📄 ইনসাফ ও অনুগ্রহ : তাকদির বোঝার গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি
‘ইচ্ছা’, ‘আদেশ’ ও ‘সন্তুষ্টি’—এই তিনের সম্পর্ক তাকদির রহস্যের এক বিশাল জট খুলে দেয়। সেটা হলো—আল্লাহর ইনসাফ ও অনুগ্রহের মাঝে তাকদিরের আবর্তন। ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘আল্লাহর সকল আনুগত্য সংঘটিত হয় তাঁর আদেশ, ভালোবাসা, সন্তোষ, ইলম, ইচ্ছা, ফয়সালা ও তাঁর নির্ধারণে। আর তাঁর অবাধ্যতাও সংঘটিত হয় তাঁর জ্ঞান, ফয়সালা, নির্ধারণ ও ইচ্ছায়; কিন্তু তাঁর ভালোবাসা, সন্তুষ্টি ও আদেশে নয়।’১১১৮ অর্থাৎ, মানুষকে যেহেতু আল্লাহ ভালোমন্দ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন, এ কারণে মানুষ আল্লাহর আনুগত্য কিংবা অবাধ্যতা দুটোর যেকোনো একটা বেছে নিতে পারে। কোনটা বেছে নেবে সেটা তিনি আগেই জানেন এবং সংঘটনের অনুমতি দেন আর লাওহে মাহফুজে সেটা লিখে রাখেন। ফলে মানুষ আনুগত্য অথবা অবাধ্যতা দুটোর যেটাই বেছে নিক, সেটা আল্লাহর জ্ঞান, ইচ্ছা ও ফয়সালার অধীনেই হচ্ছে। তবে দুটোর মাঝে পার্থক্য হলো, মানুষ যখন আনুগত্যের পথ বেছে নেয়, আল্লাহ তখন সন্তুষ্ট হন, ভালোবাসেন এবং সেটা করার নির্দেশ দেন। বিপরীতে যখন অবাধ্যতার পথ বেছে নেয়, তখন সেটা ভালোবাসেন না, সন্তুষ্ট হন না এবং অবাধ্য হওয়ার নির্দেশও দেন না। কিন্তু তিনি ইচ্ছা ও নির্ধারণ করেন। কারণ, তাঁর ইচ্ছা ও নির্ধারণ না থাকলে মানুষ কোনো কাজই করতে পারবে না। সে পরাধীন হয়ে পড়বে।
ফলে মানুষকে স্বাধীনতা দিয়ে তৈরি করলেও আল্লাহর পছন্দ হলো মানুষ সবসময় ভালো কাজ করুক, আনুগত্যের পথে চলুক। কেউ এটা করলে আল্লাহ তাঁর প্রতি অনুগ্রহ করেন। কেউ অবাধ্যতার পথে চললে তাঁর প্রতি ইনসাফ করেন, কিন্তু জুলুম করেন না। ইমাম লিখেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি করুণাময় ও ইনসাফগার। কখনো করুণা প্রদর্শন করে বান্দা পুণ্য করলে যতটুকু উপযুক্ত তারচেয়ে অনেক বেশি প্রতিদান প্রদান করেন; আর পাপ করলে কখনো ইনসাফের কারণে পাপের শাস্তি দেন, আবার কখনো করুণা করে ক্ষমা করে দেন।’১১১৯ যেমন—কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ۖ وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ ۞ অর্থ : ‘কেউ কোনো সৎকাজ করলে সে তার দশগুণ পাবে, আর কেউ কোনো অসৎকাজ করলে তাকে শুধু তারই প্রতিফল দেওয়া হবে, আর তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।’ [আনআম : ১৬০] ۞ مَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍ ۗ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ۞ অর্থ: ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শিষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শিষে একশো করে দানা থাকে। আল্লাহ যার জন্য চান দ্বিগুণ করে দেন। আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ।’ [বাকারা: ২৬১] অন্য আয়াতে বলেন, ۞ وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ ۞ অর্থ: ‘তোমাদের যে বিপদাপদ ঘটে, তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তো তিনি ক্ষমা করে দেন।’ [শুরা: ৩০] রাসুলুল্লাহ (ﷺ) একটি হাদিসে বলেন, আদম সন্তান (মানুষের) প্রত্যেকটি পুণ্য দশ গুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। ১১২০
আল্লাহর অনুগ্রহ ও ইনসাফের আরও প্রকট উদ্ভাস ঘটে আনুগত্য ও অবাধ্যতা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে। এ ব্যাপারে ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দান করেন। এটা তাঁর অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা পথচ্যুত করেন। এটা তাঁর ইনসাফ। পথচ্যুত করার অর্থ হলো পরিত্যাগ করা। আর পরিত্যাগ করার অর্থ হলো বান্দাকে তাঁর সন্তোষজনক কাজের তৌফিক না দেওয়া। এটা তাঁর ইনসাফ। ফলে বান্দা তখন গুনাহ করলে সেটার শাস্তি প্রদানও ইনসাফ।’১১২১ ইমাম তহাবিও একই কথা এভাবে বলেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে নিজ অনুগ্রহপূর্বক সঠিক পথে পরিচালিত করেন, সুরক্ষিত রাখেন, সুস্থতা ও নিরাপত্তা দান করেন। আবার যাকে ইচ্ছা ইনসাফপূর্বক তার নিজের উপর ছেড়ে দেন, বিপথগামী করেন, পরীক্ষায় ফেলেন। সকলেই তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর অনুগ্রহ ও ইনসাফের মাঝে আবর্তিত হয়।’১১২২ আবু হাফস বলেন, ‘আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো এই বিশ্বাস রাখা যে, ‘সৌভাগ্যবানের দুর্ভাগা হওয়া আল্লাহর ইনসাফ। আর দুর্ভাগার সৌভাগ্যবান হওয়া আল্লাহর অনুগ্রহ।’১১২৩
ইমামদের উপরের সবগুলো বক্তব্যের অর্থ হলো: মানুষকে আল্লাহ স্বাধীনতা ও ভালোমন্দ বেছে নেওয়ার অধিকার দিয়েছেন। তবে মানুষ দুর্বল। মানুষ সবসময় নিজের ভালো নিজে বেছে নিতে পারে না। প্রবৃত্তি ও শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মানুষের ফিতরত নষ্ট হয়ে যায়। হৃদয়ে কালিমা জমে যায়। ফলে এক্ষেত্রে মানুষকে যদি আল্লাহ সবসময় তাদের নিজেদের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেন, তবে দুর্বল মানুষ পথ হারাবে, হোঁচট খাবে, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক নানা মুসিবতে আক্রান্ত হবে। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের সবসময় তাদের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেন না, বরং কিছু বান্দার প্রতি অনুগ্রহ ও করুণার দৃষ্টিতে তাকান। তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পথচ্যুত হতে দেখে নিজ থেকে তাদের রক্ষা করেন। মহব্বতের কাউকে যখন নিজের কর্মের কারণে বিপদে পড়তে দেখেন, তার কাছ থেকে বিপদ সরিয়ে নেন। পছন্দের কাউকে যখন শয়তানের পথে হাঁটতে দেখেন, তাঁর দয়ার সাগর উথলে ওঠে। তিনি বান্দার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজে অনুগ্রহপূর্বক তাকে গোমরাহি থেকে রক্ষা করেন। এভাবে একদল বান্দা স্বাধীনতার অপব্যবহার করে অনিবার্য ধ্বংসের পথে ছোটা শুরু করলে আল্লাহর অনুগ্রহ তাকে হেফাজত করে।
কিন্তু আল্লাহ সবার ক্ষেত্রে এটা করেন না। বরং আরেক দলকে নিজেদের ইচ্ছার উপরই ছেড়ে দেন। তারা নিজেদের স্বাধীন শক্তি ব্যবহার করে পথচ্যুত হয়ে গেলে আল্লাহ সেগুলো পর্যবেক্ষণ করেন, তথাপি তাদের বিচ্যুতি থেকে ফিরিয়ে রাখেন না। বরং তাদের কর্মফলস্বরূপ বিপথগামী করেন, বিভিন্ন মুসিবত ও পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। এটা তাঁর ইনসাফ। কারণ, তিনি নিজ থেকে বান্দাকে এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে আসেন না, বরং বান্দার কর্মফলের উপর ছেড়ে দেন মাত্র। তাকে অনুগ্রহ ও সহায়তা পরিত্যাগ করেন মাত্র।
ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকে কুফর ও ঈমান থেকে বিমুক্ত সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাদের ঈমানের আদেশ দিয়েছেন, কুফর থেকে নিষেধ করেছেন। কিন্তু তারা কেউ ঈমান গ্রহণ করেছে, আবার কেউ কুফর গ্রহণ করেছে। যারা ঈমান এনেছে, তারা নিজেদের ইচ্ছাতেই এনেছে। কিন্তু আল্লাহ তাদের তৌফিক দিয়েছেন এবং সাহায্য করেছেন। বিপরীতে যারা কুফর গ্রহণ করেছে, সেটাও তাদের ইচ্ছায় করেছে। তবে এক্ষেত্রে মূল কারণ আল্লাহ তাকে ঈমান গ্রহণে সহায়তা করেননি কিংবা কুফর গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। ফলে দুজনের মাঝে পার্থক্য এটুকুই যে, প্রথম জনকে তিনি সাহায্য করেছেন, দ্বিতীয় জনকে করেননি। কিন্তু এটা জুলুম নয়। বরং প্রথম জনের প্রতি তিনি অনুগ্রহ করেছেন আর দ্বিতীয় জনের প্রতি ইনসাফ করেছেন।’ ইমাম আরও বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকে কুফর ও ঈমান থেকে বিমুক্ত সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাদের সম্বোধন করেছেন, আদেশ দিয়েছেন, নিষেধ করেছেন। অতঃপর তাদের কেউ কেউ কুফরি করেছে স্বেচ্ছায় স্বীয় কর্মের দ্বারা। কিন্তু তার এই কুফরির কারণ হলো, আল্লাহ তাকে সাহায্য পরিত্যাগ করেছেন। আর কেউ কেউ ঈমান এনেছে স্বেচ্ছায় স্বীয় কর্মের দ্বারা। কিন্তু তার এই স্বীকৃতি ও সত্যায়নের কারণ হলো, আল্লাহ তাকে তৌফিক দিয়েছেন এবং সাহায্য করেছেন।’ ১১২৪
প্রশ্ন হতে পারে, একদলকে অনুগ্রহ করে আরেক দলকে ইনসাফ করাই কি খোদ বেইনসাফি নয়? একদলকে নিজ উদ্যোগে অনিবার্য ধ্বংস থেকে বাঁচিয়ে অনুগ্রহ করা, আরেক দলকে তাদের অনিবার্য ধ্বংসের পথে ছেড়ে দিয়ে ইনসাফ করা কি একধরনের জুলুম নয়? কারণ, আল্লাহ চাইলে তো দ্বিতীয় দলকেও অনুগ্রহ করতে পারতেন! তারাও প্রথম দলের মতো বেঁচে যেত। উত্তর হলো, না। একজনকে অনুগ্রহ করা আর অন্যজনকে অনুগ্রহ পরিত্যাগ করা জুলুম নয়। কারণ, এখানে প্রথম জনকে অনুগ্রহ করা হচ্ছে তাঁর অনুগ্রহভাজন হওয়ার উপযুক্ততার কারণে। দ্বিতীয় জনকে অনুগ্রহ করা হচ্ছে না। কারণ, সে অনুগ্রহের উপযুক্ত নয়। ফলে দ্বিতীয় জনের প্রতি কোনো জুলুম করা হচ্ছে না। তাঁর প্রতি যেটা করা হচ্ছে সেটা হলো ইনসাফ। সে যদি নিজের কর্মফলে কিংবা যেকোনো কারণে আল্লাহর অনুগ্রহের পাত্র হতো, আল্লাহ তাকেও অনুগ্রহ করতেন। কিন্তু সেটা হয়নি। ফলে আল্লাহ তাকে ইনসাফ করছেন। এটার উপর কোনো আপত্তি করা যায় না। আপত্তি করা যেত, যদি তার প্রতি ক্রোধ কিংবা অন্য কোনো কারণে জুলুম করতেন। কিন্তু আল্লাহ সব ধরনের জুলুম থেকে মহাপবিত্র। এ অর্থেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যদি আল্লাহ তায়ালা আকাশ ও পৃথিবীর সবাইকে শাস্তি দান করেন, তবে তিনি শাস্তি দিতে পারেন এবং সেটা জুলুম হবে না। আর যদি তিনি তাদের অনুগ্রহ করেন, তবে সেটা তাদের আমলের চেয়ে কল্যাণকর হবে।’১১২৫ এ অর্থে ইমাম মুহাম্মাদ রহ.-এর বর্ণনায় এসেছে, ইমাম আজম আতা ইবনে আবি রাবাহের এই বক্তব্য নকল করেন, ‘যদি আল্লাহ তায়ালা আকাশ ও যমিনের সকল অধিবাসীকে শাস্তি দান করেন, তবুও তিনি জালেম হবেন না। কারণ, তিনি তাদের সৎপথের সন্ধান দিয়েছেন। তাদের হৃদয়ে সেটা ঢেলে দিয়েছেন। তাদের সে পথে সবরের তৌফিক দিয়েছেন। এসবের উর্ধ্বে, তিনি তাদের জীবন ও জগৎকে নিয়ামতে ভরপুর করে দিয়েছেন। তিনি যদি তাদের থেকে সেসব নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা চান, তবে তারা কখনোই আদায় করতে পারবে না। এই কৃতজ্ঞতা আদায় করতে না পারার অপরাধে তিনি তাদের শাস্তি দিতে পারেন এবং সে ক্ষেত্রে তা মোটেও জুলুম হবে না।’১১২৬
টিকাঃ
১১১৮. আল-ফিকহুল আকবার (৪)। আকিদাহ রুকনিয়্যাহ (২১).
১১১৯. আল-ফিকহুল আকবার (৬-৭).
১১২০. মুসলিম (কিতাবুস সিয়াম: ১১৫১)। সুনানে ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সিয়াম: ১৬৩৮).
১১২১. আল-ফিকহুল আকবার (৭).
১১২২. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (১১).
১১২৩. আস-সাওয়াদুল আজম (৪).
১১২৪. আল-ফিকহুল আকবার (৩-৪).
১১২৫. সুনানে ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সুন্নাহ: ৭৭)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুল আনসার: ২২০১২).
১১২৬. আল-উসুলুল মুনিফাহ (২০-২১)।
📄 কাউকে অনুগ্রহ আর কাউকে ইনসাফের রহস্য
প্রশ্ন হতে পারে, প্রথম জনকে অনুগ্রহ ও সহায়তা করা আর দ্বিতীয় জনকে অনুগ্রহ ও সহায়তা পরিহার করে ইনসাফ করার মাঝে বিশেষ কোনো কারণ আছে কি?
যেমনটা পিছনে বলেছি, হ্যাঁ আছে। কুরআন ও সুন্নাহতে আমরা এর উত্তর পাই। আল্লাহ বলেন, ۞ فَأَمَّا مَنْ أَعْطَىٰ وَاتَّقَىٰ ۞ ۞ وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَىٰ ۞ ۞ فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَىٰ ۞ ۞ وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَىٰ ۞ ۞ وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَىٰ ۞ ۞ فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَىٰ ۞ অর্থ : ‘অতএব, যে দান করে, আল্লাহভীরু হয় এবং উত্তম বিষয়কে সত্যায়ন করে, আমি তার জন্য সুখের বিষয়কে সহজ করে দেবো। আর যে কৃপণতা করে, মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং উত্তম বিষয়কে অস্বীকার করে, আমি তার জন্য দুঃখের পথ সহজ করে দেবো।’১১২৭ [লাইল : ৫-১০] উক্ত আয়াতে স্পষ্ট যে, প্রথম জনকে আল্লাহ সুখের পথ সহজ করে দেন। কারণ, সে আল্লাহকে ভয় করে, সদকা করে, দ্বীন ও ঈমানকে সত্যায়ন করে। আর দ্বিতীয় জনের জন্য দুঃখের পথ সহজ করে দেন (অনুগ্রহ করে সুখের পথ দেখান না)। কারণ, সে মুখ ফিরিয়ে নেয়, দ্বীন ও ঈমান অস্বীকার করে। ফলে অনুগ্রহ ও ইনসাফের পাত্র হওয়ার ক্ষেত্রেও মানুষের কর্মফলের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে。
অন্য আরেকটি আয়াতে বিষয়টি স্পষ্ট। আল্লাহ বলেন, ۞ وَاللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ ۞ ۞ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ ۞ অর্থ : ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী তাকে দ্বীনের দিকে পরিচালিত করেন।’ [ইউনুস : ৪৪] অর্থাৎ, দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া আল্লাহর অনুগ্রহ নিঃসন্দেহে। কিন্তু নিজেকে এই অনুগ্রহপ্রাপ্তির উপযুক্ত বান্দার নিজেকেই হতে হয়। যে আল্লাহর অভিমুখী হয়, আল্লাহর দিকে ছুটে যায়, আল্লাহ তাকে হেদায়াত দেন। যার হেদায়াতের সদিচ্ছা থাকে না, চেষ্টা থাকে না, আল্লাহ তাকে হেদায়াত দেন না। ফলে আল্লাহ যাকে সাহায্য পরিত্যাগ করেন সেটা তার অহংকার, সত্য প্রত্যাখ্যানের দম্ভ এবং একগুঁয়েমির কারণে করেন। আল্লাহ বলেন, ۞ إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ النَّاسَ شَيْئًا وَلَٰكِنَّ النَّاسَ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ ۞ অর্থ : ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষকে একবিন্দু জুলুম করেন না, বরং মানুষ নিজেদের উপর জুলুম করে।’ [ইউনুস: ৪৪]
আরেকটি উত্তর হচ্ছে, ‘রুহের জগতে আল্লাহ তায়ালা আদম সন্তানকে তাঁর (আদমের) পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করেছেন। তাদের জ্ঞান দান করেছেন। তাদের সম্বোধন করে ঈমানের নির্দেশ দিয়েছেন। কুফরি থেকে বারণ করেছেন। তখন তারা আল্লাহর রবুবিয়্যাহকে স্বীকার করে নিয়েছিল। আর এভাবেই তারা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছিল। পরবর্তীকালে আদম সন্তান সেই ফিতরত (ঈমানের প্রস্তুতির) উপরই জন্মলাভ করে। সুতরাং পরে যে কুফরি করল, সে মূলত (তার প্রতিশ্রুতি) বদলে ফেলল। আর যে ঈমান আনল এবং সত্যায়ন করল, সে (প্রতিশ্রুতির উপর) অটল ও অবিচল রইল। আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কাউকে কুফর বা ঈমানের উপর বাধ্য করেননি, কিংবা কাউকে মুমিন বা কাফের হিসেবে সৃষ্টি করেননি; বরং সবাইকে সৃষ্টি করেছেন ব্যক্তি (মানুষ) হিসেবে।’১১২৮ ফলে একজনকে সাহায্য করা অন্যজনকে না করা জুলুম নয়, বরং এটাও তাদের কর্মের প্রতিদান。
টিকাঃ
১১২৭. বুখারি (৪৯৪৯)। মুসলিম (২৬৪৭).
১১২৮. আল-ফিকহুল আকবার (৩-৪)।
📄 রুহের জগতে প্রতিশ্রুতি নেওয়ার রহস্য
প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহ তায়ালা কেন আমাদের থেকে রুহের জগতে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন? সেটা করে তো উলটো আমাদের ক্ষতি করলেন। কারণ, সে প্রতিশ্রুতি আমাদের মনে নেই; অথচ সে কারণে এখন আমাদের শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে। এর উত্তর হলো, আল্লাহ তায়ালা নিজেই আমাদের সেটা পরীক্ষার জন্য ভুলিয়ে দিয়েছেন। সেটা মনে থাকলে তো আর পরীক্ষা হতো না। কারণ, দুনিয়ার বাইরের সব বিষয় হলো গায়েবি তথা অদৃশ্যের। এক্ষেত্রে ঈমানই একমাত্র পথ। সুতরাং সেই প্রতিশ্রুতি মনে না থাকলেও ঈমানের মাধ্যমে সেটার অস্তিত্ব ও সত্যতার ব্যাপারে সুনিশ্চিত জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। তবে আল্লাহ এখানেই আমাদের ছেড়ে দেননি। কেবল সেই প্রতিশ্রুতি উপর ভিত্তি করে আমাদের সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্যের ফয়সালা করেননি; বরং পৃথিবীতে পাঠানোর পর তিনি আমাদের কাছ থেকে আবার সেই প্রতিশ্রুতি নবায়ন করেছেন। বিস্মৃত প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিতে তিনি অসংখ্য নবি-রাসুল প্রেরণ করেছেন, অসংখ্য আসমানি গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং এর পর আর কোনো অজুহাত পেশ করার সুযোগ নেই। ১১২৯
তাই আমাদের মনে রাখতে হবে—যেমনটা ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কাউকে কুফর বা ঈমানের উপর বাধ্য করেননি; কিংবা কাউকে মুমিন বা কাফের হিসেবে সৃষ্টি করেননি; বরং সবাইকে সৃষ্টি করেছেন ব্যক্তি (মানুষ) হিসেবে। ১১৩০ কারণ, কাউকে মুমিন হিসেবে সৃষ্টি করলে পৃথিবীতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো অর্থহীন হতো। তা ছাড়া, এটা কাফেরদের প্রতিও জুলুম হতো। একইভাবে কাউকে কাফের হিসেবে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো অর্থহীন হতো। তা ছাড়া, এটা তাদের প্রতিও জুলুম হতো। ফলে আল্লাহ সবাইকে স্বাধীনভাবে ফিতরতের উপর সৃষ্টি করেছেন। ভালোর প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ এবং মন্দের প্রতি স্বাভাবিক বিকর্ষণ তৈরি করে দিয়েছেন [হুজুরাত : ৭]। এর পর ভালোমন্দ কর্ম প্রত্যেকে নিজে বেছে নেয়। ফলে প্রত্যেককে তার কর্মের দায়ভার বহন করতে হবে।
টিকাঃ
১১২৯. শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১২৮).
১১৩০. আল-ফিকহুল আকবার (৩-৪)।
📄 তাকদিরের লিখন বর্ণনা হিসেবে, নির্দেশ হিসেবে নয়
এটা তাকদির বোঝার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সহজ চাবিকাঠি। এটা একজন সাধারণ মানুষেরও বোঝার কথা। ফলে এই আলোচনার পর তাকদিরের উপর আর কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।
ইমাম আজম বলেন, ‘দুনিয়া ও আখেরাতের কোনোকিছুই আল্লাহর ইচ্ছা, জ্ঞান, ফয়সালা ও কুদরত ব্যতীত সংঘটিত হয় না। তিনি এসব লাওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন। কিন্তু তাঁর এ লিখন বর্ণনা হিসেবে, হুকুম হিসেবে নয়’ (كتبه بالوصف لا بالحكم)।১১৩৫ অর্থাৎ মানুষ পৃথিবীতে কী করবে সেটা তিনি জেনে লিখেছেন। তিনি আগেই তাদের ভাগ্যের উপর কিছু চাপিয়ে লিখেছেন, আর মানুষ পৃথিবীতে এসে কেবল সেটাই পালন করছে—এমন নয়। কারণ, এমন হলে কিতাব অবতীর্ণ করা, রাসুল পাঠানো এবং আদেশ-নিষেধ দেওয়ার কোনো মানে হয় না। এ জন্য ইমাম প্রশ্ন করেন, ‘পৃথিবীতে বর্তমানে যা-কিছু হচ্ছে আল্লাহ জানতেন কি না? যদি কেউ বলে, না, তবে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, সে আল্লাহর ইলমকে অস্বীকার করল। আর যদি বলে, হ্যাঁ, তবে তাকে বলা হবে, আল্লাহ কি তখন যেভাবে জেনেছেন সেভাবে হওয়ার ইচ্ছা করেছেন, নাকি বিপরীত হওয়ার ইচ্ছা করেছেন? যদি বলে, যেভাবে হবে জেনেছেন সেভাবে ইচ্ছা করেছেন, তখন সে স্বীকার করে নিল যে, আল্লাহ মুমিনের জন্য ঈমান এবং কাফেরের জন্য কুফর চেয়েছেন, ফলে তা-ই হচ্ছে। আর যদি বলে, যেভাবে হবে জেনেছেন সেটা তার ইচ্ছা অনুযায়ী ছিল না, তবে আল্লাহকে অক্ষম সাব্যস্ত করা হলো। এতে সে কাফের হয়ে যাবে।’১১৩৬
উপরের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, আল্লাহর ইচ্ছা ও ফয়সালা ইলমের অনুগামী। আল্লাহ যেভাবে হবে জেনেছেন, সেভাবে মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছেন এবং সেভাবে তার ভাগ্য লিখেছেন। আগে লিখে কারও উপর চাপিয়ে দেননি। খাত্তাবি বলেন, ‘অনেক লোক মনে করে, আল্লাহ তায়ালা তাকদিরের লেখার মাধ্যমে মানুষকে ভাগ্যের লিখনের মাঝে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন, বাধ্য করেছেন। এটা ভুল ধারণা। তাকদির অর্থ মানুষকে বাধ্য করা নয়; বরং এর অর্থ মানুষকে সৃষ্টির আগেই আল্লাহ যেহেতু জানেন সে কী করবে, ফলে তিনি বান্দার কর্মফল সে ভিত্তিতেই লিখেছেন। তার জন্য ভালোমন্দ সৃষ্টি করেছেন। নিজের পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেননি। ’১১৩৭
ইমাম আরও বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকে কুফর ও ঈমান থেকে বিমুক্ত সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাদের ঈমানের আদেশ দিয়েছেন, কুফর থেকে নিষেধ করেছেন। তারা কেউ ঈমান গ্রহণ করেছে, আবার কেউ কুফর গ্রহণ করেছে। যারা ঈমান গ্রহণ করেছে, তারা নিজের ইচ্ছাতেই করেছে...। বিপরীতে যারা কুফর গ্রহণ করেছে, সেটাও তাদের ইচ্ছায় করেছে।’ ইমাম অন্যত্র বলেন, ‘...আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কাউকে কুফর বা ঈমানের উপর বাধ্য করেননি। কিংবা কাউকে মুমিন বা কাফের হিসেবে সৃষ্টি করেননি; বরং সবাইকে সৃষ্টি করেছেন ব্যক্তি (মানুষ) হিসেবে।’ ১১৩৮
কাসানিও এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বর্ণনা করেন, যা এ সম্পর্কিত সংশয় কাটাতে সাহায্য করবে। তিনি লিখেন, ‘আল্লাহ তায়ালা যা হবে বলে জেনেছেন, সেটা হওয়ার ইচ্ছা করেছেন, সেটা তাঁর আনুগত্য হোক কিংবা অবাধ্যতা হোক। আবার যেটা তিনি হবে না বলে জেনেছেন, সেটা তিনি না হওয়ার ইচ্ছা করেছেন, হোক সেটা আনুগত্য কিংবা অবাধ্যতা। মোটকথা, তাঁর ইচ্ছাটা ‘জানার’ সঙ্গে সম্পৃক্ত, আদেশ-নিষেধের সঙ্গে নয়।’১১৩৯ অর্থাৎ, আল্লাহ যখন কারও ব্যাপারে জেনেছেন সে ভালো কাজ করবে, তার জন্য সেটাই ইচ্ছা করেছেন। তাকে ভালো কাজের আদেশও দিয়েছেন। ফলে ভালো কাজটা সংঘটিত হচ্ছে। আবার আল্লাহ যখন কেউ খারাপ কাজ করবে জেনেছেন, খারাপের ইচ্ছা করেছেন। যদিও তিনি খারাপটা করতে নিষেধ করেছেন, তবু শেষ পর্যন্ত খারাপটাই হবে। কারণ, তিনি জেনেছেন সেটা, পরে ইচ্ছাও করেছেন। সুতরাং ভালোমন্দ বেছে নেওয়ার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত মানুষের ঘাড়েই পড়ে। সে নিজে বাছাই করে। ফলে এর দায়ভারও তাঁর কাঁধে।
মাগনিসাভি লিখেন, “আল্লাহ লাওহে মাহফুজে সবকিছুর বর্ণনা লিখেছেন। অর্থাৎ, তাতে আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর ভালোমন্দ, লম্বা-চওড়া, ছোট-বড়, কম-বেশি, হালকা-ভারি, গরম-ঠান্ডা, আর্দ্রতা-শুষ্কতা, আনুগত্য-অবাধ্যতা, ইচ্ছা, সামর্থ্য, উপার্জন ইত্যাদি সাধারণ বর্ণনা ও অবস্থা, গুণাগুণ ও চরিত্র লিখেছেন। ব্যাখ্যা ও কারণ ছাড়া কেবল ‘নির্দেশমূলক’ কথা লিখেননি। অন্যকথায়, লাওহে মাহফুজে আল্লাহ এমন লিখেননি—‘যায়েদ মুমিন হোক’, ‘আমর কাফের হোক।’ এমন লিখলে যায়েদ ঈমান আনতে বাধ্য হতো, আমর কুফরি করতে বাধ্য হতো। কারণ, আল্লাহর নির্দেশ অনিবার্যভাবে বাস্তবায়িত হবে। তাঁর নির্দেশ রহিত করার ক্ষমতা কারও নেই (আর এমন হলে তাতে মানুষের কোনো দায় থাকে না)। তাই আল্লাহ লিখেছেন, যায়েদ স্বেচ্ছায় ও নিজের স্বাধীনতায় ঈমান আনবে। সে ঈমান চাইবে, কুফর চাইবে না। আমর স্বেচ্ছায় ও নিজের স্বাধীনতায় কুফরি গ্রহণ করবে। কুফর চাইবে, ঈমান চাইবে না (এ কারণে মানুষকেই তার ঈমান ও কুফরের দায়ভার বহন করতে হবে)। উদ্দেশ্য হলো, বান্দার কাজের ক্ষেত্রে ‘জাবর’ তথা বাধ্যবাধকতাকে নাকচ করে দেওয়া, জাবরিয়্যাহদের মতাদর্শ বাতিল সাব্যস্ত করা।”১১৪০
টিকাঃ
১১৩৫. আল-ফিকহুল আকবার (৩).
১১৩৬. আল-উসুলুল মুনিফাহ (২৮).
১১৩৭. শরহে মুসলিম, নববি (১/১৫৫).
১১৩৮. আল-ফিকহুল আকবার (৩-৪).
১১৩৯. আল-মুতামাদ ফিল মুতাকাদ, কাসানি (৫).
১১৪০. শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১২৩-১২৪)。