📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ইচ্ছা-আদেশ-সন্তোষ তিনের সম্পর্ক

📄 ইচ্ছা-আদেশ-সন্তোষ তিনের সম্পর্ক


আল্লাহর ইচ্ছার মাধ্যমেই জগতে সবকিছু হয়। পৃথিবীর সবকিছু এবং সবকিছুর ইচ্ছা তাঁর ইচ্ছার অধীনে। তবে তাঁর ইচ্ছার একাধিক বহিঃপ্রকাশ রয়েছে। তাঁর আদেশ ও সন্তোষের সঙ্গে ইচ্ছার একাধিক সম্পর্ক রয়েছে।

ইমাম আজম বলেন, ‘আল্লাহর ইচ্ছা নানাভাবে প্রতিফলিত হয়। কখনো কখনো তিনি কোনো বিষয়ের আদেশ দেন, অথচ সেটার ইচ্ছা করেন না। আবার কখনো কোনো বিষয় ইচ্ছা করেন, অথচ সেটার আদেশ দেন না। যেমন তিনি কাফেরকে ইসলামের আদেশ দিয়েছেন, অথচ সেই আদেশ সৃষ্টি ও বাস্তবায়নের ইচ্ছা করেননি। বরং তিনি সেটা তাদের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। কারণ, তিনি যদি ইচ্ছা করতেন, তবে কাফের মুসলিম হয়ে যেত। একইভাবে তিনি কাফেরের জন্য কুফরের ইচ্ছা করেছেন, ফলে কাফের কুফর করে। কিন্তু তিনি তাকে কুফরের আদেশ দেননি।’১১১০

অর্থাৎ, আল্লাহ কাফেরের জন্য কুফরের ইচ্ছা করলেও তিনি তাকে কুফরের আদেশ দেননি কিংবা বাধ্য করেননি। বরং (সে কুফর করবে জেনে) তার জন্য কুফরের ইচ্ছা করে তাকে ঈমান ও কুফর অবলম্বনের এখতিয়ার দিয়েছেন। দুটোর মাঝে যেকোনো একটা গ্রহণের স্বাধীনতা দিয়েছেন। কারণ, তিনি কাফেরকে ইসলামের নির্দেশ দিয়েছেন। যদি তাকে কুফরের উপর বাধ্যই করতেন, তবে এমন নির্দেশ দিতেন না। দিলে সেটা অর্থহীন কাজ হতো। আল্লাহ এমন কাজ থেকে পবিত্র।

অপরদিকে আদেশ ও সন্তোষের মাঝেও সম্পর্কের একাধিক দিক রয়েছে। কখনো কখনো আল্লাহ অনেক বিষয় পছন্দ করেন, কিন্তু আদেশ দেন না। যেমন—তিনি নফল নামায পছন্দ করেন, কিন্তু সেটা আদেশ দেননি (অর্থাৎ আবশ্যক করেননি)। তবে তিনি কখনো এমন আদেশ দেন না যা তিনি পছন্দ করেন না। বরং তিনি যা আদেশ দেন সবগুলোই পছন্দ করেন।১১১১

মুহাম্মাদ রহ.-এর বর্ণনায় এসেছে, ইমাম আল্লাহর আদেশকে দুই ভাগে ভাগ করেন—এক. সৃষ্টিসংশ্লিষ্ট আদেশ। এখানে আদেশ ও ইচ্ছা দুটোরই সমন্বয় ঘটে। এটা চূড়ান্ত। এখানে তিনি যা আদেশ করেন সেটাই হয়। তবে এক্ষেত্রে সন্তোষ থাকা আবশ্যক নয়। দুই. ওহির আদেশ। এখানে সন্তোষ থাকা জরুরি। তবে এটা চূড়ান্ত নয়। ফলে এখানে আদেশ দিলেও ইচ্ছা করেন না, ইচ্ছা করলেও আদেশ দেন না। যেমন—ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে তাঁর ছেলে ইসমাইলকে যবেহ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এখানে তার আদেশ ছিল, কিন্তু ইচ্ছা ছিল না। ফলে আল্লাহর ইচ্ছাই বাস্তবায়িত হয়েছে।১১১২ একইভাবে আল্লাহ সকল মানুষকে ঈমানের আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু ইচ্ছা করেননি। ফলে সেটা বাস্তবায়িত হয় না। সকল মানুষ ঈমান আনে না। যদি তিনি চূড়ান্ত ইচ্ছা করতেন, তবে সবাই ঈমান আনত। কিন্তু চূড়ান্ত ইচ্ছা করলে মানুষের স্বাধীনতা বলতে কিছু থাকত না। এ জন্য তিনি চূড়ান্ত ইচ্ছা করেননি।

ফলে আল্লাহর ইচ্ছা দুই ধরনের—প্রথমটা হলো প্রকৃতই ইচ্ছা। চূড়ান্ত ইচ্ছা। এখানে ইচ্ছা ও নির্দেশ দুটোই বিদ্যমান। ফলে এটার বিপরীত হতে পারবে না। এটা হলো পৃথিবীর পরিচালনাসংক্রান্ত ইচ্ছা ও নির্দেশ। এখানে আল্লাহর ভালোবাসা থাকা জরুরি নয়। যেমন—আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিপদে ফেলেন, কারও বাচ্চা নিয়ে নেন, কারও প্রিয়জনকে দূরে সরিয়ে দেন, ঝড়-তুফান দিয়ে কারও ঘড়বাড়ি ধ্বংস করে ফেলেন ইত্যাদি। এগুলো পৃথিবীর শৃঙ্খলা এবং আল্লাহর ‘হিকমত’ তথা প্রজ্ঞাপূর্ণ পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আল্লাহ এগুলো ভালোবাসেন এমন নয়। যেমন—এক হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা (তাঁর প্রিয় বান্দা সম্পর্কে) বলেছেন, ‘সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে, কিন্তু আমি তাকে কষ্ট দিতে অপছন্দ করি।’১১১৩ অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে মৃত্যু দিয়ে কষ্ট দিতে পছন্দ করেন না। তবুও মৃত্যু দিতেই হয়। পৃথিবীর নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং হিকমতের কারণে তিনি এমন করেন। এক কথায়, এখানে আল্লাহর পছন্দ ও ভালোবাসা নেই, চূড়ান্ত ইচ্ছা ও আদেশ রয়েছে। ফলে এটা অনিবার্য।

দ্বিতীয় প্রকারের ইচ্ছাটা হলো ভালোবাসা, পছন্দ করা; প্রকৃত রূপে ইচ্ছা নয়। কারণ, আল্লাহ ইচ্ছা করলে সেটার বিপরীত হতে পারবে না। ফলে এখানে ‘ইচ্ছা’ শব্দটা ব্যবহার করা হলেও এটার মর্ম হলো পছন্দ, চাওয়া। যেমন—আল্লাহ চান সকল কাফের মুসলিম হয়ে যাক। আল্লাহ চান সবাই জান্নাতে যাক। তাই সবাইকে ঈমানের আদেশও দিয়েছেন। কিন্তু এটা তাঁর পছন্দ এবং ওহির আদেশ, চূড়ান্ত ইচ্ছা নয়। ফলে সবাইকে মুসলিম হওয়ার আদেশ দেওয়া সত্ত্বেও, এটা আল্লাহর পছন্দ সত্ত্বেও সকল কাফের মুসলিম হয় না। কারণ, চূড়ান্ত ইচ্ছা নেই। চূড়ান্ত ইচ্ছা থাকলে তাঁর ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার সাধ্য কারও নেই। এটাই আল্লাহর আদেশ, ইচ্ছা ও সন্তোষের আন্তঃসম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা। ১১১৪

উপরের আলোচনাতে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। তা হলো—আল্লাহর জাগতিক নির্দেশ এবং শরয়ি নির্দেশের মাঝে পার্থক্য। জাগতিক নির্দেশ চূড়ান্ত, কিন্তু তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকা জরুরি নয়। যেমন—আল্লাহ ঝড়-তুফান দিয়ে শহর ধ্বংস করেন, মানুষকে মৃত্যু দেন, বিপদে ফেলেন। এগুলো সব তাঁর ইচ্ছাতে হয়। কিন্তু তিনি বান্দাকে কষ্ট দিতে পছন্দ করেন না। বিপরীতে শরয়ি নির্দেশ তাঁর সন্তোষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে এক্ষেত্রে তিনি যা নির্দেশ দেন সবগুলোই তাঁর পছন্দ। তিনি অপছন্দ করেন এমন কোনো বিষয়ের (শরয়ি) নির্দেশ দেন না।

প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহর ইচ্ছা ও সন্তোষের মাঝে সম্পর্ক কী? ইমাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ মানে, সে আল্লাহর ইচ্ছা ও সন্তোষ দুটোই বাস্তবায়ন করে। যেমন—কাফের যদি মুসলিম হয়ে যায়, তবে তাতে আল্লাহর আদেশ, ইচ্ছা ও সন্তোষ সবগুলোই রয়েছে। বিপরীতে যে আল্লাহর আদেশের বিরোধিতা করে, সেখানে আল্লাহর ইচ্ছা থাকলেও সন্তোষ থাকে না। যেমন—কাফের যদি কুফর করে, সেটা আল্লাহর আদেশ ও সন্তোষ দুটোরই বিপরীত। কিন্তু সেখানে আল্লাহর ইচ্ছা রয়েছে। ইচ্ছা না থাকলে কুফর করতে পারত না।’১১১৫

আল্লাহর সৃষ্টি ও সন্তোষের মাঝে কী সম্পর্ক? ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ কুফর সৃষ্টি করাকে পছন্দ করেছেন, ফলে সেটা সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তিনি কুফরকে পছন্দ করেন না।’ প্রশ্ন হতে পারে, যদি আল্লাহ কোনো জিনিস পছন্দ না করেন, তবে সেটা সৃষ্টি করলেন কেন? ইমাম উত্তরে বলেন, ‘সৃষ্টির সম্পর্ক ইচ্ছার সঙ্গে, পছন্দের সঙ্গে নয়। ফলে আল্লাহ কুফরকে সৃষ্টি করেছেন। কারণ, তিনি কাফেরদের জন্য কুফরের ইচ্ছা করেছেন, কিন্তু তিনি কুফরকে পছন্দ করেন না। যেমন তিনি ইবলিস সৃষ্টিকে পছন্দ করেছেন, ফলে তাকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু স্বয়ং ইবলিসকে তিনি পছন্দ করেন না। একইভাবে তিনি মদ, শূকর—এগুলোর সৃষ্টিকে পছন্দ করেছেন, কিন্তু এগুলোকে তিনি পছন্দ করেন না। কারণ, এগুলোকে তিনি পছন্দ করলে এগুলো অবলম্বন করা নিষিদ্ধ হতো না। বরং কেউ এগুলো গ্রহণ করলে আল্লাহর সন্তোষজনক বস্তুই গ্রহণ করা হতো।’১১১৬

আল্লাহর আদেশ-ইচ্ছা-সন্তুষ্টি-তাকদির ইত্যাদির মাঝে সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয় ইমামের ওসিয়তে। তিনি সেখানে এগুলোর সঙ্গে সম্বন্ধের ভিত্তিতে আমলকে তিনভাগে ভাগ করেছেন: এক. ফরয, যাতে উপরের সবগুলো বিদ্যমান তথা আল্লাহর আদেশ, ইচ্ছা, সন্তুষ্টি, পছন্দ, নির্ধারণ, সৃষ্টি, হুকুম, ইলম, তৌফিক, লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ সবকিছু এতে পাওয়া যায়। দুই. ফযিলত (তথা নফল আমল), যাতে আল্লাহর ইচ্ছা, সন্তুষ্টি, পছন্দ, নির্ধারণ, সৃষ্টি, হুকুম, ইলম, তৌফিক ও লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ পাওয়া গেলেও আদেশ অনুপস্থিত। কারণ, আল্লাহ এটা করার আদেশ দেননি (অর্থাৎ ওয়াজিব করেননি)। তিন. পাপ ও অবাধ্যতা। এতে আল্লাহর ইচ্ছা পাওয়া গেলেও আদেশ পাওয়া যায় না। এটা আল্লাহর ফয়সালা হলেও তাতে তাঁর সন্তোষ ও পছন্দ বিদ্যমান নেই। আল্লাহর নির্ধারণ হলেও তাতে তার তৌফিক নেই। এখানে বান্দাকে তিনি পরিত্যাগ করেন, সাহায্য করেন না। এটাও লাওহে মাহফুজে লিখিত।১১১৭

মোটকথা, তিন প্রকারের আমলই আল্লাহর জ্ঞান, নির্ধারণ ও লাওহে মাহফুজে লিখিত। কিন্তু প্রথমটা তথা ফরযের মাঝে তার ইচ্ছা, আদেশ ও সন্তুষ্টি তিনটিই বিদ্যমান। দ্বিতীয়টা তথা নফলে ইচ্ছা ও সন্তুষ্টি বিদ্যমান থাকলেও আদেশ (আবশ্যকীকরণ) বিদ্যমান নেই। তৃতীয়টা তথা গুনাহে ইচ্ছা বিদ্যমান থাকলেও আদেশ ও সন্তুষ্টি বিদ্যমান নেই। ইচ্ছাটা এখন বিদ্যমান থাকা জরুরি। কারণ, পৃথিবীর সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়। তিনি ইচ্ছা না করলে কিছু হবেই না। ফলে কেউ গুনাহের ইচ্ছা করলে তিনিও চাইলে সেটার ইচ্ছা করেন। কিন্তু তিনি গুনাহের নির্দেশ দেন না, তাতে সন্তুষ্টও হন না। সেক্ষেত্রে তিনি বান্দাকে সাহায্য করেন না। এর পরও যদি বান্দা সেটা করে, তবে এর দায়ভারও তার।

টিকাঃ
১১১০. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৩).
১১১১. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৩).
১১১২. আল-উসুলুল মুনিফাহ (১৫).
১১১৩. বুখারি (৬৫০২)। বাইহাকি (সুনানে কুবরা) (৬৪৮৬)। মুসনাদে আবি ইয়ালা (৭০৮৭).
১১১৪. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৫২)। তালখিসুল আদিল্লাহ (৭৩৮)। আল- জাওহারাতুল মুনিফাহ, মোল্লা হুসাইন হানাফি (৬০)। শরহিল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (২০)।
১১১৫. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৩).
১১১৬. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৪).
১১১৭. আল-ওয়াসিয়‍্যাহ (৩৫-৩৭)। উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৫২)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ইনসাফ ও অনুগ্রহ : তাকদির বোঝার গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি

📄 ইনসাফ ও অনুগ্রহ : তাকদির বোঝার গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি


‘ইচ্ছা’, ‘আদেশ’ ও ‘সন্তুষ্টি’—এই তিনের সম্পর্ক তাকদির রহস্যের এক বিশাল জট খুলে দেয়। সেটা হলো—আল্লাহর ইনসাফ ও অনুগ্রহের মাঝে তাকদিরের আবর্তন। ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘আল্লাহর সকল আনুগত্য সংঘটিত হয় তাঁর আদেশ, ভালোবাসা, সন্তোষ, ইলম, ইচ্ছা, ফয়সালা ও তাঁর নির্ধারণে। আর তাঁর অবাধ্যতাও সংঘটিত হয় তাঁর জ্ঞান, ফয়সালা, নির্ধারণ ও ইচ্ছায়; কিন্তু তাঁর ভালোবাসা, সন্তুষ্টি ও আদেশে নয়।’১১১৮ অর্থাৎ, মানুষকে যেহেতু আল্লাহ ভালোমন্দ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন, এ কারণে মানুষ আল্লাহর আনুগত্য কিংবা অবাধ্যতা দুটোর যেকোনো একটা বেছে নিতে পারে। কোনটা বেছে নেবে সেটা তিনি আগেই জানেন এবং সংঘটনের অনুমতি দেন আর লাওহে মাহফুজে সেটা লিখে রাখেন। ফলে মানুষ আনুগত্য অথবা অবাধ্যতা দুটোর যেটাই বেছে নিক, সেটা আল্লাহর জ্ঞান, ইচ্ছা ও ফয়সালার অধীনেই হচ্ছে। তবে দুটোর মাঝে পার্থক্য হলো, মানুষ যখন আনুগত্যের পথ বেছে নেয়, আল্লাহ তখন সন্তুষ্ট হন, ভালোবাসেন এবং সেটা করার নির্দেশ দেন। বিপরীতে যখন অবাধ্যতার পথ বেছে নেয়, তখন সেটা ভালোবাসেন না, সন্তুষ্ট হন না এবং অবাধ্য হওয়ার নির্দেশও দেন না। কিন্তু তিনি ইচ্ছা ও নির্ধারণ করেন। কারণ, তাঁর ইচ্ছা ও নির্ধারণ না থাকলে মানুষ কোনো কাজই করতে পারবে না। সে পরাধীন হয়ে পড়বে।

ফলে মানুষকে স্বাধীনতা দিয়ে তৈরি করলেও আল্লাহর পছন্দ হলো মানুষ সবসময় ভালো কাজ করুক, আনুগত্যের পথে চলুক। কেউ এটা করলে আল্লাহ তাঁর প্রতি অনুগ্রহ করেন। কেউ অবাধ্যতার পথে চললে তাঁর প্রতি ইনসাফ করেন, কিন্তু জুলুম করেন না। ইমাম লিখেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি করুণাময় ও ইনসাফগার। কখনো করুণা প্রদর্শন করে বান্দা পুণ্য করলে যতটুকু উপযুক্ত তারচেয়ে অনেক বেশি প্রতিদান প্রদান করেন; আর পাপ করলে কখনো ইনসাফের কারণে পাপের শাস্তি দেন, আবার কখনো করুণা করে ক্ষমা করে দেন।’১১১৯ যেমন—কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ۖ وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ ۞ অর্থ : ‘কেউ কোনো সৎকাজ করলে সে তার দশগুণ পাবে, আর কেউ কোনো অসৎকাজ করলে তাকে শুধু তারই প্রতিফল দেওয়া হবে, আর তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।’ [আনআম : ১৬০] ۞ مَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍ ۗ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ۞ অর্থ: ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শিষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শিষে একশো করে দানা থাকে। আল্লাহ যার জন্য চান দ্বিগুণ করে দেন। আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ।’ [বাকারা: ২৬১] অন্য আয়াতে বলেন, ۞ وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ ۞ অর্থ: ‘তোমাদের যে বিপদাপদ ঘটে, তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তো তিনি ক্ষমা করে দেন।’ [শুরা: ৩০] রাসুলুল্লাহ (ﷺ) একটি হাদিসে বলেন, আদম সন্তান (মানুষের) প্রত্যেকটি পুণ্য দশ গুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। ১১২০

আল্লাহর অনুগ্রহ ও ইনসাফের আরও প্রকট উদ্ভাস ঘটে আনুগত্য ও অবাধ্যতা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে। এ ব্যাপারে ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দান করেন। এটা তাঁর অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা পথচ্যুত করেন। এটা তাঁর ইনসাফ। পথচ্যুত করার অর্থ হলো পরিত্যাগ করা। আর পরিত্যাগ করার অর্থ হলো বান্দাকে তাঁর সন্তোষজনক কাজের তৌফিক না দেওয়া। এটা তাঁর ইনসাফ। ফলে বান্দা তখন গুনাহ করলে সেটার শাস্তি প্রদানও ইনসাফ।’১১২১ ইমাম তহাবিও একই কথা এভাবে বলেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে নিজ অনুগ্রহপূর্বক সঠিক পথে পরিচালিত করেন, সুরক্ষিত রাখেন, সুস্থতা ও নিরাপত্তা দান করেন। আবার যাকে ইচ্ছা ইনসাফপূর্বক তার নিজের উপর ছেড়ে দেন, বিপথগামী করেন, পরীক্ষায় ফেলেন। সকলেই তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর অনুগ্রহ ও ইনসাফের মাঝে আবর্তিত হয়।’১১২২ আবু হাফস বলেন, ‘আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো এই বিশ্বাস রাখা যে, ‘সৌভাগ্যবানের দুর্ভাগা হওয়া আল্লাহর ইনসাফ। আর দুর্ভাগার সৌভাগ্যবান হওয়া আল্লাহর অনুগ্রহ।’১১২৩

ইমামদের উপরের সবগুলো বক্তব্যের অর্থ হলো: মানুষকে আল্লাহ স্বাধীনতা ও ভালোমন্দ বেছে নেওয়ার অধিকার দিয়েছেন। তবে মানুষ দুর্বল। মানুষ সবসময় নিজের ভালো নিজে বেছে নিতে পারে না। প্রবৃত্তি ও শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মানুষের ফিতরত নষ্ট হয়ে যায়। হৃদয়ে কালিমা জমে যায়। ফলে এক্ষেত্রে মানুষকে যদি আল্লাহ সবসময় তাদের নিজেদের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেন, তবে দুর্বল মানুষ পথ হারাবে, হোঁচট খাবে, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক নানা মুসিবতে আক্রান্ত হবে। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের সবসময় তাদের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেন না, বরং কিছু বান্দার প্রতি অনুগ্রহ ও করুণার দৃষ্টিতে তাকান। তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পথচ্যুত হতে দেখে নিজ থেকে তাদের রক্ষা করেন। মহব্বতের কাউকে যখন নিজের কর্মের কারণে বিপদে পড়তে দেখেন, তার কাছ থেকে বিপদ সরিয়ে নেন। পছন্দের কাউকে যখন শয়তানের পথে হাঁটতে দেখেন, তাঁর দয়ার সাগর উথলে ওঠে। তিনি বান্দার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজে অনুগ্রহপূর্বক তাকে গোমরাহি থেকে রক্ষা করেন। এভাবে একদল বান্দা স্বাধীনতার অপব্যবহার করে অনিবার্য ধ্বংসের পথে ছোটা শুরু করলে আল্লাহর অনুগ্রহ তাকে হেফাজত করে।

কিন্তু আল্লাহ সবার ক্ষেত্রে এটা করেন না। বরং আরেক দলকে নিজেদের ইচ্ছার উপরই ছেড়ে দেন। তারা নিজেদের স্বাধীন শক্তি ব্যবহার করে পথচ্যুত হয়ে গেলে আল্লাহ সেগুলো পর্যবেক্ষণ করেন, তথাপি তাদের বিচ্যুতি থেকে ফিরিয়ে রাখেন না। বরং তাদের কর্মফলস্বরূপ বিপথগামী করেন, বিভিন্ন মুসিবত ও পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। এটা তাঁর ইনসাফ। কারণ, তিনি নিজ থেকে বান্দাকে এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে আসেন না, বরং বান্দার কর্মফলের উপর ছেড়ে দেন মাত্র। তাকে অনুগ্রহ ও সহায়তা পরিত্যাগ করেন মাত্র।

ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকে কুফর ও ঈমান থেকে বিমুক্ত সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাদের ঈমানের আদেশ দিয়েছেন, কুফর থেকে নিষেধ করেছেন। কিন্তু তারা কেউ ঈমান গ্রহণ করেছে, আবার কেউ কুফর গ্রহণ করেছে। যারা ঈমান এনেছে, তারা নিজেদের ইচ্ছাতেই এনেছে। কিন্তু আল্লাহ তাদের তৌফিক দিয়েছেন এবং সাহায্য করেছেন। বিপরীতে যারা কুফর গ্রহণ করেছে, সেটাও তাদের ইচ্ছায় করেছে। তবে এক্ষেত্রে মূল কারণ আল্লাহ তাকে ঈমান গ্রহণে সহায়তা করেননি কিংবা কুফর গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। ফলে দুজনের মাঝে পার্থক্য এটুকুই যে, প্রথম জনকে তিনি সাহায্য করেছেন, দ্বিতীয় জনকে করেননি। কিন্তু এটা জুলুম নয়। বরং প্রথম জনের প্রতি তিনি অনুগ্রহ করেছেন আর দ্বিতীয় জনের প্রতি ইনসাফ করেছেন।’ ইমাম আরও বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকে কুফর ও ঈমান থেকে বিমুক্ত সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাদের সম্বোধন করেছেন, আদেশ দিয়েছেন, নিষেধ করেছেন। অতঃপর তাদের কেউ কেউ কুফরি করেছে স্বেচ্ছায় স্বীয় কর্মের দ্বারা। কিন্তু তার এই কুফরির কারণ হলো, আল্লাহ তাকে সাহায্য পরিত্যাগ করেছেন। আর কেউ কেউ ঈমান এনেছে স্বেচ্ছায় স্বীয় কর্মের দ্বারা। কিন্তু তার এই স্বীকৃতি ও সত্যায়নের কারণ হলো, আল্লাহ তাকে তৌফিক দিয়েছেন এবং সাহায্য করেছেন।’ ১১২৪

প্রশ্ন হতে পারে, একদলকে অনুগ্রহ করে আরেক দলকে ইনসাফ করাই কি খোদ বেইনসাফি নয়? একদলকে নিজ উদ্যোগে অনিবার্য ধ্বংস থেকে বাঁচিয়ে অনুগ্রহ করা, আরেক দলকে তাদের অনিবার্য ধ্বংসের পথে ছেড়ে দিয়ে ইনসাফ করা কি একধরনের জুলুম নয়? কারণ, আল্লাহ চাইলে তো দ্বিতীয় দলকেও অনুগ্রহ করতে পারতেন! তারাও প্রথম দলের মতো বেঁচে যেত। উত্তর হলো, না। একজনকে অনুগ্রহ করা আর অন্যজনকে অনুগ্রহ পরিত্যাগ করা জুলুম নয়। কারণ, এখানে প্রথম জনকে অনুগ্রহ করা হচ্ছে তাঁর অনুগ্রহভাজন হওয়ার উপযুক্ততার কারণে। দ্বিতীয় জনকে অনুগ্রহ করা হচ্ছে না। কারণ, সে অনুগ্রহের উপযুক্ত নয়। ফলে দ্বিতীয় জনের প্রতি কোনো জুলুম করা হচ্ছে না। তাঁর প্রতি যেটা করা হচ্ছে সেটা হলো ইনসাফ। সে যদি নিজের কর্মফলে কিংবা যেকোনো কারণে আল্লাহর অনুগ্রহের পাত্র হতো, আল্লাহ তাকেও অনুগ্রহ করতেন। কিন্তু সেটা হয়নি। ফলে আল্লাহ তাকে ইনসাফ করছেন। এটার উপর কোনো আপত্তি করা যায় না। আপত্তি করা যেত, যদি তার প্রতি ক্রোধ কিংবা অন্য কোনো কারণে জুলুম করতেন। কিন্তু আল্লাহ সব ধরনের জুলুম থেকে মহাপবিত্র। এ অর্থেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যদি আল্লাহ তায়ালা আকাশ ও পৃথিবীর সবাইকে শাস্তি দান করেন, তবে তিনি শাস্তি দিতে পারেন এবং সেটা জুলুম হবে না। আর যদি তিনি তাদের অনুগ্রহ করেন, তবে সেটা তাদের আমলের চেয়ে কল্যাণকর হবে।’১১২৫ এ অর্থে ইমাম মুহাম্মাদ রহ.-এর বর্ণনায় এসেছে, ইমাম আজম আতা ইবনে আবি রাবাহের এই বক্তব্য নকল করেন, ‘যদি আল্লাহ তায়ালা আকাশ ও যমিনের সকল অধিবাসীকে শাস্তি দান করেন, তবুও তিনি জালেম হবেন না। কারণ, তিনি তাদের সৎপথের সন্ধান দিয়েছেন। তাদের হৃদয়ে সেটা ঢেলে দিয়েছেন। তাদের সে পথে সবরের তৌফিক দিয়েছেন। এসবের উর্ধ্বে, তিনি তাদের জীবন ও জগৎকে নিয়ামতে ভরপুর করে দিয়েছেন। তিনি যদি তাদের থেকে সেসব নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা চান, তবে তারা কখনোই আদায় করতে পারবে না। এই কৃতজ্ঞতা আদায় করতে না পারার অপরাধে তিনি তাদের শাস্তি দিতে পারেন এবং সে ক্ষেত্রে তা মোটেও জুলুম হবে না।’১১২৬

টিকাঃ
১১১৮. আল-ফিকহুল আকবার (৪)। আকিদাহ রুকনিয়‍্যাহ (২১).
১১১৯. আল-ফিকহুল আকবার (৬-৭).
১১২০. মুসলিম (কিতাবুস সিয়াম: ১১৫১)। সুনানে ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সিয়াম: ১৬৩৮).
১১২১. আল-ফিকহুল আকবার (৭).
১১২২. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (১১).
১১২৩. আস-সাওয়াদুল আজম (৪).
১১২৪. আল-ফিকহুল আকবার (৩-৪).
১১২৫. সুনানে ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সুন্নাহ: ৭৭)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুল আনসার: ২২০১২).
১১২৬. আল-উসুলুল মুনিফাহ (২০-২১)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 কাউকে অনুগ্রহ আর কাউকে ইনসাফের রহস্য

📄 কাউকে অনুগ্রহ আর কাউকে ইনসাফের রহস্য


প্রশ্ন হতে পারে, প্রথম জনকে অনুগ্রহ ও সহায়তা করা আর দ্বিতীয় জনকে অনুগ্রহ ও সহায়তা পরিহার করে ইনসাফ করার মাঝে বিশেষ কোনো কারণ আছে কি?

যেমনটা পিছনে বলেছি, হ্যাঁ আছে। কুরআন ও সুন্নাহতে আমরা এর উত্তর পাই। আল্লাহ বলেন, ۞ فَأَمَّا مَنْ أَعْطَىٰ وَاتَّقَىٰ ۞ ۞ وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَىٰ ۞ ۞ فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَىٰ ۞ ۞ وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَىٰ ۞ ۞ وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَىٰ ۞ ۞ فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَىٰ ۞ অর্থ : ‘অতএব, যে দান করে, আল্লাহভীরু হয় এবং উত্তম বিষয়কে সত্যায়ন করে, আমি তার জন্য সুখের বিষয়কে সহজ করে দেবো। আর যে কৃপণতা করে, মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং উত্তম বিষয়কে অস্বীকার করে, আমি তার জন্য দুঃখের পথ সহজ করে দেবো।’১১২৭ [লাইল : ৫-১০] উক্ত আয়াতে স্পষ্ট যে, প্রথম জনকে আল্লাহ সুখের পথ সহজ করে দেন। কারণ, সে আল্লাহকে ভয় করে, সদকা করে, দ্বীন ও ঈমানকে সত্যায়ন করে। আর দ্বিতীয় জনের জন্য দুঃখের পথ সহজ করে দেন (অনুগ্রহ করে সুখের পথ দেখান না)। কারণ, সে মুখ ফিরিয়ে নেয়, দ্বীন ও ঈমান অস্বীকার করে। ফলে অনুগ্রহ ও ইনসাফের পাত্র হওয়ার ক্ষেত্রেও মানুষের কর্মফলের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে。

অন্য আরেকটি আয়াতে বিষয়টি স্পষ্ট। আল্লাহ বলেন, ۞ وَاللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ ۞ ۞ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ ۞ অর্থ : ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী তাকে দ্বীনের দিকে পরিচালিত করেন।’ [ইউনুস : ৪৪] অর্থাৎ, দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া আল্লাহর অনুগ্রহ নিঃসন্দেহে। কিন্তু নিজেকে এই অনুগ্রহপ্রাপ্তির উপযুক্ত বান্দার নিজেকেই হতে হয়। যে আল্লাহর অভিমুখী হয়, আল্লাহর দিকে ছুটে যায়, আল্লাহ তাকে হেদায়াত দেন। যার হেদায়াতের সদিচ্ছা থাকে না, চেষ্টা থাকে না, আল্লাহ তাকে হেদায়াত দেন না। ফলে আল্লাহ যাকে সাহায্য পরিত্যাগ করেন সেটা তার অহংকার, সত্য প্রত্যাখ্যানের দম্ভ এবং একগুঁয়েমির কারণে করেন। আল্লাহ বলেন, ۞ إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ النَّاسَ شَيْئًا وَلَٰكِنَّ النَّاسَ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ ۞ অর্থ : ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষকে একবিন্দু জুলুম করেন না, বরং মানুষ নিজেদের উপর জুলুম করে।’ [ইউনুস: ৪৪]

আরেকটি উত্তর হচ্ছে, ‘রুহের জগতে আল্লাহ তায়ালা আদম সন্তানকে তাঁর (আদমের) পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করেছেন। তাদের জ্ঞান দান করেছেন। তাদের সম্বোধন করে ঈমানের নির্দেশ দিয়েছেন। কুফরি থেকে বারণ করেছেন। তখন তারা আল্লাহর রবুবিয়্যাহকে স্বীকার করে নিয়েছিল। আর এভাবেই তারা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছিল। পরবর্তীকালে আদম সন্তান সেই ফিতরত (ঈমানের প্রস্তুতির) উপরই জন্মলাভ করে। সুতরাং পরে যে কুফরি করল, সে মূলত (তার প্রতিশ্রুতি) বদলে ফেলল। আর যে ঈমান আনল এবং সত্যায়ন করল, সে (প্রতিশ্রুতির উপর) অটল ও অবিচল রইল। আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কাউকে কুফর বা ঈমানের উপর বাধ্য করেননি, কিংবা কাউকে মুমিন বা কাফের হিসেবে সৃষ্টি করেননি; বরং সবাইকে সৃষ্টি করেছেন ব্যক্তি (মানুষ) হিসেবে।’১১২৮ ফলে একজনকে সাহায্য করা অন্যজনকে না করা জুলুম নয়, বরং এটাও তাদের কর্মের প্রতিদান。

টিকাঃ
১১২৭. বুখারি (৪৯৪৯)। মুসলিম (২৬৪৭).
১১২৮. আল-ফিকহুল আকবার (৩-৪)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 রুহের জগতে প্রতিশ্রুতি নেওয়ার রহস্য

📄 রুহের জগতে প্রতিশ্রুতি নেওয়ার রহস্য


প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহ তায়ালা কেন আমাদের থেকে রুহের জগতে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন? সেটা করে তো উলটো আমাদের ক্ষতি করলেন। কারণ, সে প্রতিশ্রুতি আমাদের মনে নেই; অথচ সে কারণে এখন আমাদের শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে। এর উত্তর হলো, আল্লাহ তায়ালা নিজেই আমাদের সেটা পরীক্ষার জন্য ভুলিয়ে দিয়েছেন। সেটা মনে থাকলে তো আর পরীক্ষা হতো না। কারণ, দুনিয়ার বাইরের সব বিষয় হলো গায়েবি তথা অদৃশ্যের। এক্ষেত্রে ঈমানই একমাত্র পথ। সুতরাং সেই প্রতিশ্রুতি মনে না থাকলেও ঈমানের মাধ্যমে সেটার অস্তিত্ব ও সত্যতার ব্যাপারে সুনিশ্চিত জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। তবে আল্লাহ এখানেই আমাদের ছেড়ে দেননি। কেবল সেই প্রতিশ্রুতি উপর ভিত্তি করে আমাদের সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্যের ফয়সালা করেননি; বরং পৃথিবীতে পাঠানোর পর তিনি আমাদের কাছ থেকে আবার সেই প্রতিশ্রুতি নবায়ন করেছেন। বিস্মৃত প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিতে তিনি অসংখ্য নবি-রাসুল প্রেরণ করেছেন, অসংখ্য আসমানি গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং এর পর আর কোনো অজুহাত পেশ করার সুযোগ নেই। ১১২৯

তাই আমাদের মনে রাখতে হবে—যেমনটা ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কাউকে কুফর বা ঈমানের উপর বাধ্য করেননি; কিংবা কাউকে মুমিন বা কাফের হিসেবে সৃষ্টি করেননি; বরং সবাইকে সৃষ্টি করেছেন ব্যক্তি (মানুষ) হিসেবে। ১১৩০ কারণ, কাউকে মুমিন হিসেবে সৃষ্টি করলে পৃথিবীতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো অর্থহীন হতো। তা ছাড়া, এটা কাফেরদের প্রতিও জুলুম হতো। একইভাবে কাউকে কাফের হিসেবে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো অর্থহীন হতো। তা ছাড়া, এটা তাদের প্রতিও জুলুম হতো। ফলে আল্লাহ সবাইকে স্বাধীনভাবে ফিতরতের উপর সৃষ্টি করেছেন। ভালোর প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ এবং মন্দের প্রতি স্বাভাবিক বিকর্ষণ তৈরি করে দিয়েছেন [হুজুরাত : ৭]। এর পর ভালোমন্দ কর্ম প্রত্যেকে নিজে বেছে নেয়। ফলে প্রত্যেককে তার কর্মের দায়ভার বহন করতে হবে।

টিকাঃ
১১২৯. শরহুল ফিকহিল আকবার, মাগনিসাভি (১২৮).
১১৩০. আল-ফিকহুল আকবার (৩-৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00