📄 মুজিযা ও কারামতের মাঝে পার্থক্য
সালাফে সালেহিন এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দেননি। যেমন—ইমাম আবু হানিফা মুজিযা ও কারামতের কথা বললেও দুটোর মাঝে পার্থক্যের কথা বলেননি। কারণ, তারা দুটোর মাঝের প্রকৃতিকে ভিত্তি ধরে পার্থক্য করতেন। অর্থাৎ, অলৌকিক ঘটনা যদি নবির হাতে ঘটে তবে সেটা মুজিযা, আর ওলির হাতে ঘটলে কারামত। এর বাইরে কিছু নয়। তা ছাড়া, ওলির হাতে কারামতের প্রকাশ মূলত নবির মুজিযার অংশ। কারণ, নবির অনুসরণের ভিত্তিতেই সে ওলি এবং সে কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত সম্মান (কারামতের) উপযুক্ত হয়েছে।৯৯১
তবে পরবর্তী আলেমগণ দুটোর মাঝে বিভিন্ন পার্থক্য টেনেছেন। যথা:
* নবি মুজিযা প্রকাশ করেন তাঁর নবুওত প্রমাণ করতে। বিপরীতে ওলি যদি নবুওতের দাবি করে, উলটো সে কাফের হয়ে যাবে। কারামতের সঙ্গে কোনো দাবি প্রমাণের সম্পর্ক নেই। বরং কারামতের মাধ্যমে যদি কেউ বেলায়াত (ওলিত্ব) প্রমাণের দাবি করে, তার বেলায়াতও নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ, বেলায়াতের সঙ্গে কারামতের সম্পর্ক নেই। বেলায়াত দাবি-দাওয়ার বিষয় নয়।
* নবি-রাসুলগণ মুজিযা প্রকাশ করতে আদিষ্ট। অর্থাৎ, তাদের হাতে মুজিযা সংঘটিত হয় মূলত মানুষকে প্রভাবিত করতে, ইসলামে প্রবেশ করাতে। ফলে তারা মুজিযা প্রকাশে আদিষ্ট। বিপরীতে ওলির কর্তব্য হলো কারামত যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখা, প্রকাশ না করা।
* নবি আল্লাহর ইচ্ছায় যখন খুশি মুজিযা প্রকাশ করতে পারেন। অর্থাৎ, তিনি মুজিযার প্রয়োজন হলে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, আল্লাহ তাঁর হাতে মুজিযা প্রকাশ করেন। বিপরীতে ওলির এ ধরনের কোনো ক্ষমতা নেই। বরং আল্লাহ যখন চান বিশেষ সময়ে ওলির হাতে কারামত প্রকাশ করতে পারেন, আবার নিয়ে নিতে পারেন। এ ব্যাপারে ওলির কোনো স্বাধীনতা থাকে না।
* নবিদের হাতে প্রকাশিত মুজিযা কখনো ‘ইসতিদরাজ’ (মন্দ) হতে পারে না। বিপরীতে ওলির সবসময় আতঙ্কিত থাকতে হয় তার হাতে প্রকাশিত কারামত ইসতিদরাজ হয়ে যায় কি না।
* মুজিযা ও কারামতের আরেকটি পার্থক্য হলো, মুজিযা নবিদের হাতে কাফেরদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রকাশ পায়। আর কারামত হলো যেটা সাধারণ মানুষের হাতে প্রকাশ পায় এবং তাতে কাফেরদের প্রতি কোনো চ্যালেঞ্জ থাকে না।৯৯২
টিকাঃ
৯৯১. দেখুন: আকিদাহ রুকনিয়্যাহ (৩৩)।
৯৯২. দেখুন: তাবসিরাতুল আদিল্লাহ (২/৭৭৭)। বাহরুল কালাম (১৯৮-১৯৯)। শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৬৯)।
📄 কারামত কামালত নয়
আবু আলি জুযজানি বলেন, ‘ইস্তিকামাতের অন্বেষণকারী হও; কারামতের অন্বেষণকারী হয়ো না। কেননা, কারামত তোমার নফস চাচ্ছে। অথচ তোমার রব তোমার কাছে ইস্তিকামাত (দ্বীনের উপর অবিচলতা) চাচ্ছেন।’ শায়খ সোহরাওয়ার্দী এ ব্যাপারে লম্বা কথা বলেছেন। তাঁর কথার সারমর্ম হলো, ‘কারামত কামালত নয়’—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। সুলুকের পথের অনেক লোক এটা থেকে গাফেল। ফলে তারা যখন সালাফে সালেহিনের জীবনীর মাঝে বিভিন্ন কারামত ও অলৌকিক ঘটনাসমূহ পড়ে, তখন তাদের নফসও সেটা পাওয়ার জন্য লালায়িত হতে থাকে। বরং অনেক সময় না পেলে ভগ্নমনোরথ হয়ে পড়ে, কষ্ট পায়। কাশফ-কারামত না এলে নিজের আধ্যাত্মিকতা নিয়ে সন্দেহ করা শুরু করে। অথচ তারা বাস্তবতা বুঝলে এত কষ্ট পেত না। কারণ, আল্লাহ তায়ালা অনেক সময় তার কোনো কোনো বান্দার উপর এ কারণে কারামতের দরজা খুলে দেন, যাতে সেগুলো দেখে তার ইয়াকিন বৃদ্ধি পায়, যুহদের প্রতি মনোযোগ বাড়ে, প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হয়। বিপরীতে আল্লাহ তায়ালা কিছু বান্দার মাঝে ইয়াকিন ঢেলে দেন। ফলে তার অলৌকিক কিছুর প্রয়োজন পড়ে না। কেননা, উদ্দেশ্য হলো ইয়াকিন হাসিল হওয়া। সেটা কারামত ছাড়াই অর্জিত হয়ে গিয়েছে। সুতরাং কারামত এখানে নিষ্প্রয়োজন। বরং এক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থা প্রথম অবস্থার চেয়ে উত্তম ও অধিকতর পূর্ণাঙ্গ। কারণ, প্রথম অবস্থায় ইয়াকিনের জন্য চোখের দেখার প্রয়োজন হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থায় চোখের দেখা ছাড়াই ইয়াকিন তৈরি হয়ে গিয়েছে। সুতরাং সবসময় নফসকে ইস্তিকামাতের উপর অটল রাখা চাই। এটাই আসল কারামত।৯৯৩
টিকাঃ
৯৯৩. দেখুন: আওয়ারিফুল মাআরিফ, সোহরাওয়ার্দি (৪২-৪৩)।
📄 সব কারামত কারামত নয় (ইস্তিদরাজ)
‘ইস্তিদরাজ’ হলো গুনাহগার ও কাফেরদের হাতে ঘটা অলৌকিক ঘটনা। যেমন—শয়তান মুহূর্তের মাঝে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারে। সে মানুষের শরীরের ভিতরে প্রবেশ করে রগ ও ধমনিতে চলতে পারে! একইভাবে ফিরাউনের নীল নদের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল, কিয়ামতের আগে দাজ্জালের হাতে বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা ঘটবে—এগুলো মুজিযা বা কারামত নয়। বরং এগুলোকে বলা হয় সুযোগ প্রদান, ঢিল দেওয়া, সময় দিয়ে পাকড়াও করা। ইমাম আজম বলেন, “...তবে ইবলিস, ফিরাউন এবং দাজ্জালের মতো আল্লাহর দুশমনদের হাতে যেসব আশ্চর্যজনক বিষয় সংঘটিত হয়, সেগুলোকে আমরা মুজিযা বা কারামত বলি না। সেগুলোকে আমরা বলি ‘প্রয়োজন পূরণ।’ কেননা, আল্লাহ তায়ালা অনেক সময় তাদের পৃথিবীতে অবকাশ এবং আখেরাতে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের অনেক প্রয়োজন পূরণ করেন ‘ইস্তিদরাজ’ হিসেবে। তখন তারা ধোঁকায় পড়ে যায়। তাদের অবাধ্যতা ও কুফরি আরও বৃদ্ধি পায়। এ কারণে তাদের হাতে আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে থাকে।”৯৯৪
কুরআন সুন্নাহতে এর দলিল রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ ۞ অর্থ: ‘যারা আমার আয়াতসমূহ মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, তাদের আমি ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে, তারা বুঝতেই পারবে না।’ [আরাফ: ১৮২] অর্থাৎ, অন্যায় ও অপরাধ করা সত্ত্বেও, আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের বিরোধিতা সত্ত্বেও শাস্তি বা পরীক্ষা না করে উলটো সুখ ও স্বচ্ছলতা দান করা, মৌজ-মাস্তিতে কিছুদিন জীবনযাপনের সুযোগ দেওয়া। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতে এবং আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে থাকে। অথচ আল্লাহ তাকে দ্বীন ও পারলৌকিক কল্যাণ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন—এটা অনুভবই করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা এভাবে একসময় উপরে ওঠাতে ওঠাতে হঠাৎ নিচে ছুড়ে ফেলেন। তখন আফসোস করেও লাভ হয় না।
۞ فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّىٰ إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُبْلِسُونَ ۞ অর্থ : ‘তাদের যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তারা যখন সেটা ভুলে গেল, তখন আমি তাদের সামনে সবকিছুর দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম। অবশেষে তারা নিজেদের প্রাপ্তি নিয়ে যখন উল্লসিত হয়ে পড়ল, তখন আমি অকস্মাৎ তাদের পাকড়াও করলাম। তখন তারা ব্যর্থমনোরথ হয়ে গেল।’ [আনআম : ৪৪] এটাও ‘ইসতিদরাজ’-এর বহিঃপ্রকাশ।
একটি হাদিসেও ইস্তিদরাজের কথা পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও সুখে-শান্তিতে দেখবে, বুঝে নেবে, আল্লাহ তাকে সাময়িক ছাড় দিচ্ছেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কুরআনের উপর্যুক্ত আয়াত তেলাওয়াত করেন।’৯৯৫
টিকাঃ
৯৯৪. আল-ফিকহুল আকবার (৫-৬)।
৯৯৫. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুশ শামিয়্যিন: ১৭৫৮৪)। আল মুজামুল কাবির, তাবারানি (উকবা ইবনে আমের : ১৭/৩৩১; হাদিস নং ৯১৩)।
📄 মুমিনের অন্তর্দৃষ্টি (ফিরাসাত)
‘ফিরাসাত’ শব্দের অর্থ হলো দূরদৃষ্টি, অন্তর্দৃষ্টি। অর্থাৎ, খালি চোখে যা দেখা যায় না হৃদয়ের চোখে সেটা দেখা। মানুষের বাহ্যিক অবস্থা দেখে ভিতরের অনেক খবর বলে দিতে পারা। এটা ওহি বা ইলহাম নয়, ইলমুল গায়েব তথা অদৃশ্যের জ্ঞান নয়, জিন ও শয়তানের সাহায্য গ্রহণও নয়। বরং মানব দেহের মাঝে আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি, ক্ষমতা, বিচক্ষণতা, অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা ও অন্তর্দৃষ্টির আলোকে গভীর অনুভব-ক্ষমতা। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দেন। আল্লাহওয়ালাদের জন্য এটা কারামত হিসেবে বিবেচিত হয়।
মানুষের এই ক্ষমতা কুরআন-হাদিস দ্বারা স্বীকৃত। মুমিনদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنَ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُم بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْتَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا ۚ وَمَا تُنفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ ۞ অর্থ : ‘(সদকা) ওই সকল গরিব লোকের জন্য যারা আল্লাহর পথে আবদ্ধ হয়ে গেছে, যারা জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র ঘোরাফেরা করতে সক্ষম নয়। যাজ্ঞা না করার কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদের অভাবমুক্ত মনে করে। তাদের তোমরা তাদের লক্ষণ দ্বারা চিনবে। তারা মানুষের কাছে কাকুতিমিনতি করে চায় না। তোমরা যে অর্থ ব্যয় করবে সে সম্পর্কে আল্লাহ অবগত রয়েছেন।’ [বাকারা : ২৭৩] কাফেরদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ۞ يُعْرَفُ الْمُجْرِمُونَ بِسِيمَاهُمْ فَيُؤْخَذُ بِالنَّوَاصِي وَالْأَقْدَامِ ۞ অর্থ : ‘অপরাধীদের তাদের লক্ষণ দ্বারা চেনা যাবে। মাথার চুল ও পা ধরে এদের পাকড়াও করা হবে।’ [রহমান: ৪১]
হাদিসেও ‘ফিরাসাতে’র স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইমাম রহ. নিজস্ব সনদে আবু সাইদ খুদরি রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা মুমিনের ফিরাসাত ভয় করো। কেননা, সে আল্লাহর নূর দ্বারা দেখে। অতঃপর তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন : ﴿إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِلْمُتَوَسِّمِينَ﴾ অর্থ : ‘নিশ্চয়ই এতে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ [হিজর : ৭৫]
ফলে এই অন্তর্দৃষ্টি-ই ফিরাসাত। উসমান রাযি. এই জ্ঞানে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি চোখ দেখে ব্যক্তি সম্পর্কে বলে দিতে পারতেন। ইমাম আজমও এ ব্যাপারে অগ্রগামী ছিলেন। তাঁর জীবনীগ্রন্থগুলো এমন অসংখ্য ঘটনায় ভরপুর যার কিছু পিছনে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন নিয়ে ভবিতব্য ফেতনা তিনি ফিরাসাতের মাধ্যমে প্রথমেই অনুভব করতে পেরেছিলেন।৯৯৬
টিকাঃ
৯৯৬. দেখুন: শরহে মুসনাদে আবি হানিফা, আলি কারি (৫৬৬)।