📄 খিযির ও ইলিয়াসের বর্তমানে জীবিত থাকার দাবি
পিছনে আমরা ‘হায়াতুল আম্বিয়া’ বা নবিদের কবরের জীবন সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এবার একটু দুনিয়ার জীবন সম্পর্কে আলোচনা প্রয়োজন। অর্থাৎ, যদি প্রশ্ন করা হয়: দুনিয়াতে কি বর্তমানে কোনো নবি বা-হায়াত তথা জীবিত আছেন? সহজাত ও যৌক্তিক উত্তর ‘না’ হওয়া স্বাভাবিক হলেও এত সহজে এখানে ‘না’ বলার সুযোগ নেই। কারণ, উম্মাহর বড় একদল আলেম এক্ষেত্রে বিপরীত বিশ্বাস রাখেন। তারা মনে করেন, একদল নবি এখনও জীবিত, মৃত্যুহীন। হাজার হাজার বছর পরও তারা এখনও মৃত্যুবরণ করেননি। পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা বেঁচে থাকবেন। গযনবি লিখেন, ‘চারজন নবি এখনও জীবিত। তারা হলেন: ঈসা, ইদরিস, খিযির ও ইলিয়াস। ’৯৬৫
ঈসা আলাইহিস সালাম আকাশে জীবিত। এটা সন্দেহাতীত সত্য। কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। ফলে এটা নিয়ে আহলে সুন্নাতের কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু ঈসা আলাইহিস সালাম আকাশে জীবিত, পৃথিবীতে নন। ইদরিস আলাইহিস সালামের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। তিনিও আকাশে, দুনিয়াতে নন। আর দুনিয়ার বাইরে সকল নবিই তাদের কবরে জীবিত। মিরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) একাধিক নবিকে তাদের কবরে ও আসমানে জীবিত দেখেছেন। এটা দুনিয়ার বাইরের জীবন। ফলে উক্ত জীবনকে দুনিয়ার জীবনের উপর কিয়াস করার সুযোগ নেই। তাই ঈসা ও ইদরিস (আলাইহিমাস সালাম) আমাদের আলোচনার বাইরে। বাকি রইল খিযির ও ইলিয়াস (আলাইহিমাস সালাম)-এর কথা।
খিযির আলাইহিস সালাম ইসলামের ইতিহাসের এক বিস্ময়কর চরিত্র—কেউ তাকে জিন আখ্যা দিয়েছেন; কেউ তাকে ফেরেশতা বলেছেন; কেউ নবি বলেছেন; কেউ ওলি বলেছেন; কেউ মারা গেছেন বলেছেন; কেউ জীবিত আছেন বলেছেন। কেউ মনে করেন, তিনি জঙ্গলে আছেন। কেউ মনে করেন, সাগরে আছেন। কেউ বলেন, প্রত্যেক শুক্রবার তিনি মসজিদুল হারামে মাহদি ও ঈসার সঙ্গে বৈঠক করেন। আবার কেউ বলেছেন, প্রত্যেক রাতে যুল কারনাইনের প্রাচীরের কাছে তিনি আর ইলিয়াস বৈঠক করেন! প্রত্যেক বছর হজ ও উমরা করেন। তখন যমযমের পানি পান করেন, যা পুরো এক বছরের খাবার হিসেবে যথেষ্ট হয়ে যায়! আবার কেউ তাঁর সূত্রে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে শত শত হাদিস বর্ণনা করেছেন! কেউ খিযিরকে ব্যক্তির পরিবর্তে ‘খিযিরিয়্যাত’ নামে তাসাওউফের রুতবা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ ইলিয়াস ও খিযির দুজনকেই তাসাওউফের দুটো হালত ‘কবজ’ ও ‘বাসত’ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন! এভাবে অসংখ্য মতভেদপূর্ণ বিষয় ও বিতর্কের মিশ্রণে এক অদ্ভুত অস্পষ্টতা, অনিশ্চয়তা ও সন্দেহের বেড়াজালে বন্দি হয়ে আছেন এ মহাপুরুষ। ৯৬৬
সুফিয়ায়ে কেরাম এবং একদল আলেমের কাছে খিযির আলাইহিস সালাম এখনও জীবিত। এটা বিশাল একদল আলেম ও মাশায়েখের বক্তব্য। তারা এ বিষয়ের উপর অসংখ্য স্বতন্ত্র বই-পুস্তকও লিখেছেন। বিভিন্ন গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। নববি লিখেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের মতে খিযির এখনও আমাদের মাঝে জীবিত। এটা সুফিয়ায়ে কেরাম এবং মারেফতপন্থি লোকদের সর্বসম্মত বক্তব্য। তাঁর সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ, তাঁর কাছ থেকে ওয়াজ-উপদেশ গ্রহণ, প্রশ্নোত্তর, বিভিন্ন স্থানে তাঁর উপস্থিতি ইত্যাদি সম্পর্কে তাদের বক্তব্য এত বেশি যা গোনা সম্ভব নয়, লুকানোও সম্ভব নয়। ...সালাবি বলেন, খিযির এখনও জীবিত। অধিকাংশ মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে। কিয়ামতের আগ মুহূর্তে কুরআন উঠে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি জীবিত থাকবেন।’৯৬৭ হাফেজ ইবনুস সালাহ (৬৪৩ হি.) লিখেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম, বুযুর্গ ও সাধারণ মুসলমানদের নিকট তিনি জীবিত হিসেবে গণ্য। কেবল কিছু মুহাদ্দিস তাঁর বেঁচে থাকার বিষয়টি নাকচ করেছেন।’৯৬৮
বিপরীতে ইমাম বুখারি, ইবরাহিম ইবনে ইসহাক হরবি, আবুল হুসাইন ইবনুল মুনাদি, ইবনুল জাওযি, ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়িম, ইবনে কাসির ও ইবনে হাজার আসকালানিসহ উম্মাহর অসংখ্য মুহাক্কিক আলেম খিযির আলাইহিস সালামের জীবিত থাকাকে নাকচ করে দিয়েছেন।৯৬৯ বুখারিকে খিযিরের জীবিত থাকার কথা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘তিনি কীভাবে জীবিত থাকবেন, অথচ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন একশো বছর পরে কেউ জীবিত থাকবে না?’ ইবনুল কাইয়িম বলেন, ‘খিযির আলাইহিস সালামের জীবিত থাকার ব্যাপারে যেসব হাদিস বর্ণনা করা হয়, সবগুলো বানোয়াট। তাঁর জীবিত থাকার ব্যাপারে কোনো বিশুদ্ধ হাদিস নেই।’৯৭০
টিকাঃ
৯৬৫. উসুলুদ্দিন, গযনবি (১৪৬-১৫১)।
৯৬৬. বিস্তারিত দেখুন: আয-যাহরুন নাযির ফি হায়াতিল খাযির, ইবনে হাজার আসকালানি।
৯৬৭. শরহে মুসলিম, নববি (১৫/১৩৫-১৩৬)।
৯৬৮. ফাতাওয়া ইবনিস সালাহ (১/১৮৫)।
৯৬৯. দেখুন। রুহুল মাআনি (৮/৩০৩-৩০৬)। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (২/২৭০)। আল-মানারুল মুনিফ (৭৩-৭৪)। মাজমুউল ফাতাওয়া (১/২৪৯)। ইবনে তাইমিয়্যাহর ফাতাওয়া সংকলনের একটি স্থান থেকে খিযিরের জীবিত থাকার যে উদ্ধৃতি দেখানো হয়, সেটা তাঁর নিজের বক্তব্য নয়; ভুলে অন্য কোনো গ্রন্থ থেকে ঢুকে পড়েছে। নতুবা তিনি ফাতাওয়ার অন্যান্য স্থান-সহ বিভিন্ন গ্রন্থে খিযিরের মৃত্যুর কথা বলেছেন। মিনহাজে তিনি লেখেন, ‘খিযিরের জীবিত থাকার উপর তাদের দলিল বাতিলের উপর বাতিল। সকল আলেম ও মুহাক্কিকের মতে খিজির মৃত্যুবরণ করেছেন।’ [মিনহাজুস সুন্নাহ: ৪/৯৩] শাইখুল ইসলাম ইবনে হাজার আসকালানি খিযিরের উপর তাঁর স্বতন্ত্র গ্রন্থ ‘আয-যাহরুন নাযির’-এ উভয় পক্ষের দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করে শেষে বলেন, ‘এসব মজবুত দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে আমার মন তাঁর জীবিত থাকার ব্যাপারে জনসাধারণের বিশ্বাসের বিপরীতে যায়।’ [আয-যাহরুন নাযির: ২০৮] এটাই সঠিক, ইনশাআল্লাহ।
৯৭০. আল-মানারুল মুনিফ (৬৭-৭২)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
ইমাম আজম রহ. এ ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি। চার ইমাম থেকেও এ ব্যাপারে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। কারণ, এটা দ্বীনের কোনো মৌলিক আকিদা নয়। জানা জরুরি এমন কোনো আবশ্যক বিষয় নয়। তদুপরি যেহেতু এটা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, এ জন্য প্রসঙ্গক্রমে সামান্য আলোচনা করা হচ্ছে。
বস্তুত উপরের মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে যেহেতু উভয় পক্ষে বড় বড় আলেম আছেন, সুতরাং কোনো একটাকে সরাসরি ভুল বলে অন্যটাকে সন্দেহাতীত সত্য বলার সাহস আমাদের নেই। কিন্তু দিলের রুজহান প্রকাশ করা জরুরি হলে আমাদের বক্তব্য হলো, কুরআন-সুন্নাহর দলিলগুলো পর্যালোচনার পরে খিযির আলাইহিস সালামের নবি হওয়া আমাদের কাছে অগ্রগণ্য। বিশেষত মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে তাঁর ঘটনা-পরিক্রমা, তাঁর হাতে বিভিন্ন আশ্চর্য বিষয় সংঘটন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর নিশ্চিত জ্ঞানলাভ-ওহি ছাড়া যার অন্য কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন-সবকিছু তাঁর নবি হওয়ার সুস্পষ্ট আলামত। হুজ্জাতুল ইসলাম গাযালিসহ আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন ধারার মুহাক্কিক আলেমদের মত এটাই। বিপরীত মত দুর্বল যা গ্রহণ করা কঠিন。
আর তাঁর জীবনের ব্যাপারে আমাদের কথা হলো-খিযির আলাইহিস সালাম যেহেতু স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন, আর স্বাভাবিক মানুষের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার নীতি হলো নির্দিষ্ট সময় পরে মৃত্যুবরণ করা, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ﴿وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرِ مِّنْ قَبْلِكَ الْخُلْدَ أَفَائِنُ مِتَ فَهُمُ الْخُلِدُونَ﴾ অর্থ : ‘আমি আপনার পূর্বে কোনো মানুষকে চিরস্থায়িত্ব দান করিনি। সুতরাং আপনি যদি মারা যান তারা কি চিরকাল থাকবে?’ [আম্বিয়া: ৩৪] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ﴿إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُم مَّسْئُولُونَ﴾ অর্থ : ‘নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল। তারাও মরণশীল।’ [যুমার : ৩০] রাসুলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, তিনি জীবনের শেষ দিকে এক রাতে ইশার নামাযের পরে সাহাবাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আজকের রাতটি তোমরা লক্ষ করেছ? বর্তমানে যারা পৃথিবীর বুকে জীবিত রয়েছে একশো বছরের মাথায় তাদের কেউ বেঁচে থাকবে না।’৯৭১ উক্ত হাদিসটি বুখারি, মুসলিম, কুতুবে সিত্তাহসহ বিভিন্ন গ্রন্থে এসেছে। ফলে এটার প্রামাণ্যতা শতভাগ নিশ্চিত। ঈসা আলাইহিস সালাম আকাশে জীবিত; যমিনে নন। দাজ্জালের উপরও কিয়াস করা যাবে না। কারণ, দাজ্জালকে বিশাল উদ্দেশ্য আঞ্জামের জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছে। ফলে উক্ত হাদিসের ভিত্তিতে খিযির, ইলিয়াসসহ যাদের জীবনের কথা বলা হয়, সবগুলো নাকচ হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জানাযায় উপস্থিত হওয়াসহ সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের যেসব বর্ণনা পেশ করা হয়, সেগুলোও প্রমাণিত ও নির্ভরযোগ্য নয়。
তা ছাড়া, খিযির আলাইহিস সালামের বেঁচে থাকার বিশেষ কোনো অর্থ নেই, উদ্দেশ্য নেই। ঈসা আলাইহিস সালামের জীবনের উপর এটাকে কিয়াস করা বিশুদ্ধ নয়। কারণ, ঈসা আলাইহিস সালাম পৃথিবীর শেষ লগ্নে তাজদিদ ও সংস্কারের বিশাল গুরুত্বপূর্ণ মিশন আঞ্জাম দেবেন। কিয়ামতের আগ মুহূর্তের ঘটনাবহুল পৃথিবীতে তিনি হবেন প্রধান রাষ্ট্রনায়ক। দাজ্জাল ও ইয়াজুজ-মাজুজের বিপরীতে মুমিনদের সিপাহসালার তিনি। তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবেন। আল্লাহর দুশমনদের নিজ হাতে হত্যা করবেন। পৃথিবীতে ইসলাম কায়েম করবেন, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। সকল বাতিল সমূলে বিনাশ করবেন। চতুর্দিকে তাওহিদ ও শান্তি ছড়িয়ে দেবেন। তাও হাতেগোনা মাত্র কয়েক বছরে। বিপরীতে খিযির কিংবা ইলিয়াসের কাজ কী? হাজার হাজার বছর ধরে তাদের জীবিত বলা হচ্ছে, অথচ তাসাওউফের কিছু লোকজনের সঙ্গে জঙ্গল ও বনবাদাড়ে সাক্ষাৎ ছাড়া তাদের আর কোনো দায়িত্ব নেই। ইসলামের দাওয়াত, তাযকিয়া, জিহাদ, কিয়াদাত কোনো ক্ষেত্রে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তাহলে এই বেঁচে থাকা কাদের জন্য?
এ জন্য আল্লামা আলুসি রহ. লিখেন, ‘তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় তাঁর কাছে আসেননি, তাঁর হাতে বাইয়াত হননি। তাঁর সঙ্গে জিহাদ করেননি। বরং তিনি যদি সত্যিই বেঁচে থাকতেন, তবে জঙ্গল থেকে বের হন না কেন? পৃথিবীতে এসে কাফেরদের সঙ্গে জিহাদ করা, ময়দানে সময় কাটানো, জুমা ও জামাতের নামাযে শরিক হওয়া, উম্মাহর অক্ষরজ্ঞানশূন্য সদস্যদের দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া কি পাহাড়-পর্বতে পশুপাখির মাঝে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে বেশি জরুরি নয়? ... আলুসি অন্যত্র আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের এক যুদ্ধে খিযির কর্তৃক সহায়তার ভিত্তিহীন ঘটনাকে খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন, এখানে হাজির হওয়ার চেয়ে তাঁর রাসুলুল্লাহর সঙ্গে উহুদের ময়দানে হাজির হওয়া বেশি জরুরি ছিল।’৯৭২
টিকাঃ
৯৭১. বুখারি (কিতাবুল ইলম : ১১৬)। মুসলিম (কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবাহ : ২৫৩৭)। আবু দাউদ (কিতাবুল মালাহিম : ৪৩৪৮)। তিরমিযি (আবওয়াবুল ফিতান: ২২৫১)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবদিল্লাহ ইবনে উমর: ৫৭২১)।
৯৭২. রুহুল মাআনি (৮/৩০৩-৩০৬)।