বলেন, ‘মানুষের গুনাহ করার জন্য যে ইস্তিতাআহ (সামর্থ্য)-এর দরকার হয়, পুণ্য করার জন্যও সেই একই (ইস্তিতাআহ) সামর্থ্যের দরকার হয়। তিনি মানুষকে স্বাধীনভাবে এই সামর্থ্য দিয়েছেন, কিন্তু সেটা পাপের পরিবর্তে পুণ্যের কাজে ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে এখন মানুষ যদি সেটা পাপের কাজে ব্যবহার করে, তবে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন এবং এটা ইনসাফ।’১১৫২
দুই. সামর্থ্যটা দুই ভাগে ভাগ করা হবে। এক. বান্দার শারীরিক সুস্থতা ও প্রস্তুতি। এটা কাজের আগে। দুই. আল্লাহর তৌফিক। এটাই মূল সামর্থ্য। এটা ছাড়া কাজ হয় না। কিন্তু বান্দাকে প্রথম প্রকারের সামর্থ্যের জন্য (অর্থাৎ, তার নিজের সক্ষমতার ভিত্তিতে) জবাবদিহি করতে হবে। তার সামর্থ্যের বাইরে থাকলে সেটার জন্য জবাবদিহি করতে হবে না।
প্রশ্ন আসতে পারে, আকিদার বিভিন্ন কিতাবে দুই প্রকারের সামর্থ্যের কথা দেখা যায়, আমরাও এখানে তা-ই বলেছি। তাহলে ইমাম আজম উপরে স্রেফ এক প্রকারের সামর্থ্যের কথা কেন বললেন (আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে দেওয়া সামর্থ্য (ইস্তিতাআহ) কাজ করার সময় আসে; কাজের আগেও না পরেও না।)?
এটা কয়েকটা কারণে বলেছেন। (এক.) প্রথম প্রকারের সামর্থ্যটা আল্লাহপ্রদত্ত সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল। (দুই) দ্বিতীয় প্রকারের সামর্থ্যই মূল, প্রথম প্রকারের নয়। (তিন) মুতাযিলারা দ্বিতীয় প্রকারের মূল সামর্থ্য (তথা কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত সামর্থ্য) নাকচ করে স্রেফ প্রথম প্রকারের সামর্থ্যের কথা বলে (কারণ, তাদের কাছে বান্দা সর্বেসর্বা, আল্লাহর পক্ষ থেকে করণীয় কিছু নেই, তাকদির নেই)। তারা কেবল কাজের আগে বিদ্যমান সামর্থ্যের কথা বলে। ফলে তাদের খণ্ডনে ইমাম কাজের আগের সামর্থ্যের বিদ্যমানতা নাকচ করেছে। দ্বিতীয় প্রকারের সামর্থ্য তথা মূল সামর্থ্য আল্লাহর তৌফিকের কথা উল্লেখ করেছেন।
তাঁর অনুসরণে আবু হাফস বুখারি, মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল বলখি ও বাযদাবিসহ অনেক হানাফি আলেম প্রথম প্রকারের সামর্থ্যের কথা উল্লেখ করেননি। তবে বক্তব্য স্পষ্ট করার জন্য ইমাম তহাবি, মাতুরিদি, আবু সালামা সমরকন্দি, নাসাফি, সাবুনি, গযনবি, খাব্বাযি, লামিশিসহ অধিকাংশ হানাফি আলেমই দুই প্রকারের সামর্থ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। ইমাম তহাবি লিখেন, ‘সামর্থ্য দুই প্রকারের। এক প্রকারের সামর্থ্য যা কাজের ঘটক হিসেবে পরিগণিত এবং ঘটার জন্য অপরিহার্য। এটা আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত। যেমন—তৌফিক দান। এমন সামর্থ্য বান্দার দিকে সম্পৃক্ত করা বৈধ নয় (উপরে ইমাম আজম এটার কথা বলেছেন)। আরেক প্রকারের সামর্থ্য কাজের কার্যকারণ (ঘটক নয়)। যেমন—সুস্থতা, সক্ষমতা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, উপায়-উপকরণ বিদ্যমান থাকা। এটা বান্দার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং শরিয়তের আদেশ-নিষেধ এই প্রকারের সামর্থ্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে। কুরআনে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে চাপিয়ে দেন না।’১১৫৩
মোটকথা, মানুষের সামর্থ্য দুই প্রকারের। একটা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তৌফিক যা বান্দার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায় না। এটা কাজ করার সময় জরুরি হয়। এটা না থাকলে কাজ সম্পাদিত হয় না। আরেকটা হলো কাজের আগে বিদ্যমান থাকা; যেমন—সুস্থতা, কাজ করার শক্তি, উপকরণ ইত্যাদি বিদ্যমান থাকা। এটা বান্দার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায় এবং কাজ করার আগে বিদ্যমান থাকা জরুরি হয়। কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় বিশ্বাস করে—মানুষের মাঝে সব ধরনের সামর্থ্য সবসময় বিদ্যমান থাকে। ফলে সে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। এটা গলত কথা। এমন বলা হলে আল্লাহর প্রতি মানুষের কোনো মুখাপেক্ষিতা থাকে না; অথচ আল্লাহ থেকে অমুখাপেক্ষিতা কুফর। এখানেই তাদের বিচ্যুতি। ১১৫৪
টিকাঃ
১১৫১. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪৮-৪৯)। আরও দেখুন : উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১২০)। আস-সাওয়াদুল আজম। (৩৮) আল-ইতিকাদ, বলখি (১০৬)।
১১৫২. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৩)।
১১৫৩. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৬-২৭)। ইমাম মাতুরিদি বলেন, ‘আমাদের কাছে কুদরত (বা ইস্তিতাআহ= সামর্থ্য) দুই প্রকারের। এক. উপায়-উপকরণ ঠিক থাকা। এটা কাজের আগে বিদ্যমান থাকা জরুরি। এটা থাকলেই কাজ হয়ে যাবে এমন নয়। দুই. কাজ করার সময় বিদ্যমান সামর্থ্য। যখন কাজ সংঘটিত হয় তখন এর মাধ্যমেই সংঘটিত হয়।’ [আত-তাওহিদ (১৮৮)] আবু সালামা সমরকন্দি (৩৪০ হি.) লিখেন, ‘সামর্থ্য দুই প্রকারের—একটা হলো অবস্থাগত সামর্থ্য। অর্থাৎ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুস্থ থাকা, উপায়-উপকরণ সক্রিয় ও শুদ্ধ থাকা। অপরটা হলো কর্মগত সামর্থ্য। এটা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তৌফিক দেওয়া না-দেওয়া, তাকদির ও ফয়সালা ইত্যাদি।’ [জুমাল মিন উসুলিদ্দিন (২৫)]
মাইমুন নাসাফি লিখেন, ‘সামর্থ্য (ইস্তিতাআহ), কুওয়াত (শক্তি), কুদরত, ‘তাকাত’—এগুলো সব কাছাকাছি অর্থবোধক শব্দ। কুদরত ও ইস্তিতাআহ আমাদের কাছে দুই প্রকারের : এক. উপায়-উপকরণ এবং মাধ্যম-হাতিয়ারের বিশুদ্ধতা। এটা কাজের আগে আসে। এটা কাজের মূল সংঘটক নয়। তবে এগুলো ছাড়াও কাজ হয় না। মোটকথা, এগুলো আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত; যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। এ ধরনের ইস্তিতাআহকে, এক কথায়, কাজের প্রস্তুতি বলা যেতে পারে। কুরআনে এর উদাহরণ, যেমন—আল্লাহ তায়ালার বাণী : ۞ فَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّينَ مِسْكِينًا ۞ অর্থ : ‘ (যিহারের কাফফারা) যে ব্যক্তি দিতে সমর্থ না হবে, সে ষাটজন মিসকিনকে খাওয়াবে।’ [মুজাদালাহ : ৪] দুই. এটা কাজের সময় আল্লাহপ্রদত্ত বিশেষ সাহায্য, যা কাজের আগে বোঝার ক্ষমতা নেই। এই সাহায্যে বান্দা কাজটা করতে পারে। ফলে এটা কাজের মূল কারণ (ঘটক)। এই প্রকারের সামর্থ্যের উদাহরণ হলো, আল্লাহর বাণী : ۞ وَسَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَوِ اسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ ۞ অর্থ: ‘তারা শীঘ্রই আল্লাহর নামে শপথ করে বলবে, আমাদের সামর্থ্য থাকলে তোমাদের সঙ্গে বের হতাম!’ [তাওবা: ৪২] এখানে আল্লাহ তাদের মিথ্যাপ্রতিপন্ন করেছেন। কারণ, তাদের সামর্থ্য আছে কি না সেটা মদিনার ভিতরে বসে বোঝা যাবে না। যদি মদিনা থেকে বাইরে যুদ্ধের জন্য বের হতো, এরপর পারত কি পারত না বোঝা যেত।’ [দেখুন: তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/৭৮০-৭৮১)]
আলাউদ্দিন উসমান্দি লিখেন, ‘ইস্তিতাআহ তথা সামর্থ্য দুই প্রকারের। একটা হলো অবস্থাগত সামর্থ্য তথা উপায়-উপকরণ প্রস্তুত থাকা, শরীর সুস্থ থাকা। এটা কাজের আগে। ... আরেকটা হলো কর্মগত সামর্থ্য। এটা আহলে সুন্নাতের মতে কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মুতাযিলা এটাকেও কাজের আগে মনে করে।’ [দেখুন: লুবাবুল কালাম, উসমান্দি (পাণ্ডুলিপি : ৬৩)] খাব্বাযি লিখেন, ‘সামর্থ্য দু প্রকারের। এক. উপায়-উপকরণের বিশুদ্ধতা। এটা কাজের আগে আসে। (আল্লাহর পক্ষ থেকে) দায়িত্ব এটার উপর ভিত্তি করে। কারণ, এটা না থাকলে দায়িত্বই আসবে না। দুই. প্রকৃত সামর্থ্য। এটা না থাকলে কাজই হবে না। এটা কাজের সময় থাকে।’ [আল-হাদি ফি উসুলিদ্দিন (১৪৭-১৪৮)]
আবদুল্লাহ নাসাফি লিখেন, ‘সামর্থ্য (ইস্তিতাআহ), শক্তি (তাকাত), কুদরত, কুওয়াত ইত্যাদি সব সমার্থক শব্দ। এটা দুই প্রকারের। এক. উপায়-উপকরণ শুদ্ধ থাকা। এটা কাজের আগে আসে, যাতে বান্দা নিজের ইচ্ছা ও স্বাধীনতায়, নিজ সামর্থ্যে কাজটি করার প্রস্তুতি নিতে পারে। যেমন—আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا ۞ অর্থ: ‘যারা সফরের সামর্থ্য রাখে তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বাইতুল্লাহর হজ করা আবশ্যক।’ [আলে ইমরান: ৯৭] এখানে সামর্থ্য বলতে কাজের আগের সামর্থ্য বোঝানো হয়েছে। এগুলো থাকলেই কাজ বাস্তবায়িত হয়ে যাবে এমন নয়। দুই. হাকিকি সামর্থ্য। এটা কাজের ঘটক। এটার মাধ্যমেই কাজ সংঘটিত হয়। এটা ছাড়া কাজ হয় না। যেমন—আল্লাহ বলেন, ۞ أَمَا كَانُوا يَسْتَطِيعُونَ السَّمْعَ وَمَا كَانُوا يُبْصِرُونَ ۞ ‘তারা শুনতে পারত না, দেখতে পেত না।’ [হুদ : ২০] এখানে আল্লাহ তাদের নিন্দা করেছেন। কারণ, তাদের উপায়-উপকরণ সবকিছু বিশুদ্ধ থাকা সত্ত্বেও তারা অন্যায়ের পথে হেঁটেছে। শুনেও শোনেনি, দেখেও দেখেনি। ফলে হেদায়াত পায়নি।’ [আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (২৭৯-২৮০)। আরও দেখুন: আত-তামহিদ, লামিশি (৯৩)] কাসানি দুটো প্রকারকে আরও স্পষ্ট করে লিখেন, ‘বান্দার ইস্তিতাআহ তথা সামর্থ্য যার মাধ্যমে সে কাজ করে সেটা কাজের সঙ্গে বিদ্যমান থাকে, আগেও নয় পরেও নয়। আর ‘তাকলিফ’ তথা দায়িত্বের সামর্থ্য (অর্থাৎ, যা কাজের মূল ঘটক নয়, কিন্তু যার উপর ভিত্তি করে কাজটা শরিয়তের পক্ষ থেকে বান্দার উপর আবশ্যক হয়) সেটা কাজের আগে আসে। যেমন—উপায়-উপকরণ বিশুদ্ধ থাকা।’ [আল-মুতামাদ, কাসানি (৬)]
১১৫৪. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (১৭)। আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ, সাবুনি (২৪৩-২৪৪)। এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়; তা হলো, বাহ্যত তহাবি, মাতুরিদি, সমরকন্দি, নাসাফি, সাবুনি—সহ হানাফি আলেমদের বক্তব্য ইমাম আজমের বক্তব্যের বিপরীত। কারণ, ইমাম আজম কেবল একধরনের সামর্থ্যের কথা বলেছেন যা কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিপরীতে তাঁর অনুসারী হানাফি আলেমগণ কাজের আগেও একধরনের সামর্থ্যের অস্তিত্বের কথা বলেছেন। এ কারণে আবুল ইউসর বাযদাবি—সহ কেউ কেউ এসব বক্তব্যকে গলত বলেছেন। বাযদাবি লিখেন, ‘খোরাসান ও ইরাকে আমাদের একদল ফকিহ মনে করেন—সামর্থ্য কাজের আগে পাওয়া যায়। এটা গলত বক্তব্য। মুতাযিলাদের কাছ থেকে নেওয়া। কারণ, কাজের আগে সামর্থ্যের কথা বলা মানে মানুষকে কাজের সৃষ্টিকর্তা বানিয়ে ফেলা।’ [উসুলুদ্দিন, বাযদাবি: ১২১] কিন্তু বাযদাবির কথা বরং গলত। কারণ, ইমাম তহাবি—সহ যেসব আলেম পূর্ব সামর্থ্যের কথা বলেছেন তারা মূলত বান্দার সুস্থতা, শারীরিক উপকরণ ইত্যাদি বিদ্যমান থাকার কথা বলেছেন। এটা প্রকৃত সামর্থ্য নয়। কারণ, এগুলো থাকলেই কেউ কোনো কাজ করতে পারবে সেটার নিশ্চয়তা নেই। বরং প্রকৃত সামর্থ্য হলো আল্লাহর দেওয়া শক্তি ও তৌফিক যার মাধ্যমে কাজ সংঘটিত হয় এবং যা ছাড়া কাজ সংঘটিত হয় না। ফলে ইমাম তহাবি—সহ এসব আলেম আর ইমাম আজমের কথার মাঝে কোনো সংঘর্ষ নেই। বরং আল্লাহ তায়ালাও এ ধরনের (পূর্ব) সামর্থ্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন [আলে ইমরান: ৯৭; তাগাবুন: ১৬] তা ছাড়া, এটা স্রেফ কয়েকজন আলেমের বক্তব্য নয়, বরং অধিকাংশ হানাফি আলেমই দুই প্রকারের সামর্থ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। উপরে সেগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে বলখি, বাযদাবি—সহ যারা কেবল এক প্রকারের সামর্থ্যের কথা উল্লেখ করেছেন, সেটা মূলত ইমামের মতো প্রথম প্রকারের সামর্থ্যটাকে গৌণ ধরার কারণে। অর্থাৎ, সে সামর্থ্যটা মূলত আল্লাহর দেওয়া তৌফিকেই হয়; আল্লাহ না চাইলে কেউ সুস্থ থাকতে পারে না, উপকরণ প্রস্তুত করতে পারে না। এ জন্য তারা মূল সামর্থ্য তথা দ্বিতীয় প্রকারটাকেই একটা ধরে উল্লেখ করেছেন। ফলে তফসিলি বক্তব্য ভিন্ন হলেও তাদের মূল কথা এক।
📄 ভালোমন্দ দুটোই আল্লাহর ইচ্ছার অধীন
ভালোমন্দের সম্পর্ক নিয়ে কাদারিয়্যাহ, ফালাসিফাহ ও মুতাযিলা সম্প্রদায়ের আরও একটা বিচ্যুতি হলো—তারা মনে করে, বান্দার মন্দ কাজে আল্লাহর কোনো ইচ্ছা (ইরাদা ও মাশিয়াহ) নেই। ফলে ফাসেক ব্যক্তি যখন গুনাহ করে কিংবা কোনো কাফের যখন কুফর করে, তাতে আল্লাহর ইচ্ছা থাকে না; বরং সে নিজের ইচ্ছায় করে। কারণ, আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী হলে তাকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ থাকত না। বরং শাস্তি দিলে জুলুম হিসেবে গণ্য হতো। অথচ আল্লাহ গুনাহের শাস্তি দেবেন। বোঝা গেল, গুনাহ ও কুফর আল্লাহর ইচ্ছার অধীন নয়। উলটো আহলে সুন্নাত যেহেতু পুণ্য ও পাপ সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছার অধীন বলেন, এ জন্য তারা আহলে সুন্নাতকে ‘জালেম’ (أهل الجور) আখ্যা দিয়ে নিজেদের ‘ইনসাফগার’ (أهل العدل) দাবি করে।
এটা সুস্পষ্ট বিচ্যুতি। কারণ, আল্লাহর ইচ্ছার উপর কারও ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয় না। ফলে আল্লাহ কারও গুনাহ বা কুফরের ইচ্ছা না করা সত্ত্বেও কেউ সেটা করতে পারবে এমন কোনো সুযোগ নেই। বরং গুনাহ ও কুফরও আল্লাহর ইচ্ছাতেই সংঘটিত হচ্ছে। তাকদিরের ভালোমন্দ দুটোই আল্লাহর জ্ঞান, ইচ্ছা, সৃষ্টি ও নির্ধারণে সম্পন্ন হয়। কিন্তু আল্লাহ কাউকে বাধ্য করেন না। ফলে এর দায়ভারও মানুষের কাঁধে। ১১৫৫
টিকাঃ
১১৫৫. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (৮)। আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ (১৬৭-১৬৮, ২৮৬)।
📄 আল্লাহর উপর কোনোকিছু আবশ্যক নয়
উপরের বিচ্যুতি এসব সম্প্রদায়কে আরেক বিচ্যুতির দিকে ঠেলে দেয়। তারা মনে করে, আল্লাহর উপর বান্দার জন্য কল্যাণকর ফয়সালা করা আবশ্যক (ওয়াজিব)। অর্থাৎ, তাকদির শুধু ভালো ও ইতিবাচক। ভালো কিছু ঘটলে মনে করতে হবে তাকদিরের ফল। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত অনুগ্রহ। বিপরীতে তাকদিরে মন্দের উপস্থিতি নেই। আল্লাহ মানুষের জন্য খারাপ কিছু নির্ধারণ করেন না। ফলে মন্দ কিছু হলে সেটা মানুষের সৃষ্টি, আল্লাহর নয়। আল্লাহর উপর স্রেফ ভালোটা করা আবশ্যক!
তারা মূলত কুরআন-সুন্নাহর কিছু বক্তব্য ভুল বুঝে সেগুলোকে নিজেদের দলিল মনে করে। অথচ বাস্তবে সেগুলো আদৌ তাদের মতবাদের দলিল নয়। তারা আল্লাহ তায়ালার এই বাণী তাদের দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে: ۞ وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا ۚ كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُبِينٍ ۞ ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকলের জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহরই। তিনি এদের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত; সুস্পষ্ট কিতাবে সবকিছুই আছে।’ [হুদ : ৬] এখানে আল্লাহ নিজের উপর গোটা সৃষ্টির রিযিককে আবশ্যক (ওয়াজিব) করে নিয়েছেন। এ জন্য তারা মনে করে ভালোটা করাও আল্লাহর উপর আবশ্যক। মন্দটা তাঁর পক্ষ থেকে নয়।
আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো, উপরের আয়াত আল্লাহর উপর আবশ্যক বোঝায় না; বরং উলটো তাঁর অনুগ্রহ বোঝায়। তিনি নিজ অনুগ্রহে সবার রিযিকের দায়িত্ব নিয়েছেন। কারণ, তাঁর দায়িত্ব নেওয়া ছাড়া সৃষ্টি রিযিক লাভ করতে পারবে না। বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।
বিপরীতে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে নিজের পূর্ণ স্বাধীনতা ও এখতিয়ারের জানান দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَٰكِن يُضِلُّ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ ۚ وَلَتُسْأَلُنَّ عَمَّا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ ۞ অর্থ ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদের সবাইকে এক জাতি করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। তোমরা যা করো সে বিষয়ে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।’ [নাহল : ৯৩] আল্লাহ অন্যত্র বলেন, ۞ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ ۚ وَيَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ ۞ অর্থ ‘আল্লাহ যাকে বিপথগামী করেন তাকে কেউ হেদায়াত দিতে পারে না। আর আল্লাহ তাদের ছেড়ে দেন। ফলে তারা তাদের অবাধ্যতার ভিতর উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।’ [আরাফ : ১৮৬] এসব আয়াতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আল্লাহ মানুষকে বিভ্রান্ত করার কথা বলছেন। অথচ সেটা তাদের জন্য কল্যাণকর নয়। বোঝা গেল, বান্দার কল্যাণটাই করতে হবে। আল্লাহর উপর এটা আবশ্যক নয়। তা ছাড়া, আল্লাহর উপর কোনোকিছু আবশ্যক করার অর্থ হলো তাকে ‘বাধ্য’ ও ‘পরাধীন’ করে ফেলা; অথচ এটা ঈমান বিধ্বংসী কথা। ১১৫৬
টিকাঃ
১১৫৬. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১২২-১২১)। আল-বিদায়াহ মিনাল কিফায়াহ (১২৯-১২৮)।
📄 ‘যা হয়েছে ভালোর জন্য হয়েছে
উপরের আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি বিষয় হলো—মুসলিম সর্বসাধারণের মাঝে একটি বহুল প্রচলিত বক্তব্য : ‘তাকদিরে আল্লাহ যা লিখেছেন ভালোর জন্যই লিখেছেন’ কিংবা ‘যা হয়েছে ভালোর জন্যই হয়েছে।’ শরিয়তে এই কথার ভিত্তি কী? বান্দা বিভিন্ন মুসিবত-সংকট দ্বারা আক্রান্ত হলেও কি সবসময় সেটা তার ভালোর জন্য হয়েছে এমনটা মানতে হবে?
আবুল ইউসর বাযদাবি বলেন, ‘এটা সাধারণ মানুষের কথা। তারা আল্লাহর প্রতি সম্মান রেখে এমন কথা বলে এবং এমন বিশ্বাস রাখে। কিন্তু আমরা এর সঙ্গে একমত নই। কাউকে এমন বলতে দেখলে নিষেধ করি।১১৫৭ কারণ, এটার অর্থ অনেকটা এমন হয় যে, বান্দার ভালোটা করা আল্লাহর উপর আবশ্যক। অথচ উপরে এ ধরনের বক্তব্যকে আমরা নাকচ করেছি। তা ছাড়া, মানুষ অনেক সময় নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনে। ফলে তার কর্মফলস্বরূপ বিপদ আসে। এখানে বিপদটা তার ভালোর জন্য এসেছে এমন নয়; তার কর্মের কারণে এসেছে। ফলে এটা তার জন্য মঙ্গলময় নয়; বরং এটা তার মন্দ কর্মের মন্দ পরিণতি। সে যদি ভালো কাজ করত, চিন্তাভাবনা করে কাজ করত এবং আরও সাবধান হতো, হয়তো তাকে এ বিপদে পড়তেই হতো না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ﴿ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ ﴾ অর্থ : ‘তোমাদের উপর যেসব বিপদাপদ পতিত হয় তা তোমাদের কর্মের ফল। উপরন্তু তিনি তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দেন।’ [শুরা : ৩০] এখানে মুসিবতকে মানুষের কর্মফল সাব্যস্ত করা হয়েছে। অন্য আয়াতে আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেন, ﴿وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ ﴾
‘স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে মানুষের কৃতকর্মের ফলে, যাতে তিনি তাদের কর্মের কিছু শাস্তি তিনি তাদের আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ [রুম : ৪১] এখানে মানুষের কর্মফলকে ‘ফ্যাসাদ’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যা কল্যাণের বিপরীত। আয়াতের শেষে তাদের ‘কর্মফল ভোগ’ করার কথা বলা হয়েছে, যেটা কল্যাণের বিপরীত; অকল্যাণ। ফলে মন্দ কাজের মন্দ ফল কিংবা ভুলের পরিণতি সবসময় ভালো কিংবা মঙ্গল দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কাসানি লিখেন, ‘বান্দার জন্য ভালোটা করা আল্লাহর উপর আবশ্যক নয়; বরং আল্লাহ যেভাবে চান সেভাবে করেন। ফলে যদি কিছু বান্দার জন্য কল্যাণকর হয় সেটা আল্লাহর অনুগ্রহ। আর যদি কল্যাণকর না হয় তবে সেটা তাঁর ইনসাফ।’১১৫৮
তবে অধমের পর্যবেক্ষণ হলো, যদি মানুষ নিজের সর্বাত্মক চেষ্টা-প্রচেষ্টা ব্যয় করেও, সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও বিপদে আক্রান্ত হয়, তখন সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণের ফয়সালা হিসেবে মেনে নিতে হবে। এর সঙ্গে আল্লাহর উপর কিছু আবশ্যক করার সম্পর্ক নেই। কারণ, বিপদ যেমন অনেক সময় কর্মফলস্বরূপ হয়, অনেক সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ, কল্যাণস্বরূপ, ছোট বিপদের মাধ্যমে বড় বিপদ থেকে সুরক্ষা এবং দুনিয়ায় বিপদ দিয়ে আখেরাতে আল্লাহর কাছে মর্যাদা উচু করার মতো মঙ্গলময়ও হয়। আল্লাহ বলেন, ۞ وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ ۞ অর্থ : ‘আমি তোমাদের কিছু ভয়, ক্ষুধা ও ধনসম্পদ, জীবন ও ফলফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে অবশ্যই পরীক্ষা করব। সুতরাং সুসংবাদও দাও ধৈর্যশীলদের।’ [বাকারা: ১৫৫] ফলে কোন বিপদ পরীক্ষাস্বরূপ আর কোনটা কর্মফলস্বরূপ এটা যেহেতু পার্থক্য করা সবসময় সম্ভব হয় না, তাই যদি সাধারণ মানুষ তাকদিরের সকল ফয়সালাকে কল্যাণকর মনে করে সান্ত্বনা পায়, তবে তাতে দোষের কিছু নেই। অধিকন্তু কর্মফলস্বরূপ বিপদ এলেও মানুষ যদি সতর্ক হয়ে যায়, সেটাও তার জন্য শেষ পর্যন্ত কল্যাণকরই। তাই সাধারণ মানুষের এমন বিশ্বাসকে একেবারে ভুল কিংবা ভিত্তিহীন বলার অবকাশ নেই।
টিকাঃ
১১৫৭. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১৩৩).
১১৫৮. আল-মুতামাদ ফিল মুতাকাদ (৬)।