📄 নবি ওলির চেয়ে শ্রেষ্ঠ
ওলি হলেন সাধারণ মুমিন, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং আমলের ক্ষেত্রে অগ্রবর্তী থাকেন। শিরক ও অন্যায়-অশ্লীলতা থেকে দূরে অবস্থান করেন। আল্লাহর অবাধ্যতা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। ইবাদত ও বন্দেগিতে ব্যাপৃত থাকেন। আল্লাহর অনুগ্রহে নেক কাজে আগে থাকেন। হ্যাঁ, তাদের থেকে ভুলভ্রান্তি হওয়া অসম্ভব নয়। ফলে কখনো কখনো আমলে ত্রুটিবিচ্যুতির শিকার হন। পুণ্যের সঙ্গে পাপ মিশ্রিত করে ফেলেন। কেউ কখনো কখনো নিজের উপর জুলুম করে ফেলেন। অতঃপর আবার তাওবা করেন। ফলে গুনাহ সত্ত্বেও আল্লাহর প্রতি ঈমান, আনুগত্য ও নিবেদনের কারণে তারা আল্লাহর ওলি তথা বন্ধু, প্রিয় পাত্র।৯৯৭
অতীতের কিছু বিভ্রান্ত সম্প্রদায় এবং বিভ্রান্ত সুফি নবিদের চেয়ে ওলিদের শ্রেষ্ঠ মনে করেছে। তাদের ধারণা ছিল, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই নবুওতের সমাপ্তি ঘটে, বেলায়াতের সমাপ্তি ঘটে না। সুতরাং ওলি নবির চেয়ে উত্তম। অথচ তারা এটা বোঝেনি যে, যিনি নবি তিনি বড় ওলিও। ফলে ওলি নবির চেয়ে শ্রেষ্ঠ হবে তো দূরের কথা, একজন নবি জগতের সকল ওলির চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তা ছাড়া, নবুওত মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। বরং স্রেফ তাবলিগের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। নবুওতের মর্যাদা কবর, পরকাল, কিয়ামত, হাশর-নাশর, পুলসিরাত এমনকি জান্নাতেও অব্যাহত থাকবে।৯৯৮
এ ধরনের বিভ্রান্তি অনেক আগ থেকেই চলে এসেছে। এ জন্য ইমাম তহাবি রহ.-কে বলতে হয়েছে, ‘আমরা কোনো ওলিকে নবির চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করি না। বরং আমরা বলি, মাত্র একজন নবি সকল ওলির চেয়ে শ্রেষ্ঠ।’৯৯৯ আবু হাফস লিখেন, ‘নবিগণের মর্যাদা ওলিগণের মর্যাদার চেয়ে ঊর্ধ্বে। যে ব্যক্তি নবিদের চেয়ে ওলিদের শ্রেষ্ঠ মনে করবে, সে বিদআতি কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায়ভুক্ত গণ্য হবে। এটা সাধারণ যুক্তিতেও বোঝা যায়। নবিগণ বেলায়াতের দরজা লাভ করার পরেই নবুওতপ্রাপ্ত হন। একইভাবে ওলিরা বেলায়াতের মর্যাদা নবিগণের অনুসরণের ফলেই লাভ করেন।’১০০০
আবদুল কাহের বাগদাদি (৪২৯ হি.) লিখেন, ‘কাররামিয়্যাহদের একটি দল মনে করেছে, ওলি নবির চেয়ে উত্তম। বরং তাদের জাহেল অনুসারীরা ইবনে কাররামকে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদসহ অনেক সাহাবির চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করেছে। রাফেযিরা নবিদের চেয়ে তাদের ইমামদের শ্রেষ্ঠ মনে করে। কিন্তু আহলে হকের আকিদা হলো, প্রত্যেক নবি ফেরেশতাদের চেয়ে উত্তম। সুতরাং মানুষের চেয়ে তো আরও বেশি উত্তম। ১০০১
নবির চেয়ে ওলির শ্রেষ্ঠ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ নবি মাসুম; ওলি মাসুম নন। নবিগণের জীবনের শেষ পরিণতি নিশ্চিতভাবে ঈমান, ইখলাস ও তাকওয়ার উপর। ওলিদের জন্য এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। নবিদের কাছে ওহি আসে, ওলিদের কাছে আসে না। নবি ফেরেশতাদের দেখতে পান, ওলি দেখে না। নবিগণ সৃষ্টির সকল সুন্দর গুণ এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী। ওলিদের জন্য এত পূর্ণাঙ্গ কামালত নেই। ফলে কাররামিয়্যাহ ও রাফেযিদের বক্তব্য সুস্পষ্ট অজ্ঞতা ও গোমরাহি।
একদল সুফি থেকেও এ ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়। বিশেষত ইবনে আরাবির সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক বক্তব্য বিভিন্ন গ্রন্থে বিদ্যমান। আলুসি সেসব বক্তব্য ব্যাখ্যা করেন। আলি কারি মনে করেন, এগুলো ইবনে আরাবির উপর অপবাদ। তিনি নবিদের চেয়ে সাধারণ ওলিদের শ্রেষ্ঠ বলতে পারেন না।১০০২
কোনো বিশেষ সুফি এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন কি না সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু একদল সুফি যে এ ধরনের ধারণা করত, ফলে সুফি সম্প্রদায়ের মাঝে এমন বিশ্বাস প্রচলিত ছিল, সেটা স্পষ্ট ও সন্দেহাতীত দুঃখজনক বাস্তবতা। প্রখ্যাত সুফি শায়খ আল্লামা রুকনুদ্দিন সমরকন্দি হানাফি (৭০১ হি.) বলেন, ‘একজন ওলি যত চেষ্টা করুক, বেলায়াতের যত উঁচু পর্যায়ে উন্নীত হোক, কখনোই একজন নবির মর্যাদায় পৌঁছতে পারবে না। বিপরীতে একদল মূর্খ সুফি এক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হয়েছে। তারা ওলিকে নবির চেয়ে ঊর্ধ্বে মনে করেছে। অথচ আমাদের মাশায়েখের বক্তব্য হলো, সিদ্দিকিনের মঞ্জিল যেখানে শেষ, নবিদের সেখান থেকে শুরু। তা ছাড়া, ওলিদের বেলায়াতের ভিত্তিই হলো নবিদের অনুসরণ। ১০০৩
তাসাওউফের নামে যুগে যুগে এমন অনেক ভ্রান্তির চাষাবাদ করেছে এক শ্রেণির মানুষ। তেমন আরেকটি বিভ্রান্তি হলো এমন বিশ্বাস রাখা যে, বেলায়াতের উচ্চমার্গে পৌঁছে গেলে ইবাদতের দায়িত্ব রহিত হয়ে যায়। অথচ বাস্তব কথা হলো, ওলির মর্তবা যত উচুঁই হোক, তার উপর আরোপিত ফরয ইবাদতগুলো কখনো রহিত হয় না। বরং যে বেলায়াতের যত উচ্চতায় পৌঁছে যায়, তাঁর ইবাদত ও বন্দেগি তত বৃদ্ধি পায়। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন এর জীবন্ত উদাহরণ। ফলে যে ব্যক্তি এমন মনে করবে যে, ওলি হয়ে হাকিকতের দরজায় পৌঁছে গেলে শরিয়তের বিধিবিধান তার উপর থেকে রহিত হয়ে যায়, সে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট। কাসানি লিখেন, ‘এমন ব্যক্তি কাফের ও মুলহিদ। এটা তো নবিদের বেলাতেই হয় না। তাহলে ওলির বেলায় কীভাবে হবে?’১০০৪
টিকাঃ
৯৯৭. তালখিসুল আদিল্লাহ (৮১০)।
৯৯৮. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২৪১)।
৯৯৯. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (৩০-৩১)।
১০০০. আস-সাওয়াদুল আজম (২৭)।
১০০১. উসুলুদ্দিন, বাগদাদি (১৬৭)।
১০০২. দেখুন : শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (১১০)।
১০০৩. দেখুন: আকিদাহ রুকনিয়্যাহ (৩৮)।
১০০৪. দেখুন: আল-মুতামাদ ফিল মুতাকাদ (১০-১১)। উসুলুদ্দিন, গযনবি (১৬৩-১৬৪)।