📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ভালোমন্দ দুটোই আল্লাহর সৃষ্টি

📄 ভালোমন্দ দুটোই আল্লাহর সৃষ্টি


কাদারিয়্যাহ, শিয়া, মুতাযিলা ও খারেজিসহ তাকদির অস্বীকারকারী সম্প্রদায়গুলোর একটি উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি হলো, তারা বিশ্বাস করে—বান্দার (মন্দ) কাজ আল্লাহর সৃষ্টি নয়, বরং বান্দার নিজের সৃষ্টি। কাযি আবদুল জাব্বার (৪১৫ হি.) লিখেন, ‘মানুষের কাজ আল্লাহর সৃষ্টি নয়; (أن أفعال العباد ليست مخلوقة لله تعالى، وأنها أفعالهم)। এক্ষেত্রে তাদের যুক্তি হলো, যদি এগুলো আল্লাহর কাজই হতো, তবে আমাদের এগুলো থেকে ভালোমন্দের নির্দেশ দেওয়ার কিছু নেই। আমরা ভালো কিছু করলে প্রশংসা করা এবং সওয়াব দেওয়া আর খারাপ করলে নিন্দা করা এবং শাস্তি দেওয়ারও যুক্তি নেই। তা ছাড়া, বান্দার কাজ যদি আল্লাহর কাজই হতো, তবে সেটা আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী সংঘটিত হতো না। একইভাবে মানুষ আল্লাহকে গালি দেয়, তাঁর নিন্দা করে। তাহলে আল্লাহ কি নিজের গালি এবং নিজের নিন্দা সৃষ্টি করেছেন? একইভাবে (আল্লাহকে যদি মানুষের কাজের সৃষ্টিকর্তা বলা হয়, তবে) কেউ জুলুম করলে আল্লাহকে জালেম বলতে হবে; কেউ ইনসাফ করলে আল্লাহকে আদিল বলতে হবে...। সুতরাং প্রমাণিত হলো, মানুষের মন্দ কাজ আল্লাহর সৃষ্টি নয়; বরং (الأفعال القبيحة لم يخلقها الله عز وجل وأنها من فعل العباد)। কারণই তারা তাদের কর্মফল লাভ করে।’ ১১৪১

কিন্তু এগুলো কিছু শুবাহ ও সংশয়; কুরআন-সুন্নাহর বিশুদ্ধ সমঝ নয়।

যেহেতু ইমাম রহ.-এর যুগেই কাদারিয়‍্যাহ ও মুতাযিলা সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, ফলে তাকদিরের ক্ষেত্রে সকল বিচ্যুতির তিনি জবাব দেন। এ কারণে ইমামের বিভিন্ন গ্রন্থে তাদের উপরের সংশয়ের জবাব রয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি শরয়ি তথা কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জবাব যেমন দিয়েছেন, তেমনই যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়েও খণ্ডন করেছেন। ইমাম বলেন, “ভালো (খাইর) ও মন্দ (শার) দুটোই আল্লাহর সৃষ্টি। যেমন—আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ۞ قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ ۞ ۞ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ ۞ অর্থ : ‘আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের পালনকর্তার, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে।” [ফালাক: ১-২]১১৪২

ইমামের উল্লেখকৃত আয়াতে আল্লাহ ‘সৃষ্টির মন্দত্ব’-কে সরাসরি নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। আরও বিভিন্ন আয়াতে তিনি এটা করেছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ ۞ অর্থ : ‘প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদের এবং তোমাদের সকল কাজকে।’ [সাফফাত : ৯৬] এখানে মানুষের সকল কাজকে আল্লাহর সৃষ্টি বলা হয়েছে। তা ছাড়া, উপরের আয়াতে মন্দ কাজকেও সুনির্ধারিতভাবে আল্লাহর সৃষ্টি বলা হয়েছে। তাই এগুলোকে মানুষের সৃষ্টি বলা মূলত আল্লাহর পাশাপাশি মানুষকেও সৃষ্টিকর্তা সাব্যস্ত করা। এ জন্যই তাকদির অস্বীকারকারী (কাদারিয়্যাহ ও মুতাযিলা) সম্প্রদায়কে অগ্নিপূজক বলা হয়েছে। কারণ, অগ্নিপূজকরাও দুই খোদায় বিশ্বাসী।১১৪৩ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘শেষ যুগে একটি সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা বলবে, তাকদির বলতে কিছু নেই। সাবধান! তারা এই উম্মতের অগ্নিপূজারী (মাজুস)। তারা অসুস্থ হলে তোমরা দেখতে যাবে না, মৃত্যুবরণ করলে উপস্থিত হবে না।’১১৪৪

মোটকথা, ভালো ও মন্দ উভয়টাই আল্লাহর পক্ষ থেকে। কারণ, আল্লাহ যদি চাইতেন সৃষ্টিতে কুফর-শিরক কিছু থাকবে না, কেউ তার অবাধ্য হবে না, তবে তিনি সেটা করতে পারতেন। কিন্তু হিকমতের কারণে করেননি। ফলে মন্দটাও তিনিই সৃষ্টি করেছেন, তিনিই একে অস্তিত্বে এনেছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত রাখবেন। সুতরাং আমাদের ভালোমন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তবে আলেমগণ মন্দকে সরাসরি আল্লাহর প্রতি সম্পৃক্ত করা অপছন্দ করেন। এটা কুরআনেরও রীতি। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা’, ‘তিনি সবকিছুর পালনকর্তা।’ কিন্তু আল্লাহ ‘মলমূত্রের সৃষ্টিকর্তা’ বা তিনি ‘শূকরের পালনকর্তা’—এভাবে বলা হয়নি। অথচ বাস্তবতা হলো, এগুলোও কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ও পালনের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু সরাসরি তাঁর দিকে সম্পৃক্ত না করার কারণ হলো তাঁর সুউচ্চ শান ও মর্যাদা। আল্লামা তাশকুবরা যাদাহ লিখেন, ‘মাশায়েখগণ মন্দটা আল্লাহর প্রতি আদবের কারণে সম্পৃক্ত করেন না। নতুবা আল্লাহ ভালোমন্দ সবকিছুর স্রষ্টা। এটাই ইবরাহিমি আদর্শ।’১১৪৫

টিকাঃ
১১৪১. আল-উসুলুল খামসাহ, কাযি আবদুল জাব্বার (৭৭-৭৮)।
১১৪২. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৩)।
১১৪৩. আবু দাউদ (৪৬৯১)। মুসতাদরাকে হাকেম (২৮৫)।
১১৪৪. তাবারানি, আল-মুজামুস সাগির (২/৭১; হাদিস নং ৮০০), আল-আওসাত (৫৩০৩)। কিন্তু এর মানে (পরবর্তী) কাদারিয়‍্যাহ (ও মুতাযিলা) সম্প্রদায় কাফের নয়। কারণ, তাদের ভুলগুলো শুবুহাত (সংশয়) ও জাহালত (অজ্ঞতা) থেকে উৎসারিত। ফলে তাদের ‘অগ্নিপুজারী’ বলা হয়েছে তাদের আকিদার জঘন্যতা বোঝাতে, প্রকৃত অর্থেই কাফের ঘোষণা করতে নয়। হ্যাঁ, কেউ যদি আল্লাহর ইলম (জ্ঞান) ও তাকদির (ভাগ্য নির্ধারণ)-কে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করে, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে তারা মুসলিম উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত বিচ্যুত সম্প্রদায়।
১১৪৫. দেখুন: রিসালা ফিল কাজা ওয়াল কাদার (১০৭-১০৮)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 সৃষ্টি ও কামাইয়ের সম্পর্ক

📄 সৃষ্টি ও কামাইয়ের সম্পর্ক


বিষয়টি আরও স্পষ্ট করার জন্য আহলে সুন্নাতের ইমামগণ বেশ কিছু পরিভাষা ও মূলনীতি ব্যবহার করেন। তন্মধ্যে একটি হলো, ‘খালক’ তথা সৃষ্টি ও ‘কাসব’ তথা কামাই বা উপার্জন। ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘নড়াচড়া ও স্থিরতাসহ বান্দার সকল কাজ মূলত তাঁর উপার্জন (কাসব)। কিন্তু এগুলোর সৃষ্টিকর্তা (খালিক) হলেন আল্লাহ তায়ালা। আর তাই এ সবকিছু সংঘটিত হয় তাঁর ইচ্ছা, জ্ঞান, ফয়সালা ও নির্ধারণে।’ ১১৪৮ ইমাম তহাবি এটাকে এভাবে বলেন, ‘বান্দার সকল কাজ আল্লাহর সৃষ্টি, কিন্তু বান্দার হাতের কামাই (কাসব)।’১১৪৯

কাসব শব্দের শাব্দিক অর্থ উপার্জন, কামাই। পরিভাষায় কাসব হলো: বান্দার কাজে তার ইচ্ছা ও সামর্থ্য থাকা। অন্যকথায়, স্বেচ্ছায় ও নিজ স্বাধীনতায় কোনো কাজ করা। ফলে একজন মানুষ যখন নড়াচড়া করে, সেটা তাঁর ইচ্ছা ও সামর্থ্যে করে। এ হিসেবে এটাকে মানুষের ‘কাসব’ তথা কামাই বলা হয়। কিন্তু আল্লাহর এ কাজটা অস্তিত্বে আনা, তাঁর দেওয়া তৌফিক ও ইচ্ছা ছাড়া যেহেতু মানুষ নড়াচড়া করতে পারত না, এ হিসেবে এটাকে আল্লাহর সৃষ্টি বলা হয়। ফলে মানুষের প্রত্যেকটা কাজ আল্লাহর সৃষ্টি এবং মানুষের কাসব তথা কামাইয়ের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। সাফফার বুখারি বলেন, ‘প্রত্যেক কাজের একজন কর্তা দরকার হয়। সুতরাং মানুষ যেটা করে সেটা তার নিজের হাতের ক্রিয়া (কামাই)। আল্লাহর সৃষ্টির ব্যবহার। অন্যকথায়, প্রত্যেকটা কাজের সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ক সৃষ্টির। তিনি সেগুলো সৃষ্টি করেন। কিন্তু কাজটা বাস্তবায়ন করে বান্দা। ফলে সেটা তার কামাই (কাসব)।’১১৫০

টিকাঃ
১১৪৮. আল-ফিকহুল আকবার (৪)।
১১৪৯. আকিদাহ তহাবিয়‍্যাহ (২৭)। আরও দেখুন: আল-মুতামাদ ফিল মুতাকাদ, কাসানি (৩)।
১১৫০. তালখিসুল আদিল্লাহ (১৭৭-১৭৮)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 সামর্থ্যের প্রকারভেদ

📄 সামর্থ্যের প্রকারভেদ


প্রশ্ন হতে পারে, যেহেতু মানুষ আল্লাহর দেওয়া শক্তি-সামর্থ্য দিয়েই গুনাহের কাজ করে, তিনি গুনাহের শক্তি না দিলে মানুষ গুনাহ করতে পারত না, তাহলে এর জন্যও তো প্রকারান্তরে আল্লাহই দায়ী হচ্ছেন!

প্রাথমিকভাবে এটা সত্য ও সঠিক। অর্থাৎ, মানুষের সব ধরনের সামর্থ্য আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। এটাকে অস্বীকার করা যাবে না যেমনটা কাদারিয়্যাহ ও মুতাযিলারা করেছে। কারণ, তাতে আল্লাহ থেকে মানুষের অমুখাপেক্ষীতা ফুটে ওঠে। ইমাম আজম আল্লাহপ্রদত্ত সামর্থ্য প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে দেওয়া সামর্থ্য (ইস্তিতাআহ) কাজ করার সময় আসে; কাজের আগেও না পরেও না। কারণ, কাজটি করার আগেই যদি তার সামর্থ্য থাকে, তবে তো কাজটি করার সময় সে আল্লাহর মুখাপেক্ষী থাকল না। অথচ কুরআন বলছে, ۞ وَاللَّهُ الْغَنِيُّ وَأَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ ۞ অর্থ : ‘আল্লাহ অমুখাপেক্ষী আর তোমরা সবাই মুখাপেক্ষী।’ [মুহাম্মাদ : ৩৮] একইভাবে কাজটি সম্পন্ন করার পরে সামর্থ্য আসবে সেটাও অসম্ভব। কারণ, আল্লাহর দেওয়া সামর্থ্য ছাড়া মানুষের কোনো কাজ করা সম্ভব নয়।”১১৫১

প্রশ্ন হতে পারে, সামর্থ্য যদি আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়, তবে মানুষকে দায়ী করার কী যুক্তি? আল্লাহ সামর্থ্য না দিলে তো কাজটিই হতো না। দুইভাবে ইমামগণ এর জবাব দিয়েছেন :

এক. আল্লাহ মানুষকে স্বাধীনতার উদ্দেশ্যেই সামর্থ্য দিয়েছেন। তাকে যদি কোনো ধরনের সামর্থ্য না দিতেন, তবে সে তো সম্পূর্ণ পরাধীন হয়ে পড়ত। ফলে তাকে সামর্থ্য দেওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু যেহেতু সে সামর্থ্য নিজ স্বাধীনতা অনুযায়ী ব্যয় করতে পারছে, ফলে এর পাপ-পুণ্যের দায়ভারও তার কাঁধে। ইমাম আজম বলেন, ‘মানুষের গুনাহ করার জন্য যে ইস্তিতাআহ (সামর্থ্য)-এর দরকার হয়, পুণ্য করার জন্যও সেই একই (ইস্তিতাআহ) সামর্থ্যের দরকার হয়। তিনি মানুষকে স্বাধীনভাবে এই সামর্থ্য দিয়েছেন, কিন্তু সেটা পাপের পরিবর্তে পুণ্যের কাজে ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে এখন মানুষ যদি সেটা পাপের কাজে ব্যবহার করে, তবে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন এবং এটা ইনসাফ।’১১৫২

দুই. সামর্থ্যটা দুই ভাগে ভাগ করা হবে। এক. বান্দার শারীরিক সুস্থতা ও প্রস্তুতি। এটা কাজের আগে। দুই. আল্লাহর তৌফিক। এটাই মূল সামর্থ্য। এটা ছাড়া কাজ হয় না। কিন্তু বান্দাকে প্রথম প্রকারের সামর্থ্যের জন্য (অর্থাৎ, তার নিজের সক্ষমতার ভিত্তিতে) জবাবদিহি করতে হবে। তার সামর্থ্যের বাইরে থাকলে সেটার জন্য জবাবদিহি করতে হবে না।

প্রশ্ন আসতে পারে, আকিদার বিভিন্ন কিতাবে দুই প্রকারের সামর্থ্যের কথা দেখা যায়, আমরাও এখানে তা-ই বলেছি। তাহলে ইমাম আজম উপরে স্রেফ এক প্রকারের সামর্থ্যের কথা কেন বললেন (আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে দেওয়া সামর্থ্য (ইস্তিতাআহ) কাজ করার সময় আসে; কাজের আগেও না পরেও না।)?

এটা কয়েকটা কারণে বলেছেন। (এক.) প্রথম প্রকারের সামর্থ্যটা আল্লাহপ্রদত্ত সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল। (দুই) দ্বিতীয় প্রকারের সামর্থ্যই মূল, প্রথম প্রকারের নয়। (তিন) মুতাযিলারা দ্বিতীয় প্রকারের মূল সামর্থ্য (তথা কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত সামর্থ্য) নাকচ করে স্রেফ প্রথম প্রকারের সামর্থ্যের কথা বলে (কারণ, তাদের কাছে বান্দা সর্বেসর্বা, আল্লাহর পক্ষ থেকে করণীয় কিছু নেই, তাকদির নেই)। তারা কেবল কাজের আগে বিদ্যমান সামর্থ্যের কথা বলে। ফলে তাদের খণ্ডনে ইমাম কাজের আগের সামর্থ্যের বিদ্যমানতা নাকচ করেছে। দ্বিতীয় প্রকারের সামর্থ্য তথা মূল সামর্থ্য আল্লাহর তৌফিকের কথা উল্লেখ করেছেন।

তাঁর অনুসরণে আবু হাফস বুখারি, মুহাম্মাদ ইবনুল ফযল বলখি ও বাযদাবিসহ অনেক হানাফি আলেম প্রথম প্রকারের সামর্থ্যের কথা উল্লেখ করেননি। তবে বক্তব্য স্পষ্ট করার জন্য ইমাম তহাবি, মাতুরিদি, আবু সালামা সমরকন্দি, নাসাফি, সাবুনি, গযনবি, খাব্বাযি, লামিশিসহ অধিকাংশ হানাফি আলেমই দুই প্রকারের সামর্থ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। ইমাম তহাবি লিখেন, ‘সামর্থ্য দুই প্রকারের। এক প্রকারের সামর্থ্য যা কাজের ঘটক হিসেবে পরিগণিত এবং ঘটার জন্য অপরিহার্য। এটা আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত। যেমন—তৌফিক দান। এমন সামর্থ্য বান্দার দিকে সম্পৃক্ত করা বৈধ নয় (উপরে ইমাম আজম এটার কথা বলেছেন)। আরেক প্রকারের সামর্থ্য কাজের কার্যকারণ (ঘটক নয়)। যেমন—সুস্থতা, সক্ষমতা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, উপায়-উপকরণ বিদ্যমান থাকা। এটা বান্দার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং শরিয়তের আদেশ-নিষেধ এই প্রকারের সামর্থ্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে। কুরআনে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে চাপিয়ে দেন না।’১১৫৩

মোটকথা, মানুষের সামর্থ্য দুই প্রকারের। একটা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তৌফিক যা বান্দার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায় না। এটা কাজ করার সময় জরুরি হয়। এটা না থাকলে কাজ সম্পাদিত হয় না। আরেকটা হলো কাজের আগে বিদ্যমান থাকা; যেমন—সুস্থতা, কাজ করার শক্তি, উপকরণ ইত্যাদি বিদ্যমান থাকা। এটা বান্দার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায় এবং কাজ করার আগে বিদ্যমান থাকা জরুরি হয়। কাদারিয়‍্যাহ সম্প্রদায় বিশ্বাস করে—মানুষের মাঝে সব ধরনের সামর্থ্য সবসময় বিদ্যমান থাকে। ফলে সে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। এটা গলত কথা। এমন বলা হলে আল্লাহর প্রতি মানুষের কোনো মুখাপেক্ষিতা থাকে না; অথচ আল্লাহ থেকে অমুখাপেক্ষিতা কুফর। এখানেই তাদের বিচ্যুতি। ১১৫৪

টিকাঃ
১১৫১. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৪৮-৪৯)। আরও দেখুন : উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১২০)। আস-সাওয়াদুল আজম। (৩৮) আল-ইতিকাদ, বলখি (১০৬)।
১১৫২. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৩)।
১১৫৩. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৬-২৭)। ইমাম মাতুরিদি বলেন, ‘আমাদের কাছে কুদরত (বা ইস্তিতাআহ= সামর্থ্য) দুই প্রকারের। এক. উপায়-উপকরণ ঠিক থাকা। এটা কাজের আগে বিদ্যমান থাকা জরুরি। এটা থাকলেই কাজ হয়ে যাবে এমন নয়। দুই. কাজ করার সময় বিদ্যমান সামর্থ্য। যখন কাজ সংঘটিত হয় তখন এর মাধ্যমেই সংঘটিত হয়।’ [আত-তাওহিদ (১৮৮)] আবু সালামা সমরকন্দি (৩৪০ হি.) লিখেন, ‘সামর্থ্য দুই প্রকারের—একটা হলো অবস্থাগত সামর্থ্য। অর্থাৎ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুস্থ থাকা, উপায়-উপকরণ সক্রিয় ও শুদ্ধ থাকা। অপরটা হলো কর্মগত সামর্থ্য। এটা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তৌফিক দেওয়া না-দেওয়া, তাকদির ও ফয়সালা ইত্যাদি।’ [জুমাল মিন উসুলিদ্দিন (২৫)]

মাইমুন নাসাফি লিখেন, ‘সামর্থ্য (ইস্তিতাআহ), কুওয়াত (শক্তি), কুদরত, ‘তাকাত’—এগুলো সব কাছাকাছি অর্থবোধক শব্দ। কুদরত ও ইস্তিতাআহ আমাদের কাছে দুই প্রকারের : এক. উপায়-উপকরণ এবং মাধ্যম-হাতিয়ারের বিশুদ্ধতা। এটা কাজের আগে আসে। এটা কাজের মূল সংঘটক নয়। তবে এগুলো ছাড়াও কাজ হয় না। মোটকথা, এগুলো আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত; যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। এ ধরনের ইস্তিতাআহকে, এক কথায়, কাজের প্রস্তুতি বলা যেতে পারে। কুরআনে এর উদাহরণ, যেমন—আল্লাহ তায়ালার বাণী : ۞ فَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّينَ مِسْكِينًا ۞ অর্থ : ‘ (যিহারের কাফফারা) যে ব্যক্তি দিতে সমর্থ না হবে, সে ষাটজন মিসকিনকে খাওয়াবে।’ [মুজাদালাহ : ৪] দুই. এটা কাজের সময় আল্লাহপ্রদত্ত বিশেষ সাহায্য, যা কাজের আগে বোঝার ক্ষমতা নেই। এই সাহায্যে বান্দা কাজটা করতে পারে। ফলে এটা কাজের মূল কারণ (ঘটক)। এই প্রকারের সামর্থ্যের উদাহরণ হলো, আল্লাহর বাণী : ۞ وَسَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَوِ اسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ ۞ অর্থ: ‘তারা শীঘ্রই আল্লাহর নামে শপথ করে বলবে, আমাদের সামর্থ্য থাকলে তোমাদের সঙ্গে বের হতাম!’ [তাওবা: ৪২] এখানে আল্লাহ তাদের মিথ্যাপ্রতিপন্ন করেছেন। কারণ, তাদের সামর্থ্য আছে কি না সেটা মদিনার ভিতরে বসে বোঝা যাবে না। যদি মদিনা থেকে বাইরে যুদ্ধের জন্য বের হতো, এরপর পারত কি পারত না বোঝা যেত।’ [দেখুন: তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/৭৮০-৭৮১)]

আলাউদ্দিন উসমান্দি লিখেন, ‘ইস্তিতাআহ তথা সামর্থ্য দুই প্রকারের। একটা হলো অবস্থাগত সামর্থ্য তথা উপায়-উপকরণ প্রস্তুত থাকা, শরীর সুস্থ থাকা। এটা কাজের আগে। ... আরেকটা হলো কর্মগত সামর্থ্য। এটা আহলে সুন্নাতের মতে কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মুতাযিলা এটাকেও কাজের আগে মনে করে।’ [দেখুন: লুবাবুল কালাম, উসমান্দি (পাণ্ডুলিপি : ৬৩)] খাব্বাযি লিখেন, ‘সামর্থ্য দু প্রকারের। এক. উপায়-উপকরণের বিশুদ্ধতা। এটা কাজের আগে আসে। (আল্লাহর পক্ষ থেকে) দায়িত্ব এটার উপর ভিত্তি করে। কারণ, এটা না থাকলে দায়িত্বই আসবে না। দুই. প্রকৃত সামর্থ্য। এটা না থাকলে কাজই হবে না। এটা কাজের সময় থাকে।’ [আল-হাদি ফি উসুলিদ্দিন (১৪৭-১৪৮)]

আবদুল্লাহ নাসাফি লিখেন, ‘সামর্থ্য (ইস্তিতাআহ), শক্তি (তাকাত), কুদরত, কুওয়াত ইত্যাদি সব সমার্থক শব্দ। এটা দুই প্রকারের। এক. উপায়-উপকরণ শুদ্ধ থাকা। এটা কাজের আগে আসে, যাতে বান্দা নিজের ইচ্ছা ও স্বাধীনতায়, নিজ সামর্থ্যে কাজটি করার প্রস্তুতি নিতে পারে। যেমন—আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا ۞ অর্থ: ‘যারা সফরের সামর্থ্য রাখে তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বাইতুল্লাহর হজ করা আবশ্যক।’ [আলে ইমরান: ৯৭] এখানে সামর্থ্য বলতে কাজের আগের সামর্থ্য বোঝানো হয়েছে। এগুলো থাকলেই কাজ বাস্তবায়িত হয়ে যাবে এমন নয়। দুই. হাকিকি সামর্থ্য। এটা কাজের ঘটক। এটার মাধ্যমেই কাজ সংঘটিত হয়। এটা ছাড়া কাজ হয় না। যেমন—আল্লাহ বলেন, ۞ أَمَا كَانُوا يَسْتَطِيعُونَ السَّمْعَ وَمَا كَانُوا يُبْصِرُونَ ۞ ‘তারা শুনতে পারত না, দেখতে পেত না।’ [হুদ : ২০] এখানে আল্লাহ তাদের নিন্দা করেছেন। কারণ, তাদের উপায়-উপকরণ সবকিছু বিশুদ্ধ থাকা সত্ত্বেও তারা অন্যায়ের পথে হেঁটেছে। শুনেও শোনেনি, দেখেও দেখেনি। ফলে হেদায়াত পায়নি।’ [আল-ইতিমাদ ফিল ইতিকাদ (২৭৯-২৮০)। আরও দেখুন: আত-তামহিদ, লামিশি (৯৩)] কাসানি দুটো প্রকারকে আরও স্পষ্ট করে লিখেন, ‘বান্দার ইস্তিতাআহ তথা সামর্থ্য যার মাধ্যমে সে কাজ করে সেটা কাজের সঙ্গে বিদ্যমান থাকে, আগেও নয় পরেও নয়। আর ‘তাকলিফ’ তথা দায়িত্বের সামর্থ্য (অর্থাৎ, যা কাজের মূল ঘটক নয়, কিন্তু যার উপর ভিত্তি করে কাজটা শরিয়তের পক্ষ থেকে বান্দার উপর আবশ্যক হয়) সেটা কাজের আগে আসে। যেমন—উপায়-উপকরণ বিশুদ্ধ থাকা।’ [আল-মুতামাদ, কাসানি (৬)]
১১৫৪. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (১৭)। আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ, সাবুনি (২৪৩-২৪৪)। এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়; তা হলো, বাহ্যত তহাবি, মাতুরিদি, সমরকন্দি, নাসাফি, সাবুনি—সহ হানাফি আলেমদের বক্তব্য ইমাম আজমের বক্তব্যের বিপরীত। কারণ, ইমাম আজম কেবল একধরনের সামর্থ্যের কথা বলেছেন যা কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিপরীতে তাঁর অনুসারী হানাফি আলেমগণ কাজের আগেও একধরনের সামর্থ্যের অস্তিত্বের কথা বলেছেন। এ কারণে আবুল ইউসর বাযদাবি—সহ কেউ কেউ এসব বক্তব্যকে গলত বলেছেন। বাযদাবি লিখেন, ‘খোরাসান ও ইরাকে আমাদের একদল ফকিহ মনে করেন—সামর্থ্য কাজের আগে পাওয়া যায়। এটা গলত বক্তব্য। মুতাযিলাদের কাছ থেকে নেওয়া। কারণ, কাজের আগে সামর্থ্যের কথা বলা মানে মানুষকে কাজের সৃষ্টিকর্তা বানিয়ে ফেলা।’ [উসুলুদ্দিন, বাযদাবি: ১২১] কিন্তু বাযদাবির কথা বরং গলত। কারণ, ইমাম তহাবি—সহ যেসব আলেম পূর্ব সামর্থ্যের কথা বলেছেন তারা মূলত বান্দার সুস্থতা, শারীরিক উপকরণ ইত্যাদি বিদ্যমান থাকার কথা বলেছেন। এটা প্রকৃত সামর্থ্য নয়। কারণ, এগুলো থাকলেই কেউ কোনো কাজ করতে পারবে সেটার নিশ্চয়তা নেই। বরং প্রকৃত সামর্থ্য হলো আল্লাহর দেওয়া শক্তি ও তৌফিক যার মাধ্যমে কাজ সংঘটিত হয় এবং যা ছাড়া কাজ সংঘটিত হয় না। ফলে ইমাম তহাবি—সহ এসব আলেম আর ইমাম আজমের কথার মাঝে কোনো সংঘর্ষ নেই। বরং আল্লাহ তায়ালাও এ ধরনের (পূর্ব) সামর্থ্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন [আলে ইমরান: ৯৭; তাগাবুন: ১৬] তা ছাড়া, এটা স্রেফ কয়েকজন আলেমের বক্তব্য নয়, বরং অধিকাংশ হানাফি আলেমই দুই প্রকারের সামর্থ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। উপরে সেগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে বলখি, বাযদাবি—সহ যারা কেবল এক প্রকারের সামর্থ্যের কথা উল্লেখ করেছেন, সেটা মূলত ইমামের মতো প্রথম প্রকারের সামর্থ্যটাকে গৌণ ধরার কারণে। অর্থাৎ, সে সামর্থ্যটা মূলত আল্লাহর দেওয়া তৌফিকেই হয়; আল্লাহ না চাইলে কেউ সুস্থ থাকতে পারে না, উপকরণ প্রস্তুত করতে পারে না। এ জন্য তারা মূল সামর্থ্য তথা দ্বিতীয় প্রকারটাকেই একটা ধরে উল্লেখ করেছেন। ফলে তফসিলি বক্তব্য ভিন্ন হলেও তাদের মূল কথা এক।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ভালোমন্দ দুটোই আল্লাহর ইচ্ছার অধীন

📄 ভালোমন্দ দুটোই আল্লাহর ইচ্ছার অধীন


ভালোমন্দের সম্পর্ক নিয়ে কাদারিয়্যাহ, ফালাসিফাহ ও মুতাযিলা সম্প্রদায়ের আরও একটা বিচ্যুতি হলো—তারা মনে করে, বান্দার মন্দ কাজে আল্লাহর কোনো ইচ্ছা (ইরাদা ও মাশিয়াহ) নেই। ফলে ফাসেক ব্যক্তি যখন গুনাহ করে কিংবা কোনো কাফের যখন কুফর করে, তাতে আল্লাহর ইচ্ছা থাকে না; বরং সে নিজের ইচ্ছায় করে। কারণ, আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী হলে তাকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ থাকত না। বরং শাস্তি দিলে জুলুম হিসেবে গণ্য হতো। অথচ আল্লাহ গুনাহের শাস্তি দেবেন। বোঝা গেল, গুনাহ ও কুফর আল্লাহর ইচ্ছার অধীন নয়। উলটো আহলে সুন্নাত যেহেতু পুণ্য ও পাপ সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছার অধীন বলেন, এ জন্য তারা আহলে সুন্নাতকে ‘জালেম’ (أهل الجور) আখ্যা দিয়ে নিজেদের ‘ইনসাফগার’ (أهل العدل) দাবি করে।

এটা সুস্পষ্ট বিচ্যুতি। কারণ, আল্লাহর ইচ্ছার উপর কারও ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয় না। ফলে আল্লাহ কারও গুনাহ বা কুফরের ইচ্ছা না করা সত্ত্বেও কেউ সেটা করতে পারবে এমন কোনো সুযোগ নেই। বরং গুনাহ ও কুফরও আল্লাহর ইচ্ছাতেই সংঘটিত হচ্ছে। তাকদিরের ভালোমন্দ দুটোই আল্লাহর জ্ঞান, ইচ্ছা, সৃষ্টি ও নির্ধারণে সম্পন্ন হয়। কিন্তু আল্লাহ কাউকে বাধ্য করেন না। ফলে এর দায়ভারও মানুষের কাঁধে। ১১৫৫

টিকাঃ
১১৫৫. দেখুন: শরহুল ফিকহিল আকবার, সমরকন্দি (৮)। আল-কিফায়াহ ফিল হিদায়াহ (১৬৭-১৬৮, ২৮৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00