📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 নবি-রাসূলগণের মর্যাদার তারতম্য

📄 নবি-রাসূলগণের মর্যাদার তারতম্য


নবি-রাসুলগণ সাধারণ মানুষের তুলনায় মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ। এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের প্রতিষ্ঠিত আকিদা। ইমাম আজম বলেন, ‘নবিগণ বিভিন্ন দিক থেকে আমাদের সাধারণ মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কারণ, তারা এমন কিছু বৈশিষ্ট্যেমণ্ডিত যা থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত। তন্মধ্যে সর্বপ্রথম হলো নবুওত ও রিসালাত। তারা এক্ষেত্রে সকল মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। দ্বিতীয়ত আল্লাহর ভয় এবং তাঁর প্রতি আশা। উত্তম চরিত্র-মাধুর্য। এগুলোর ক্ষেত্রেও তারা সকল মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তা ছাড়া, নবিগণ ফেরেশতা ও আল্লাহর বিস্ময়কর যেসব নিদর্শন দেখেছেন, সাধারণ মানুষ সেগুলো থেকেও বঞ্চিত। নবিগণ বিপদে-আপদে হতাশাগ্রস্ত হন না, ভেঙে পড়েন না। সাধারণ মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়, ভেঙে পড়ে। সবশেষে নবিগণ গুনাহের কারণে অন্যান্য সম্প্রদায়ের উপর আপতিত শাস্তির কথা জানেন। এটা গুনাহ এবং তাদের মাঝে প্রাচীর হিসেবে কাজ করে।’৯৪২

এভাবে নবিগণ পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষ, সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষ, সবচেয়ে মর্যাদাময় মানুষ, আল্লাহর সবচেয়ে কাছের মানুষ। তবে সকল নবির মর্যাদা সমান নয়। সকল নবি সম্মান এবং আল্লাহর নৈকট্যের ক্ষেত্রে সমন্তরে নন। কারণ, ওহি ও নবুওতপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এক হলেও দ্বীনের জন্য কুরবানি, মুজাহাদা, আল্লাহর ভালোবাসা, মনোনয়নসহ বিভিন্ন কারণে তাদের মাঝে মর্যাদার তারতম্য হয়ে থাকে। এটা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত এবং উম্মতের ইজমা তথা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। ফলে স্বাভাবিকভাবে সকল রাসুল সকল নবির চেয়ে উত্তম। কারণ, প্রত্যেক রাসুল নবি; কিন্তু প্রত্যেক নবি রাসুল নন। আবার রাসুলগণের মাঝ থেকেও সবার মর্যাদা সমান নয়। বরং কিছু রাসুল কিছু রাসুলের চেয়ে উত্তম। ইমাম তহাবি রহ. বলেন, ‘আমরা পূর্ণ বিশ্বাস, সত্যায়ন ও সমর্পণপূর্বক ঘোষণা করছি, আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে খলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। আমরা ফেরেশতা, নবিগণ, রাসুলদের উপর অবতীর্ণ সকল আসমানি গ্রন্থে ঈমান রাখি। আমরা সাক্ষ্য দিই যে, তারা সুস্পষ্ট সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।’৯৪৩ ইমাম তহাবির কথায় স্পষ্ট যে, সকল নবির মর্যাদা সমস্তরে নয়। বরং নবিদের মাঝ থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ), ইবরাহিম ও মুসা আলাইহিমাস সালামের মর্যাদা অন্যদের তুলনায় অনেক ঊর্ধ্বে। এ জন্য আল্লাহ তাদের যা দান করেছেন অন্যদের তা দান করেননি。

নবি-রাসুলের পারস্পরিক মর্যাদার পার্থক্য কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত ও বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ বলেন, ۞ تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ ۘ مِنْهُم مَّن كَلَّمَ اللَّهُ ۖ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ ۞ অর্থ : ‘এই রাসুলগণ আমি তাদের কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। তাদের কারও সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা কথা বলেছেন। তাদের কতককে তিনি উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন।’ [বাকারা : ২৫৩] অন্য আয়াতে বলেন, ۞ وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّينَ عَلَىٰ بَعْضٍ ۞ অর্থ : ‘আর আমি কতক নবিকে কতক নবির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’ [ইসরা : ৫৫]

টিকাঃ
৯৪২. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৫)।
৯৪৩. দেখুন: আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 সর্বশ্রেষ্ঠ পাঁচজন রাসূল

📄 সর্বশ্রেষ্ঠ পাঁচজন রাসূল


রাসুলদের মাঝে মর্যাদাগত তারতম্য আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের প্রতিষ্ঠিত আকিদা। আহলে সুন্নাতের আরেকটি প্রতিষ্ঠিত আকিদা হলো, রাসুলদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল হচ্ছেন পাঁচজন, কুরআনে যাদের ‘উলুল আযমি মিনার রুসুল’ তথা ‘দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী রাসুল’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। তারা হলেন নুহ, ইবরাহিম, মুসা, ঈসা ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহিম ওয়া সাল্লাম)। তারা অন্যান্য রাসুলের চেয়ে আল্লাহর পথে বেশি মেহনত ও মুজাহাদা করেছেন। তা ছাড়া, অন্যদের তুলনায় পৃথিবীতে তাদের মুজাহাদার ফলাফল বেশি। আল্লাহর প্রতি তাদের নিষ্ঠা ও মহব্বতও বেশি। তাই আল্লাহ তাদের বেশি ভালোবেসেছেন, তাদের বেশি মর্যাদা দান করেছেন।

এটা কুরআনের একাধিক জায়গায় আল্লাহ তায়ালা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ۞ شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ ۖ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ ۗ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ ۚ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ ۞ অর্থ : ‘তিনি তোমাদের জন্য সেই দ্বীন নির্ধারণ করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নুহকে, আর যা আমি ওহি করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহিম, মুসা ও ঈসার প্রতি এ মর্মে যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করো এবং তাতে মতভেদ করো না।’ [শুরা : ১৩] আরেক আয়াতে বলেন, ۞ وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُّوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ۞ অর্থ : ‘যখন আমি নবিগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম, আপনার কাছ থেকে এবং নুহ, ইবরাহিম, মুসা ও মরিয়ম তনয় ঈসার কাছ থেকে।’ [আহযাব : ৭]

উক্ত পাঁচজন শ্রেষ্ঠ হওয়ার অর্থ তারা সবাই সমস্তরের নন, বরং অন্যদের চেয়ে যেমন তাদের মর্যাদা আলাদা, ঠিক তেমন তাদের মাঝ থেকে একেকজনের মর্যাদা অন্যদের তুলনায় বেশি। ফলে উক্ত পাঁচজনের মাঝে সর্বসম্মতিক্রমে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন মুহাম্মাদ (ﷺ)। স্বয়ং কুরআনের উপরের আয়াত থেকেও এটা প্রমাণিত। আল্লাহ বলেন, ۞ وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُّوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ۞ অর্থ : ‘যখন আমি নবিগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম, আপনার কাছ থেকে এবং নুহ, ইবরাহিম, মুসা ও মরিয়ম তনয় ঈসার কাছ থেকে।’ [আহযাব : ৭] এখানে দেখুন, চারজন রাসুলকে ঐতিহাসিক পালাক্রমে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু মুহাম্মাদ (ﷺ) সবার শেষে হওয়া সত্ত্বেও আগে উল্লেখ করেছেন। কারণ, তিনি শেষে এলেও মর্যাদার দিক থেকে বাকি চারজনের আগে।

তা ছাড়া, তিনি গোটা বিশ্বের কাছে রাসুল হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন, অথচ অন্যান্য নবি-রাসুলের দাওয়াত তাদের নিজস্ব সম্প্রদায়ের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। অন্যান্য নবি-রাসুলের দাওয়াত ছিল সাময়িক, পরবর্তী রাসুল আসার আগ পর্যন্ত। এভাবে স্থান ও কাল উভয় দিক থেকেই তাদের রিসালাত সীমাবদ্ধ ছিল। বিপরীতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রিসালাত গোটা বিশ্বজগৎ বিস্তৃত। কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। ফলে কাল ও স্থান সকল সীমার ঊর্ধ্বে তাঁর রিসালাত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا ۞ অর্থ : ‘বরকতময় সেই সত্তা (আল্লাহ তায়ালা) যিনি তাঁর বান্দার উপর সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি গোটা বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হন।’ [ফুরকান : ১] অন্য আয়াতে বলেন, ۞ وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ ۞ অর্থ : ‘আমি আপনাকে গোটা বিশ্ববাসীর জন্য কেবল রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি।’ [আম্বিয়া : ১০৭]

হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘আমাকে ছয়টি জিনিসের মাধ্যমে সকল নবির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে—এক. আমাকে স্বল্প কথায় অধিক মর্ম পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে; দুই. দুশমনের অন্তরে ভয় ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে (ফলে দূর থেকে শত্রু তার আগমনের কথা শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ত); তিন. আমার জন্য গনিমত হালাল করা হয়েছে; চার. গোটা ভূপৃষ্ঠ আমার জন্য পবিত্রতার মাধ্যম এবং সিজদায় জায়গা বানানো হয়েছে; পাঁচ. আমাকে গোটা সৃষ্টির কাছে রাসুল হিসেবে পাঠানো হয়েছে; ছয়. আমার মাধ্যমে নবিদের ধারাবাহিকতা সমাপ্ত করা হয়েছে।’৯৪৪

আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘আমি কিয়ামতের দিন গোটা আদম সন্তানের নেতা হব। সর্বপ্রথম আমার কবর বিদীর্ণ হবে। আমি সর্বপ্রথম সুপারিশ করব। সর্বপ্রথম আমার সুপারিশ কবুল করা হবে।’৯৪৫ ইবনে আব্বাস সূত্রে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিমকে খলিল তথা পরম প্রিয় বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মুসাকে তিনি নাজি তথা তাঁর সঙ্গে কথোপকথনকারী হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ঈসা হচ্ছেন তাঁর দেওয়া রুহ এবং তাঁর নির্দেশ (কালিমা)। আদম তাঁর মুস্তফা তথা মনোনীত। আর আমি তাঁর হাবিব তথা প্রিয় বন্ধু; গর্ব নেই, গর্ব নেই। আমিই কিয়ামতের দিন আল্লাহর প্রশংসার ঝান্ডাধারী হবো। আমিই কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম শাফায়াত করব আর সর্বপ্রথম আমার শাফায়াতই গৃহীত হবে; গর্ব নেই। আমি সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজার কড়া নাড়ব এবং আমার জন্য আল্লাহ তা খুলে দেবেন। আমাকে সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করাবেন; গর্ব নেই। আমার সাথে থাকবে দরিদ্র মুমিনরা। আমিই ইহকাল ও পরকাল, প্রথম যুগ ও শেষ যুগ সকল মানুষের মাঝে শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত। এতে গর্ব নেই।’৯৪৬

দ্বিতীয় সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। এটা বিভিন্ন আয়াত ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন—কুরআনে আল্লাহ তায়ালা একাধিক জায়গায় ইবরাহিম আলাইহিস সালামের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا ۞ অর্থ : ‘আল্লাহ ইবরাহিমকে খলিল (পরম বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করেছেন। [নিসা : ১২৫] কুরআনে তাকে একাই এক উম্মাহ (জাতি) বলা হয়েছে, তাওহিদবাদীদের ইমাম বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ۞ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتًا لِّلَّهِ حَنِيفًا وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ۞ অর্থ : ‘ইবরাহিম ছিলেন একটি জাতি। আল্লাহর একনিষ্ঠ বন্দেগিকারী। তিনি মুশরিক ছিলেন না।’ [নাহল : ১২০] একব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে ডাক দেয়, হে সৃষ্টির সর্বোত্তম। তখন রাসুলুল্লাহ বলেন, ‘তিনি ইবরাহিম’।৯৪৭

মুহাম্মাদ (ﷺ) ও ইবরাহিম আলাইহিস সালামের পরে হচ্ছেন নুহ, মুসা ও ঈসা আলাইহিমাস সালাম। তবে শেষোক্ত তিনজনের মাঝে কে শ্রেষ্ঠ সে সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহতে সুস্পষ্ট বর্ণনা নেই। ফলে বিষয়টি মতভেদপূর্ণ থাকবে। এ ব্যাপারে নীরব-নিরপেক্ষ থাকা উচিত হবে। সাফারিনি লিখেন, ‘মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পরে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম সৃষ্টির সর্বোত্তম। এটা মুসলমানদের সর্বসম্মত মতামত। সুতরাং ইবরাহিম আলাইহিস সালাম মুসা আলাইহিস সালামের চেয়ে উত্তম। তবে শেষ তিন জনের মাঝে কে উত্তম সেটা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।’ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কোনো দলিল পাইনি। তবে আমার কাছে মনে হয়, প্রথমে মুসা আলাইহিস সালাম, অতঃপর ঈসা আলাইহিস সালাম এবং সর্বশেষ নুহ আলাইহিস সালাম। কোনো কোনো আলেমের মতে, মুসাকে নুহ ও ঈসার আগে আনার কারণ হচ্ছে, তিনি আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। তবে সুনিশ্চিত হওয়া যায় না এমন বিষয়ে নিরপেক্ষ থাকাই উত্তম।’৯৪৮

টিকাঃ
৯৪৪. মুসলিম (কিতাবুল মাসাজিদ: ৫২৩)। তিরমিযি (আবওয়াবুস সিয়ার: ১৫৫৩)।
৯৪৫. মুসলিম (কিতাবুল ফায়ায়েল: ২২৭৮)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৬৭৩)।
৯৪৬. তিরমিযি (আবওয়াবুল মানাকিব: ৩৬১৬)। মুসনাদে দারেমি (মুকাদ্দিমাতুল মুআল্লিফ: ৪৮)।
৯৪৭. মুসলিম (কিতাবুল ফাযায়েল: ২৩৬৯)। তিরমিযি (আবওয়াবু তাফসিরিল কুরআন : ৩৩৩২)।
৯৪৮. লাওয়ামিউল আনওয়ার, সাফারিনি (২/৩০০)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 নবিদের মাঝে তুলনা নিষিদ্ধ নয়

📄 নবিদের মাঝে তুলনা নিষিদ্ধ নয়


হ্যাঁ, কিছু কিছু হাদিসে নবিদের মাঝে তুলনা করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাদের একজনকে অন্যজনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলতে বারণ করা হয়েছে। ফলে বাহ্যত এসব হাদিসের সঙ্গে সেসব হাদিসের সংঘাত তৈরি হয়। বাস্তবতা হলো, উপরের আয়াত ও হাদিসগুলো উন্মুক্তভাবে গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ, নবিদের মাঝে মর্যাদার তারতম্য সুস্পষ্ট ও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত বাস্তবতা। ফলে যেসব হাদিসের সঙ্গে এই বাস্তবতার সংঘাত দেখা দেবে, সেগুলোকে উন্মুক্তভাবে গ্রহণ করা হবে না; বরং প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতার আলোকে ব্যাখ্যা করা হবে。

যেমন—একটি হাদিসে এসেছে, একজন মুসলিম এবং একজন ইহুদি কার নবি শ্রেষ্ঠ সে বিষয়ে মারামারি করে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে বিচার নিয়ে গেল। আল্লাহর রাসুল শুনলেন, মুসলিম লোকটি তাকে মুসা আলাইহিস সালামের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলছিল। ইহুদিটি মুসা আলাইহিস সালামকে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলছিল। সব শুনে রাসুল (ﷺ) বললেন, ‘আমাকে তোমরা মুসার চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলো না।’ কেননা, কিয়ামতের দিন সকল মানুষ বেহুঁশ হয়ে যাবে। আমিও বেহুঁশ হব। সবার আগে আমার হুঁশ ফিরে আসবে। কিন্তু জ্ঞান ফেরার পরে আমি মুসাকে আরশের পাশে দেখব। আমি নিশ্চত নই, তিনি কি বেহুঁশ হয়ে আমার আগেই হুঁশ ফিরে পেয়েছেন, নাকি আল্লাহ তায়ালা তাঁকে এটা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।৯৪৯

আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘কারও জন্য এটা বলা উচিত নয় যে, আমি ইউনুস ইবনে মাত্তার চেয়ে উত্তম।’৯৫০

এসব হাদিস আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা হবে না। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে সাধারণ নীতি হলো উপরে বর্ণিত কুরআনের আয়াত ও হাদিসগুলো। ফলে নবিদের মাঝে মর্যাদাগত তারতম্য স্বীকৃত বাস্তবতা। কিন্তু যেসব হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাকে মুসা কিংবা ইউনুসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলতে নিষেধ করেছেন, সেগুলো বিভিন্ন ব্যাখ্যাসহ গ্রহণ করা হবে। যেমন—রাসুলুল্লাহ (ﷺ) কখনো বিনয়বশত সেগুলো বলেছেন। বাস্তবে তাঁর মর্যাদা মুসা ও ইউনুসের চেয়ে বেশি। আবার কখনো বিশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বলেছেন। যেমন—মুসলিম ও ইহুদির ঝগড়াসংক্রান্ত হাদিস। সেখানে মুসলিম ব্যক্তি ইহুদির উপর আবেগ ও জাত্যাভিমানকে উপরে রাখতে অহংকার করে রাসুলুল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করছিলেন। অথচ মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুলদের একজন। ফলে স্বাভাবিকভাবে রাসুলুল্লাহকে তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলাতে সমস্যা ছিল না। কিন্তু অহংকার প্রদর্শন কিংবা জাত্যাভিমানের লড়াই থেকে বললে সেখানে মুসা আলাইহিস সালামের মর্যাদাহানি হয়। ফলে সেক্ষেত্রে এ ধরনের বক্তব্য নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে। একইভাবে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে স্বতন্ত্রভাবে শ্রেষ্ঠ বলা আপত্তিকর নয়। কিন্তু ইউনুস আলাইহিস সালামের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে ইউনুস আলাইহিস সালামের ভুলের কারণে তাকে ছোট করে রাসুলুল্লাহকে শ্রেষ্ঠ বলা অনুচিত。

মোটকথা, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ। সকল মানুষের চেয়ে উত্তম। অন্যান্য নবির মাঝেও পারস্পরিক মর্যাদার তারতম্য রয়েছে। এক্ষেত্রে অনুমান কিংবা যুক্তি নয়; বরং কুরআনে যাদের শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে তাদের শ্রেষ্ঠ হিসেবে মেনে নিতে হবে। অন্য নবিগণকে যেন ছোট না করা হয় সেদিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে। নির্দিষ্টভাবে কোনো নবিকে অন্য নির্দিষ্ট নবির তুলনায় শ্রেষ্ঠ বললে যদি দ্বিতীয় জনের ছোট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে সেখানে তুলনা বর্জন করতে হবে。

টিকাঃ
৯৪৯. বুখারি (কিতাবু আহাদিসিল আম্বিয়া: ৩৪০৮)। মুসলিম (কিতাবুল ফাযায়েল : ২৩৭৩)।
৯৫০. বুখারি (কিতাবু আহাদিসিল আম্বিয়া: ৩৩৯৫)। মুসলিম (কিতাবুল ফাযায়েল : ২৩৭৬)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 হায়াতুল আম্বিয়া (নবিদের কবরের জীবন)

📄 হায়াতুল আম্বিয়া (নবিদের কবরের জীবন)


বাহ্যিক চোখে মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ইসলাম আমাদের চোখের দেখার বাইরে ও ঊর্ধ্বেও অনেক বিষয় জানিয়েছে যা খোলা চোখে কিংবা অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও দেখা সম্ভব নয়। বরং তা দেখার জন্য কুরআন-সুন্নাহর দিকে তাকানো জরুরি, ওহির চোখে দেখা জরুরি। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে শহিদদের সম্পর্কে বলেছেন, ﴿وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُরজَقُونَ﴾ অর্থ : ‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের তোমরা মৃত ভেবো না। বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত, রিযিকপ্রাপ্ত।’ [আলে ইমরান : ১৬৯] অর্থাৎ দুনিয়াতে যারা আল্লাহর পথে শাহাদাত বরণ করে, দুনিয়াবাসীকে খালি চোখে তাদের মৃত্যুবরণ করতে দেখলেও আসলে তারা অমর। তারা মৃত্যুঞ্জয়ী। ফলে যখন তাদের কবরে রাখা হয় কিংবা তাদের রুহ আল্লাহর নির্দেশে যেখানে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে তারা জীবিত হয়ে আল্লাহর নেয়ামত উপভোগের সৌভাগ্য লাভ করেন। পার্থক্য এটুকু যে, আমরা মানুষ সেটা দেখতে পাই না, অনুভব করি না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ﴿وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِن لَّا تَشْعُرُونَ﴾ অর্থ : ‘আল্লাহর পথে যাদের প্রাণ যায়, তাদের তোমরা মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা বুঝতে পারো না।’ [বাকারা : ১৫৪]

ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, যখন তোমাদের ভাইয়েরা উহুদের যুদ্ধে শহিদ হলো, তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের রুহগুলো সবুজ পাখির পেটে প্রবেশ করিয়ে দিলেন। তারা জান্নাতের নদীগুলো থেকে পানি পান করছে। জান্নাতের ফল খাচ্ছে। আরশের ছায়ায় ঝুলন্ত প্রদীপের কাছে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। এভাবে যখন তারা জান্নাতের সুস্বাদু খাদ্য, পানীয় ও অবসর-বিনোদনের স্বাদ পেল, তখন বলে উঠল, আমরা যে জান্নাতে জীবিত আছি এবং পানাহার করছি এসব কথা কে আমাদের ভাইদের দুনিয়াতে পৌঁছিয়ে দেবে, যাতে তারা আমাদের কথা শুনে জিহাদে অমনোযোগী না হয় এবং যুদ্ধে ভীরুতা প্রদর্শন না করে? তখন আল্লাহ তায়ালা বললেন, আমিই তাদের তোমাদের অবস্থার কথা পৌঁছিয়ে দেবো। নবিজি (ﷺ) বলেন, তখন আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত নাযিল করেন, ﴿وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُواْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ ﴾ অর্থ : ‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের তোমরা মৃত ভেবো না। বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত, রিযিকপ্রাপ্ত।’ [আলে ইমরান : ১৬৯]৯৫১

এই যদি হয় উম্মাহর সাধারণ একজন সদস্যের ফযিলত, তবে নবি ও রাসুলের মর্যাদা কত বেশি সেটা সহজেই বোধগম্য হওয়ার কথা। উক্ত শহিদের ঈমান, আমল, জিহাদ, শাহাদাত সবকিছুর পিছনে তাঁর নবির অবদান রয়েছে। নবির হাতে সে মুসলমান হয়েছে, নবির উপর অবতীর্ণ কিতাবে সে ঈমান এনেছে, নবির কথার উপর ভরসা করে সে জিহাদের ময়দানে জীবন বিলিয়ে দিয়েছে, ফলে এসব পুণ্যে নবির পূর্ণ অংশ থাকবে। নবির মর্যাদা হবে তাঁর চেয়ে অনেক বেশি। সুতরাং শহিদ যদি মৃত্যুর পরে পাখি হয়ে ঘোরাফেরা করে, জান্নাতের খাদ্য ও পানাহার উপভোগ করে, তবে নবি-রাসুলরা যে এগুলো পাওয়ার এবং এরচেয়ে শতগুণ বেশি পাওয়ার উপযুক্ত, সেটা তো সুস্পষ্ট ও সুপ্রমাণিত বিষয়।

এটা কেবল গবেষণালব্ধ মতামত নয়; কুরআন-সুন্নাহর অনেক বক্তব্য দ্বারাও প্রমাণিত। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) একটি হাদিসে বলেছেন, ‘নবিগণ তাদের কবরে জীবিত। তারা নামায আদায় করেন।’৯৫২ মিরাজের রাতে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন মক্কা থেকে বোরাকের পিঠে করে বাইতুল মাকদিস যাচ্ছিলেন, তখন মুসা আলাইহিস সালামকে তাঁর কবরে নামায আদায় করতে দেখেছেন।৯৫৩ অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘আমি একদল নবিকে দেখতে পাই। মুসা আলাইহিস সালামকে নামায পড়তে দেখতে পাই। তিনি কোঁকড়াকেশী শানুআ গোত্রের লোকদের মতো ছিলেন। আমি ঈসা আলাইহিস সালামকে নামাযরত দেখতে পাই। তাকে দেখতে হুবহু উরওয়া ইবনে মাসউদের মতো লাগছিল। আমি ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে নামাযরত দেখতে পাই। তাকে আমার মতো লাগছিল।’৯৫৪ বরং রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন ঊর্ধ্বজগতে গেলেন, সেখানে বিভিন্ন আকাশে নামাযরত এসব নবি এবং তারা ছাড়াও বিভিন্ন নবিকে দেখতে পান। মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী প্রথম আকাশে আদম, দ্বিতীয় আকাশে ঈসা, তৃতীয় আকাশে ইউসুফ, চতুর্থ আকাশে ইদরিস, পঞ্চম আকাশে হারুন, ষষ্ঠ আকাশে মুসা এবং সপ্তম আকাশে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সঙ্গে তিনি মুলাকাত করেন। অর্থাৎ, প্রথমে মুসা আলাইহিস সালামকে কবরে নামায পড়তে দেখেন, আবার ষষ্ঠ আকাশেও তাঁর সঙ্গে মুলাকাত করেন। বরং তাঁর অনুরোধেই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে আমাদের দৈনন্দিন ফরয নামায পঞ্চাশ ওয়াক্ত থেকে পাঁচ ওয়াক্তে নামিয়ে আনেন।৯৫৫

এসব অদৃশ্য জগতের কথা। ফলে এগুলোকে কাল্পনিক ঘটনা ভাবা যাবে না। আবার এগুলোর ব্যাপারে মনগড়া ব্যাখ্যাও দেওয়া যাবে না। বরং একজন সাচ্চা মুমিন হিসেবে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল (ﷺ) থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত সবকিছু বিনা বাক্যে গ্রহণ করে নিতে হবে। এখানেই একজন বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীর পার্থক্য। বিভিন্ন কুযুক্তির কারণে অতীত ও সমকালীন অনেক পণ্ডিত দাবিদার লোকজন মিরাজকে অস্বীকার করেছে। এগুলো কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিমুখতা ও বিবেক-বুদ্ধির উপর নির্ভরতার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘনের কুফল। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন。

মোটকথা, মত্যুই শেষ নয়। বরং মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষ অমরত্বের মাঝে প্রবেশ করে। নবিদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও বিস্তৃত ও ব্যাপক। ফলে নবিগণ মৃত্যুর পরও জীবিত। ভূপৃষ্ঠের জীবনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাদৃশ্য না রাখলেও তাদের জীবন অত্যন্ত পরিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সেটা বোঝা যায়। একটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা আমার উপর সালাম পাঠ করো। কেননা, তোমরা যেখানেই থাকো, তোমাদের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।’৯৫৬ স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায় যে, আমাদের এবং আমাদের পিতার নাম-পরিচয়সহ রাসুলুল্লাহর কাছে সালাম পৌঁছে দেওয়া হয় এবং তিনি আমাদের উপর সন্তুষ্ট হন আর দোয়া করেন। পরকালে হয়তো এ ভিত্তিতে শাফায়াতও করবেন। নতুবা সালাম পৌঁছে দেওয়ার বিশেষ কোনো অর্থ থাকে না। বরং আরেক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার উপর দূর থেকে সালাম পাঠ করে, সেটা আমাকে পৌঁছে দেওয়া হয়। আর যে ব্যক্তি আমার উপর আমার কবরের কাছে এসে সালাম দেয়, আমি সেটা শুনতে পাই।’৯৫৭ ফলে কবরের ভিতর থেকে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের আওয়াজ শোনেন এবং কে সালাম দিলো সেটাও জানেন। বরং আবু দাউদে আবু হুরাইরা রাযি.-এর হাদিসে আরও স্পষ্টভাবে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যখন কোনো মুসলিম আমাকে সালাম দেয়, আল্লাহ আমার রুহ ফিরিয়ে দেন, আমি তাঁর সালামের জবাব দিই।’৯৫৮

আরও একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমাদের সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। এ দিন আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এ দিন তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। এ দিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে। এ দিন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং এ দিন তোমরা আমার উপর বেশি বেশি সালাম পাঠ করো। কেননা, তোমাদের দরুদ-সালাম আমার কাছে পেশ করা হয়। সাহাবাগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, কীভাবে পেশ করা হয়, অথচ আপনার তখন মাটিতে মিশে যাওয়ার কথা? রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আল্লাহ তায়ালা মাটির উপর নবিদের দেহভক্ষণ হারাম করে দিয়েছেন। ’৯৫৯ বাযযারের বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘আমার জীবন তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আমার মৃত্যুও তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আমার জীবন কল্যাণকর এভাবে যে, আমি তোমাদের সঙ্গে কথা বলি, তোমরা আমার সঙ্গে কথা বলতে পারো। আর মৃত্যু কল্যাণকর এভাবে যে, আমার কাছে তোমাদের আমল পেশ করা হয়। তাতে ভালো কিছু দেখলে আল্লাহর প্রশংসা করি, মন্দ দেখলে তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করি।’৯৬০

এসব হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, নবিদের কবরের জীবন, যাকে ‘বারযাখি জীবন’ বলা হয়, সাধারণ মানুষের বারযাখি জীবনের তুলনায় অনেক বেশি পরিপূর্ণ, বিস্তৃত ও মাহাত্ম্যপূর্ণ। ফলে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা জরুরি। রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে মহব্বত করা, তাঁর অনুসরণ করা জরুরি, যাতে প্রত্যেক শুক্রবার যখন তাঁর কাছে আমাদের সালাম পেশ করা হয়, তিনি আমাদের উপর সন্তুষ্ট হন, দোয়া করেন। পরকালে এগুলো আমাদের জন্য তাঁর শাফায়াত প্রাপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়。

সতর্কতা : কিন্তু এসব হাদিস থেকে ভুল ব্যাখ্যা গ্রহণের সুযোগ নেই। নবি-রাসুলগণ কবরে জীবিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে আমাদের আমলনামা পেশ করা হয়, সালাম পেশ করা হয়, কবরের কাছে গিয়ে সালাম দিলে তিনি সালাম শুনতে পান, তাই তাঁর কবরের জীবনকে হুবহু দুনিয়ার জীবনের মতো মনে করা, তাঁর কবরের কাছে গিয়ে দরুদ-সালামের পরিবর্তে সন্তান-সম্পদ ও সুখ-সৌভাগ্য প্রার্থনা করা কিংবা পরকালে জান্নাত চাওয়ার কোনো বৈধতা নেই। কারণ, এখানে হাদিসে যেসব বিষয় বলা হয়েছে, সেগুলো স্বাভাবিক জীবন ও যুক্তিভিত্তিক বাস্তবতা নয়। বরং এগুলো যুক্তির ঊর্ধ্বে এক অদৃশ্য জগতের কথা, যার বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেই। ফলে কুরআন-সুন্নাহতে যতটুকু এসেছে, ততটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। সীমালঙ্ঘন করা যাবে না।

দুঃখজনকভাবে একদল লোক সীমালঙ্ঘন করেছে। তারা কবরে থাকা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে ‘আলিমুল গায়েব’ তথা যাবতীয় অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী বানিয়ে দিয়েছে। তিনি আমাদের সকল আমল সম্পর্কে জানেন, আমাদের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে খবর রাখেন—মনে করেছে। অথচ দুনিয়ার জীবনেও তিনি এমন ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না। বরং আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কয়েক কদম দূরের বস্তু সম্পর্কেও তিনি জানতে পারতেন না। ‘যাতুর রিকা’ যুদ্ধে আয়েশা রাযি.-এর গলার হার হারিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত পেরেশান হন। সকল মুসলমানের যাত্রা বিলম্বিত হয়। পানির অভাবে তাদের তায়াম্মুম করে নামায পড়তে হয়। শেষ পর্যন্ত এক সাহাবি হারটি খুঁজে পান! অথচ রাসুলুল্লাহ(ﷺ) খুঁজে পাননি।৯৬১ ‘ইফকে’র ঘটনায় স্ত্রী আয়েশা রাযি.-এর নামে অপবাদ দেওয়া হয়। দীর্ঘ এক মাসের অধিক সময় রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর ব্যাপারে ওহির অপেক্ষা করেন। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত ও মর্মাহত থাকেন। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা আম্মাজান আয়েশার পবিত্রতা ও নির্মলতার সাক্ষ্য দিয়ে আয়াত নাযিল করেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সন্তুষ্ট হন। অথচ ওহি আসার আগ পর্যন্ত তিনি সত্যতা জানতে পারেননি।৯৬২ বিরে মাউনার ঘটনায় তিনি সত্তরজন সাহাবিকে ইসলাম প্রচারের জন্য পাঠান। তাদের জঘন্যভাবে হত্যা করা হয়। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এতটাই মর্মাহত হন যে, তিনি তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ত্রিশ দিন নামাযে বদদোয়া করেন।৯৬৩ এটা ছিল একটা ষড়যন্ত্রমূলক হত্যাকাণ্ড। তিনি যদি গায়েব জানতেন, তাহলে এমন পরিস্থিতি সহজেই এড়িয়ে যেতে পারতেন, কিন্তু পারেননি। কারণ, তিনি গায়েবের মালিক ছিলেন না। গায়েবের একমাত্র মালিক আল্লাহ তায়ালা। গায়েব থেকে আল্লাহ যতটুকু তাঁকে জানাতেন, তিনি ততটুকুই জানাতেন। এটাকে গায়েব জানা বলা হয় না। ফলে যে মানুষটি দুনিয়ার জীবনেও সর্বজ্ঞানী ছিলেন না, গায়েবের অধিকারী ছিলেন না, মৃত্যুর পরে কবরে থাকা অবস্থায় তাকে সর্বজ্ঞানী মনে করা, তিনি দুনিয়ার সবার অবস্থা সম্পর্কে জানেন, সবার কথা শোনেন এবং প্রয়োজন পূর্ণ করার ক্ষমতা রাখেন, সব জায়গায় উপস্থিত হন এবং সবকিছু দেখেন (হাজির-নাজির) বলে বিশ্বাস করা সীমালঙ্ঘন ছাড়া আর কী হতে পারে?

উপরন্তু এখানে আরও যে ভয়ংকর অবস্থা তৈরি হয় তা হলো, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন মুজিযার ক্ষেত্রে অন্যান্য মানুষকেও শরিক করা। ফলে পির-মাশায়েখের ক্ষেত্রেও উপরের বিশ্বাসগুলো রাখা হয়। কারামতের নামে তাদের সকল খবর সম্পর্কে জ্ঞাত দাবি করা হয়। অথচ এগুলো সুস্পষ্ট বিচ্যুতি। সাহাবায়ে কেরাম কিংবা পরবর্তী সময়ের সাধারণ ওলি-আউলিয়াদের কারও কারও ব্যাপারে কবরে নামায কিংবা কুরআন তেলাওয়াতের কথা এলেও সেগুলো তাদের কারামত বিবেচিত হবে এবং বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হওয়াসাপেক্ষে যেটুকু এসেছে সেটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। কিন্তু তারা আমাদের আমল সম্পর্কে জানেন, সালাম দিলে শোনেন বা জবাব দেন-এমন কোনো বৈশিষ্ট্যের কথা কুরআন-সুন্নাহতে আসেনি। বরং এগুলো রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর একক বৈশিষ্ট্য। আর কবরে বসে প্রয়োজন পূর্ণ করেন-এমন আকিদা কারও ব্যাপারেই রাখা যাবে না।৯৬৪

উপরন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, সকল চাওয়া-পাওয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ তায়ালা। যখন কিছু চাওয়ার, আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। বিপদে পড়লে আল্লাহর কাছে ছুটে যেতে হবে। দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যাণ ও সুখ-সৌভাগ্যের মালিক আল্লাহ তায়ালা; কোনো ফেরেশতা বা মানুষ নন। আল্লাহর পরিবর্তে কোনো মানুষকে—হোন তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)—যাবতীয় কল্যাণ-অকল্যাণের স্বতন্ত্র ও স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী মনে করা উম্মাহর মুহাক্কিক আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে শিরক। কবরকেন্দ্রিক যাবতীয় বাড়াবাড়ি ও বিচ্যুতির সূচনা এখান থেকেই। সুতরাং এ ব্যাপারে সতর্ক ও রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি রাখা আবশ্যক।

টিকাঃ
৯৫১. আবু দাউদ (কিতাবুল জিহাদ : ১৫২০)। মুসতাদরাকে হাকেম (কিতাবুল জিহাদ : ২৪৫৮)।
৯৫২. বাযযার (মুসনাদু আনাস ইবনে মালেক : ৬৮৮৮)। মুসনাদে আবি ইয়ালা (মুসনাদু আনাস ইবনে মালেক : ৩৪২৫)।
৯৫৩. মুসলিম (কিতাবুল ফাযায়েল : ২৩৭৫)। নাসায়ি (কিতাবু কিয়ামিল লাইল : ১/১৬৩০)। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আনাস ইবনে মালেক : ১২৬৯৯)।
৯৫৪. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ১৭২)।
৯৫৫. মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ১৬৩-১৬৪)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুল ইসরা : ৫০)।
৯৫৬. আবু দাউদ (কিতাবুল মানাসিক: ২০৪২)। হাদীসটির সনদ সহীহ। তা ছাড়া, উক্ত হাদিসের বেশ কিছু শাওয়াহিদ তথা কাছাকাছি বর্ণনা রয়েছে যা এর সত্যতাকে সমর্থন করে। ফলে হাদিসটি নির্ভরযোগ্য গণ্য করা হবে। মুসনাদে আহমদ (মুসনাদু আবি হুরাইরা : ৮৯২৬)। বাযযার (মুসনাদু আলি ইবনে আবি তালিব : ৫০৯)। মুসান্নাফে আবদির রাযযাক (কিতাবুস সালাত: ৪৮৩৯)।
৯৫৭. আবুশ শাইখের কিতাবুস সাওয়াবের উদ্ধৃতিতে ইবনে হাজার এটা বর্ণনা করেছেন এবং এর সনদকে ‘জাইয়িদ’ (ভালো) বলেছেন। দেখুন: ফাতহুল বারি (৬/৪৮৮)।
৯৫৮. আবু দাউদ (কিতাবুল মানাসিক: ২০৪১)। আলিমদের মতে এটার সনদও সহীহ। [দেখুন : আউনুল মাবুদ ২/১৬৯]।
৯৫৯. আবু দাউদ (কিতাবুস সালাত : ১০৪৭)। ইবনে মাজা (আবওয়াবু ইকামাতিস সালাত : ১০৮৫)। নাসায়ি (১/১৩৭৩)। মুসনাদে আহমদ (আউয়ালু মুসনাদিল মাদানিয়্যিন: ১৬৪১৩)। সহিহ ইবনে খুযাইমা (কিতাবুল জুমুআহ : ১৭৩৩)। দারেমি (কিতাবুস সালাত : ১৬১৩)। ইবনে হিব্বান (কিতাবুর রাকায়েক : ১১০)। উক্ত হাদিসটি বিশুদ্ধ। আবু দাউদ, নাসায়ি ও ইবনে মাজা তিন ইমামই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। ইবনে খুযাইমা, ইবনে হিব্বান ও হাকেম এটাকে সহিহ বলেছেন। হাকেম লিখেছেন, এটা বুখারির শর্ত মোতাবেক সহিহ (মুসতাদরাকে হাকেম : কিতাবুল জুমুআহ : ১০৩৪)।
৯৬০. মুসনাদে বাযযার (মুসনাদু আবদিল্লাহ ইবনে মাসউদ ১৯২৫)। আল-মাতালিবুল আলিয়াহ (কিতাবুল মানাকিব: ৩৮২৪) হাইসামি এটার সনদ সহিহ বলেছেন। যুরকানি ‘জাইয়িদ’ (ভালো) বলেছেন। [শরহুয যুরকানি আলাল মুওয়াত্তা ১/১৪৭]
৯৬১. মুয়াত্তা মালেক (১/৫৩: হাদিস নং ৮৯; তাহকিক: আবদুল বাকি)। বুখারি (কিতাবুত তায়াম্মুম ৩৩৪)। মুসলিম (কিতাবুল হায়েয : ৩৬৭)।
৯৬২. বুখারি (কিতাবুশ শাহাদাত: ২৬৬১)। মুসলিম (কিতাবুত তাওবা: ২৭৭০)।
৯৬৩. বুখারি (কিতাবুল জিহাদ: ৩০৬৪)। মুসলিম (কিতাবুল মাসাজিদ: ৬৭৭)।
৯৬৪. ইস্তিশফা তথা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কবরের কাছে গিয়ে তাঁর কাছে শাফায়াত প্রার্থনা করা, তিনি যেন পরকালে আল্লাহর কাছে শাফায়াত করেন এমন দোয়া চাওয়ার বৈধতা-অবৈধতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা দেখুন এই গ্রন্থের শেষ দিকে এবং অধমের ‘আকিদাহ তহাবিয়্যাহ’র ভাষ্যগ্রন্থে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00