📄 রুহের জগতে প্রতিশ্রুতি নেওয়ার রহস্য
প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহ তায়ালা কেন আমাদের থেকে রুহের জগতে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন? সেটা করে তো উলটো আমাদের ক্ষতি করলেন। কারণ, সে প্রতিশ্রুতি আমাদের মনে নেই; অথচ সে কারণে এখন আমাদের শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে। এর উত্তর হলো, আল্লাহ তায়ালা নিজেই আমাদের সেটা পরীক্ষার জন্য ভুলিয়ে দিয়েছেন। সেটা মনে থাকলে তো আর পরীক্ষা হতো না। কারণ, দুনিয়ার বাইরের সব বিষয় হলো গায়েবি তথা অদৃশ্যের। এক্ষেত্রে ঈমানই একমাত্র পথ। সুতরাং সেই প্রতিশ্রুতি মনে না থাকলেও ঈমানের মাধ্যমে সেটার অস্তিত্ব ও সত্যতার ব্যাপারে সুনিশ্চিত জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। তবে আল্লাহ এখানেই আমাদের ছেড়ে দেননি। কেবল সেই প্রতিশ্রুতি উপর ভিত্তি করে আমাদের সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্যের ফয়সালা করেননি; বরং পৃথিবীতে পাঠানোর পর তিনি আমাদের কাছ থেকে আবার সেই প্রতিশ্রুতি নবায়ন করেছেন। বিস্মৃত প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিতে তিনি অসংখ্য নবি-রাসুল প্রেরণ করেছেন, অসংখ্য আসমানি গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং এর পর আর কোনো অজুহাত পেশ করার সুযোগ নেই। ১১২৯
তাই আমাদের মনে রাখতে হবে—যেমনটা ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কাউকে কুফর বা ঈমানের উপর বাধ্য করেননি; কিংবা কাউকে মুমিন বা কাফের হিসেবে সৃষ্টি করেননি; বরং সবাইকে সৃষ্টি করেছেন ব্যক্তি (মানুষ) হিসেবে। ১১৩০ কারণ, কাউকে মুমিন হিসেবে সৃষ্টি করলে পৃথিবীতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো অর্থহীন হতো। তা ছাড়া, এটা কাফেরদের প্রতিও জুলুম হতো। একইভাবে কাউকে কাফের হিসেবে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো অর্থহীন হতো। তা ছাড়া, এটা তাদের প্রতিও জুলুম হতো। ফলে আল্লাহ সবাইকে স্বাধীনভাবে ফিতরতের উপর সৃষ্টি করেছেন। ভালোর প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ এবং মন্দের প্রতি স্বাভাবিক বিকর্ষণ তৈরি করে দিয়েছেন [হুজুরাত : ৭]। এর পর ভালোমন্দ কর্ম প্রত্যেকে নিজে বেছে নেয়। ফলে প্রত্যেককে তার কর্মের দায়ভার বহন করতে হবে।
টিকাঃ
১১২৯. শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১২৮).
১১৩০. আল-ফিকহুল আকবার (৩-৪)।
📄 তাকদিরের লিখন বর্ণনা হিসেবে, নির্দেশ হিসেবে নয়
এটা তাকদির বোঝার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সহজ চাবিকাঠি। এটা একজন সাধারণ মানুষেরও বোঝার কথা। ফলে এই আলোচনার পর তাকদিরের উপর আর কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।
ইমাম আজম বলেন, ‘দুনিয়া ও আখেরাতের কোনোকিছুই আল্লাহর ইচ্ছা, জ্ঞান, ফয়সালা ও কুদরত ব্যতীত সংঘটিত হয় না। তিনি এসব লাওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন। কিন্তু তাঁর এ লিখন বর্ণনা হিসেবে, হুকুম হিসেবে নয়’ (كتبه بالوصف لا بالحكم)।১১৩৫ অর্থাৎ মানুষ পৃথিবীতে কী করবে সেটা তিনি জেনে লিখেছেন। তিনি আগেই তাদের ভাগ্যের উপর কিছু চাপিয়ে লিখেছেন, আর মানুষ পৃথিবীতে এসে কেবল সেটাই পালন করছে—এমন নয়। কারণ, এমন হলে কিতাব অবতীর্ণ করা, রাসুল পাঠানো এবং আদেশ-নিষেধ দেওয়ার কোনো মানে হয় না। এ জন্য ইমাম প্রশ্ন করেন, ‘পৃথিবীতে বর্তমানে যা-কিছু হচ্ছে আল্লাহ জানতেন কি না? যদি কেউ বলে, না, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, সে আল্লাহর ইলমকে অস্বীকার করল। আর যদি বলে, হ্যাঁ, তবে তাকে বলা হবে, আল্লাহ কি তখন যেভাবে জেনেছেন সেভাবে হওয়ার ইচ্ছা করেছেন, নাকি বিপরীত হওয়ার ইচ্ছা করেছেন? যদি বলে, যেভাবে হবে জেনেছেন সেভাবে ইচ্ছা করেছেন, তখন সে স্বীকার করে নিল যে, আল্লাহ মুমিনের জন্য ঈমান এবং কাফেরের জন্য কুফর চেয়েছেন, ফলে তা-ই হচ্ছে। আর যদি বলে, যেভাবে হবে জেনেছেন সেটা তার ইচ্ছা অনুযায়ী ছিল না, তবে আল্লাহকে অক্ষম সাব্যস্ত করা হলো। এতে সে কাফের হয়ে যাবে।’১১৩৬
উপরের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, আল্লাহর ইচ্ছা ও ফয়সালা ইলমের অনুগামী। আল্লাহ যেভাবে হবে জেনেছেন, সেভাবে মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছেন এবং সেভাবে তার ভাগ্য লিখেছেন। আগে লিখে কারও উপর চাপিয়ে দেননি। খাত্তাবি বলেন, ‘অনেক লোক মনে করে, আল্লাহ তায়ালা তাকদিরের লেখার মাধ্যমে মানুষকে ভাগ্যের লিখনের মাঝে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন, বাধ্য করেছেন। এটা ভুল ধারণা। তাকদির অর্থ মানুষকে বাধ্য করা নয়; বরং এর অর্থ মানুষকে সৃষ্টির আগেই আল্লাহ যেহেতু জানেন সে কী করবে, ফলে তিনি বান্দার কর্মফল সে ভিত্তিতেই লিখেছেন। তার জন্য ভালোমন্দ সৃষ্টি করেছেন। নিজের পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেননি। ’১১৩৭
ইমাম আরও বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকে কুফর ও ঈমান থেকে বিমুক্ত সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাদের ঈমানের আদেশ দিয়েছেন, কুফর থেকে নিষেধ করেছেন। তারা কেউ ঈমান গ্রহণ করেছে, আবার কেউ কুফর গ্রহণ করেছে। যারা ঈমান গ্রহণ করেছে, তারা নিজের ইচ্ছাতেই করেছে...। বিপরীতে যারা কুফর গ্রহণ করেছে, সেটাও তাদের ইচ্ছায় করেছে।’ ইমাম অন্যত্র বলেন, ‘...আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কাউকে কুফর বা ঈমানের উপর বাধ্য করেননি। কিংবা কাউকে মুমিন বা কাফের হিসেবে সৃষ্টি করেননি; বরং সবাইকে সৃষ্টি করেছেন ব্যক্তি (মানুষ) হিসেবে।’ ১১৩৮
কাসানিও এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বর্ণনা করেন, যা এ সম্পর্কিত সংশয় কাটাতে সাহায্য করবে। তিনি লিখেন, ‘আল্লাহ তায়ালা যা হবে বলে জেনেছেন, সেটা হওয়ার ইচ্ছা করেছেন, সেটা তাঁর আনুগত্য হোক কিংবা অবাধ্যতা হোক। আবার যেটা তিনি হবে না বলে জেনেছেন, সেটা তিনি না হওয়ার ইচ্ছা করেছেন, হোক সেটা আনুগত্য কিংবা অবাধ্যতা। মোটকথা, তাঁর ইচ্ছাটা ‘জানার’ সঙ্গে সম্পৃক্ত, আদেশ-নিষেধের সঙ্গে নয়।’১১৩৯ অর্থাৎ, আল্লাহ যখন কারও ব্যাপারে জেনেছেন সে ভালো কাজ করবে, তার জন্য সেটাই ইচ্ছা করেছেন। তাকে ভালো কাজের আদেশও দিয়েছেন। ফলে ভালো কাজটা সংঘটিত হচ্ছে। আবার আল্লাহ যখন কেউ খারাপ কাজ করবে জেনেছেন, খারাপের ইচ্ছা করেছেন। যদিও তিনি খারাপটা করতে নিষেধ করেছেন, তবু শেষ পর্যন্ত খারাপটাই হবে। কারণ, তিনি জেনেছেন সেটা, পরে ইচ্ছাও করেছেন। সুতরাং ভালোমন্দ বেছে নেওয়ার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত মানুষের ঘাড়েই পড়ে। সে নিজে বাছাই করে। ফলে এর দায়ভারও তাঁর কাঁধে।
মাগনিসাভি লিখেন, “আল্লাহ লাওহে মাহফুজে সবকিছুর বর্ণনা লিখেছেন। অর্থাৎ, তাতে আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর ভালোমন্দ, লম্বা-চওড়া, ছোট-বড়, কম-বেশি, হালকা-ভারি, গরম-ঠান্ডা, আর্দ্রতা-শুষ্কতা, আনুগত্য-অবাধ্যতা, ইচ্ছা, সামর্থ্য, উপার্জন ইত্যাদি সাধারণ বর্ণনা ও অবস্থা, গুণাগুণ ও চরিত্র লিখেছেন। ব্যাখ্যা ও কারণ ছাড়া কেবল ‘নির্দেশমূলক’ কথা লিখেননি। অন্যকথায়, লাওহে মাহফুজে আল্লাহ এমন লিখেননি—‘যায়েদ মুমিন হোক’, ‘আমর কাফের হোক।’ এমন লিখলে যায়েদ ঈমান আনতে বাধ্য হতো, আমর কুফরি করতে বাধ্য হতো। কারণ, আল্লাহর নির্দেশ অনিবার্যভাবে বাস্তবায়িত হবে। তাঁর নির্দেশ রহিত করার ক্ষমতা কারও নেই (আর এমন হলে তাতে মানুষের কোনো দায় থাকে না)। তাই আল্লাহ লিখেছেন, যায়েদ স্বেচ্ছায় ও নিজের স্বাধীনতায় ঈমান আনবে। সে ঈমান চাইবে, কুফর চাইবে না। আমর স্বেচ্ছায় ও নিজের স্বাধীনতায় কুফরি গ্রহণ করবে। কুফর চাইবে, ঈমান চাইবে না (এ কারণে মানুষকেই তার ঈমান ও কুফরের দায়ভার বহন করতে হবে)। উদ্দেশ্য হলো, বান্দার কাজের ক্ষেত্রে ‘জাবর’ তথা বাধ্যবাধকতাকে নাকচ করে দেওয়া, জাবরিয়্যাহদের মতাদর্শ বাতিল সাব্যস্ত করা।”১১৪০
টিকাঃ
১১৩৫. আল-ফিকহুল আকবার (৩).
১১৩৬. আল-উসুলুল মুনিফাহ (২৮).
১১৩৭. শরহে মুসলিম, নববি (১/১৫৫).
১১৩৮. আল-ফিকহুল আকবার (৩-৪).
১১৩৯. আল-মুতামাদ ফিল মুতাকাদ, কাসানি (৫).
১১৪০. শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১২৩-১২৪)。
📄 তাকদিরের ক্ষেত্রে বিচ্যুতি ও খণ্ডন
তাকদিরের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশুদ্ধ ও ভারসাম্যপূর্ণ আকিদা বর্ণনার পর এবার আমরা তাকদিরের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিচ্যুতি ও বিচ্যুত সম্প্রদায় নিয়ে আলোচনা করব; তাদের বিচ্যুতির জায়গাগুলো সংশোধন করব। এতে করে তাকদিরকেন্দ্রিক সকল জটিলতা ও বিভ্রান্তির অবসান ঘটবে, ইনশাআল্লাহ。
আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো—মানুষের সকল কাজ আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহ সেগুলোর সৃষ্টিকারী, উদ্ভাবক এবং অস্তিত্বে আনয়নকারী। কিন্তু মানুষ সেগুলোর কর্তা। মানুষের ইচ্ছা-স্বাধীনতা ও সামর্থ্যের মাধ্যমে সেটা সম্পন্ন হয়। ফলে আল্লাহ সৃষ্টি করেন। মানুষ কাজে পরিণত করে; সৃষ্টি করে না। কিন্তু এক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্প্রদায় ভারসাম্য নষ্ট করেছে। তাকদিরের ক্ষেত্রে তারা নানারকম প্রান্তিকতায় লিপ্ত হয়েছে। তাকদিরের নানান বিষয় অস্বীকার করে প্রান্তিকতার শিকার হয়েছে সকল কাদারিয়্যাহ, একদল শিয়া, মুতাযিলা এবং অধিকাংশ খারেজি ফিরকা। অপরদিকে তাকদির স্বীকার করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির কারণে প্রান্তিকতার শিকার হয়েছে জাবরিয়্যাহ ও জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়। নিচে ধারাবাহিকভাবে তাদের বিচ্যুতি এবং ইমাম আজমের ভাষ্যে সেগুলোর খণ্ডন উল্লেখ করা হচ্ছে :
📄 তাকদিরের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জনকারী সম্প্রদায়ের সংশয় নিরসন
তাকদিরের ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায়ের বিপরীতে জাবরিয়্যাহ সম্প্রদায় মনে করে—মানুষের কোনো প্রকারের সামর্থ্য নেই। হ্যাঁ, মানুষ কাজ করে। কিন্তু সেটা এমন, যেমন কোনো গাছ ধরে নাড়া দিলে গাছের পাতা নড়ে। সবকিছু আল্লাহ তাকে দিয়ে করান। জাহমিয়্যাদের বিভ্রান্তি আরও বেশি। তাদের কথা হলো, বান্দা যত নড়াচড়া করে, সব আল্লাহ করেন। বান্দা নিজে কিছুই করে না। এগুলো সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি ও কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী ধ্যানধারণা। আল্লাহ তায়ালা তাদের খণ্ডনে বলেন, ۞ سَيَقُولُ الَّذِينَ أَشْرَكُوا لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا أَشْرَكْنَا وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِنْ شَيْءٍ ۚ كَذَٰلِكَ كَذَّبَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ حَتَّىٰ ذَاقُوا بَأْسَنَا ۗ قُلْ هَلْ عِنْدَكُمْ مِنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا ۖ إِنْ تَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ أَنْتُمْ إِلَّا تَخْرُصُونَ ۞ অর্থ : “যারা শিরক করেছে তারা বলবে, ‘আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন তবে আমরা ও আমাদের পূর্বপুরুষগণ শিরক করতাম না এবং কোনোকিছুই হারাম করতাম না।’ এভাবে তাদের পূর্ববর্তী লোকেরা প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং অবশেষে তারা আমার শাস্তি ভোগ করেছিল। আপনি বলে দিন, ‘তোমাদের নিকট কোনো যুক্তি আছে কি? থাকলে আমার নিকট তা পেশ করো; তোমরা শুধু কল্পনারই অনুসরণ করো আর স্রেফ মনগড়া কথা বলো।” [আনআম: ১৪৮] আরও বলেন, ۞ وَقَالَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا عَبَدْنَا مِنْ دُونِهِ مِنْ شَيْءٍ نَحْنُ وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِنْ دُونِهِ مِنْ شَيْءٍ ۚ كَذَٰلِكَ فَعَلَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ ۚ فَهَلْ عَلَى الرُّسُلِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ ۞ অর্থ : “মুশরিকরা বলবে, ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমাদের পিতৃপুরুষেরা ও আমরা তাঁর ইবাদত ব্যতীত অন্য কোনোকিছুর ইবাদত করতাম না এবং তাঁর অনুজ্ঞা ব্যতীত আমরা কোনোকিছু নিষিদ্ধ করতাম না।’ এদের পূর্ববর্তী লোকেরা এরূপই করত। রাসুলদের কর্তব্য তো কেবল সুস্পষ্ট বাণী পৌঁছে দেওয়া।” [নাহল : ৩৫] অন্য আয়াতে বলেন, ۞ وَقَالُوا لَوْ شَاءَ الرَّحْمَنُ مَا عَبَدْنَاهُمْ ۗ مَا لَهُمْ بِذَٰلِكَ مِنْ عِلْمٍ ۖ إِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ ۞ অর্থ : ‘তারা বলে, রহমান আল্লাহ ইচ্ছা না করলে আমরা ওদের পূজা করতাম না। এ বিষয়ে তারা কিছুই জানে না। তারা কেবল অনুমানে কথা বলে।’ [যুখরুফ: ২০]
শিরক করে তাকদিরের দোহাই দেওয়া এবং আল্লাহর উপর দোষ চাপানো পূর্ববর্তী যুগের কাফের-মুশরিকদের স্বভাব। অবশ্য তাতে কোনো লাভ নেই। আল্লাহর কাছে এসব মনগড়া অসার যুক্তির কোনো মূল্য নেই। ফলে তাদের শাস্তি অনিবার্য। নিঃসন্দেহে আল্লাহ যা চান তা-ই হয়, যা চান না তা হয় না, যেমনটা রাসুলুল্লাহ (ﷺ) নিজে বলেছেন, ‘আল্লাহ যা চান তা-ই হয়, তিনি যা চান না তা হয় না।’১১৫৯ কিন্তু এর দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহর চিরন্তন ইচ্ছা; বান্দার সকল স্বাধীনতাকে নাকচ করা নয়। কারণ, তিনি মানুষকে হেদায়াত ও গোমরাহি, হক ও বাতিল দুটোর মাঝে যেকোনো একটা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন।
জাবরিয়্যাহ ও জাহমিয়্যাহরা মূলত কয়েকটি আয়াত গলত বোঝার ফলে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। তারা বলে, কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ۞ وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ ۞ অর্থ : ‘আল্লাহ তোমাদের এবং তোমাদের কর্মসমূহ সৃষ্টি করেছেন।’ [সাফফাত : ৯৬] সুতরাং বোঝা গেল, মানুষের কিছু করার নেই। কিন্তু এটা ভুল দাবি। কারণ, এখানে সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, কাজের কথা নয়। অর্থাৎ, জগতের সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা। তিনি কোনো কাজ সৃষ্টি না করলে সেটা অস্তিত্বেই আসত না। কিন্তু সৃষ্টি আর কর্ম এক নয়। আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, মানুষ সেটা নিজে করে। পিছনে আমরা সৃষ্টি ও কামাই সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করেছি।
কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মানুষকেই তার কাজের কর্তা এবং সেটার প্রতিদানের উপযুক্ত পাত্র বলেছেন। যেমন—তিনি বলেন, ۞ فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ۞ অর্থ : ‘কেউ জানে না তাদের জন্য চক্ষুশীতলকারী কী প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। এটা তাদের কর্মের প্রতিদান।’ [সাজদা : ১৭] আরও বলেন, ۞ وَإِذْ قَتَلْتُمْ نَفْسًا ۞ অর্থ : ‘যখন তোমরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে।’ [বাকারা : ৭২] এখানে হত্যাটা আল্লাহ মানুষের সঙ্গেই সম্পৃক্ত করেছেন। কারণ, কাজটা মানুষই করেছে। এভাবে সকল কাজ মানুষ নিজেই করে, ফলে সে নিজেই তার কর্মের জন্য দায়ী। তা ছাড়া, আল্লাহ আমাদের অনেক কাজ থেকে নিষেধ করেছেন। বোঝা গেল, আমরা সেগুলো করি, আল্লাহ করেন না। আরও একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। যেমন—আমরা বসি। বসা ব্যাপারটা সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ তায়ালা। তিনি যদি বসা বলতে কিছু সৃষ্টি না করতেন, আমরা বসতে পারতাম না। কিন্তু আমরা যখন বসছি, তখন সেটা আমাদের কাজ হচ্ছে।
তা ছাড়া, আল্লাহ আমাদের কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ ۖ إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ ۞ অর্থ : ‘তোমরা যা ইচ্ছা করো। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম দেখছেন।’ [ফুসসিলাত : ৪০] পরকালের পরিণতিকে আমাদের নিজেদের কাজের ফলাফল বলেছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ ۞ ۞ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ ۞ অর্থ : ‘যে একবিন্দু ভালো কাজ করবে সে তা দেখতে পাবে; যে একবিন্দু মন্দ কাজ করবে সে তা দেখতে পাবে।’ [যালযালাহ : ৭-৮] আরও বলেন, ۞ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ۞ অর্থ: ‘এটা তাদের কর্মের ফল।’ [ওয়াকিয়াহ : ২৪] বোঝা গেল, কাজ মানুষকেই করতে হবে এবং মানুষকেই তার কাজের দায়ভার বহন করতে হবে। আল্লাহ তায়ালাকে কর্মের কর্তা এবং নিজেদের পরাধীন ভাবলে আখেরাতে উপকার হবে না। আল্লাহর প্রতি কর্মের সম্পৃক্ততা শুধু এদিক থেকে বিশুদ্ধ যে, আল্লাহ তায়ালা সকল কাজের প্রকৃত স্রষ্টা। যদি তিনি কাজগুলো সৃষ্টি না করতেন, তবে অস্তিত্বেই আসত না। তিনি ভালো ও মন্দ সবকিছুই সৃষ্টি করেছেন, অস্তিত্বে এনেছেন। অস্তিত্বে আসার পরে সেগুলো বাস্তবায়ন ও ব্যবহার করছে মানুষ। ফলে মানুষের সব কাজ তার হাতের কামাই। সুফল কিংবা কুফল সে-ই ভোগ করবে।
বর্ণিত আছে, একবার উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.-এর কাছে এক চোর ধরে নিয়ে আসা হয়। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করেন—চুরি করলে কেন? সে বলল, আল্লাহ তাকদিরে লিখে রেখেছেন, তাই। উমর রাযি. তাকে প্রথমে বেত্রাঘাত করলেন। এরপর তার হাত কাটার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর বললেন, হাত কাটা হলো চুরির শাস্তি। আর বেত্রাঘাত হলো আল্লাহর উপর মিথ্যাচারের শাস্তি। অর্থাৎ, সে নিজের অন্যায়কে তাকদিরের দোহাই দিয়ে ঢাকতে চেয়েছে। সে বলতে চেয়েছে—আল্লাহ ভাগ্যে চুরি লিখেছেন, তাই করেছে। অথচ বাস্তবতা হলো, সে নিজে চুরিকে বেছে নিয়েছে। আল্লাহ তাকে চুরি করতে বাধ্য করেননি।১১৬০
মোটকথা, আল্লাহ মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। মানুষ তাঁর ইচ্ছা ও স্বাধীনতামতো ঈমান ও কুফর, ভালো ও মন্দ বাছাই করে নিতে পারে। আল্লাহ তাকদির লিখেছেন, তাই মানুষ বাধ্য—এমন নয়। তাকদিরের লিখন মানুষকে অন্যায় কাজে বাধ্য করে না। কারণ, আল্লাহ সবকিছু জানেন। ফলে তিনি যেভাবে জেনেছেন সেভাবে লিখেছেন। তা ছাড়া, আল্লাহ কার ভাগ্যে কী লিখেছেন সেটা কারও জানা নেই। ফলে আল্লাহ কী লিখেছেন সেটার সঙ্গে মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষকে প্রশ্ন করা হবে আল্লাহর নির্দেশ পালন করেছে কি না। যদি নির্দেশ পালন করে, সে মুক্তি পাবে; অমান্য করলে শাস্তি পাবে। তাকদিরে আল্লাহ তায়ালা কী লিখেছেন সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার সুযোগই পাবে না।
টিকাঃ
১১৫৯. আবু দাউদ (কিতাবুল আদাব : ৫০৭৫)। সুনানে কুবরা, নাসায়ি (কিতাবু আমালিল ইয়াওমি ওয়া লাইলাই : ৯৭৫৬).
১১৬০. তালখিসুল আদিল্লাহ (৪৭)।