📄 কাসেম
তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জ্যেষ্ঠ সন্তান। নবুওতের পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নামেই রাসুলুল্লাহর উপনাম ছিল ‘আবুল কাসেম’ (কাসেমের পিতা)। কিন্তু জন্মের বছর দুয়েকের মাঝে ওফাত লাভ করেন। বলা হয়, তিনি হাঁটাচলা করতে শুরু করেছিলেন! খুব সম্ভবত রাসুলুল্লাহর নবুওত লাভের পরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
📄 তাহের
তিনি মক্কাতে নবুওতের পরে জন্মগ্রহণ করেন এবং শিশু বয়সেই ওফাত লাভ করেন। তাহের ছাড়া তাকে ‘আবদুল্লাহ’ ও ‘তাইয়েব’ নামেও ডাকা হতো। যদিও কারও কারও মতে, তাইয়েব ও আবদুল্লাহ নামে রাসুলুল্লাহর অন্য আরও দুজন ছেলে ছিলেন, যেমনটা দারাকুতনি বলেছেন। কিন্তু ইমাম আজমের কাছে খুব সম্ভবত এই মত গ্রহণযোগ্য নয়। বরং তিনি তাহের, তাইয়েব ও আবদুল্লাহ একজনের তিনটি নাম মনে করেন। এ কারণে কেবল রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর তিন ছেলের কথাই উল্লেখ করেছেন। এটাই অধিকতর বিশুদ্ধ কথা।
📄 ইবরাহিম
তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর তৃতীয় পুত্র। অষ্টম হিজরিতে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রাসুলুল্লাহর একমাত্র সন্তান যিনি খাদিজার গর্ভে জন্ম নেননি। বরং মিশরীয় বংশোদ্ভূত মারিয়া ছিলেন তাঁর মাতা। জন্মের ষোলো বা আঠারো মাসের মাথায় মৃত্যুবরণ করেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর মৃত্যুতে অত্যন্ত শোকাহত হন। চোখের পানি ছেড়ে বলেন, ‘আমাদের হৃদয় ভারাক্রান্ত, চোখ অশ্রুসিক্ত। তদুপরি আমরা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে এমন কিছু বলব না। ইবরাহিম, আমরা তোমার বিচ্ছেদে বেদনা-ভারাক্রান্ত।’ অতঃপর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) নিজে তাঁর জানাযা পড়ান। বাকী' গোরস্থানে নিজের দুধভাই উসমান ইবনে মাযউনের পাশে সন্তানকে দাফন করেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন, কিন্তু মর্যাদায় উচ্চ ছিলেন। হাদিসে একাধিক সাহাবির বক্তব্য এসেছে, যদি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরে কোনো নবি আসত, তবে নবিপুত্র ইবরাহিম নবি হতেন।১০৮৭
একজন এতিম মানুষ। জন্মের আগেই বাবাকে হারান। জন্মের কয়েক বছর পরে মাকে হারান। ভাই নেই, বোন নেই। প্রৌঢ়ত্বে এসে আল্লাহ তায়ালা তাকে তিনটি ছেলে দান করেন। কিন্তু কেউ কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছরের বেশি পৃথিবীতে থাকেন না। একের পর এক তিনটি ছেলেই মৃত্যুবরণ করেন! সাধারণ একজন মানুষের জীবনে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সে কী করত? সে কি বেঁচে থাকতে পারত? আল্লাহর প্রতি অভিযোগ না ছুড়ে শান্তি পেত? যে সমাজের মানুষ মেয়ে জন্মালে ভ্রু কুঁচকায়, অসন্তুষ্ট হয়, ভবিষ্যৎ ও বার্ধক্যের সময় বেঁচে থাকার অবলম্বনের কথা চিন্তা করে মুষড়ে পড়ে, সে সমাজে কারও তিনটা ছেলে মারা গেলে কী পরিমাণ আঘাত পেতে পারে সেটা তো বলাই বাহুল্য। আরবে মেয়েদের আরও বেশি অলক্ষুনে ও বোঝা মনে করা হতো। বরং ক্ষেত্রবিশেষে মেয়েদের জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলার রেওয়াজও ছিল। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এগুলো ভাঙার জন্যই মনোনীত হয়েছিলেন। ফলে তাঁর সবর করতে হয়েছিল। তিনটি ছেলেকেই হারিয়ে বোঝাতে হয়েছিল, মেয়েরা অলক্ষুনে নয়, বোঝা নয়। বরং মেয়েরা সুখের ঠিকানা, জান্নাতের চাবি। ছেলেরা সবকিছু নয়। বার্ধক্যে ছেলে ছাড়া বেঁচে থাকা যাবে না—এটা তাকদির ও রিযিকের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ, মানসিক বিকলাঙ্গতা। মেয়ে জন্ম নিলে বোঝা মনে করা, অসন্তুষ্ট হওয়া বিশুদ্ধ তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ সবকিছু রাসুলুল্লাহ (ﷺ) নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করেই দেখিয়ে গিয়েছেন, শিখিয়ে গিয়েছেন।
টিকাঃ
১০৮৭. বুখারি (কিতাবুল আদাব : ৬১৯৪)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আনাস ইবনে মালেক : ১২৫৫৩)।
📄 ফাতিমা
জান্নাতের নারীদের সর্দার, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সবচেয়ে আদরের মেয়ে ফাতিমা আয-যাহরা। বয়সে অন্য বোনদের ছোট হওয়া সত্ত্বেও ইমাম আজম রহ. তাকে সবার আগে এনেছেন তাঁর মর্যাদার প্রতি লক্ষ করে। পরিণত বয়সে পৌঁছার পর রাসুলুল্লাহর চাচাতো ভাই আলি রাযি.-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয় (অর্থাৎ চাচাতো চাচার সাথে)। এই বিবাহ ছিল আল্লাহর নির্দেশে এবং ওহির ভিত্তিতে। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। রাসুল (ﷺ) যখন দূরে যেতেন, সবশেষে তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতেন। আবার যখন দূর থেকে আসতেন, সর্বপ্রথম তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। তাঁর ব্যাপারে রাসুল (ﷺ) বলেন, 'ফাতিমা আমার অংশ। সে কষ্ট পেলে আমিও কষ্ট পাই।১০৮৮ রাসুলের জীবদ্দশায় তিনি বেঁচে ছিলেন। তাঁর ইন্তিকালের মাত্র ছয় মাস পরে ফাতিমাও ইন্তিকাল করেন। ফাতিমার পাঁচজন সন্তান ছিলেন। হাসান, হুসাইন, মুহসিন, উম্মে কুলসুম ও যয়নব। মুহসিন শিশু অবস্থায় ইন্তিকাল করেন। হাসান ও হুসাইন রাযি. জান্নাতের যুবকদের সর্দারে পরিণত হন। রাসুল (ﷺ)-এর অন্যান্য মেয়ের সন্তান ছোটবেলাতেই ইন্তিকাল করেন। কেবল ফাতিমার দুই সন্তান হাসান ও হুসাইন বেঁচে থাকেন। তাদের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর বংশধারা সংরক্ষিত এবং পৃথিবীতে বিস্তৃত হয়।
টিকাঃ
১০৮৮. বুখারি (কিতাবুন নিকাহ : ৫২৩০)। মুসলিম (কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবা : ২৪৪৯)।