📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 অধমের পর্যবেক্ষণ

📄 অধমের পর্যবেক্ষণ


যেমনটা পিছনেও বলেছি যে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতাকে মুক্তিপ্রাপ্ত সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে উপরে প্রদত্ত দ্বিতীয় ও তৃতীয় কারণটি শক্তিশালী নয়। কারণ, তাদের জীবিত হয়ে ঈমান আনার বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয়। এ ব্যাপারে যেসব বর্ণনা পেশ করা হয় সেগুলো গ্রহণীয় পর্যায়ের নয়। অপরদিকে রাসুল (ﷺ)-এর পিতা আবদুল্লাহ থেকে আদম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত সকলের মুমিন হওয়ার বিষয়টিও সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়; বরং একান্তই অনুমানমূলক বক্তব্য। তবে তৃতীয় কারণটি বেশ শক্তিশালী। কারণ, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর পিতা-মাতা সন্দেহাতীতভাবে ‘আহলে ফাতরাহ’র অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, ইনশাআল্লাহ। যারা এর বিপরীত কথা বলেছেন তাদের কথা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, তাদের কাছে ইসলামের এবং বিশুদ্ধ তাওহিদের দাওয়াত পৌঁছয়নি। সে যুগ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ عَلَىٰ فَتْرَةٍ مِّنَ الرُّسُلِ أَن تَقُولُوا مَا جَاءَنَا مِن بَشِيرٍ وَلَا نَذِيرٍ ۖ فَقَدْ جَاءَكُم بَشِيرٌ وَنَذِيرٌ ۗ وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ۞ অর্থ: ‘হে কিতাবিগণ, তোমাদের নিকট এমন একসময় আমার রাসুল (দ্বীনের) ব্যাখ্যাদানের জন্য এসেছে, যখন রাসুলগণের আগমনধারা বন্ধ ছিল, যাতে তোমরা বলতে না পারো, আমাদের কাছে (জান্নাতের) কোনো সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নাম সম্পর্কে) সতর্ককারী আসেনি। এবার তোমাদের কাছে একজন সুসংবাদদাতা সতর্ককারী এসে গেছে। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে পরিপূর্ণ ক্ষমতাবান।’ [মায়িদা : ১৯]

ফলে ঢালাওভাবে তাদের মূর্তিপূজক আখ্যা দেওয়া—যেমনটা বাইহাকিসহ অতীত ও সমকালীন কেউ কেউ করেছেন—ভিত্তিহীন অভিযোগ। এ ব্যাপারে তারা কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখাতে সক্ষম হননি। বাইহাকি প্রশ্ন তুলেছেন, তারা ঈসা আলাইহিস সালামের ধর্ম গ্রহণ করেননি কেন?১০৭৭ জবাবের পরিবর্তে বরং বাইহাকিকে প্রশ্ন করা যায়, ঈসা আলাইহিস সালামের ধর্ম আরবে তখন কতটা বিস্তৃত ছিল? কতটুকু বিশুদ্ধ ছিল? এক ওয়ারাকা ইবনে নওফল এবং এ শ্রেণির কিছু লোক বাদে আর কেউ কি প্রকৃত ঈসায়ি দ্বীনের উপর ছিল? সালমান ফারসি রাযি.-এর সত্য সন্ধানের ঘটনা তো বরং প্রমাণ করে, ঈসায়ি দ্বীনের অবস্থাও তখন দীনে ইবরাহিমের মতো কিংবা আরও করুণ ছিল। ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আগমনের পরে কয়েক সহস্র বছর পার হয়ে গিয়েছিল। ফলে সময়ের বিবর্তনে ইবরাহিমি ধর্ম বিকৃত ও বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। দু-একজন মানুষ দ্বীনে ইবরাহিমের সামান্য কিছু ইবাদত ধরে রেখেছিল। তারা ছিল ‘হুনাফা’ নামে পরিচিত। একই কথা ঈসায়ি ধর্মের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ঈসা আলাইহিস সালামের পরে অর্ধসহস্র বছর কেটে গিয়েছিল। তাঁর রেখে যাওয়া দ্বীন ব্যাপক বিকৃতির শিকার হয়েছিল। হাতেগোনা কিছু মানুষ এর অবশিষ্ট কিছু অংশ আঁকড়ে ধরে ছিল। সেটাও ছিল গির্জা ও পাদরি-পুরোহিতদের মাঝে সীমাবদ্ধ। ফলে এই হুনাফা ও ঈসায়ি ধর্মের পাদরিদের অবস্থা ছিল ঘন অন্ধকার রাতে দু-চারটা জোনাকির মতো, যা এদিক-সেদিক নিভুনিভু করে আলো জ্বেলে রাখলেও গোটা জাযিরাতুল আরব ছিল পৌত্তলিকতা, কুফর ও গাফলতির নিশ্ছিদ্র তমসায় নিমজ্জিত। বরং যদি ইবরাহিমি কিংবা ঈসায়ি ধর্ম তখন বিশুদ্ধরূপে বিদ্যমান থাকত, আল্লাহ তায়ালা আহলে কিতাবকে উপরের আয়াতের কথা কেন বললেন? তিনি তো বললেই পারতেন—তোমরা ইবরাহিমি কিংবা ঈসায়ি দুটোকেই প্রত্যাখ্যান করেছ। ঠিক আছে, এবার মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর ধর্ম গ্রহণ করো।

আল্লাহর ঘর কাবার ভিতর ও চারপাশ জুড়ে কয়েকশো মূর্তি দাঁড়িয়ে ছিল। দুনিয়ার বুকে সর্বপ্রথম ঘর যা আল্লাহর ইবাদতের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, সেখানেই চলছিল পৃথিবীর বুকে সর্বনিকৃষ্ট কাজ শিরক। এমন এক ত্রাহি-ত্রাহি অবস্থায় জন্ম হয়েছিল আবদুল্লাহ ও আমিনার। সামান্য কিছু বছর বাঁচার পরে যৌবনের শুরুতেই, জীবন ও জগতকে ঠিকভাবে উপলব্ধি করার আগেই দুজনে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাদের মৃত্যুর কয়েক দশক পরে নবুওত লাভ করেন। ফলে তাদের আহলে ফাতরাহর অন্তর্ভুক্ত না করে সরাসরি মূর্তিপূজক আখ্যা দিয়ে জাহান্নামি বানানো কুরআনি নুসূস ও বাস্তবতা দুটোকেই প্রত্যাখ্যানের নামান্তর।১০৭৮

আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারেই বলেছেন, ۞ يس ۞ ۞ وَالْقُرْآنِ الْحَكِيمِ ۞ ۞ إِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ ۞ ۞ عَلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ ۞ ۞ تَنزِيلَ الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ ۞ ۞ لِتُنذِرَ قَوْمًا مَّا أُنذِرَ آبَاؤُهُمْ فَهُمْ غَافِلُونَ ۞ অর্থ: ‘ইয়া-সিন। প্রজ্ঞাময় কুরআনের শপথ! নিশ্চয় আপনি প্রেরিত রাসুলগণের একজন। সরল পথে প্রতিষ্ঠিত। কুরআন অবতীর্ণ পরাক্রমশালী পরম দয়ালু আল্লাহর নিকট থেকে, যাতে আপনি এমন এক জাতিকে সতর্ক করেন, যাদের পূর্বপুরুষদের সতর্ক করা হয়নি। ফলে তারা গাফেল।’ [ইয়াসিন: ১-৬] আল্লাহ ۞ أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ ۚ بَلْ هُوَ الْحَقُّ مِن رَّبِّكَ لِتُنذِرَ قَوْمًا مَّا أَتَاهُم مِّن نَّذِيرٍ مِّن قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَهْتَدُونَ ۞ অর্থ: ‘তারা কি বলে এটা সে মিথ্যা রচনা করেছে? বরং এটা আপনার পালনকর্তার তরফ থেকে সত্য, যাতে আপনি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন, যাদের কাছে আপনার পূর্বে কোনো সতর্ককারী আসেনি। সম্ভবত এরা সুপথপ্রাপ্ত হবে।’ [সাজদা : ৩] স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারে বলছেন, তিনি তাদের কাছে রাসুল পাঠাননি ফলে তারা গাফেল। তাদের কাছে কোনো সতর্ককারী আসেনি। অথচ এসব আলেম বিভিন্ন যুক্তিতে তাদের উপর ইবরাহিমি ও ঈসায়ি ধর্ম চাপিয়ে তাদের মুশরিক ও জাহান্নামি ঘোষণা করেছেন!

স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা অন্য জায়গায় এ যুক্তি খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেছেন, তাদের কিতাব দেওয়ার আগে শাস্তি দিলে তারা বলত—হে আল্লাহ, ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কাছে নবি-রাসুল ও কিতাব এসেছে। আমাদের কিতাব না দিয়ে কেন শাস্তি দিয়েছেন? ফলে আল্লাহ কিতাব পাঠানোর মাধ্যমে তাদের উপর ‘হুজ্জত’ সম্পূর্ণ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ وَهَٰذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَকٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ۞ ۞ أَن تَقُولُوا إِنَّময় অَنزِلَ الْكِتَابُ عَلَىٰ طَائِفَتَيْنِ مِن قَبْلِنَا وَإِن كُنَّا عَن دِرَاسَتِهِمْ لَغَافِلِينَ ۞ ۞ أَوْ تَقُولُوا لَوْ أَنَّا أُنزِلَ عَلَيْنَا الْكِتَابُ لَكُنَّا أَهْدَىٰ مِنْهُمْ ۚ فَقَدْ جَاءَكُم بَيِّنَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ ۚ فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن كَذَّبَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَصَدَفَ عَنْهَا ۗ سَنَجْزِي الَّذِينَ يَصْدِفُونَ عَنْ آيَاتِنَا سُوءَ الْعَذَابِ بِمَا كَانُوا يَصْدِفُونَ ۞ অর্থ : ‘এ কিতাব আমি নাযিল করেছি যা কল্যাণময়। সুতরাং এর অনুসরণ করো আর ভয় করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। (আমি এ কিতাব নাযিল করেছি এ জন্য যে) পাছে তোমরা বলা শুরু করো—কিতাব তো নাযিল করা হয়েছিল আমাদের পূর্বের দুটি সম্প্রদায় (ইহুদি ও খ্রিষ্টান)-এর প্রতি। আমরা তার পাঠ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলাম। কিংবা বলতে শুরু করো—যদি আমাদের প্রতি কোনো গ্রন্থ অবতীর্ণ হতো, আমরা এদের চাইতে অধিক পথপ্রাপ্ত হতাম। অতএব, তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সুষ্পষ্ট প্রমাণ, হেদায়াত ও রহমত এসে গেছে। অতঃপর সে ব্যক্তির চাইতে অধিক জালেম কে হবে, যে আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়? অতি সত্বর আমি তাদের শাস্তি দেবো যারা আমার আয়াতসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আমি তাদের সত্যবিমুখতার কারণে তাদের কঠোর শাস্তি দেবো।’ [আনআম : ১৫৫-১৫৭] সুতরাং কিতাব আসার আগে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, যেমন—রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতা, তারা কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে একই যুক্তি পেশ করতে পারবেন খুব সহজেই। কারণ, শাস্তি হবে কিতাব আসার পরেও যারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের। যারা কিতাবই পাননি তাদের শাস্তির কোনো যুক্তি নেই。

প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে সে যুগে মক্কার সবাই কি গাফেল এবং সবাই জান্নাতে যাবে? নাহ্। আহলে ফাতরাহর সবাই জান্নাতে চলে যাবে ব্যাপারটি তেমন নয়। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আমর ইবনে লুহাইর ব্যাপারে জাহান্নামের সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমর বিন লুহাইকে জাহান্নামের মধ্যে তার নাড়িভুঁড়ি টানতে দেখেছি।’১০৭৯ একইভাবে আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ব্যাপারেও জাহান্নামের সাক্ষ্য দিয়েছেন।১০৮০ অথচ তারাও সেই একই যুগের মানুষ। বোঝা গেল, পরকালে পরীক্ষা বা মুক্তি আহলে ফাতরাহর সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। এক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, যাদের কাছে নবিদের দাওয়াত কিংবা কোনো দ্বীনের বিশুদ্ধ পয়গাম পৌঁছেছে এবং ফলে যারা ‘গাফেল’-এর আওতার বাইরে চলে গেছে, দাওয়াত পৌঁছা সত্ত্বেও যারা শিরকের মাঝে ডুবে গেছে, বিভিন্ন উপায়ে শয়তানের পূজা করেছে, তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। বিপরীতে যারা কোনো সত্য ধর্মের অনুসারী হওয়ার সুযোগ না পাওয়াতে স্বাভাবিক ফিতরত ও গাফলতের মাঝে জীবনযাপন করেছে, বিশুদ্ধ তাওহিদের দাওয়াত যেমন পায়নি, তেমনই কোনো শিরকেও লিপ্ত হয়নি, এমন লোকদের কিয়ামতের দিন আল্লাহ পরীক্ষা করবেন এবং পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে ফয়সালা করবেন। সরাসরি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন না। এ ব্যাপারে পিছনে একাধিক হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে। উপরের লোকদের ব্যাপারে শিরক প্রমাণিত। ফলে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাদের জাহান্নামি ঘোষণা করেছেন। বিপরীতে তাঁর সম্মানিত মাতা-পিতার ব্যাপারে এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না যে, তারা শিরক করতেন, মূর্তিপূজা করতেন। বরং সর্বোচ্চ যতটুকু বোঝা যায়, তারা দ্বীন-ধর্ম সম্পর্কে ফিতরত ও গাফলতের উপর ছিলেন। বরং অসম্ভব নয় যে, শিরক থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তাদেরকে যৌবনের শুরুতেই দুনিয়া থেকে তুলে নিয়েছেন। যারা বলেন, আবদুল্লাহ ও আমিনা যেহেতু মক্কায় ছিলেন, আর মক্কাবাসী মূর্তিপূজা করত, তাই তারাও করতেন—এমন বক্তব্য সঠিক নয়। এটা বিদ্বেষপূর্ণ ও ভিত্তিহীন কথা। পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর শানে গোস্তাখি。

হ্যাঁ, সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে যেসব ইমাম রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতার ব্যাপারে জাহান্নামের কথা বলেছেন, তারা নসের অনুসরণ ও সম্মানের কারণে বলেছেন। ফলে তাদের কথা ভুল কিংবা শুদ্ধ যেটাই হোক, ইজতিহাদের কারণে তারা পুণ্য লাভ করবেন, নিন্দিত হবেন না। আবার যারা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতাকে জান্নাতি বলেছেন, তারাও নসের ভিত্তিতে ইজতিহাদ এবং রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মহব্বত ও সম্মানের খাতিরে বলেছেন। ফলে তাদের কথাও ভুল কিংবা শুদ্ধ যেটাই হোক, তারা পুণ্য লাভ করবেন, নিন্দিত হবেন না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মানুষ রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতাকে জাহান্নামে পাঠানোর ঠিকাদারি নিয়েছেন। বিপরীত পক্ষের আলেমদের গুরুত্বপূর্ণ ইজতিহাদকে তারা ‘শুবাহ’ তথা সংশয় আখ্যা দিয়ে নিজেদের মতামতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করছেন। কোনো শরয়ি নস ছাড়া কেবল অনুমানের উপর ভিত্তি করে তাদের কাফের-মুশরিক আখ্যা দিচ্ছেন। অথচ কুরআন-সুন্নাহর কোথাও তাদের সরাসরি কাফের-মুশরিক বলা হয়নি। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর চাচা আবু তালিব নবুওতের প্রায় এক দশক পরে ইন্তেকাল করেন। দীর্ঘ দশ বছর রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে নবি হিসেবে দেখেন। তাঁর দাওয়াতের কাজে ইখলাস ও ফিদা দেখে তাকে সাহায্য করেন। অথচ নিজে ঈমান আনেননি। এমনকি আবু তালিব যখন মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে, সেই মুমূর্ষু অবস্থাতেও রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাকে ঈমানের দাওয়াত দেন, কালিমা পড়তে বলেন। কিন্তু আবু তালিব প্রত্যাখ্যান করেন। এতকিছুর পরও মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি আবু তালিবের মহব্বত ও ভালোবাসার কারণে আল্লাহ তার শাস্তি লঘু করে দেবেন। ফলে জাহান্নামে সবার চেয়ে কম শাস্তি হবে আবু তালিবের।১০৮১

তাহলে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতার কী দোষ? বাবা আবদুল্লাহ তো তাঁর জন্মের আগেই মারা গেলেন। মাতা আমিনা মৃত্যুবরণ করলেন ছয় বছর বয়সে। তারা হয়তো কখনো কল্পনাও করার সুযোগ পাননি—আল্লাহ নতুন দ্বীন পাঠাবেন। তিনি গর্ভে থাকাকালীন মাতা আমিনা অনেক আশ্চর্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। পেট থেকে নূর বের হতে দেখেছেন।১০৮২ কিন্তু তিনি কি কখনো বুঝতে পেরেছেন তাঁর সন্তান একদিন নবি হবেন? বিশ্বজাহানের সর্দার হবেন? হয়তো বোঝেননি। বুঝলেও কিছু করার সুযোগ তাঁর ছিল না। দ্বীনে ইবরাহিমি পুরোপুরি বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। মূর্তিপূজার ভিড়ে সত্যকে খুঁজে বের করার সুযোগই পাননি আবদুল্লাহ। আমিনা তো ছিলেন ঘরের ভিতরে। হুনাফা কিংবা খ্রিষ্টানদের কাছে গিয়ে সত্য দ্বীন পরখ করার সুযোগ কোথায় তাঁর? উপরন্তু, তারা মূর্তিপূজা করতেন—এমন কোনো প্রমাণও নেই আমাদের কাছে। এর পরও তাদের জাহান্নামে পাঠানোর জন্য এত আগ্রহ কেন?

হ্যাঁ, একদিকে সনদ বিশুদ্ধ এমন একাধিক হাদিসে রাসুলুল্লাহর পিতা জাহান্নামে থাকার কথা বলা হয়েছে এবং মাতা আমিনার জন্য ইস্তিগফার নিষেধ করা হয়েছে, অপরদিকে তাদের ‘আহলে ফাতরাহ’ হওয়া সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত, আর আহলে ফাতরাহদের জাহান্নামি সাব্যস্ত করা কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। উপরন্তু উভয় পক্ষে পরবর্তী আলেমদের বক্তব্য থাকলেও আমাদের প্রাচীন ইমামদের এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য নেই, বিশেষত ইমাম আবু হানিফা, মালেক, শাফেয়ি ও আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. থেকে এ ব্যাপারে কথা বলার সুনিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই, অথচ তারা এসব হাদিস জানতেন না কিংবা এ ব্যাপারে কুরআন-হাদিসের আপাত সাংঘর্ষিক অবস্থান বুঝতেন না এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বোঝা গেল, এ ব্যাপারে আমাদের প্রথম যুগের ইমামগণ ইচ্ছাকৃতভাবেই নীরব থাকাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এমনকি পরবর্তী ইমামদের মাঝে ইমাম নববিও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত রাসুলুল্লাহর ‘পিতা’ জাহান্নামে-সংক্রান্ত হাদিসটি খুবই সংক্ষিপ্ত ও বাহ্যিক অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর পিতার পরিণতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য দেননি। খুব সম্ভবত তিনিও এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকাকে অগ্রাধিকার দিতেন।১০৮৩

আল্লামা আহমদ হামাভি (১০৯৮ হি.) ‘আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের’-এর ব্যাখ্যায় লিখেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমাদের সাহাবাদের ব্যাপারে মন্দ কথা বলতে নিষেধ করেছেন। ফলে রাসুলুল্লাহর মাতা-পিতার ব্যাপারে এমন কিছু বলা থেকে বিরত থাকা আরও বেশি জরুরি। তা ছাড়া, এটা আকিদার জরুরি কোনো বিষয় নয়। ফলে এ বিষয়ে কথা বলা থেকে মুখে লাগাম দেওয়া আবশ্যক।’১০৮৪ ইবনে আবিদিন শামি লিখেন, ‘সেকালে মক্কার একদল লোক আহলে ফাতরাহর অন্তর্ভুক্ত হয়ে ‘গাফেল’ অবস্থায় ছিলেন [শিরক করেননি, ঈমানও আনেননি]। আরেক দল আকলের মাধ্যমে হেদায়াত পেয়েছিলেন [হুনাফা]। সুতরাং আল্লাহর অনুগ্রহে আমাদের সুধারণা হলো, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতা উপরের দুই প্রকারের যেকোনো দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন [ফলে জাহান্নাম থেকে নাজাত পেতে পারেন]। ...মোটকথা, এটা এমন মাসআলা, যেটা নিয়ে কথা বলার সময় অত্যন্ত আদবের সঙ্গে বলা উচিত [যাতে রাসুলুল্লাহর প্রতি বেয়াদবি না হয়]। উপরন্তু এটা এমন কোনো মাসআলা নয়, যা না জানলে ক্ষতি হবে কিংবা যে সম্পর্কে কবরে বা হাশরের মাঠে প্রশ্ন করা হবে। ফলে হয় এ ব্যাপারে উত্তম কথা বলতে হবে, নয়তো চুপ থাকতে হবে।’১০৮৫

তাই আহলে সুন্নাতের অনুসারী প্রত্যেক আল্লাহভীরু ও রাসুলপ্রেমী মুসলিমের কর্তব্য হলো, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সম্মানিত মাতা-পিতার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কিংবা জবান-দরাজি দুটো থেকেই বিরত থাকা। অতিভক্তি কিংবা গোস্তাখি দুটোই বর্জনপূর্বক তাদের আখেরাতের পরিণতের ব্যাপারে নীরব-নিরপেক্ষ থাকা। মুমিন-কাফের, জান্নাতি-জাহান্নামি কোনোটা না বানিয়ে এগুলো বরং আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়া। তিনি নিশ্চয়ই কাউকে একবিন্দু জুলুম করবেন না। তাঁর প্রিয় বন্ধু রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতার প্রতি তিনি ইনসাফ করবেন। পরকালে রাসুলুল্লাহকে সম্পূর্ণ ও সর্বোচ্চ সন্তুষ্ট করবেন—এটা তো সুনিশ্চিত। ফলে এ ব্যাপারে মনস্তাপে ভোগার কিছু নেই।

টিকাঃ
১০৭৭. দালায়েলুন নুবুওয়াহ, বাইহাকি (১/১৯২)।
১০৭৮. আযিমাবাদি তাঁর আউনুল মাবুদে নববির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ‘তাদের কাছে ইবরাহিম ও অন্যান্য নবীর দাওয়াত পৌঁছেছে’ (১২/৩২৩)। এটা ভিত্তিহীন বক্তব্য। নবিজির বাবা-মায়ের ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে সিরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থগুলো একেবারেই নীরব। তা ছাড়া, মক্কাতে প্রকৃত ইবরাহিমি কিংবা ঈসায়ি ধর্মের অবশিষ্ট ছিটেফোঁটা সম্পর্কে অবগত লোকের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা দু-একজন। সামগ্রিকভাবে ইবরাহিমি কিংবা ঈসায়ি ধর্ম বলতে যা ছিল সেগুলো কোনো আসমানি ধর্ম ছিল না; বরং বিকৃত, মূর্তিপূজা ও কুফর-শিরকে ভরা সেসব ধর্মের খোলস এবং কিছু আচার-অনুষ্ঠান ছিল। এটাকে আসমানি ধর্মের দাওয়াত পৌঁছেছে বলে চালিয়ে দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।
১০৭৯. বুখারি (কিতাবুল মানাকিব: ৩৫২১)। মুসলিম (কিতাবুল জান্নাহ: ২৮৫৬)।
১০৮০. বুখারি (কিতাবুল মানাকিব : ৩৫২১; কিতাবু মানাকিবিল আনসার: ৩৮৮৩)। মুসলিম (কিতাবুল জান্নাহ : ২৮৫৬; কিতাবুল ঈমান ২০৯)।
১০৮১. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ২১৪)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল বির ওয়াল ইহসান: ৩৩০)। শিয়া-সহ একদল সুফি সম্প্রদায় ‘আবু তালিবও মুমিন হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন।’- এমন বিশ্বাস রাখে। কিন্তু সেটা প্রমাণিত নয়। এ ব্যাপারে তারা যেসব বর্ণনা পেশ করে সেগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। আবু তালিবের কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণের বিষয়টি কুরআন ও বিশুদ্ধ সুন্নাহ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। বিপরীতে মাতা-পিতার বিষয়টি অস্পষ্ট।
১০৮২. মুসান্নাফে আবদির রাযযাক (কিতাবুল মাগাযি: ৯৭১৮)। মুসনাদে তয়ালেসি (আহাদিসু আবি উমামা বাহেলি : ১২৩৬)। মুসনাদে দারেমি (মুকাদ্দিমাতুল মুআল্লিফ: ১৩)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুশ শামিয়্যিন : ১৭৪২৫)।
১০৮৩. শরহে মুসলিম, নববি (৩/৭৯)।
১০৮৪. গামযু উয়নিল বাসায়ের (৩/২৪১)।
১০৮৫. রদ্দুল মুহতার (৩/১৮৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00