📄 তাকদিরের পরিচয় এবং তাকদিরে বিশ্বাসের আবশ্যকতা
‘তাকদির’ (التقدير) শব্দের শাব্দিক অর্থ: নির্ধারণ করা, ধার্য করা। তাকদিরে বিশ্বাস ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আকিদা, ঈমানের একটি মৌলিক ভিত্তি। আহলে সুন্নাতের মতে, তাকদিরে ঈমানের অর্থ হলো এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ তায়ালা গোটা বিশ্বজগতের সবকিছু সৃষ্টির আগেই প্রত্যেকটি বিষয় জেনে নিয়েছেন সেটা কখন ঘটবে কীভাবে ঘটবে। সেই পরিপূর্ণ জ্ঞান ও তাঁর সর্বব্যাপী ইচ্ছা অনুযায়ী প্রত্যেকটি বিষয় সুপরিমিতভাবে নির্ধারণ করেছেন। ‘লাওহে মাহফুজে’ সে মোতাবেক সবকিছু লিখেছেন। সবকিছুকে সেভাবেই সৃষ্টি করেছেন। ফলে এখন জীবন ও জগতের ভালোমন্দ সবকিছু সেভাবেই ঘটছে ও ঘটবে যেভাবে তিনি জেনেছেন, চেয়েছেন, লিখেছেন, নির্ধারণ ও সৃষ্টি করেছেন। কোনোকিছুতে একবিন্দু পরিমাণ ব্যত্যয় ঘটবে না। কেউ তাঁর জ্ঞান, ইচ্ছা, লেখা, নির্ধারণ ও সৃষ্টির বাইরে যেতে পারবে না।১০৯২
কুরআন-সুন্নাহর অসংখ্য বক্তব্য দ্বারা তাকদির সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। ফলে এটা ঈমানের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। যে ব্যক্তি এটা অস্বীকার করবে, সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِكُكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ ۗ وَإِنْ تُصِبْهُمْ حَسَنَةٌ يَقُولُوا هَٰذِهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ ۖ وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَقُولُوا هَٰذِهِ مِنْ عِنْدِكَ ۚ قُلْ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ ۖ فَمَالِ هَٰؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثًا ۞ অর্থ : “তোমরা যেখানেই থাকো না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমনকি সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করলেও। যদি তাদের কোনো কল্যাণ হয় তবে তারা বলে, ‘এটা আল্লাহর নিকট হতে।’ আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয় তবে তারা বলে, ‘এটা আপনার নিকট হতে।’ বলুন, ‘সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ হতে।’ এই সম্প্রদায়ের হলো কী যে, এরা কোনো কথা বুঝতে চায় না?” [নিসা: ৭৮] অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَكُلُّ شَيْءٍ فَعَلُوهُ فِي الزُّبُرِ * وَكُلُّ صَغِيرٍ وَكَبِيرٍ مُّسْتَطَرٌ ۞ অর্থ: ‘তাদের সকল কর্ম কিতাবে রয়েছে। ছোট-বড় সবকিছু লেখা রয়েছে।’ [কামার: ৫২] আরও বলেন, ۞ أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ۗ إِنَّ ذَٰلِكَ فِي كِتَابٍ ۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ ۞ অর্থ: ‘তুমি কি জানো না আকাশ ও যমিনের সবকিছু আল্লাহ তায়ালা জানেন? এ সমস্ত কিছু কিতাবে রয়েছে। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর জন্য সহজ।’ [হজ : ৭০]
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) হাদিসে বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেককে মাতৃগর্ভে চল্লিশ দিন পর্যন্ত (সৃষ্টির মৌল উপাদানরূপে) সংগৃহীত করা হয়। অতঃপর তা রক্তপিণ্ডে পরিণত হয়, অতঃপর মাংসপিণ্ডে। এরপর আল্লাহ তার কাছে চারটি বিষয়ের নির্দেশ দিয়ে একজন ফেরেশতা পাঠান। ফেরেশতা তার আমল, জীবনকাল, রিযিক এবং সে সৌভাগ্যবান হবে নাকি দুর্ভাগা সেটা লিখে রাখেন। অতঃপর তার মাঝে রুহ ফুঁকে দেওয়া হয়।’১০৯৩ ইমাম আজম হাম্মাদ সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে উক্ত হাদিসটি এভাবে বর্ণনা করেন: ‘তোমাদের প্রত্যেকে মায়ের গর্ভে সর্বপ্রথম চল্লিশ দিন বীর্য আকারে থাকে। এর পরের চল্লিশ দিনে রক্তপিণ্ডে পরিণত হয়। এর পর চল্লিশ দিনে মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়। তখন আল্লাহ তার কাছে একজন ফেরেশতা পাঠান যে তার ভিতরে রুহ ফুঁকে দেয় এবং চারটি বিষয় লিপিবদ্ধ করে : তার রিযিক, মৃত্যু, আমল এবং সে সৌভাগ্যবান হবে নাকি দুর্ভাগা। ওই সত্তার শপথ যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই! তোমাদের কেউ জীবনভর জাহান্নামের আমল করতে থাকে, এর পর যখন জাহান্নাম এবং তার মাঝে মাত্র এক হাত বাকি থাকে, ওই সময় ভাগ্যলিপি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় এবং তার সর্বশেষ আমল হয় জান্নাতিদের। ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করে। আবার তোমাদের কেউ সারা জীবন জান্নাতিদের আমল করে। পরিশেষে যখন তার মাঝে এবং জান্নাতের মাঝে মাত্র এক হাত দূরত্ব থাকে, তার জীবনের শেষ আমল হয় জাহান্নামিদের। ফলে মৃত্যুর পরে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে।’১০৯৪
অন্য প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বালক ইবনে আব্বাসকে নসিহত করেন, ‘বৎস, আল্লাহ তায়ালাকে হেফাজত করো (অর্থাৎ, তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলো), আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন। সুখের সময়ে তাকে মনে রাখো, তিনি দুঃখের সময় তোমাকে মনে রাখবেন। যখন কিছু চাও, আল্লাহর কাছে চাও। যখন সাহায্যের জন্য কাউকে দরকার, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। কলম শুকিয়ে গিয়েছে। যা হওয়ার তা-ই হবে। যদি সৃষ্টির সবাই তোমাকে উপকার করার ইচ্ছা করে, আল্লাহর ফয়সালা না থাকলে তারা তোমাকে একবিন্দু উপকার করতে পারবে না। আবার যদি সৃষ্টির সবাই তোমাকে ক্ষতি করার ইচ্ছা করে, আল্লাহর ফয়সালা না থাকলে তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’১০৯৫
ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘তাকদিরের ভালোমন্দ উভয়টিই আল্লাহর পক্ষ থেকে। সুতরাং কেউ যদি এটা মনে করে যে, ভালোমন্দ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হয়, তবে তার তাওহিদ নষ্ট হবে এবং সে কাফের হয়ে যাবে।’১০৯৬
ইমাম আরও বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু কোনো বস্তু থেকে এগুলো সৃষ্টি করেননি (সম্পূর্ণ নতুন তৈরি করেছেন)। অনাদিতে সকল বস্তু সৃষ্টির আগেই আল্লাহ এগুলো সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত ছিলেন। তিনিই সবকিছু নির্ধারণ করেছেন এবং ফয়সালা করেছেন। দুনিয়া ও আখেরাতের কোনোকিছুই আল্লাহর ইচ্ছা, তাঁর জ্ঞান, তাঁর ফয়সালা এবং তাঁর কুদরত ব্যতীত সংঘটিত হয় না। তিনি এসব লাওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন।’১০৯৭
লেখার প্রক্রিয়া সম্পর্কে ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা কলমকে সৃষ্টি করে নির্দেশ দিলেন, তুমি লেখো। কলম বলল, হে প্রতিপালক, কী লিখব? তিনি বললেন, ‘কিয়ামত পর্যন্ত যা-কিছু হবে তা লেখো।’ কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এ প্রসঙ্গে বলেন, ۞ وَكُلُّ شَيْءٍ فَعَلُوهُ فِي الزُّبُرِ * وَكُلُّ صَغِيرٍ وَكَبِيرٍ مُّسْتَطَرٌ ۞ অর্থ : তারা যা-কিছু করে, সবই আমলনামায় রয়েছে। প্রত্যেক ছোট ও বড় সবকিছুই লিপিবদ্ধ।’ [কামার: ৫২-৫৩] ১০৯৮
আবু ইউসুফ রহ. বলেন, “আমি ইমাম আবু হানিফার কাছে ছিলাম। তখন বসরা থেকে এক ব্যক্তি এসে ইমামকে জিজ্ঞাসা করল, আবু হানিফা, আপনি কি তাকদির মানেন? তিনি বললেন, তাকদির না মেনে উপায় আছে? আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এটা সাব্যস্ত করে বলেছেন, ﴿وَإِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ﴾ অর্থ : ‘আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাণে।’ [কামার : ৪৯] সুতরাং পৃথিবীর সবকিছুই তাকদিরের অন্তর্ভুক্ত। ...বান্দার কাজে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে বান্দা যে কাজ করবে, সেটার দায়ভারও তার বহন করতে হবে।”১০৯৯
আবু জাফর তহাবি লিখেন: ‘আল্লাহ নিজ পূর্ণজ্ঞানে সবাইকে সৃষ্টি করেছেন; সবার ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন; সবার জন্ম-মৃত্যু সুনির্দিষ্ট করেছেন। সৃষ্টিজীবকে সৃষ্টি করার আগে তাদের কোনোকিছুই তাঁর কাছে গোপন ছিল না। সৃষ্টির আগেই তিনি জানতেন তারা কী করবে। তিনি তাদের তাঁর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর অবাধ্য হতে নিষেধ করেছেন। সবকিছু তাঁর নির্ধারণ ও ইচ্ছা অনুযায়ীই হয়ে থাকে। তাঁর ইচ্ছাই কার্যকর হয়। তাঁর ইচ্ছার বাইরে সৃষ্টির ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই। তিনি যা ইচ্ছা করেন, তা-ই হয়। যা ইচ্ছা করেন না, তা হয় না।’ ১১০০
তহাবি আরও বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আদম আলাইহিস সালাম এবং তার সন্তানদের কাছ থেকে যে প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন, তা সত্য। অনাদিকাল থেকেই আল্লাহ তায়ালা বিস্তারিত জানেন—কতজন মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং কতজন জাহান্নামে প্রবেশ করবে। সুতরাং তাতে প্রবেশকারীদের সংখ্যা কোনো ধরনের কমবেশি হবে না। একইভাবে পৃথিবীতে কে কী কাজ করবে আল্লাহ তায়ালা তাও জেনে রেখেছেন। ফলে প্রত্যেককে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজ তার কাছে সহজ করে দেওয়া হয়েছে। সকল আমল শেষ অবস্থার উপর নির্ভরশীল। তাই প্রকৃত সৌভাগ্যবান হচ্ছে সে ব্যক্তি, আল্লাহ তায়ালা যার কপালে সৌভাগ্য লিখে রেখেছেন। আর দুর্ভাগা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা যার কপালে দুর্ভাগ্য লিখে রেখেছেন।’ ১১০১
লাওহে মাহফুজের লেখা এবং তাকদিরের অপরিবর্তনীয়তা প্রসঙ্গে তহাবি বলেন, “আমরা লওহ (মাহফুজ), কলম এবং (লাওহে) লিপিবদ্ধ সবকিছুতে বিশ্বাস করি। সুতরাং তাতে যদি কোনো বিষয় ‘হবে’ বলে লেখা থাকে, গোটা সৃষ্টি মিলেও সেটাকে প্রতিহত করতে পারবে না। একইভাবে তাতে যদি কোনো বিষয় ‘হবে না’ লেখা থাকে, গোটা সৃষ্টির সবাই মিলেও সেটা করতে পারবে না। কলম শুকিয়ে গেছে। ফলে যা লেখা হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সেগুলোই থাকবে। কেউ যা হারিয়েছে, সে কখনো তা পাওয়ারই ছিল না। আর যা পেয়েছে, কখনো তা হারানোরই ছিল না।”১১০২
তাকদিরে ঈমান আনার আবশ্যকতা বর্ণনার পাশাপাশি ইমাম রহ. একাধিক বক্তব্যে তাকদির অস্বীকার করা থেকে সতর্ক করেছেন। তিনি নিজস্ব সনদে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে এ ব্যাপারে একাধিক হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি (নাফে ইবনে উমর সূত্রে) বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘এমন একটি সম্প্রদায় আসবে যারা বলবে, তাকদির বলতে কিছু নেই। যদি তোমরা তাদের পাও, তবে তাদের সালাম দেবে না। তারা অসুস্থ হলে দেখতে যাবে না। মারা গেলে তাদের জানাযা পড়বে না। কারণ, তারা দাজ্জালের অনুসারী, এই উম্মতের অগ্নিপূজারী। আল্লাহ তায়ালা তাদের সেসব লোকের সঙ্গেই একত্র করবেন।’১১০৩
অপর আরেকটি বর্ণনায় তিনি (সালেম আবদুল্লাহ ইবনে উমর সূত্রে) বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কাদারিয়্যাহ সম্প্রদায়কে লানত করেছেন এবং বলেছেন, ‘আমার পূর্বে আল্লাহ তায়ালা যত নবি প্রেরণ করেছেন, প্রত্যেকেই তাদের উম্মতকে তাদের থেকে সতর্ক করেছেন এবং তাদের লানত দিয়েছেন।’ আরেকটি বর্ণনায় তিনি আলি রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, আলি রাযি. কুফার মিম্বরে বসে বলেন, ‘যে ব্যক্তি এই বিশ্বাস রাখবে না যে, ভালোমন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’১১০৪
টিকাঃ
১০৯২. শরহে মুসলিম, নববি (১/১৫৪)।
১০৯৩. বুখারি (কিতাবুত তাওহিদ: ৭৪৫২)। মুসলিম (কিতাবুল কদর: ২৬৪৩)।
১০৯৪. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৪)।
১০৯৫. তিরমিযি (আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ : ২৫১৬)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু বনি হাশিম : ২৭১৩)।
১০৯৬. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৩৪)। আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২৬)।
১০৯৭. আল-ফিকহুল আকবার (৩)।
১০৯৮. আল-ফিকহুল আকবার (৩)।
১০৯৯. আল-ইতিকাদ, নিশাপুরি (১১৭)।
১১০০. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (১০-১১)।
১১০১. প্রাগুক্ত (১৬)।
১১০২. প্রাগুক্ত (১৮)।
১১০৩. আল-উসুলুল মুনিফাহ (২৫)।
১১০৪. আল-উসুলুল মুনিফাহ (২৫)। জটিলতা হলো, খোদ ইমাম আজমের কোনো কোনো শাগরেদের ব্যাপারে তাকদির অস্বীকারের অভিযোগ উঠেছে। এটা ভিত্তিহীন বক্তব্য, বাতিল অপবাদ। এটা ঠিক সেই প্রকারের অপবাদ, যেমনটা ইমাম হাসান বসরির উপর তোলা হয়েছে। ইতিহাসের আরও বড় বড় ব্যক্তির উপর তোলা হয়েছে। স্বয়ং ইমামের নামে বিভিন্ন বিষয়ে অপবাদ আরোপ করা হয়েছে, যার কিছু উদাহরণ আমরা এ গ্রন্থে আলোচনা করেছি। আবদুল মালেক ইবনে আবিশ শাওয়ারিব বসরার একটি প্রাচীন ভবনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘এই ঘর থেকে আবু হানিফার মাযহাবের উপর সত্তর জন কাযি বের হয়েছেন। তাদের প্রত্যেকে তাকদির সাব্যস্ত করতেন। আল্লাহ তায়ালাকে ভালোমন্দ সবকিছুর স্রষ্টা বলতেন। এসব আকিদা তারা আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, যুফার, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান এবং তাদের শাগরেদদের ব্যাপারে বর্ণনা করতেন। (আকিদা ও) ফিকহের ক্ষেত্রে তারা আবু হানিফা এবং তাঁর এসব শাগরেদদের অনুসারী ছিলেন। সুতরাং যে ব্যক্তি বলবে, আল্লাহ কেবল ভালো সৃষ্টি করেছেন, মন্দ তাঁর সৃষ্টি নয়, সে তাকদিরকে অস্বীকারকারী বিদআতি গণ্য হবে। তার পিছনে নামায পড়া যাবে না।’ [আল- ইতিকাদ, নিশাপুরি; ১২৭-১২৯]
হাসান বসরি কি তাকদীর অস্বীকার করতেন? খোদ ইমাম আজম হাসান বসরির উপর উত্থাপিত অপবাদ মিথ্যারোপ করে বলেন, ‘মানুষ হাসানের ব্যাপারে মিথ্যাচার করেছে। তাকে তাকদির অস্বীকারকারী বানিয়ে দিয়েছে।’ [আল- ইতিকাদ, নিশাপুরি (১২৯)] ইমাম আজম রহ. সত্য বলেছেন। কারণ, হাসান বসরির উপর এটা মিথ্যাচার। স্বয়ং হাসান বসরি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তাকদিরকে অস্বীকার করল, সে যেন কুরআনকে অস্বীকার করল।’ [মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : কিতাবুল জামে : ২০০৮৫]
হুমাইদ বর্ণনা করেন, একবার হাসান বসরি মক্কা এলেন। মক্কার ফকিহগণ আমাকে বললেন আমি যেন তাকে কোনো একটা মজলিসে কিছু কথা ও নসিহত করার অনুরোধ করি। তিনি সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। মানুষ সমবেত হওয়ার পরে তিনি তাদের নসিহত করলেন। হঠাৎ এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, আবু সাইদ, শয়তানকে কে সৃষ্টি করেছে? তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সৃষ্টিকর্তা আছে নাকি? তিনিই শয়তানকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি ভালো সৃষ্টি করেছেন, মন্দকেও তিনি সষ্টি করেছেন। তখন লোকটি বলল, তাদের সর্বনাশ হোক! তারা কীভাবে এই শায়খের নামে মিথ্যাচার করে! ইবনে আউন বলেন, আমি শামে গেলাম। হঠাৎ একব্যক্তি আমাকে পিছন থেকে ডাক দিলো। আমি পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম তিনি রজা ইবনে হাইওয়া। আমাকে তিনি বললেন, আবু আউন, লোকজন হাসানের নামে কী বলাবলি করছে? আমি তাকে বললাম, মানুষ হাসানের নামে অনেক মিথ্যা বলাবলি করে।
প্রশ্ন আসতে পারে, মানুষ হাসান বসরি ও ইমাম আজমের শাগরেদদের নামে কেন মিথ্যাচার করত? উক্ত মিথ্যাচারের কারণ ঠিক সেগুলো, যেগুলো তাদের নামে অন্যান্য অপবাদের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ছিল। একদল সুবিধাবাদী, আরেকদল হিংসকু, যেমনটা আইয়ুব সাখতিয়ানি বলতেন। আবু দাউদ বর্ণনা করেন, আইয়ুব সাখতিয়ানি বলতেন, দুই শ্রেণির লোক হাসানের উপর মিথ্যাচার করেছে। এক. যারা নিজেরা তাকদির অস্বীকার করত। হাসানের নাম ব্যবহার করে তারা তাদের মতাদর্শ মানুষের মাঝে বিকাতে চেয়েছে। দুই. যারা হিংসুক ও বিদ্বেষগ্রস্ত। তারা বলত, সে কি এটা বলেনি? সে কি ওটা বলেনি? [আবু দাউদ: কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৬১৮-৪৬২২]
📄 মানুষ স্বাধীন নাকি পরাধীন?
তাকদির নিয়ে আলোচনার শুরুতেই একটি জটিল প্রশ্নের উদয় হয়—যদি সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়, তবে মানুষের স্বাধীনতা কোথায়? তবে কি মানুষ স্বাধীন নয়? নাকি পরাধীন? এটা এমন এক প্রশ্ন যা যুগে যুগে মানুষকে ভাবিয়েছে, পেরেশান ও অস্থির করেছে, সংকটে ফেলেছে। মানুষ বিভিন্নভাবে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে। কেউ ডানে চলে গেছে, কেউ-বা বামে। কেউ সত্যের কাছাকাছি পৌঁছেছে, কেউ বিভ্রান্তির অতলান্তে তলিয়ে গিয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহ দিয়েছে এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান—ওহিভিত্তিক সমাধান, মানবীয় বিবেক-বুদ্ধি যা দিতে অক্ষম।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশুদ্ধ আকিদা অনুযায়ী, মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়, আবার পরাধীনও নয়। বরং মানুষের স্বাধীনতা এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর মুখাপেক্ষিতা, অন্যকথায়, আল্লাহর ইচ্ছা এবং মানুষের ইচ্ছার এক বিরল ভারসাম্যের উপর গোটা বিশ্বজগৎ দাঁড়ানো। এই ভারসাম্যের সুফলে মানুষ নিজের ইচ্ছামতো পৃথিবীতে জীবনযাপন করতে পারছে। আবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইচ্ছামতো সবকিছু করতে পারছে না। এই ভারসাম্যের কারণে মানুষ অন্যায় করলে পরকালে সেটার দায়ভার নিতে হবে। আবার এই ভারসাম্যের কারণে মানুষ বিপদে আক্রান্ত হলে সেটাকে ভাগ্যের উপর চাপিয়ে দিতে পারছে।
তাকদির বোঝার জন্য এই ভারসাম্য বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বরং এই ভারসাম্য উপলব্ধিই তাকদির অনুধাবনের মূল চাবিকাঠি। এটা না বোঝার ফলেই তাকদিরের ক্ষেত্রে একাধিক সম্প্রদায় বিভ্রান্ত হয়েছে। এ কারণে ইমাম আজম বিভিন্ন জায়গায় সবিস্তারে এগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। আমরা নিচে সংক্ষেপে সেগুলো উল্লেখ করার চেষ্টা করব :
ইমাম আজম রহ.-কে প্রশ্ন করা হলো—পৃথিবীর সবকিছু যদি আল্লাহর ইচ্ছাতে হয়ে থাকে, তবে তো মানুষ পরাধীন বিবেচিত হলো। তাহলে ভুল করলে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে কেন? তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আল্লাহ যদি চাইতেন সমগ্র সৃষ্টিকে ফেরেশতাদের মতো অনুগত বানাতে পারতেন কি না? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, পারতেন। কারণ, আল্লাহ বলেছেন, ۞ وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ ۞ অর্থ : ‘তিনি তাঁর বান্দাদের উপর পরাক্রমশালী।’ [আনআম : ১৮] তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আল্লাহ যদি চাইতেন ইবলিসকে জিবরিলের মতো অনুগত বানাতে পারতেন কি না? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’ তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, মানুষ যখন ব্যভিচার করে, মদ্যপান করে, সেগুলো কি আল্লাহর ইচ্ছায় সংঘটিত হয় না? তিনি বললেন, ‘আলবত হ্যাঁ। পৃথিবীর সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছায় সংঘটিত হয়।’ তখন তাকে মূল প্রশ্ন করা হলো, তাহলে মানুষের কী দোষ? ইবলিসের কী দোষ? ব্যভিচারী ও মদ্যপের কী দোষ? কেন তাদের শাস্তি দেওয়া হবে? সবকিছু তো আল্লাহর ইচ্ছাতেই হচ্ছে! ইমাম জবাবে বলেন, ‘এসব কর্ম আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছার বিরোধিতার কারণে শাস্তি দেওয়া হয় না। বরং আল্লাহর নির্দেশের বিরোধিতার কারণে শাস্তি দেওয়া হয়। পৃথিবীতে এটা কোনো আশ্চর্য নিয়ম নয়। যেমন—কারও যদি একজন গোলাম থাকে, সে যদি তাকে হত্যা করে, তবে আল্লাহর ইচ্ছাতেই হত্যা করল। কিন্তু তাতে মানুষ তার সমালোচনা করবে। আর যদি তাকে মুক্ত করে দেয়, সেটাও আল্লাহর ইচ্ছাতেই করল। কিন্তু এক্ষেত্রে মানুষ তার প্রশংসা করবে। তাহলে দুটো কাজই আল্লাহর ইচ্ছাতে সংঘটিত হলেও একটিতে মানুষ সমালোচনা করে আরেকটিতে প্রশংসা করে। আল্লাহর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি এমন। পুণ্য ও পাপ দুটোই আল্লাহর ইচ্ছাতে সংঘটিত হয়। কিন্তু আল্লাহ পুণ্যের নির্দেশ দিয়েছেন এবং পুণ্য করলে তিনি সন্তুষ্ট হন। তাই তাকে পুরস্কৃত করেন। বিপরীতে তিনি পাপ থেকে বারণ করেছেন এবং পাপ করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন। ফলে পাপীকে শাস্তি দেবেন।’১১০৫
উপরের কথায় কারও কাছে জবাব স্পষ্ট নাও হতে পারে। এ জন্য ইমাম আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘কুরআনের অসংখ্য আয়াতে ঈমান ও কুফর, হেদায়াত ও গোমরাহিসহ সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাতে হয়—এ কথার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ۞ وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَآمَنَ مَنْ فِي الْأَرْضِ كُلُّهُمْ جَمِيعًا ۞ অর্থ : ‘আর আপনার রব যদি চাইতেন, তবে পৃথিবীর বুকে যারা রয়েছে তাদের সবাই সমবেতভাবে ঈমান আনত।’ [ইউনুস: ৯৯] আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন, ۞ وَلَوْ أَنَّنَا نَزَّلْنَا إِلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةَ وَكَلَّمَهُمُ الْمَوْتَىٰ وَحَشَرْنَا عَلَيْهِمْ كُلَّ شَيْءٍ قُبُلًا مَّا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ يَجْهَلُونَ ۞ অর্থ : ‘আমি যদি তাদের কাছে ফেরেশতাদের অবতারণ করতাম, তাদের সাথে মৃতরা কথাবার্তা বলত এবং আমি সব বস্তুকে তাদের সামনে জীবিত করে পেশ করতাম, তবুও তারা কখনো বিশ্বাস স্থাপনকারী হতো না যদি না আল্লাহ চান। কিন্তু তাদের অধিকাংশ মূর্খ।’ [আনআম : ১১১] আরও বলেন, ۞ وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَنْ تُؤْمِنَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۞ অর্থ : ‘আর কারও পক্ষে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া ঈমান আনা সম্ভব নয়।’ [ইউনুস: ১০০] আল্লাহ আরও বলেন, ۞ وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً ۖ وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ ۞ অর্থ : ‘আর আপনার পালনকর্তা যদি ইচ্ছা করতেন, তবে সব মানুষকে একই জাতিসত্তায় পরিণত করতে পারতেন, কিন্তু তারা মতভেদ করতেই থাকবে।’ [হুদ: ১১৮] আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ۞ وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا ۞ অর্থ : ‘আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে তোমরা কোনো ইচ্ছা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ [ইনসান : ৩০]১১০৬ আল্লাহ আরও বলেন, ۞ وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُونَ ۖ فَمِنْهُم مَّنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُم مَّنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَالَةُ ۞ অর্থ : ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের মাঝে রাসুল প্রেরণ করেছি (এই দাওয়াত নিয়ে যে) তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে দূরে থাকো। অতঃপর তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যককে আল্লাহ হেদায়াত দান করেছেন এবং কিছু সংখ্যকের জন্য বিচ্যুতি অবধারিত হয়ে গেছে।’ [নাহল : ৩৬] আল্লাহ আরও বলেন, ۞ قَدِ افْتَرَيْنَا عَلَى اللَّهِ كَذِبًا إِنْ عُدْنَا فِي مِلَّتِكُمْ بَعْدَ إِذْ نَجَّانَا اللَّهُ مِنْهَا ۚ وَمَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَعُودَ فِيهَا إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّنَا ۞ অর্থ : ‘যদি আমরা তোমাদের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করি, তবে আমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপকারী হয়ে যাব, অথচ তিনি আমাদের এ থেকে মুক্তি দিয়েছেন। আর আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত এই প্রত্যাবর্তন সম্ভবও নয়।’ [আরাফ : ৮১] নুহ আলাইহিস সালাম তাঁর সম্প্রদায়কে বলেন, ۞ وَلَا يَنْفَعُكُمْ نُصْحِي إِنْ أَرَدْتُ أَنْ أَنْصَحَ لَكُمْ إِنْ كَانَ اللَّهُ يُرِيدُ أَنْ يُغْوِيَكُمْ ۚ هُوَ رَبُّكُمْ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ ۞ অর্থ : ‘আমি তোমাদের নসিহত করতে চাইলেও তা তোমাদের জন্য ফলপ্রসূ হবে না, যদি আল্লাহ তোমাদের গোমরাহ করতে চান; তিনিই তোমাদের পালনকর্তা এবং তাঁর কাছেই তোমাদের ফিরে যেতে হবে।’ [হুদ: ৩৪] ১১০৭
উপরের সবগুলো আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, হেদায়াত ও গোমরাহির মালিক আল্লাহ তায়ালা। সৎপথ প্রদর্শন কিংবা বিচ্যুতকরণ, ইমান ও কুফর, ভালো ও মন্দ পথে গমন—সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে আল্লাহর ইচ্ছাতে হয়। এসব আয়াত দ্বারা বাহ্যত এটাই বোঝা যায় যে, সৃষ্টির সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণের অধীন। অন্যকথায়, মানুষ পরাধীন!
এখানেই আহলে সুন্নাতের আলেমগণ শক্তভাবে দাঁড়িয়ে যান। তারা উপরের বক্তব্যকে কঠোরভাবে খণ্ডন করে বলেন, মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়, আবার পুরোপুরি পরাধীনও নয়। বরং মানুষের স্বাধীনতা আর আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্ধারণ—দুটোর ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের উপর গোটা জীবন ও জগৎ প্রতিষ্ঠিত। এটার ব্যাখ্যা হলো—হ্যাঁ, মানুষের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে এবং আল্লাহর ইচ্ছাই চূড়ান্ত। কিন্তু মানুষকে তিনি ঈমান ও কুফরের মাঝে, আলো ও কালোর মাঝে, হক ও বাতিলের মাঝে কোনোটা গ্রহণে বাধ্য করেননি; বরং তিনি তাকে দুটোর যেকোনো একটা বেছে নেওয়ার শক্তি ও স্বাধীনতা দান করেছেন। তাকে হেদায়াত ও সত্য গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। গোমরাহি ও মিথ্যা থেকে সতর্ক করেছেন। তবুও মানুষ মিথ্যাকে গ্রহণ করেছে। ফলে এর দায়ভারও কেবল তাকেই নিতে হবে。
“আল্লাহ তায়ালা সামুদ সম্প্রদায় সম্পর্কে বলেন, ۞ وَأَمَّا ثَمُودُ فَهَدَيْنَاهُمْ فَاسْتَحَبُّوا الْعَمَىٰ عَلَى الْهُدَىٰ فَأَخَذَتْهُمْ صَاعِقَةُ الْعَذَابِ الْهُونِ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ ۞ অর্থ : ‘আমি পথ প্রদর্শন করেছিলাম, কিন্তু তারা পথপ্রাপ্তির পরিবর্তে অন্ধত্বকেই বেছে নিল। ফলে তাদের কৃতকর্মের কারণে তাদের অবমাননাকর শাস্তি এসে পাকড়াও করল।’ [ফুসসিলাত : ১৭] আর মানুষকে ভালোমন্দ, ঈমান ও কুফর গ্রহণের স্বাধীনতা ও নির্দেশ দেওয়ার পরও যখন মানুষ মন্দ ও কুফরকে গ্রহণ করেছে, তখন আল্লাহ তাকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ۞ اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ ۞ অর্থ : ‘তোমাদের যা ইচ্ছা তা-ই করো।’ [ফুসসিলাত : ৪০] অন্যত্র বলেন, ۞ فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ ۞ অর্থ : ‘যার ইচ্ছা ঈমান আনবে, আর যার ইচ্ছা কুফর করবে।’ [কাহাফ : ২৯] এখানে মানুষ যা ইচ্ছা তা-ই করবে সেটা বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। বরং হুঁশিয়ারি প্রদান উদ্দেশ্য।”১১০৮
এ কারণে ইমাম রহ. বলেন, “পৃথিবীতে আল্লাহর ফয়সালাের বাইরে গিয়ে কারও কিছু করার সাধ্য নেই। তবে কেউ কুফরে লিপ্ত হলে সেক্ষেত্রে আল্লাহকে জালেম বলার সুযোগ নেই। কারণ, আল্লাহ তাকে কুফরের নির্দেশ দেননি; বরং ঈমানের নির্দেশ দিয়েছেন। আর আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘনের ফলে খোদ মানুষ জালেম সাব্যস্ত হবে। হ্যাঁ, আল্লাহ তাঁর কুফর চেয়েছেন। কিন্তু এই চাওয়ার অর্থ এটা নয় যে, তিনি সেটা তার উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। বরং তাকে ঈমান চিনিয়েছেন, তার কাছে ঈমান চেয়েছেন, ঈমানের নির্দেশ দিয়েছেন। ঈমান ও কুফর গ্রহণের স্বাধীনতা দিয়েছেন।”১১০৯
টিকাঃ
১১০৫. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৪-৫৫)।
১১০৬. প্রাগুক্ত (৫৭-৫৮)।
১১০৭. প্রাগুক্ত (৫৮)।
১১০৮. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৭)।
১১০৯. আল-উসুলুল মুনিফাহ (১৬)।
📄 ইচ্ছা-আদেশ-সন্তোষ তিনের সম্পর্ক
আল্লাহর ইচ্ছার মাধ্যমেই জগতে সবকিছু হয়। পৃথিবীর সবকিছু এবং সবকিছুর ইচ্ছা তাঁর ইচ্ছার অধীনে। তবে তাঁর ইচ্ছার একাধিক বহিঃপ্রকাশ রয়েছে। তাঁর আদেশ ও সন্তোষের সঙ্গে ইচ্ছার একাধিক সম্পর্ক রয়েছে।
ইমাম আজম বলেন, ‘আল্লাহর ইচ্ছা নানাভাবে প্রতিফলিত হয়। কখনো কখনো তিনি কোনো বিষয়ের আদেশ দেন, অথচ সেটার ইচ্ছা করেন না। আবার কখনো কোনো বিষয় ইচ্ছা করেন, অথচ সেটার আদেশ দেন না। যেমন তিনি কাফেরকে ইসলামের আদেশ দিয়েছেন, অথচ সেই আদেশ সৃষ্টি ও বাস্তবায়নের ইচ্ছা করেননি। বরং তিনি সেটা তাদের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। কারণ, তিনি যদি ইচ্ছা করতেন, তবে কাফের মুসলিম হয়ে যেত। একইভাবে তিনি কাফেরের জন্য কুফরের ইচ্ছা করেছেন, ফলে কাফের কুফর করে। কিন্তু তিনি তাকে কুফরের আদেশ দেননি।’১১১০
অর্থাৎ, আল্লাহ কাফেরের জন্য কুফরের ইচ্ছা করলেও তিনি তাকে কুফরের আদেশ দেননি কিংবা বাধ্য করেননি। বরং (সে কুফর করবে জেনে) তার জন্য কুফরের ইচ্ছা করে তাকে ঈমান ও কুফর অবলম্বনের এখতিয়ার দিয়েছেন। দুটোর মাঝে যেকোনো একটা গ্রহণের স্বাধীনতা দিয়েছেন। কারণ, তিনি কাফেরকে ইসলামের নির্দেশ দিয়েছেন। যদি তাকে কুফরের উপর বাধ্যই করতেন, তবে এমন নির্দেশ দিতেন না। দিলে সেটা অর্থহীন কাজ হতো। আল্লাহ এমন কাজ থেকে পবিত্র।
অপরদিকে আদেশ ও সন্তোষের মাঝেও সম্পর্কের একাধিক দিক রয়েছে। কখনো কখনো আল্লাহ অনেক বিষয় পছন্দ করেন, কিন্তু আদেশ দেন না। যেমন—তিনি নফল নামায পছন্দ করেন, কিন্তু সেটা আদেশ দেননি (অর্থাৎ আবশ্যক করেননি)। তবে তিনি কখনো এমন আদেশ দেন না যা তিনি পছন্দ করেন না। বরং তিনি যা আদেশ দেন সবগুলোই পছন্দ করেন।১১১১
মুহাম্মাদ রহ.-এর বর্ণনায় এসেছে, ইমাম আল্লাহর আদেশকে দুই ভাগে ভাগ করেন—এক. সৃষ্টিসংশ্লিষ্ট আদেশ। এখানে আদেশ ও ইচ্ছা দুটোরই সমন্বয় ঘটে। এটা চূড়ান্ত। এখানে তিনি যা আদেশ করেন সেটাই হয়। তবে এক্ষেত্রে সন্তোষ থাকা আবশ্যক নয়। দুই. ওহির আদেশ। এখানে সন্তোষ থাকা জরুরি। তবে এটা চূড়ান্ত নয়। ফলে এখানে আদেশ দিলেও ইচ্ছা করেন না, ইচ্ছা করলেও আদেশ দেন না। যেমন—ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে তাঁর ছেলে ইসমাইলকে যবেহ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এখানে তার আদেশ ছিল, কিন্তু ইচ্ছা ছিল না। ফলে আল্লাহর ইচ্ছাই বাস্তবায়িত হয়েছে।১১১২ একইভাবে আল্লাহ সকল মানুষকে ঈমানের আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু ইচ্ছা করেননি। ফলে সেটা বাস্তবায়িত হয় না। সকল মানুষ ঈমান আনে না। যদি তিনি চূড়ান্ত ইচ্ছা করতেন, তবে সবাই ঈমান আনত। কিন্তু চূড়ান্ত ইচ্ছা করলে মানুষের স্বাধীনতা বলতে কিছু থাকত না। এ জন্য তিনি চূড়ান্ত ইচ্ছা করেননি।
ফলে আল্লাহর ইচ্ছা দুই ধরনের—প্রথমটা হলো প্রকৃতই ইচ্ছা। চূড়ান্ত ইচ্ছা। এখানে ইচ্ছা ও নির্দেশ দুটোই বিদ্যমান। ফলে এটার বিপরীত হতে পারবে না। এটা হলো পৃথিবীর পরিচালনাসংক্রান্ত ইচ্ছা ও নির্দেশ। এখানে আল্লাহর ভালোবাসা থাকা জরুরি নয়। যেমন—আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিপদে ফেলেন, কারও বাচ্চা নিয়ে নেন, কারও প্রিয়জনকে দূরে সরিয়ে দেন, ঝড়-তুফান দিয়ে কারও ঘড়বাড়ি ধ্বংস করে ফেলেন ইত্যাদি। এগুলো পৃথিবীর শৃঙ্খলা এবং আল্লাহর ‘হিকমত’ তথা প্রজ্ঞাপূর্ণ পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আল্লাহ এগুলো ভালোবাসেন এমন নয়। যেমন—এক হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা (তাঁর প্রিয় বান্দা সম্পর্কে) বলেছেন, ‘সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে, কিন্তু আমি তাকে কষ্ট দিতে অপছন্দ করি।’১১১৩ অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে মৃত্যু দিয়ে কষ্ট দিতে পছন্দ করেন না। তবুও মৃত্যু দিতেই হয়। পৃথিবীর নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং হিকমতের কারণে তিনি এমন করেন। এক কথায়, এখানে আল্লাহর পছন্দ ও ভালোবাসা নেই, চূড়ান্ত ইচ্ছা ও আদেশ রয়েছে। ফলে এটা অনিবার্য।
দ্বিতীয় প্রকারের ইচ্ছাটা হলো ভালোবাসা, পছন্দ করা; প্রকৃত রূপে ইচ্ছা নয়। কারণ, আল্লাহ ইচ্ছা করলে সেটার বিপরীত হতে পারবে না। ফলে এখানে ‘ইচ্ছা’ শব্দটা ব্যবহার করা হলেও এটার মর্ম হলো পছন্দ, চাওয়া। যেমন—আল্লাহ চান সকল কাফের মুসলিম হয়ে যাক। আল্লাহ চান সবাই জান্নাতে যাক। তাই সবাইকে ঈমানের আদেশও দিয়েছেন। কিন্তু এটা তাঁর পছন্দ এবং ওহির আদেশ, চূড়ান্ত ইচ্ছা নয়। ফলে সবাইকে মুসলিম হওয়ার আদেশ দেওয়া সত্ত্বেও, এটা আল্লাহর পছন্দ সত্ত্বেও সকল কাফের মুসলিম হয় না। কারণ, চূড়ান্ত ইচ্ছা নেই। চূড়ান্ত ইচ্ছা থাকলে তাঁর ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার সাধ্য কারও নেই। এটাই আল্লাহর আদেশ, ইচ্ছা ও সন্তোষের আন্তঃসম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা। ১১১৪
উপরের আলোচনাতে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। তা হলো—আল্লাহর জাগতিক নির্দেশ এবং শরয়ি নির্দেশের মাঝে পার্থক্য। জাগতিক নির্দেশ চূড়ান্ত, কিন্তু তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকা জরুরি নয়। যেমন—আল্লাহ ঝড়-তুফান দিয়ে শহর ধ্বংস করেন, মানুষকে মৃত্যু দেন, বিপদে ফেলেন। এগুলো সব তাঁর ইচ্ছাতে হয়। কিন্তু তিনি বান্দাকে কষ্ট দিতে পছন্দ করেন না। বিপরীতে শরয়ি নির্দেশ তাঁর সন্তোষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে এক্ষেত্রে তিনি যা নির্দেশ দেন সবগুলোই তাঁর পছন্দ। তিনি অপছন্দ করেন এমন কোনো বিষয়ের (শরয়ি) নির্দেশ দেন না।
প্রশ্ন হতে পারে, আল্লাহর ইচ্ছা ও সন্তোষের মাঝে সম্পর্ক কী? ইমাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ মানে, সে আল্লাহর ইচ্ছা ও সন্তোষ দুটোই বাস্তবায়ন করে। যেমন—কাফের যদি মুসলিম হয়ে যায়, তবে তাতে আল্লাহর আদেশ, ইচ্ছা ও সন্তোষ সবগুলোই রয়েছে। বিপরীতে যে আল্লাহর আদেশের বিরোধিতা করে, সেখানে আল্লাহর ইচ্ছা থাকলেও সন্তোষ থাকে না। যেমন—কাফের যদি কুফর করে, সেটা আল্লাহর আদেশ ও সন্তোষ দুটোরই বিপরীত। কিন্তু সেখানে আল্লাহর ইচ্ছা রয়েছে। ইচ্ছা না থাকলে কুফর করতে পারত না।’১১১৫
আল্লাহর সৃষ্টি ও সন্তোষের মাঝে কী সম্পর্ক? ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ কুফর সৃষ্টি করাকে পছন্দ করেছেন, ফলে সেটা সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তিনি কুফরকে পছন্দ করেন না।’ প্রশ্ন হতে পারে, যদি আল্লাহ কোনো জিনিস পছন্দ না করেন, তবে সেটা সৃষ্টি করলেন কেন? ইমাম উত্তরে বলেন, ‘সৃষ্টির সম্পর্ক ইচ্ছার সঙ্গে, পছন্দের সঙ্গে নয়। ফলে আল্লাহ কুফরকে সৃষ্টি করেছেন। কারণ, তিনি কাফেরদের জন্য কুফরের ইচ্ছা করেছেন, কিন্তু তিনি কুফরকে পছন্দ করেন না। যেমন তিনি ইবলিস সৃষ্টিকে পছন্দ করেছেন, ফলে তাকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু স্বয়ং ইবলিসকে তিনি পছন্দ করেন না। একইভাবে তিনি মদ, শূকর—এগুলোর সৃষ্টিকে পছন্দ করেছেন, কিন্তু এগুলোকে তিনি পছন্দ করেন না। কারণ, এগুলোকে তিনি পছন্দ করলে এগুলো অবলম্বন করা নিষিদ্ধ হতো না। বরং কেউ এগুলো গ্রহণ করলে আল্লাহর সন্তোষজনক বস্তুই গ্রহণ করা হতো।’১১১৬
আল্লাহর আদেশ-ইচ্ছা-সন্তুষ্টি-তাকদির ইত্যাদির মাঝে সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয় ইমামের ওসিয়তে। তিনি সেখানে এগুলোর সঙ্গে সম্বন্ধের ভিত্তিতে আমলকে তিনভাগে ভাগ করেছেন: এক. ফরয, যাতে উপরের সবগুলো বিদ্যমান তথা আল্লাহর আদেশ, ইচ্ছা, সন্তুষ্টি, পছন্দ, নির্ধারণ, সৃষ্টি, হুকুম, ইলম, তৌফিক, লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ সবকিছু এতে পাওয়া যায়। দুই. ফযিলত (তথা নফল আমল), যাতে আল্লাহর ইচ্ছা, সন্তুষ্টি, পছন্দ, নির্ধারণ, সৃষ্টি, হুকুম, ইলম, তৌফিক ও লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ পাওয়া গেলেও আদেশ অনুপস্থিত। কারণ, আল্লাহ এটা করার আদেশ দেননি (অর্থাৎ ওয়াজিব করেননি)। তিন. পাপ ও অবাধ্যতা। এতে আল্লাহর ইচ্ছা পাওয়া গেলেও আদেশ পাওয়া যায় না। এটা আল্লাহর ফয়সালা হলেও তাতে তাঁর সন্তোষ ও পছন্দ বিদ্যমান নেই। আল্লাহর নির্ধারণ হলেও তাতে তার তৌফিক নেই। এখানে বান্দাকে তিনি পরিত্যাগ করেন, সাহায্য করেন না। এটাও লাওহে মাহফুজে লিখিত।১১১৭
মোটকথা, তিন প্রকারের আমলই আল্লাহর জ্ঞান, নির্ধারণ ও লাওহে মাহফুজে লিখিত। কিন্তু প্রথমটা তথা ফরযের মাঝে তার ইচ্ছা, আদেশ ও সন্তুষ্টি তিনটিই বিদ্যমান। দ্বিতীয়টা তথা নফলে ইচ্ছা ও সন্তুষ্টি বিদ্যমান থাকলেও আদেশ (আবশ্যকীকরণ) বিদ্যমান নেই। তৃতীয়টা তথা গুনাহে ইচ্ছা বিদ্যমান থাকলেও আদেশ ও সন্তুষ্টি বিদ্যমান নেই। ইচ্ছাটা এখন বিদ্যমান থাকা জরুরি। কারণ, পৃথিবীর সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়। তিনি ইচ্ছা না করলে কিছু হবেই না। ফলে কেউ গুনাহের ইচ্ছা করলে তিনিও চাইলে সেটার ইচ্ছা করেন। কিন্তু তিনি গুনাহের নির্দেশ দেন না, তাতে সন্তুষ্টও হন না। সেক্ষেত্রে তিনি বান্দাকে সাহায্য করেন না। এর পরও যদি বান্দা সেটা করে, তবে এর দায়ভারও তার।
টিকাঃ
১১১০. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৩).
১১১১. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৩).
১১১২. আল-উসুলুল মুনিফাহ (১৫).
১১১৩. বুখারি (৬৫০২)। বাইহাকি (সুনানে কুবরা) (৬৪৮৬)। মুসনাদে আবি ইয়ালা (৭০৮৭).
১১১৪. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৫২)। তালখিসুল আদিল্লাহ (৭৩৮)। আল- জাওহারাতুল মুনিফাহ, মোল্লা হুসাইন হানাফি (৬০)। শরহিল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (২০)।
১১১৫. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৩).
১১১৬. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৪).
১১১৭. আল-ওয়াসিয়্যাহ (৩৫-৩৭)। উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৫২)।
📄 ইনসাফ ও অনুগ্রহ : তাকদির বোঝার গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি
‘ইচ্ছা’, ‘আদেশ’ ও ‘সন্তুষ্টি’—এই তিনের সম্পর্ক তাকদির রহস্যের এক বিশাল জট খুলে দেয়। সেটা হলো—আল্লাহর ইনসাফ ও অনুগ্রহের মাঝে তাকদিরের আবর্তন। ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘আল্লাহর সকল আনুগত্য সংঘটিত হয় তাঁর আদেশ, ভালোবাসা, সন্তোষ, ইলম, ইচ্ছা, ফয়সালা ও তাঁর নির্ধারণে। আর তাঁর অবাধ্যতাও সংঘটিত হয় তাঁর জ্ঞান, ফয়সালা, নির্ধারণ ও ইচ্ছায়; কিন্তু তাঁর ভালোবাসা, সন্তুষ্টি ও আদেশে নয়।’১১১৮ অর্থাৎ, মানুষকে যেহেতু আল্লাহ ভালোমন্দ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন, এ কারণে মানুষ আল্লাহর আনুগত্য কিংবা অবাধ্যতা দুটোর যেকোনো একটা বেছে নিতে পারে। কোনটা বেছে নেবে সেটা তিনি আগেই জানেন এবং সংঘটনের অনুমতি দেন আর লাওহে মাহফুজে সেটা লিখে রাখেন। ফলে মানুষ আনুগত্য অথবা অবাধ্যতা দুটোর যেটাই বেছে নিক, সেটা আল্লাহর জ্ঞান, ইচ্ছা ও ফয়সালার অধীনেই হচ্ছে। তবে দুটোর মাঝে পার্থক্য হলো, মানুষ যখন আনুগত্যের পথ বেছে নেয়, আল্লাহ তখন সন্তুষ্ট হন, ভালোবাসেন এবং সেটা করার নির্দেশ দেন। বিপরীতে যখন অবাধ্যতার পথ বেছে নেয়, তখন সেটা ভালোবাসেন না, সন্তুষ্ট হন না এবং অবাধ্য হওয়ার নির্দেশও দেন না। কিন্তু তিনি ইচ্ছা ও নির্ধারণ করেন। কারণ, তাঁর ইচ্ছা ও নির্ধারণ না থাকলে মানুষ কোনো কাজই করতে পারবে না। সে পরাধীন হয়ে পড়বে।
ফলে মানুষকে স্বাধীনতা দিয়ে তৈরি করলেও আল্লাহর পছন্দ হলো মানুষ সবসময় ভালো কাজ করুক, আনুগত্যের পথে চলুক। কেউ এটা করলে আল্লাহ তাঁর প্রতি অনুগ্রহ করেন। কেউ অবাধ্যতার পথে চললে তাঁর প্রতি ইনসাফ করেন, কিন্তু জুলুম করেন না। ইমাম লিখেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি করুণাময় ও ইনসাফগার। কখনো করুণা প্রদর্শন করে বান্দা পুণ্য করলে যতটুকু উপযুক্ত তারচেয়ে অনেক বেশি প্রতিদান প্রদান করেন; আর পাপ করলে কখনো ইনসাফের কারণে পাপের শাস্তি দেন, আবার কখনো করুণা করে ক্ষমা করে দেন।’১১১৯ যেমন—কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ۖ وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ ۞ অর্থ : ‘কেউ কোনো সৎকাজ করলে সে তার দশগুণ পাবে, আর কেউ কোনো অসৎকাজ করলে তাকে শুধু তারই প্রতিফল দেওয়া হবে, আর তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।’ [আনআম : ১৬০] ۞ مَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍ ۗ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ۞ অর্থ: ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শিষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শিষে একশো করে দানা থাকে। আল্লাহ যার জন্য চান দ্বিগুণ করে দেন। আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ।’ [বাকারা: ২৬১] অন্য আয়াতে বলেন, ۞ وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ ۞ অর্থ: ‘তোমাদের যে বিপদাপদ ঘটে, তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তো তিনি ক্ষমা করে দেন।’ [শুরা: ৩০] রাসুলুল্লাহ (ﷺ) একটি হাদিসে বলেন, আদম সন্তান (মানুষের) প্রত্যেকটি পুণ্য দশ গুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। ১১২০
আল্লাহর অনুগ্রহ ও ইনসাফের আরও প্রকট উদ্ভাস ঘটে আনুগত্য ও অবাধ্যতা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে। এ ব্যাপারে ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দান করেন। এটা তাঁর অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা পথচ্যুত করেন। এটা তাঁর ইনসাফ। পথচ্যুত করার অর্থ হলো পরিত্যাগ করা। আর পরিত্যাগ করার অর্থ হলো বান্দাকে তাঁর সন্তোষজনক কাজের তৌফিক না দেওয়া। এটা তাঁর ইনসাফ। ফলে বান্দা তখন গুনাহ করলে সেটার শাস্তি প্রদানও ইনসাফ।’১১২১ ইমাম তহাবিও একই কথা এভাবে বলেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে নিজ অনুগ্রহপূর্বক সঠিক পথে পরিচালিত করেন, সুরক্ষিত রাখেন, সুস্থতা ও নিরাপত্তা দান করেন। আবার যাকে ইচ্ছা ইনসাফপূর্বক তার নিজের উপর ছেড়ে দেন, বিপথগামী করেন, পরীক্ষায় ফেলেন। সকলেই তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর অনুগ্রহ ও ইনসাফের মাঝে আবর্তিত হয়।’১১২২ আবু হাফস বলেন, ‘আহলে সুন্নাতের আকিদা হলো এই বিশ্বাস রাখা যে, ‘সৌভাগ্যবানের দুর্ভাগা হওয়া আল্লাহর ইনসাফ। আর দুর্ভাগার সৌভাগ্যবান হওয়া আল্লাহর অনুগ্রহ।’১১২৩
ইমামদের উপরের সবগুলো বক্তব্যের অর্থ হলো: মানুষকে আল্লাহ স্বাধীনতা ও ভালোমন্দ বেছে নেওয়ার অধিকার দিয়েছেন। তবে মানুষ দুর্বল। মানুষ সবসময় নিজের ভালো নিজে বেছে নিতে পারে না। প্রবৃত্তি ও শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মানুষের ফিতরত নষ্ট হয়ে যায়। হৃদয়ে কালিমা জমে যায়। ফলে এক্ষেত্রে মানুষকে যদি আল্লাহ সবসময় তাদের নিজেদের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেন, তবে দুর্বল মানুষ পথ হারাবে, হোঁচট খাবে, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক নানা মুসিবতে আক্রান্ত হবে। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের সবসময় তাদের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেন না, বরং কিছু বান্দার প্রতি অনুগ্রহ ও করুণার দৃষ্টিতে তাকান। তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পথচ্যুত হতে দেখে নিজ থেকে তাদের রক্ষা করেন। মহব্বতের কাউকে যখন নিজের কর্মের কারণে বিপদে পড়তে দেখেন, তার কাছ থেকে বিপদ সরিয়ে নেন। পছন্দের কাউকে যখন শয়তানের পথে হাঁটতে দেখেন, তাঁর দয়ার সাগর উথলে ওঠে। তিনি বান্দার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজে অনুগ্রহপূর্বক তাকে গোমরাহি থেকে রক্ষা করেন। এভাবে একদল বান্দা স্বাধীনতার অপব্যবহার করে অনিবার্য ধ্বংসের পথে ছোটা শুরু করলে আল্লাহর অনুগ্রহ তাকে হেফাজত করে।
কিন্তু আল্লাহ সবার ক্ষেত্রে এটা করেন না। বরং আরেক দলকে নিজেদের ইচ্ছার উপরই ছেড়ে দেন। তারা নিজেদের স্বাধীন শক্তি ব্যবহার করে পথচ্যুত হয়ে গেলে আল্লাহ সেগুলো পর্যবেক্ষণ করেন, তথাপি তাদের বিচ্যুতি থেকে ফিরিয়ে রাখেন না। বরং তাদের কর্মফলস্বরূপ বিপথগামী করেন, বিভিন্ন মুসিবত ও পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। এটা তাঁর ইনসাফ। কারণ, তিনি নিজ থেকে বান্দাকে এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে আসেন না, বরং বান্দার কর্মফলের উপর ছেড়ে দেন মাত্র। তাকে অনুগ্রহ ও সহায়তা পরিত্যাগ করেন মাত্র।
ইমাম বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকে কুফর ও ঈমান থেকে বিমুক্ত সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাদের ঈমানের আদেশ দিয়েছেন, কুফর থেকে নিষেধ করেছেন। কিন্তু তারা কেউ ঈমান গ্রহণ করেছে, আবার কেউ কুফর গ্রহণ করেছে। যারা ঈমান এনেছে, তারা নিজেদের ইচ্ছাতেই এনেছে। কিন্তু আল্লাহ তাদের তৌফিক দিয়েছেন এবং সাহায্য করেছেন। বিপরীতে যারা কুফর গ্রহণ করেছে, সেটাও তাদের ইচ্ছায় করেছে। তবে এক্ষেত্রে মূল কারণ আল্লাহ তাকে ঈমান গ্রহণে সহায়তা করেননি কিংবা কুফর গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। ফলে দুজনের মাঝে পার্থক্য এটুকুই যে, প্রথম জনকে তিনি সাহায্য করেছেন, দ্বিতীয় জনকে করেননি। কিন্তু এটা জুলুম নয়। বরং প্রথম জনের প্রতি তিনি অনুগ্রহ করেছেন আর দ্বিতীয় জনের প্রতি ইনসাফ করেছেন।’ ইমাম আরও বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকে কুফর ও ঈমান থেকে বিমুক্ত সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাদের সম্বোধন করেছেন, আদেশ দিয়েছেন, নিষেধ করেছেন। অতঃপর তাদের কেউ কেউ কুফরি করেছে স্বেচ্ছায় স্বীয় কর্মের দ্বারা। কিন্তু তার এই কুফরির কারণ হলো, আল্লাহ তাকে সাহায্য পরিত্যাগ করেছেন। আর কেউ কেউ ঈমান এনেছে স্বেচ্ছায় স্বীয় কর্মের দ্বারা। কিন্তু তার এই স্বীকৃতি ও সত্যায়নের কারণ হলো, আল্লাহ তাকে তৌফিক দিয়েছেন এবং সাহায্য করেছেন।’ ১১২৪
প্রশ্ন হতে পারে, একদলকে অনুগ্রহ করে আরেক দলকে ইনসাফ করাই কি খোদ বেইনসাফি নয়? একদলকে নিজ উদ্যোগে অনিবার্য ধ্বংস থেকে বাঁচিয়ে অনুগ্রহ করা, আরেক দলকে তাদের অনিবার্য ধ্বংসের পথে ছেড়ে দিয়ে ইনসাফ করা কি একধরনের জুলুম নয়? কারণ, আল্লাহ চাইলে তো দ্বিতীয় দলকেও অনুগ্রহ করতে পারতেন! তারাও প্রথম দলের মতো বেঁচে যেত। উত্তর হলো, না। একজনকে অনুগ্রহ করা আর অন্যজনকে অনুগ্রহ পরিত্যাগ করা জুলুম নয়। কারণ, এখানে প্রথম জনকে অনুগ্রহ করা হচ্ছে তাঁর অনুগ্রহভাজন হওয়ার উপযুক্ততার কারণে। দ্বিতীয় জনকে অনুগ্রহ করা হচ্ছে না। কারণ, সে অনুগ্রহের উপযুক্ত নয়। ফলে দ্বিতীয় জনের প্রতি কোনো জুলুম করা হচ্ছে না। তাঁর প্রতি যেটা করা হচ্ছে সেটা হলো ইনসাফ। সে যদি নিজের কর্মফলে কিংবা যেকোনো কারণে আল্লাহর অনুগ্রহের পাত্র হতো, আল্লাহ তাকেও অনুগ্রহ করতেন। কিন্তু সেটা হয়নি। ফলে আল্লাহ তাকে ইনসাফ করছেন। এটার উপর কোনো আপত্তি করা যায় না। আপত্তি করা যেত, যদি তার প্রতি ক্রোধ কিংবা অন্য কোনো কারণে জুলুম করতেন। কিন্তু আল্লাহ সব ধরনের জুলুম থেকে মহাপবিত্র। এ অর্থেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যদি আল্লাহ তায়ালা আকাশ ও পৃথিবীর সবাইকে শাস্তি দান করেন, তবে তিনি শাস্তি দিতে পারেন এবং সেটা জুলুম হবে না। আর যদি তিনি তাদের অনুগ্রহ করেন, তবে সেটা তাদের আমলের চেয়ে কল্যাণকর হবে।’১১২৫ এ অর্থে ইমাম মুহাম্মাদ রহ.-এর বর্ণনায় এসেছে, ইমাম আজম আতা ইবনে আবি রাবাহের এই বক্তব্য নকল করেন, ‘যদি আল্লাহ তায়ালা আকাশ ও যমিনের সকল অধিবাসীকে শাস্তি দান করেন, তবুও তিনি জালেম হবেন না। কারণ, তিনি তাদের সৎপথের সন্ধান দিয়েছেন। তাদের হৃদয়ে সেটা ঢেলে দিয়েছেন। তাদের সে পথে সবরের তৌফিক দিয়েছেন। এসবের উর্ধ্বে, তিনি তাদের জীবন ও জগৎকে নিয়ামতে ভরপুর করে দিয়েছেন। তিনি যদি তাদের থেকে সেসব নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা চান, তবে তারা কখনোই আদায় করতে পারবে না। এই কৃতজ্ঞতা আদায় করতে না পারার অপরাধে তিনি তাদের শাস্তি দিতে পারেন এবং সে ক্ষেত্রে তা মোটেও জুলুম হবে না।’১১২৬
টিকাঃ
১১১৮. আল-ফিকহুল আকবার (৪)। আকিদাহ রুকনিয়্যাহ (২১).
১১১৯. আল-ফিকহুল আকবার (৬-৭).
১১২০. মুসলিম (কিতাবুস সিয়াম: ১১৫১)। সুনানে ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সিয়াম: ১৬৩৮).
১১২১. আল-ফিকহুল আকবার (৭).
১১২২. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (১১).
১১২৩. আস-সাওয়াদুল আজম (৪).
১১২৪. আল-ফিকহুল আকবার (৩-৪).
১১২৫. সুনানে ইবনে মাজা (আবওয়াবুস সুন্নাহ: ৭৭)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুল আনসার: ২২০১২).
১১২৬. আল-উসুলুল মুনিফাহ (২০-২১)।