📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
ইমাম আজম রহ. এ ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি। চার ইমাম থেকেও এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। কারণ, এটা দ্বীনের কোনো মৌলিক আকিদা নয়। জানা জরুরি এমন কোনো আবশ্যক বিষয় নয়। তদুপরি যেহেতু এটা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, এ জন্য প্রসঙ্গক্রমে সামান্য আলোচনা করা হচ্ছে。
বস্তুত উপরের মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে যেহেতু উভয় পক্ষে বড় বড় আলেম আছেন, সুতরাং কোনো একটাকে সরাসরি ভুল বলে অন্যটাকে সন্দেহাতীত সত্য বলার সাহস আমাদের নেই। কিন্তু দিলের রুজহান প্রকাশ করা জরুরি হলে আমাদের বক্তব্য হলো, কুরআন-সুন্নাহর দলিলগুলো পর্যালোচনার পরে খিযির আলাইহিস সালামের নবি হওয়া আমাদের কাছে অগ্রগণ্য। বিশেষত মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে তাঁর ঘটনা-পরিক্রমা, তাঁর হাতে বিভিন্ন আশ্চর্য বিষয় সংঘটন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর নিশ্চিত জ্ঞানলাভ-ওহি ছাড়া যার অন্য কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন-সবকিছু তাঁর নবি হওয়ার সুস্পষ্ট আলামত। হুজ্জাতুল ইসলাম গাযালিসহ আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন ধারার মুহাক্কিক আলেমদের মত এটাই। বিপরীত মত দুর্বল যা গ্রহণ করা কঠিন。
আর তাঁর জীবনের ব্যাপারে আমাদের কথা হলো-খিযির আলাইহিস সালাম যেহেতু স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন, আর স্বাভাবিক মানুষের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার নীতি হলো নির্দিষ্ট সময় পরে মৃত্যুবরণ করা, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ﴿وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرِ مِّنْ قَبْلِكَ الْخُلْدَ أَفَائِنُ مِتَ فَهُمُ الْخُلِدُونَ﴾ অর্থ : ‘আমি আপনার পূর্বে কোনো মানুষকে চিরস্থায়িত্ব দান করিনি। সুতরাং আপনি যদি মারা যান তারা কি চিরকাল থাকবে?’ [আম্বিয়া: ৩৪] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ﴿إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُم مَّسْئُولُونَ﴾ অর্থ : ‘নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল। তারাও মরণশীল।’ [যুমার : ৩০] রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, তিনি জীবনের শেষ দিকে এক রাতে ইশার নামাযের পরে সাহাবাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আজকের রাতটি তোমরা লক্ষ করেছ? বর্তমানে যারা পৃথিবীর বুকে জীবিত রয়েছে একশো বছরের মাথায় তাদের কেউ বেঁচে থাকবে না।’৯৭১ উক্ত হাদিসটি বুখারি, মুসলিম, কুতুবে সিত্তাহসহ বিভিন্ন গ্রন্থে এসেছে। ফলে এটার প্রামাণ্যতা শতভাগ নিশ্চিত। ঈসা আলাইহিস সালাম আকাশে জীবিত; যমিনে নন। দাজ্জালের উপরও কিয়াস করা যাবে না। কারণ, দাজ্জালকে বিশাল উদ্দেশ্য আঞ্জামের জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছে। ফলে উক্ত হাদিসের ভিত্তিতে খিযির, ইলিয়াসসহ যাদের জীবনের কথা বলা হয়, সবগুলো নাকচ হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জানাযায় উপস্থিত হওয়াসহ সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের যেসব বর্ণনা পেশ করা হয়, সেগুলোও প্রমাণিত ও নির্ভরযোগ্য নয়。
তা ছাড়া, খিযির আলাইহিস সালামের বেঁচে থাকার বিশেষ কোনো অর্থ নেই, উদ্দেশ্য নেই। ঈসা আলাইহিস সালামের জীবনের উপর এটাকে কিয়াস করা বিশুদ্ধ নয়। কারণ, ঈসা আলাইহিস সালাম পৃথিবীর শেষ লগ্নে তাজদিদ ও সংস্কারের বিশাল গুরুত্বপূর্ণ মিশন আঞ্জাম দেবেন। কিয়ামতের আগ মুহূর্তের ঘটনাবহুল পৃথিবীতে তিনি হবেন প্রধান রাষ্ট্রনায়ক। দাজ্জাল ও ইয়াজুজ-মাজুজের বিপরীতে মুমিনদের সিপাহসালার তিনি। তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবেন। আল্লাহর দুশমনদের নিজ হাতে হত্যা করবেন। পৃথিবীতে ইসলাম কায়েম করবেন, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। সকল বাতিল সমূলে বিনাশ করবেন। চতুর্দিকে তাওহিদ ও শান্তি ছড়িয়ে দেবেন। তাও হাতেগোনা মাত্র কয়েক বছরে। বিপরীতে খিযির কিংবা ইলিয়াসের কাজ কী? হাজার হাজার বছর ধরে তাদের জীবিত বলা হচ্ছে, অথচ তাসাওউফের কিছু লোকজনের সঙ্গে জঙ্গল ও বনবাদাড়ে সাক্ষাৎ ছাড়া তাদের আর কোনো দায়িত্ব নেই। ইসলামের দাওয়াত, তাযকিয়া, জিহাদ, কিয়াদাত কোনো ক্ষেত্রে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তাহলে এই বেঁচে থাকা কাদের জন্য?
এ জন্য আল্লামা আলুসি রহ. লিখেন, ‘তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় তাঁর কাছে আসেননি, তাঁর হাতে বাইয়াত হননি। তাঁর সঙ্গে জিহাদ করেননি। বরং তিনি যদি সত্যিই বেঁচে থাকতেন, তবে জঙ্গল থেকে বের হন না কেন? পৃথিবীতে এসে কাফেরদের সঙ্গে জিহাদ করা, ময়দানে সময় কাটানো, জুমা ও জামাতের নামাযে শরিক হওয়া, উম্মাহর অক্ষরজ্ঞানশূন্য সদস্যদের দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া কি পাহাড়-পর্বতে পশুপাখির মাঝে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে বেশি জরুরি নয়? ... আলুসি অন্যত্র আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের এক যুদ্ধে খিযির কর্তৃক সহায়তার ভিত্তিহীন ঘটনাকে খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন, এখানে হাজির হওয়ার চেয়ে তাঁর রাসুলুল্লাহর সঙ্গে উহুদের ময়দানে হাজির হওয়া বেশি জরুরি ছিল।’৯৭২
টিকাঃ
৯৭১. বুখারি (কিতাবুল ইলম : ১১৬)। মুসলিম (কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবাহ : ২৫৩৭)। আবু দাউদ (কিতাবুল মালাহিম : ৪৩৪৮)। তিরমিযি (আবওয়াবুল ফিতান: ২২৫১)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবদিল্লাহ ইবনে উমর: ৫৭২১)।
৯৭২. রুহুল মাআনি (৮/৩০৩-৩০৬)।