📄 রাসূলুল্লাহ (সা.) কি নুরের তৈরি?
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মাটির তৈরি মানুষ ছিলেন; নূরের তৈরি নয়। মানুষ হওয়ার দিক থেকে তিনি অন্যান্য মানুষের মতো। সকল মানুষ যেমন পিতার ঔরসে মাতার গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করে, রাসুলুল্লাহও তেমন সাইয়েদ আবদুল্লাহর ঔরসে সাইয়েদা আমিনার গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করেন। কুরআন বলেছে ۞ قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ ۞ অর্থ : ‘আপনি বলুন, আমি তোমাদের মতোই মানুষ।’ [কাহাফ : ১১০] অন্য আয়াতে কাফেররা যখন নবিজির প্রতি ঈমান আনার জন্য আকাশে আরোহণের শর্ত দেয়, আল্লাহ আয়াত অবতীর্ণ করেন ۞ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّى هَلْ كُنْتُ إِلَّا بَشَرًا رَّسُوْلًا ۞ অর্থ : ‘আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক পবিত্র। আমি তো একজন মানব রাসুল।’ [ইসরা: ৯৩] অর্থাৎ, আমার কাজ আকাশে চড়া নয়। আমি তোমাদের মতো মানুষ। ফলে আমার কাছে এমন কিছু চেয়ো না, যা মানুষের কাজ নয়। মোটকথা, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মানুষ ছিলেন এটা সুস্পষ্ট ও সন্দেহাতীত বাস্তবতা। তাঁর শরীর রক্ত-মাংস ও হাড়ের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। তিনি কষ্ট পেতেন, খুশি হতেন, কাঁদতেন, ক্ষুধা অনুভব করতেন, ব্যথা পেতেন, আহত হতেন, পানাহার করতেন, শারীরিক ও প্রাকৃতিক চাহিদা পূর্ণ করতেন, অসুস্থ হতেন। বরং অসুস্থতার মুখেই তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন।
মানবিক দুর্বলতার কারণে তিনি (ওহি ব্যতীত) বিভিন্ন বিষয় ভুলে যেতেন, যেভাবে মানুষ ভুলে যায়। একটি হাদিসে স্বয়ং তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের মতোই মানুষ। তোমরা যেমন ভুলে যাও, আমিও ভুলে যাই। সুতরাং আমি যখন ভুলে যাব, আমাকে স্মরণ করিয়ে দেবে।’১০২৯ আয়েশা রাযি. বলেন, ‘রাসুল মানুষের মাঝে একজন মানুষ ছিলেন। তিনি তার জামাকাপড় ধৌত করতেন, দুধ দোহন করতেন, নিজের কাজ নিজে করতেন।’১০৩০ এটা রাসুলুল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর সাক্ষ্য। কিন্তু একদল মানুষ এগুলো পছন্দ করে না। খ্রিষ্টানরা যেমন ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহর মানবিক রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে আসা অবতার কল্পনা করেছে, একদল মুসলিমও সরাসরি অবতার বলার সাহস না পেয়ে রাসুলুল্লাহকে আল্লাহর নূর থেকে তৈরি অতিমানবিক এক সৃষ্টি কল্পনা করেছে।
টিকাঃ
১০২৯. বুখারি (কিতাবুস সালাত: ৪০১)। মুসলিম (কিতাবুল মাসাজিদ: ৫৭২)।
১০৩০. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আয়িশাহ: ২৬৮৩৫)। সহিহ ইবনে হিব্বান (কিতাবুল হাযার ওয়াল ইবাহাহ : ৫৬৭৫)।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা.) মানুষ ছিলেন; কিন্তু আমাদের মতো মানুষ নন
হ্যাঁ, এর মানে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) মানবিক দিক থেকে আমাদের মতো হলেও সকল দিক থেকে আমাদের মতো নন; বরং তিনি একাধিক এমন বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিলেন, যেসব আমাদের নেই। তিনি গুনাহ থেকে পবিত্র ছিলেন। তাঁর বুক চিরে হৃদয় ধুয়ে পবিত্র করে দেওয়া হয়েছিল।১০৩১ পাথর তাঁকে সালাম দিত এবং তিনি সেটা শুনতেন। তিনি ফেরেশতাদের দেখতেন। বরং তিনি পিছনে না ফিরেও পিছন দিকে দেখতে পেতেন।১০৩২ শুকনো কাঠ তাঁর জন্য কাঁদত।১০৩৩ তিনি হাত দিয়ে কিছু স্পর্শ করলেই সেটা বরকতপূর্ণ হয়ে উঠত। দুধবিহীন বকরির শরীর স্পর্শ করতেই সেটা দুধেল হয়ে উঠত।১০৩৪
তিনি আকাশ ও মাটির এমন অনেককিছু দেখতে ও শুনতে পেতেন, যেসব অন্যরা দেখে না বা শোনে না। যেমন—তিনি এক হাদিসে বলেন, ‘আমি যা দেখি, তোমরা তা দেখো না। আমি যা শুনি, তোমরা তা শোনো না। আকাশ কড়কড় করছে আর কড়কড় করাই তার সাজে। (আকাশে) একবিন্দু জায়গা খালি নেই, যেখানে কোনো-না-কোনো ফেরেশতা আল্লাহর জন্য সিজদায় লুটিয়ে পড়ে না আছে। আল্লাহর শপথ! আমি যা জানি, তোমরা তা জানলে কম হাসতে বেশি কাঁদতে। বিছানায় স্ত্রী সম্ভোগ করতে না। বরং কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর জন্য পথে-প্রান্তরে বেরিয়ে পড়তে।’১০৩৫ আল্লাহর রাসুলের চোখ ঘুমাত; কিন্তু তাঁর হৃদয় ঘুমাত না।১০৩৬
তাঁর ঘাম পবিত্র ও সুরভিত ছিল। একইভাবে তাঁর শরীরের গন্ধও সুবাসিত ও সুনির্মল ছিল। এ কারণে সাহাবাগণ তাঁর শরীরের ঘাম সংগ্রহ করতেন। তারা সাক্ষ্য দিয়েছেন রাসুলুল্লাহর শরীরের গন্ধ আতর ও মেশকের চেয়েও সুরভিত ছিল। তিনি কোনো রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে মানুষ ঘ্রাণে বুঝে ফেলত রাসুলুল্লাহ এ পথ দিয়ে গিয়েছেন! তাঁর শরীর রেশমের চেয়েও কোমল ও পেলব ছিল।১০৩৭ তাঁর ওজুর পানি, থুথু, চুল ইত্যাদি বরকতময় ছিল। সাহাবায়ে কেরাম সেগুলো সংগ্রহের জন্য প্রতিযোগিতা করতেন।১০৩৮
ফলে তিনি মানুষ হয়েও সাধারণ মানুষের মতো ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন মহামানব। এক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে থাকতে হলে কুরআন ও বিশুদ্ধ সুন্নাহ সালাফে সালেহিনের মানহাজের আলোকে মানার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে যারা সবচেয়ে বেশি বাড়াবাড়িতে লিপ্ত, কুরআন-হাদিস দিয়ে তারাই সবচেয়ে বেশি দলিল পেশ করার দাবিদার। অথচ তারা কুরআন-সুন্নাহর নামে যা পেশ করছে, সেগুলোর অধিকাংশই কুরআন-সুন্নাহর নিরেট অপব্যাখ্যা। ফলে কেউ সুন্নাহর রেফারেন্স দিলেই তার কথা শোনা যাবে না। বরং এ ব্যাপারে সালাফে সালেহিন এবং মুসলিম উম্মাহর প্রথম যুগের সম্মানিত ইমামগণের কী আকিদা, সেটা জেনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আবশ্যক। কারণ, রাসুলুল্লাহর (ﷺ) ভালোবাসা ও অনুসরণের ক্ষেত্রে তারাই এ উম্মাহর সর্বাপেক্ষা ভারসাম্যপূর্ণ, মধ্যমপন্থি ও আদর্শ প্রজন্ম।
টিকাঃ
১০৩১. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ১৬২)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আনস ইবনে মালেক: ১৪২৮৫)।
১০৩২. বুখারি (কিতাবুল আযান: ৭১৮)। মুসলিম (কিতাবুস সালাত : ৪২৩)।
১০৩৩. বুখারি (কিতাবুত তারিখ: ৯১৮)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুল ইকামাতিস সালাত : ১৪১৭)।
১০৩৪. মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুল হিজরাহ: ৪২৯৭)। আল-মুজামুল কাবির (হুবাইশ ইবনে খালেদ : ৩৬০৫)।
১০৩৫. তিরমিযি (আবওয়াবুয যুহদ: ২৩১২)। ইবনে মাজা (আবওয়াবুয যুহদ: ৪১৯০)।
১০৩৬. বুখারি (কিতাবুল মানাকিব: ৩৫৬৯)। সুনানে কুবরা, বাইহাকি (কিতাবুন নিকাহ: ১৩৫১৮)।
১০৩৭. বুখারি (কিতাবুস সাওম: ১৯৭৩)। মুসলিম (কিতাবুল ফাযায়েল: ২৩৩০, ২৩৩১)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদে আনাস ইবনে মালেক: ১৩৫১৪)।
১০৩৮. বুখারি (কিতাবুশ শুরুত: ২৭৩১) (কিতাবুল ওযু: ১৯৪)। মুসনাদে আহমদ (আউয়ালু মুসনাদিল কুফিয়্যিন: ১৯২৩১)।