📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 ইমাম আজমের বক্তব্যের ব্যাপারে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা

📄 ইমাম আজমের বক্তব্যের ব্যাপারে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা


ইমাম আজমের বক্তব্যের ব্যাপারে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা। হায়দ্রাবাদের দারুল মাআরিফ আল-উসমানিয়্যাহ কর্তৃক প্রকাশিত ‘আল-ফিকহুল আকবার’-এর পাণ্ডুলিপিতে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর মাতা-পিতার পরিণতি নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। একইভাবে আরব আমিরাতের মাকতাবাতুল ফুরকান থেকে প্রকাশিত নুসখাতেও এ ব্যাপারে কোনো কথা নেই। এগুলোতে স্রেফ রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সন্তানসন্ততির কথা বলা হয়েছে: ‘কাসেম, তাহের ও ইবরাহিম রাসুল (ﷺ)-এর পুত্র। ফাতেমা, রুকাইয়া, যয়নব ও উম্মে কুলসুম রাযি. তাঁর কন্যা।’১০৩৯ অথচ আমাদের হাতে বিদ্যমান আযহারে সংরক্ষিত একটি পাণ্ডুলিপিতে স্পষ্টভাবে তাঁর মাতা-পিতা ও চাচার কথা এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে: ‘রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর পিতা-মাতা কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। একইভাবে তাঁর চাচা আবু তালিবও কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।’১০৪০ বিপরীতে আরেফ হিকমত লাইব্রেরির একটি পাণ্ডুলিপিতে এসেছে, ‘রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর পিতা-মাতা কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেননি।’১০৪১ একই লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত অন্য পাণ্ডুলিপিতে এসেছে, ‘রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর পিতা-মাতা ফিতরতের উপর মৃত্যুবরণ করেছেন।’১০৪২

টিকাঃ
১০৩৯. আল-ফিকহুল আকবার (৮)।
১০৪০. আল-ফিকহুল আকবার (আযহার পাণ্ডুলিপি) (১১ আলিফ)।
১০৪১. দেখুন : আল-ইমাম আলি কারি ওয়া আসারুহু ফি ইলমিল হাদিস (১০৬)। আরেফ হিকমত লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপি (নং ১৬১/মাজামি’)।
১০৪২. দেখুন: আল-ফিকহুল আকবার (আরেফ হিকমত লাইব্রেরি, নাসেখ মুহাম্মাদ নূর) (৯)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 প্রথম দলের মত

📄 প্রথম দলের মত


একদল মুহাক্কিক আলেম রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতাকে জাহান্নামি মনে করেন! বাইহাকি (৪৫৮ হি.) উক্ত মতবাদের শক্ত প্রচারক। তিনি সুস্পষ্টভাবেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতা ও দাদাকে কাফের আখ্যা দিয়েছেন।১০৫২ ‘সুনানে কুবরা’তেও তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতাকে সরাসরি ‘মুশরিক’ আখ্যা দিয়েছেন।১০৫৩ ইবনে জারির তাবারিও (৩১০ হি.) তাঁর তাফসিরে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতাকে মুশরিক গণ্য করেছেন।১০৫৪ মুসলিমের ব্যাখ্যায় ইমাম নববি (৬৭৬ হি.)-এর বক্তব্য দ্বারাও বোঝা যায়, তিনি উক্ত মত সমর্থন করেন, যদিও তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতার ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলেননি।১০৫৫ ইবনে তাইমিয়্যাহ রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতা কুফরের উপর মৃত্যুবরণ করেছেন বলে মত দিয়েছেন।১০৫৬ ইবনে কাসির (৭৭৪ হি.) তাঁর তাফসির ও ইতিহাস গ্রন্থ ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’সহ সর্বত্র রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতা, দাদা আবদুল মুত্তালিব সবাইকে জাহান্নামি হওয়ার মত দিয়েছেন।১০৫৭

এভাবে তাদের মতে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতা উভয়েই জাহান্নামি। এটা তারা কুরআন-সুন্নাহতে প্রমাণিত এবং আহলে সুন্নাতের সুস্পষ্ট আকিদা দাবি করেন। সরাসরি কুরআনের কোনো আয়াত না থাকলেও তারা একটি ঘটনাকে শানে নুযুল মেনে সেটা দিয়ে দলিল দেওয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনাটি হলো :

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) একদিন বলেন, হায়! আমি যদি জানতাম আমার মাতা-পিতার কী অবস্থা! তখন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাঁর উপর এ আয়াত অবতীর্ণ হলো : ۞ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ بِالْحَقِّ بَشِيرًا وَنَذِيرًا ۖ وَلَا تُسْأَلُ عَنْ أَصْحَابِ الْجَحِيمِ ۞ অর্থ : ‘নিশ্চয় আমি আপনাকে সত্যধর্মসহ সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারীরূপে পাঠিয়েছি। আপনি দোযখবাসী সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন না।’ [বাকারা : ১১৯]১০৫৮ এটার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতাকে স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে জাহান্নামি বলা হয়েছে। কিন্তু উক্ত শানে নুযুল নিজেই সুপ্রমাণিত নয়। ফলে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আকিদার ক্ষেত্রে এটা দলিল হতে পারে না।

এক্ষেত্রে তাদের মূল দলিল হলো কিছু হাদিস, যেগুলো হাদিসের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। ফলে সনদের দিক থেকে এসব হাদিস বিশুদ্ধ। এমন কিছু হাদিস হলো :

আনাস বিন মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমার পিতা কোথায়? তিনি বললেন, ‘জাহান্নামে।’ লোকটি ফিরে যেতে উদ্যত হলে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার পিতা এবং আমার পিতা দুজনেই জাহান্নামে।’১০৫৯

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (ﷺ) একদিন কবর যিয়ারতের জন্য বের হলেন। আমরাও তার সাথে বের হলাম। তিনি আমাদের বসার নির্দেশ দিলে আমরা বসে গেলাম। অতঃপর তিনি বিভিন্ন কবরের মাঝে হাঁটাহাঁটি করতে থাকেন। একসময় একটি কবরের কাছে পৌঁছে লম্বা সময় সেখানে গুনগুন আওয়াজ করেন। একপর্যায়ে তাঁর কান্নার আওয়াজ উঁচু হয়ে গেল। তাকে কাঁদতে দেখে আমরাও কাঁদলাম। অতঃপর তিনি আমাদের কাছে ফিরে এলেন। উমর ইবনুল খাত্তাব তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার কান্নার কারণ কী? আপনার কান্না আমাদেরও কাঁদিয়েছে, আমাদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছে। আল্লাহর রাসুল আমাদের কাছে এসে বললেন, “আমার কান্না তোমাদের কষ্ট দিয়েছে?’ আমরা বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, ‘আমাকে যে কবরের কাছে মুনাজাত করতে দেখেছ, সেটা আমার মা আমিনা বিনতে ওয়াহাবের কবর। আমি আমার রবের কাছে তাঁর কবর যিয়ারতের অনুমতি চেয়েছি, তিনি আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। আমি তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনার (ইস্তিগফার) অনুমতি চেয়েছি, কিন্তু তিনি আমাকে অনুমতি দেননি। বরং আমার মায়ের জন্য একজন সন্তানের যেমন লাগে আমারও তেমন লেগেছে। তাই আমি কেঁদেছি।”১০৬০ সহিহ মুসলিম, সুনানে আবি দাউদ ও ইবনে মাজাসহ বিভিন্ন গ্রন্থে উক্ত হাদিসটি আবু হুরাইরা রাযি. সূত্রে সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে।১০৬১

ইবনে বুরাইদা থেকে বর্ণিত, তিনি তার পিতা (বুরাইদা) থেকে বর্ণনা করেন, আমরা আল্লাহর রাসুলের সাথে ছিলাম। তিনি কতগুলো কবরের কাছে এসে তাঁর মায়ের জন্য শাফায়াত প্রার্থনা করলেন। তখন জিবরিল তার বুকে আঘাত করে বললেন, আপনি কি এমন কারও জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করছেন, যিনি মুশরিক অবস্থায় মারা গিয়েছেন? তখন তিনি দুঃখ-ভারাক্রান্ত হয়ে ফিরে আসেন।১০৬২

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি.-এর লম্বা হাদিস। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মুলাইকার দুই ছেলেকে বলেন, ‘তোমাদের মা জাহান্নামে।’ তখন তাদের খারাপ লাগে। রাসুল (ﷺ) তাদের ডেকে বলেন, ‘আমার মাও তোমাদের মায়ের সাথে রয়েছেন।’১০৬৩

আবু রযিন থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসুলকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমার মা কোথায়? রাসুল (ﷺ) বললেন, ‘তোমার মা জাহান্নামে।’ আবু রযিন বললেন, তাহলে আপনার আত্মীয়স্বজন কোথায়? রাসুল (ﷺ) বললেন, ‘পেরেশান হয়ো না। তোমার মা আমার মায়ের সাথেই আছেন।’১০৬৪

টিকাঃ
১০৫২. দেখুন: দালায়েলুন নুবুওয়াহ, বাইহাকি (১/১৯২)।
১০৫৩. দেখুন: সুনানে কুবরা, বাইহাকি (কিতাবুন নিকাহ: ১৪১৮৮)।
১০৫৪. দেখুন: তাফসিরে তাবারি (২/৫৬০)।
১০৫৫. দেখুন: শরহে মুসলিম, নববি (৩/৭৯)।
১০৫৬. দেখুন: মাজমুউল ফাতাওয়া (৪/৩২৪-৩২৮)।
১০৫৭. দেখুন : তাফসিরে ইবনে কাসির (৪/১৯৫)। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির (৩/৪২৯)।
১০৫৮. তাফসিরে তাবারি (২/৪৮১)। তাফসিরে ইবনে কাসির (১/২৮০)। কিন্তু এটা যয়িফ উপরন্তু মুরসাল বর্ণনা। ফলে এক্ষেত্রে এটা দলিল হতে পারে না।
১০৫৯. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান : ২০০)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৭১৮)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল বির ওয়াল ইহসান : ৫৭৮)
১০৬০. মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুত তাফসির : ৩৩১১)। মুসান্নাফে আবদির রাযযাক (কিতাবুল জানায়েয : ৬৭১৪)।
১০৬১. মুসলিম (কিতাবুল জানায়েয : ৯৭৬)। আবু দাউদ (কিতাবুল জানায়েয: ৩২৩৪)। সুনানে ইবনে মাজা (আবওয়াবুল জানায়েয: ১৫৭২)
১০৬২. মুসনাদে বাযযার (মুসনাদে বুরাইদা: ৪৪৫৩)।
১০৬৩. মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুত তাফসির : ৩৪০৫)। মুসনাদে আহমদ (৩৮৪৪)।
১০৬৪. মুসনাদে আহমদ (আওয়ালু মুসনাদিল মাদানিয়্যিন: ১৬৪৩৯)। মুসনাদে তয়ালেসি (১১৮৬)

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 দ্বিতীয় দলের মত

📄 দ্বিতীয় দলের মত


উল্লিখিত অধিকাংশ বর্ণনা সনদের দিক দিয়ে বিশুদ্ধ। তাহলে কি নিশ্চিতভাবেই রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতা জাহান্নামি? বিষয়টি এত সরল নয়। এ কারণে ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি, খতিবে বাগদাদি, শাইখুল ইসলাম ইবনে হাজার আসকালানি, জালালুদ্দিন সুয়ুতি, মাওয়ারদি, আবুল কাসেম সুহাইলি, মুহিব্বুদ্দিন তাবারি, মুহাম্মাদ ইবনে রাসুল বারযানজি, মুহাম্মাদ মারআশি, মুহাম্মাদ মুহিব্বি, কাযি সানাউল্লাহ পানিপথি, যাহেদ কাওসারি সহ উম্মাহর বিশাল সংখ্যক আলেম উক্ত মতের বিরোধিতা করেন। তারা কুরআন-সুন্নাহ ও যুক্তির আলোকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর পিতা-মাতা জাহান্নামি নন—প্রমাণ করেন। পিছনে বর্ণিত হাদিসগুলোকে তারা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। এ বিষয়ে তারা এবং বিভিন্ন আলেম প্রায় শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন।১০৬৫ তাদের মতে, বিভিন্ন বিচারে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতা জাহান্নামি হওয়া থেকে রক্ষা পেতে পারেন :

এক: সুহাইলি, মুহিব্বুদ্দিন তাবারি, সুয়ুতি, বারযানজিসহ একদল আলেম মনে করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতাকে তাঁর জীবদ্দশায় জীবিত করা হয়েছিল। তারা তাঁর উপর ঈমান আনেন এবং মুমিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ফলে তাদের জান্নাতে প্রবেশে আর কোনো বাধা থাকল না।

তবে এ ব্যাপারে তারা যেসব বর্ণনা পেশ করেন, সেসবের অধিকাংশ ভিত্তিহীন। যেমন—একটি বর্ণনায় বলা হয়, রাসুলুল্লাহর (ﷺ) বিদায় হজের সময় আল্লাহ তাঁর মাতা-পিতাকে জীবিত করে দেন এবং তারা তাঁর উপর ঈমান আনেন। এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য বর্ণনা নয়।১০৬৬ একইভাবে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কিয়ামতের দিন তাঁর পিতা-মাতা, চাচা এবং জাহেলি যুগের এক ভাইয়ের জন্য সুপারিশ করবেন—এমন বর্ণনাও প্রমাণিত নয়।১০৬৭

দুই. রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতা মুশরিক ছিলেন না। বরং তারা উভয়ে ‘হানিফ’ এবং দ্বীনে ইবরাহিমির উপর ছিলেন। ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি, জালালুদ্দিন সুয়ুতি, মাওয়ারদি, বারযানজি প্রমুখ আলেম উক্ত মত রাখেন। তাদের যুক্তি, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মুশরিকদের ‘অপবিত্র’ আখ্যা দিয়েছেন [তাওবা : ২৮]। আর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কোনো অপবিত্রের ঔরস থেকে জন্ম নিতে পারেন না। অথচ তাঁর পূর্বপুরুষের মাঝে কেউ মুশরিক থাকলে তাকে অপবিত্র ঔরস থেকেই জন্ম নিতে হয়! তাই আবদুল্লাহ থেকে শুরু করে আদম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত রাসুলুল্লাহর পূর্বপুরুষ সকলে মুমিন ছিলেন! তাওহিদের উপর ছিলেন।১০৬৮

উক্ত মতটিও গ্রহণযোগ্য নয়। তারা যে যুক্তিতে আদম আলাইহিস সালাম থেকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) পর্যন্ত তাঁর পুরো বংশ লতিকাকে মুমিন হওয়া আবশ্যক মনে করেন, সেটা মোটেই আবশ্যক নয়। বরং এক্ষেত্রে তাদের হাতে কোনো প্রমাণও নেই। যেসব বিষয়কে তারা প্রমাণস্বরূপ পেশ করতে চান, সেগুলো নিতান্তই তাকাল্লুফপূর্ণ ও অযৌক্তিক। তাই এ ব্যাপারে বাস্তবস্মত কথা হলো—রাসুলুল্লাহর পূর্বপুরুষদের মাঝে অনেকে মুমিন ছিলেন, আবার অনেকে কাফের ছিলেন। তাঁর বংশপরম্পরায় কোনো কাফেরের উপস্থিতি তাঁর শান ও মানের জন্য বেমানান নয়। নবুওতের মর্যাদার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক নয়।

তিন: রাসুলুল্লাহর সম্মানিত মাতা-পিতা ‘আহলে ফাতরাহ’র অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ, তারা সেসব মানুষের মাঝে গণ্য হবেন যারা দুই নবির আগমনের মাঝামাঝি সময়ে বসবাস করেছেন। ফলে তাদের কাছে ইসলাম ও তাওহিদের বিশুদ্ধ দাওয়াত পৌঁছয়নি। তারা আল্লাহর মনোনীত দ্বীন সম্পর্কে জানার সুযোগ পাননি। এ অবস্থাতেই তারা মৃত্যুবরণ করেছেন। এক্ষেত্রে ইসলামের সর্বসম্মত নীতি হলো—যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছবে না, আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না। কারণ, সেটা জুলুম গণ্য হবে। আল্লাহ সব ধরনের জুলুম থেকে পবিত্র।১০৬৯

কুরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ مَّنِ اهْتَدَىٰ فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ ۖ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا ۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ۗ وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا ۞ অর্থ: ‘যে সৎপথে চলে, সে নিজের মঙ্গলের জন্যই সৎপথে চলে। আর যে পথভ্রষ্ট হয়, নিজের অমঙ্গলের জন্যই পথভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। আর রাসুল পাঠানোর আগ পর্যন্ত আমি কাউকে শাস্তি দান করি না।’ [ইসরা : ১৫] অন্য আয়াতে বলেন, ۞ وَمَا كَانَ رَبُّكَ مُهْلِكَ الْقُرَىٰ حَتَّىٰ يَبْعَثَ فِي أُمِّهَا رَسُولًا يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا ۚ وَمَا كُنَّا مُهْلِكِي الْقُرَىٰ إِلَّا وَأَهْلُهَا ظَالِمُونَ ۞ অর্থ : ‘আপনার পালনকর্তা জনপদসমূহকে ধ্বংস করেন না যে পর্যন্ত তার কেন্দ্রস্থলে রাসুল প্রেরণ না করেন, যিনি তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করেন। আর আমি জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করি, যখন তার বাসিন্দারা জুলুম করে।’ [কাসাস : ৫৯] তৃতীয় আরেক আয়াতে বলেন, ۞ وَمَا أَهْلَكْنَا مِن قَرْيَةٍ إِلَّا لَهَا مُنذِرُونَ ۞ ۞ ذِكْرَىٰ وَمَا كُنَّا ظَالِمِينَ ۞ অর্থ : ‘আমি কোনো জনপদকে ধ্বংস করিনি এ ব্যতিরেকে যে, তাদের জন্য সতর্ককারী ছিল, যাতে তারা তাদের উপদেশ দান করে। আর আমি জালেম নই।’ [শুআরা : ২০৪-২০৫]

আল্লাহ যদি নবি-রাসুল ও কিতাব পাঠানোর আগেই কোনো সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেন, তবে তারা কিয়ামতের দিন তাদের পক্ষে সেটাকে যুক্তি হিসেবে পেশ করবে। তাই তিনি নবি-রাসুল ও কিতাব পাঠানোর আগে কোনো সম্প্রদায়কে শাস্তি দেন না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ নিজেই বলেন, ۞ وَهَٰذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَকٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ۞ ۞ أَن تَقُولُوا إِنَّمَا أُنزِلَ الْكِتَابُ عَلَىٰ طَائِفَتَيْنِ مِن قَبْلِنَا وَإِن كُنَّا عَن دِرَاسَتِهِمْ لَغَافِلِينَ ۞ অর্থ : ‘এটা এক বরকতপূর্ণ কিতাব, যা আমি নাযিল করেছি। সুতরাং এর অনুসরণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষিত হয়। এ জন্য যে, কখনো তোমরা বলতে শুরু করো, গ্রন্থ তো কেবল আমাদের পূর্ববর্তী দুই সম্প্রদায়ের (ইহুদি ও খ্রিষ্টান) প্রতিই অবতীর্ণ হয়েছে এবং আমরা সেগুলোর পাঠ ও পঠন সম্পর্কে কিছুই জানতাম না।’ [আনআম : ১৫৫-১৫৬] আরেক আয়াতে বলেন, ۞ وَلَوْلَا أَن تُصِيبَهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ فَيَقُولُوا رَبَّنَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُولًا فَنَتَّبِعَ آيَاتِكَ وَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ ۞ অর্থ : ‘যাতে তাদের কৃতকার্যের কারণে তাদের উপর কোনো মুসিবত এলে তারা বলতে না পারে—হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আমাদের কাছে কোনো রাসুল পাঠালেন না কেন? তাহলে আমরা আপনার আয়াতসমূহ অনুসরণ করতাম এবং আমরাও ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম।’ [কাসাস : ৪৭]

একাধিক হাদিস দ্বারাও ‘আহলে ফাতরাহ’ তথা ইসলামের দাওয়াত পৌঁছয়নি এমন ব্যক্তিদের পরকালে মুক্তির ঘোষণা পাওয়া যায়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হাদিস হলো :

আসওয়াদ ইবনে সারি থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘চার ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে তাদের (ইসলাম গ্রহণ না করার) কৈফিয়ত পেশ করবে—এক. বধির। দুই. পাগল। তিন. বৃদ্ধ। চার. ইসলাম পৌঁছার আগে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি। বধির বলবে—প্রভু, ইসলাম এসেছিল। কিন্তু আমি তা শুনতে পাইনি। পাগল বলবে—প্রভু, ইসলাম এসেছিল। কিন্তু বাচ্চারা আমার উপর বিষ্ঠা নিক্ষেপ করে তাড়িয়ে দিত। বৃদ্ধ বলবে—প্রতিপালক, ইসলাম এসেছিল। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি। চতুর্থ ব্যক্তি বলবে—হে প্রভু, আমার কাছে আপনার কোনো রাসুল আসেননি! তখন আল্লাহ তাদের থেকে আনুগত্যের অঙ্গীকার নিয়ে একজন রাসুল পাঠাবেন। রাসুল (দূত) এসে (পরীক্ষাস্বরূপ) বলবেন, তোমরা আগুনে ঝাঁপ দাও! আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! যদি তারা তাতে প্রবেশ করে, তবে আগুন তাদের জন্য শীতল ও প্রশান্তিময় স্থানে পরিণত হবে।’ উক্ত হাদিসটি একাধিক সনদে বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।১০৭০

আনাস ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন চার ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে—এক. ছোট শিশু। দুই. পাগল। তিন. যার কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছয়নি। চার. অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি। তারা প্রত্যেকেই আল্লাহর কাছে (ঈমান না আনার) কারণ পেশ করবে। আল্লাহ তখন জাহান্নামের একটা অংশকে লক্ষ্য করে বলবেন, বেরিয়ে আসো। অতঃপর তাদের উদ্দেশে বলবেন, আমি আমার বান্দাদের কাছে তাদের ভিতরের মানুষকে রাসুল হিসেবে প্রেরণ করতাম। আজ আমি নিজেই তোমাদের রাসুল। তোমরা ওটার মাঝে প্রবেশ করো। তখন যার কপালে দুর্ভাগ্য লেখা হয়েছে সে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলবে—হে প্রভু, আমরা যেটা থেকে পালাতাম এখন সেখানেই আমাদের প্রবেশ করাবেন? আর যার কপালে সৌভাগ্য লেখা হয়েছে সে আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণপূর্বক দ্রুত জাহান্নামে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তখন আল্লাহ অবাধ্যদের লক্ষ্য করে বলবেন, তোমরা আমারই অবাধ্য হয়েছ। পৃথিবীতে রাসুলদের দাওয়াত পেলে তো আরো বেশি অবাধ্য হতে। তখন তিনি অনুগতদের জান্নাত দান করবেন, আর অবাধ্যদের জাহান্নামে ফেলবেন।’১০৭১

সাওবান থেকে বর্ণিত, আল্লাহর নবি (ﷺ) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন জাহেলি যুগের মানুষ তাদের পিঠে মূর্তি নিয়ে আল্লাহর কাছে হাজির হবে। আল্লাহ তাদের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা বলবে, হে প্রভু, আমাদের কাছে আপনি কোনো রাসুল পাঠাননি। আমাদের কাছে আপনার নির্দেশ পৌঁছয়নি। যদি আপনি আমাদের কাছে রাসুল প্রেরণ করতেন, তবে আমরা সবাই আপনার সবচেয়ে অনুগত হতাম। তখন আল্লাহ তাদের বলবেন, তাহলে এখন যদি আমি তোমাদের নির্দেশ দিই তোমরা আমার নির্দেশ পালন করবে? তারা বলবে, হ্যাঁ। তখন তিনি তাদের জাহান্নামে প্রবেশ করার নির্দেশ দেবেন। তারা জাহান্নামের কাছাকাছি পৌঁছে এর ক্রোধোন্মত্ত গর্জন শুনে তাতে প্রবেশ না করে আল্লাহর কাছে ফিরে এসে বলবে, প্রভু, আপনি আমাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করুন। আল্লাহ তাদের বলবেন, তোমরা কি বলোনি আমি তোমাদের যা নির্দেশ দেবো তোমরা তা পালন করবে? তারা আবারও আনুগত্যের ওয়াদা করবে। আল্লাহ তাদের ওয়াদা নিয়ে আবার জাহান্নামে প্রবেশের নির্দেশ দেবেন। তারা পূর্বের মতোই আবারও ভীত হয়ে ফিরে এসে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানাবে। তখন আল্লাহ তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। আল্লাহর নবি বলেন, যদি তারা আল্লাহর নির্দেশ পালন করে জাহান্নামে প্রবেশ করত, সেটা তাদের জন্য শীতল শান্তিদায়ক স্থানে পরিণত হতো।’১০৭২

আবু সাইদ খুদরি থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তিকে আনা হবে—এক. ইসলাম পৌঁছানোর আগে মৃত্যুবরণকারী। দুই. পাগল। তিন. শিশু। ইসলাম পৌঁছার আগে মৃত্যুবরণকারী বলবে, প্রভু, আমার কাছে কোনো কিতাব অথবা রাসুল আসেনি...। পাগল বলবে, হে আল্লাহ, আমাকে আপনি ভালোমন্দের মাঝে পার্থক্য করার বিবেক দেননি। শিশু বলবে, হে আল্লাহ, আমি পরিণত বয়সে পৌঁছতে পারিনি। তখন তাদের সামনে জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে। তাদের বলা হবে, এখানে প্রবেশ করো। যে ব্যক্তি আল্লাহর জ্ঞানে সৌভাগ্যবান ছিল সে তাতে প্রবেশ করবে। আর যে আল্লাহর জ্ঞানে দুর্ভাগা ছিল সে তাতে প্রবেশ করবে না। তখন আল্লাহ বলবেন, তোমরা আমারই অবাধ্য হলে। আমার রাসুলদের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করতে তা তো বোঝাই যাচ্ছে।’১০৭৩

টিকাঃ
১০৬৫. উদাহরণস্বরূপ দেখুন : সাদাদুদ দ্বীন ওয়া সিদাদুদ দাইন, বারযানজি (৭২-৭৫)। দেখুন: তাফসিরে মাযহারি (১/১২০)। মুকাদ্দিমাতুল ইমাম কাওসারি (১৬৯-১৭০)।
১০৬৬. আস-সাবেক ওয়াল লাহেক, খতিবে বাগদাদি (৩৪৪)। আর-রাওযুল উনুফ, সুহাইলি (২/১৮৭- ১৮৮)। খতিবে বাগদাদি ও সুহাইলি ছাড়াও দারাকুতনি, ইবনে আসাকির, ইবনে শাহিন, মুহিব্বুদ্দিন তাবারি, বারযানজি, মারআশি প্রমুখ আলেম তাদের গ্রন্থে এ বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন। তারা সকলে স্বীকার করেছেন হাদিসটি যয়িফ। কিন্তু ‘মানাকিব’-এর ক্ষেত্রে যয়িফ হাদিস গ্রহণযোগ্য-এমন দলিল দিয়েছেন। অথচ এটা স্রেফ ‘মানাকিব’ নয়; ‘গায়েব’ ও ‘আকিদা’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। একারণে ইবনে কাসির সুহাইলির বর্ণনাকে ‘অত্যন্ত মুনকার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/৪২৯)।
১০৬৭. যাখায়িরুল উকবা ফি মানাকিবি যাবিল কুরবা, মুহিব্বুদ্দিন তাবারি (৭)।
১০৬৮. দেখুন: আল-হাভি লিল ফাতাওয়া, সুয়ুতি (২/২৫৪)। আদ-দুরাজুল মুনিফাহ ফিল আবায়িশ শরিফাহ (রাশেদ খলিল সংকলিত রাসায়িলুস সুয়ুতি) (২৩-২৮)। বাইজুরিও উক্ত মত পোষণ করেন। দেখুন: শরহুল জাওহারাহ (৪৬)।
১০৬৯. দেখুন : সাদাদুদ দ্বীন ওয়া সিদাদুদ দাইন (১৬৬)। রিসালাতুস সুরুর ওয়াল ফারাহ (পাণ্ডুলিপি), মারআশি (৮-৯)।
১০৭০. মুসনাদে আহমদ (আউয়ালু মুসনাদিল মাদানিয়্যিন : ১৬৫৫৯)। সহিহ ইবনে হিব্বান (কিতাবু ইখবারিহি আন মানাকিবিস সাহাবাহ : ৭৩৫৭)। মুসনাদুল বাযযার (তাতিম্মাতু মারউইয়্যাতি আবি হুরাইরা : ১৫৯৭)
১০৭১. মুসনাদে বাযযার (মুসনাদে আনাস ইবনে মালেক : ৭৫৯৪)। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (কিতাবু সিফাতিল জান্নাতি ওয়ান নার: ৩৫৩২১)। তাফসিরে ইবনে কাসির (৫/৫১)।
১০৭২. মুসনাদে বাযযার (মুসনাদে সাওবান: ৪১৬৯)। তাফসিরে ইবনে কাসির (৫/৫১)।
১০৭৩. মুসনাদে আবিল জাদ (২০৩৮)। শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, লালাকায়ি (১০৭৬)। আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (মুআজ ইবনে জাবাল: ২০/৮৩ হাদিস নং ১৫৮)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 অধমের পর্যবেক্ষণ

📄 অধমের পর্যবেক্ষণ


যেমনটা পিছনেও বলেছি যে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতাকে মুক্তিপ্রাপ্ত সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে উপরে প্রদত্ত দ্বিতীয় ও তৃতীয় কারণটি শক্তিশালী নয়। কারণ, তাদের জীবিত হয়ে ঈমান আনার বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয়। এ ব্যাপারে যেসব বর্ণনা পেশ করা হয় সেগুলো গ্রহণীয় পর্যায়ের নয়। অপরদিকে রাসুল (ﷺ)-এর পিতা আবদুল্লাহ থেকে আদম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত সকলের মুমিন হওয়ার বিষয়টিও সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়; বরং একান্তই অনুমানমূলক বক্তব্য। তবে তৃতীয় কারণটি বেশ শক্তিশালী। কারণ, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর পিতা-মাতা সন্দেহাতীতভাবে ‘আহলে ফাতরাহ’র অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, ইনশাআল্লাহ। যারা এর বিপরীত কথা বলেছেন তাদের কথা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, তাদের কাছে ইসলামের এবং বিশুদ্ধ তাওহিদের দাওয়াত পৌঁছয়নি। সে যুগ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ عَلَىٰ فَتْرَةٍ مِّنَ الرُّسُلِ أَن تَقُولُوا مَا جَاءَنَا مِن بَشِيرٍ وَلَا نَذِيرٍ ۖ فَقَدْ جَاءَكُم بَشِيرٌ وَنَذِيرٌ ۗ وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ۞ অর্থ: ‘হে কিতাবিগণ, তোমাদের নিকট এমন একসময় আমার রাসুল (দ্বীনের) ব্যাখ্যাদানের জন্য এসেছে, যখন রাসুলগণের আগমনধারা বন্ধ ছিল, যাতে তোমরা বলতে না পারো, আমাদের কাছে (জান্নাতের) কোনো সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নাম সম্পর্কে) সতর্ককারী আসেনি। এবার তোমাদের কাছে একজন সুসংবাদদাতা সতর্ককারী এসে গেছে। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে পরিপূর্ণ ক্ষমতাবান।’ [মায়িদা : ১৯]

ফলে ঢালাওভাবে তাদের মূর্তিপূজক আখ্যা দেওয়া—যেমনটা বাইহাকিসহ অতীত ও সমকালীন কেউ কেউ করেছেন—ভিত্তিহীন অভিযোগ। এ ব্যাপারে তারা কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখাতে সক্ষম হননি। বাইহাকি প্রশ্ন তুলেছেন, তারা ঈসা আলাইহিস সালামের ধর্ম গ্রহণ করেননি কেন?১০৭৭ জবাবের পরিবর্তে বরং বাইহাকিকে প্রশ্ন করা যায়, ঈসা আলাইহিস সালামের ধর্ম আরবে তখন কতটা বিস্তৃত ছিল? কতটুকু বিশুদ্ধ ছিল? এক ওয়ারাকা ইবনে নওফল এবং এ শ্রেণির কিছু লোক বাদে আর কেউ কি প্রকৃত ঈসায়ি দ্বীনের উপর ছিল? সালমান ফারসি রাযি.-এর সত্য সন্ধানের ঘটনা তো বরং প্রমাণ করে, ঈসায়ি দ্বীনের অবস্থাও তখন দীনে ইবরাহিমের মতো কিংবা আরও করুণ ছিল। ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আগমনের পরে কয়েক সহস্র বছর পার হয়ে গিয়েছিল। ফলে সময়ের বিবর্তনে ইবরাহিমি ধর্ম বিকৃত ও বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। দু-একজন মানুষ দ্বীনে ইবরাহিমের সামান্য কিছু ইবাদত ধরে রেখেছিল। তারা ছিল ‘হুনাফা’ নামে পরিচিত। একই কথা ঈসায়ি ধর্মের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ঈসা আলাইহিস সালামের পরে অর্ধসহস্র বছর কেটে গিয়েছিল। তাঁর রেখে যাওয়া দ্বীন ব্যাপক বিকৃতির শিকার হয়েছিল। হাতেগোনা কিছু মানুষ এর অবশিষ্ট কিছু অংশ আঁকড়ে ধরে ছিল। সেটাও ছিল গির্জা ও পাদরি-পুরোহিতদের মাঝে সীমাবদ্ধ। ফলে এই হুনাফা ও ঈসায়ি ধর্মের পাদরিদের অবস্থা ছিল ঘন অন্ধকার রাতে দু-চারটা জোনাকির মতো, যা এদিক-সেদিক নিভুনিভু করে আলো জ্বেলে রাখলেও গোটা জাযিরাতুল আরব ছিল পৌত্তলিকতা, কুফর ও গাফলতির নিশ্ছিদ্র তমসায় নিমজ্জিত। বরং যদি ইবরাহিমি কিংবা ঈসায়ি ধর্ম তখন বিশুদ্ধরূপে বিদ্যমান থাকত, আল্লাহ তায়ালা আহলে কিতাবকে উপরের আয়াতের কথা কেন বললেন? তিনি তো বললেই পারতেন—তোমরা ইবরাহিমি কিংবা ঈসায়ি দুটোকেই প্রত্যাখ্যান করেছ। ঠিক আছে, এবার মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর ধর্ম গ্রহণ করো।

আল্লাহর ঘর কাবার ভিতর ও চারপাশ জুড়ে কয়েকশো মূর্তি দাঁড়িয়ে ছিল। দুনিয়ার বুকে সর্বপ্রথম ঘর যা আল্লাহর ইবাদতের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, সেখানেই চলছিল পৃথিবীর বুকে সর্বনিকৃষ্ট কাজ শিরক। এমন এক ত্রাহি-ত্রাহি অবস্থায় জন্ম হয়েছিল আবদুল্লাহ ও আমিনার। সামান্য কিছু বছর বাঁচার পরে যৌবনের শুরুতেই, জীবন ও জগতকে ঠিকভাবে উপলব্ধি করার আগেই দুজনে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাদের মৃত্যুর কয়েক দশক পরে নবুওত লাভ করেন। ফলে তাদের আহলে ফাতরাহর অন্তর্ভুক্ত না করে সরাসরি মূর্তিপূজক আখ্যা দিয়ে জাহান্নামি বানানো কুরআনি নুসূস ও বাস্তবতা দুটোকেই প্রত্যাখ্যানের নামান্তর।১০৭৮

আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারেই বলেছেন, ۞ يس ۞ ۞ وَالْقُرْآنِ الْحَكِيمِ ۞ ۞ إِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ ۞ ۞ عَلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ ۞ ۞ تَنزِيلَ الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ ۞ ۞ لِتُنذِرَ قَوْمًا مَّا أُنذِرَ آبَاؤُهُمْ فَهُمْ غَافِلُونَ ۞ অর্থ: ‘ইয়া-সিন। প্রজ্ঞাময় কুরআনের শপথ! নিশ্চয় আপনি প্রেরিত রাসুলগণের একজন। সরল পথে প্রতিষ্ঠিত। কুরআন অবতীর্ণ পরাক্রমশালী পরম দয়ালু আল্লাহর নিকট থেকে, যাতে আপনি এমন এক জাতিকে সতর্ক করেন, যাদের পূর্বপুরুষদের সতর্ক করা হয়নি। ফলে তারা গাফেল।’ [ইয়াসিন: ১-৬] আল্লাহ ۞ أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ ۚ بَلْ هُوَ الْحَقُّ مِن رَّبِّكَ لِتُنذِرَ قَوْمًا مَّا أَتَاهُم مِّن نَّذِيرٍ مِّن قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَهْتَدُونَ ۞ অর্থ: ‘তারা কি বলে এটা সে মিথ্যা রচনা করেছে? বরং এটা আপনার পালনকর্তার তরফ থেকে সত্য, যাতে আপনি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন, যাদের কাছে আপনার পূর্বে কোনো সতর্ককারী আসেনি। সম্ভবত এরা সুপথপ্রাপ্ত হবে।’ [সাজদা : ৩] স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারে বলছেন, তিনি তাদের কাছে রাসুল পাঠাননি ফলে তারা গাফেল। তাদের কাছে কোনো সতর্ককারী আসেনি। অথচ এসব আলেম বিভিন্ন যুক্তিতে তাদের উপর ইবরাহিমি ও ঈসায়ি ধর্ম চাপিয়ে তাদের মুশরিক ও জাহান্নামি ঘোষণা করেছেন!

স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা অন্য জায়গায় এ যুক্তি খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেছেন, তাদের কিতাব দেওয়ার আগে শাস্তি দিলে তারা বলত—হে আল্লাহ, ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কাছে নবি-রাসুল ও কিতাব এসেছে। আমাদের কিতাব না দিয়ে কেন শাস্তি দিয়েছেন? ফলে আল্লাহ কিতাব পাঠানোর মাধ্যমে তাদের উপর ‘হুজ্জত’ সম্পূর্ণ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ۞ وَهَٰذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَকٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ۞ ۞ أَن تَقُولُوا إِنَّময় অَنزِلَ الْكِتَابُ عَلَىٰ طَائِفَتَيْنِ مِن قَبْلِنَا وَإِن كُنَّا عَن دِرَاسَتِهِمْ لَغَافِلِينَ ۞ ۞ أَوْ تَقُولُوا لَوْ أَنَّا أُنزِلَ عَلَيْنَا الْكِتَابُ لَكُنَّا أَهْدَىٰ مِنْهُمْ ۚ فَقَدْ جَاءَكُم بَيِّنَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ ۚ فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن كَذَّبَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَصَدَفَ عَنْهَا ۗ سَنَجْزِي الَّذِينَ يَصْدِفُونَ عَنْ آيَاتِنَا سُوءَ الْعَذَابِ بِمَا كَانُوا يَصْدِفُونَ ۞ অর্থ : ‘এ কিতাব আমি নাযিল করেছি যা কল্যাণময়। সুতরাং এর অনুসরণ করো আর ভয় করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। (আমি এ কিতাব নাযিল করেছি এ জন্য যে) পাছে তোমরা বলা শুরু করো—কিতাব তো নাযিল করা হয়েছিল আমাদের পূর্বের দুটি সম্প্রদায় (ইহুদি ও খ্রিষ্টান)-এর প্রতি। আমরা তার পাঠ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলাম। কিংবা বলতে শুরু করো—যদি আমাদের প্রতি কোনো গ্রন্থ অবতীর্ণ হতো, আমরা এদের চাইতে অধিক পথপ্রাপ্ত হতাম। অতএব, তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সুষ্পষ্ট প্রমাণ, হেদায়াত ও রহমত এসে গেছে। অতঃপর সে ব্যক্তির চাইতে অধিক জালেম কে হবে, যে আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়? অতি সত্বর আমি তাদের শাস্তি দেবো যারা আমার আয়াতসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আমি তাদের সত্যবিমুখতার কারণে তাদের কঠোর শাস্তি দেবো।’ [আনআম : ১৫৫-১৫৭] সুতরাং কিতাব আসার আগে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, যেমন—রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতা, তারা কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে একই যুক্তি পেশ করতে পারবেন খুব সহজেই। কারণ, শাস্তি হবে কিতাব আসার পরেও যারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের। যারা কিতাবই পাননি তাদের শাস্তির কোনো যুক্তি নেই。

প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে সে যুগে মক্কার সবাই কি গাফেল এবং সবাই জান্নাতে যাবে? নাহ্। আহলে ফাতরাহর সবাই জান্নাতে চলে যাবে ব্যাপারটি তেমন নয়। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আমর ইবনে লুহাইর ব্যাপারে জাহান্নামের সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমর বিন লুহাইকে জাহান্নামের মধ্যে তার নাড়িভুঁড়ি টানতে দেখেছি।’১০৭৯ একইভাবে আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ব্যাপারেও জাহান্নামের সাক্ষ্য দিয়েছেন।১০৮০ অথচ তারাও সেই একই যুগের মানুষ। বোঝা গেল, পরকালে পরীক্ষা বা মুক্তি আহলে ফাতরাহর সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। এক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, যাদের কাছে নবিদের দাওয়াত কিংবা কোনো দ্বীনের বিশুদ্ধ পয়গাম পৌঁছেছে এবং ফলে যারা ‘গাফেল’-এর আওতার বাইরে চলে গেছে, দাওয়াত পৌঁছা সত্ত্বেও যারা শিরকের মাঝে ডুবে গেছে, বিভিন্ন উপায়ে শয়তানের পূজা করেছে, তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। বিপরীতে যারা কোনো সত্য ধর্মের অনুসারী হওয়ার সুযোগ না পাওয়াতে স্বাভাবিক ফিতরত ও গাফলতের মাঝে জীবনযাপন করেছে, বিশুদ্ধ তাওহিদের দাওয়াত যেমন পায়নি, তেমনই কোনো শিরকেও লিপ্ত হয়নি, এমন লোকদের কিয়ামতের দিন আল্লাহ পরীক্ষা করবেন এবং পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে ফয়সালা করবেন। সরাসরি জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন না। এ ব্যাপারে পিছনে একাধিক হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে। উপরের লোকদের ব্যাপারে শিরক প্রমাণিত। ফলে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাদের জাহান্নামি ঘোষণা করেছেন। বিপরীতে তাঁর সম্মানিত মাতা-পিতার ব্যাপারে এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না যে, তারা শিরক করতেন, মূর্তিপূজা করতেন। বরং সর্বোচ্চ যতটুকু বোঝা যায়, তারা দ্বীন-ধর্ম সম্পর্কে ফিতরত ও গাফলতের উপর ছিলেন। বরং অসম্ভব নয় যে, শিরক থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তাদেরকে যৌবনের শুরুতেই দুনিয়া থেকে তুলে নিয়েছেন। যারা বলেন, আবদুল্লাহ ও আমিনা যেহেতু মক্কায় ছিলেন, আর মক্কাবাসী মূর্তিপূজা করত, তাই তারাও করতেন—এমন বক্তব্য সঠিক নয়। এটা বিদ্বেষপূর্ণ ও ভিত্তিহীন কথা। পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর শানে গোস্তাখি。

হ্যাঁ, সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে যেসব ইমাম রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতার ব্যাপারে জাহান্নামের কথা বলেছেন, তারা নসের অনুসরণ ও সম্মানের কারণে বলেছেন। ফলে তাদের কথা ভুল কিংবা শুদ্ধ যেটাই হোক, ইজতিহাদের কারণে তারা পুণ্য লাভ করবেন, নিন্দিত হবেন না। আবার যারা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতাকে জান্নাতি বলেছেন, তারাও নসের ভিত্তিতে ইজতিহাদ এবং রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মহব্বত ও সম্মানের খাতিরে বলেছেন। ফলে তাদের কথাও ভুল কিংবা শুদ্ধ যেটাই হোক, তারা পুণ্য লাভ করবেন, নিন্দিত হবেন না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মানুষ রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতাকে জাহান্নামে পাঠানোর ঠিকাদারি নিয়েছেন। বিপরীত পক্ষের আলেমদের গুরুত্বপূর্ণ ইজতিহাদকে তারা ‘শুবাহ’ তথা সংশয় আখ্যা দিয়ে নিজেদের মতামতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করছেন। কোনো শরয়ি নস ছাড়া কেবল অনুমানের উপর ভিত্তি করে তাদের কাফের-মুশরিক আখ্যা দিচ্ছেন। অথচ কুরআন-সুন্নাহর কোথাও তাদের সরাসরি কাফের-মুশরিক বলা হয়নি। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর চাচা আবু তালিব নবুওতের প্রায় এক দশক পরে ইন্তেকাল করেন। দীর্ঘ দশ বছর রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে নবি হিসেবে দেখেন। তাঁর দাওয়াতের কাজে ইখলাস ও ফিদা দেখে তাকে সাহায্য করেন। অথচ নিজে ঈমান আনেননি। এমনকি আবু তালিব যখন মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে, সেই মুমূর্ষু অবস্থাতেও রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাকে ঈমানের দাওয়াত দেন, কালিমা পড়তে বলেন। কিন্তু আবু তালিব প্রত্যাখ্যান করেন। এতকিছুর পরও মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি আবু তালিবের মহব্বত ও ভালোবাসার কারণে আল্লাহ তার শাস্তি লঘু করে দেবেন। ফলে জাহান্নামে সবার চেয়ে কম শাস্তি হবে আবু তালিবের।১০৮১

তাহলে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতার কী দোষ? বাবা আবদুল্লাহ তো তাঁর জন্মের আগেই মারা গেলেন। মাতা আমিনা মৃত্যুবরণ করলেন ছয় বছর বয়সে। তারা হয়তো কখনো কল্পনাও করার সুযোগ পাননি—আল্লাহ নতুন দ্বীন পাঠাবেন। তিনি গর্ভে থাকাকালীন মাতা আমিনা অনেক আশ্চর্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। পেট থেকে নূর বের হতে দেখেছেন।১০৮২ কিন্তু তিনি কি কখনো বুঝতে পেরেছেন তাঁর সন্তান একদিন নবি হবেন? বিশ্বজাহানের সর্দার হবেন? হয়তো বোঝেননি। বুঝলেও কিছু করার সুযোগ তাঁর ছিল না। দ্বীনে ইবরাহিমি পুরোপুরি বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। মূর্তিপূজার ভিড়ে সত্যকে খুঁজে বের করার সুযোগই পাননি আবদুল্লাহ। আমিনা তো ছিলেন ঘরের ভিতরে। হুনাফা কিংবা খ্রিষ্টানদের কাছে গিয়ে সত্য দ্বীন পরখ করার সুযোগ কোথায় তাঁর? উপরন্তু, তারা মূর্তিপূজা করতেন—এমন কোনো প্রমাণও নেই আমাদের কাছে। এর পরও তাদের জাহান্নামে পাঠানোর জন্য এত আগ্রহ কেন?

হ্যাঁ, একদিকে সনদ বিশুদ্ধ এমন একাধিক হাদিসে রাসুলুল্লাহর পিতা জাহান্নামে থাকার কথা বলা হয়েছে এবং মাতা আমিনার জন্য ইস্তিগফার নিষেধ করা হয়েছে, অপরদিকে তাদের ‘আহলে ফাতরাহ’ হওয়া সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত, আর আহলে ফাতরাহদের জাহান্নামি সাব্যস্ত করা কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। উপরন্তু উভয় পক্ষে পরবর্তী আলেমদের বক্তব্য থাকলেও আমাদের প্রাচীন ইমামদের এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য নেই, বিশেষত ইমাম আবু হানিফা, মালেক, শাফেয়ি ও আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. থেকে এ ব্যাপারে কথা বলার সুনিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই, অথচ তারা এসব হাদিস জানতেন না কিংবা এ ব্যাপারে কুরআন-হাদিসের আপাত সাংঘর্ষিক অবস্থান বুঝতেন না এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বোঝা গেল, এ ব্যাপারে আমাদের প্রথম যুগের ইমামগণ ইচ্ছাকৃতভাবেই নীরব থাকাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এমনকি পরবর্তী ইমামদের মাঝে ইমাম নববিও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত রাসুলুল্লাহর ‘পিতা’ জাহান্নামে-সংক্রান্ত হাদিসটি খুবই সংক্ষিপ্ত ও বাহ্যিক অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর পিতার পরিণতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য দেননি। খুব সম্ভবত তিনিও এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকাকে অগ্রাধিকার দিতেন।১০৮৩

আল্লামা আহমদ হামাভি (১০৯৮ হি.) ‘আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের’-এর ব্যাখ্যায় লিখেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমাদের সাহাবাদের ব্যাপারে মন্দ কথা বলতে নিষেধ করেছেন। ফলে রাসুলুল্লাহর মাতা-পিতার ব্যাপারে এমন কিছু বলা থেকে বিরত থাকা আরও বেশি জরুরি। তা ছাড়া, এটা আকিদার জরুরি কোনো বিষয় নয়। ফলে এ বিষয়ে কথা বলা থেকে মুখে লাগাম দেওয়া আবশ্যক।’১০৮৪ ইবনে আবিদিন শামি লিখেন, ‘সেকালে মক্কার একদল লোক আহলে ফাতরাহর অন্তর্ভুক্ত হয়ে ‘গাফেল’ অবস্থায় ছিলেন [শিরক করেননি, ঈমানও আনেননি]। আরেক দল আকলের মাধ্যমে হেদায়াত পেয়েছিলেন [হুনাফা]। সুতরাং আল্লাহর অনুগ্রহে আমাদের সুধারণা হলো, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতা উপরের দুই প্রকারের যেকোনো দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন [ফলে জাহান্নাম থেকে নাজাত পেতে পারেন]। ...মোটকথা, এটা এমন মাসআলা, যেটা নিয়ে কথা বলার সময় অত্যন্ত আদবের সঙ্গে বলা উচিত [যাতে রাসুলুল্লাহর প্রতি বেয়াদবি না হয়]। উপরন্তু এটা এমন কোনো মাসআলা নয়, যা না জানলে ক্ষতি হবে কিংবা যে সম্পর্কে কবরে বা হাশরের মাঠে প্রশ্ন করা হবে। ফলে হয় এ ব্যাপারে উত্তম কথা বলতে হবে, নয়তো চুপ থাকতে হবে।’১০৮৫

তাই আহলে সুন্নাতের অনুসারী প্রত্যেক আল্লাহভীরু ও রাসুলপ্রেমী মুসলিমের কর্তব্য হলো, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সম্মানিত মাতা-পিতার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কিংবা জবান-দরাজি দুটো থেকেই বিরত থাকা। অতিভক্তি কিংবা গোস্তাখি দুটোই বর্জনপূর্বক তাদের আখেরাতের পরিণতের ব্যাপারে নীরব-নিরপেক্ষ থাকা। মুমিন-কাফের, জান্নাতি-জাহান্নামি কোনোটা না বানিয়ে এগুলো বরং আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়া। তিনি নিশ্চয়ই কাউকে একবিন্দু জুলুম করবেন না। তাঁর প্রিয় বন্ধু রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাতা-পিতার প্রতি তিনি ইনসাফ করবেন। পরকালে রাসুলুল্লাহকে সম্পূর্ণ ও সর্বোচ্চ সন্তুষ্ট করবেন—এটা তো সুনিশ্চিত। ফলে এ ব্যাপারে মনস্তাপে ভোগার কিছু নেই।

টিকাঃ
১০৭৭. দালায়েলুন নুবুওয়াহ, বাইহাকি (১/১৯২)।
১০৭৮. আযিমাবাদি তাঁর আউনুল মাবুদে নববির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ‘তাদের কাছে ইবরাহিম ও অন্যান্য নবীর দাওয়াত পৌঁছেছে’ (১২/৩২৩)। এটা ভিত্তিহীন বক্তব্য। নবিজির বাবা-মায়ের ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে সিরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থগুলো একেবারেই নীরব। তা ছাড়া, মক্কাতে প্রকৃত ইবরাহিমি কিংবা ঈসায়ি ধর্মের অবশিষ্ট ছিটেফোঁটা সম্পর্কে অবগত লোকের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা দু-একজন। সামগ্রিকভাবে ইবরাহিমি কিংবা ঈসায়ি ধর্ম বলতে যা ছিল সেগুলো কোনো আসমানি ধর্ম ছিল না; বরং বিকৃত, মূর্তিপূজা ও কুফর-শিরকে ভরা সেসব ধর্মের খোলস এবং কিছু আচার-অনুষ্ঠান ছিল। এটাকে আসমানি ধর্মের দাওয়াত পৌঁছেছে বলে চালিয়ে দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।
১০৭৯. বুখারি (কিতাবুল মানাকিব: ৩৫২১)। মুসলিম (কিতাবুল জান্নাহ: ২৮৫৬)।
১০৮০. বুখারি (কিতাবুল মানাকিব : ৩৫২১; কিতাবু মানাকিবিল আনসার: ৩৮৮৩)। মুসলিম (কিতাবুল জান্নাহ : ২৮৫৬; কিতাবুল ঈমান ২০৯)।
১০৮১. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ২১৪)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল বির ওয়াল ইহসান: ৩৩০)। শিয়া-সহ একদল সুফি সম্প্রদায় ‘আবু তালিবও মুমিন হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন।’- এমন বিশ্বাস রাখে। কিন্তু সেটা প্রমাণিত নয়। এ ব্যাপারে তারা যেসব বর্ণনা পেশ করে সেগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। আবু তালিবের কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণের বিষয়টি কুরআন ও বিশুদ্ধ সুন্নাহ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। বিপরীতে মাতা-পিতার বিষয়টি অস্পষ্ট।
১০৮২. মুসান্নাফে আবদির রাযযাক (কিতাবুল মাগাযি: ৯৭১৮)। মুসনাদে তয়ালেসি (আহাদিসু আবি উমামা বাহেলি : ১২৩৬)। মুসনাদে দারেমি (মুকাদ্দিমাতুল মুআল্লিফ: ১৩)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুশ শামিয়্যিন : ১৭৪২৫)।
১০৮৩. শরহে মুসলিম, নববি (৩/৭৯)।
১০৮৪. গামযু উয়নিল বাসায়ের (৩/২৪১)।
১০৮৫. রদ্দুল মুহতার (৩/১৮৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00