📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 নবি-রাসূলের দাওয়াতের অভিন্নতা

📄 নবি-রাসূলের দাওয়াতের অভিন্নতা


আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে অসংখ্য নবি-রাসুল প্রেরণ করেছেন। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছে নবি পাঠিয়েছেন। যদিও বিভিন্ন রাসুলের শরিয়ত ভিন্ন ভিন্ন ছিল, তথাপি সকলের ঈমান ও আকিদা ছিল এক ও অভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُونَ ۖ فَمِنْهُم مَّنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُم مَّنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَالَةُ ۖ فَسِيْرُوْا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ ۞ অর্থ : ‘আল্লাহর ইবাদত এবং তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসুল পাঠিয়েছি। অতঃপর তাদের কতককে আল্লাহ হেদায়াত দিয়েছেন, আর কতকের উপর গোমরাহি অবধারিত হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং দেখো মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের পরিণাম কী হয়েছে।’ [নাহল : ৩৬] আরও বলেন, ۞ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ بِالْحَقِّ بَشِيرًا وَنَذِيرًا ۚ وَإِن مِّنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ ۞ অর্থ : ‘আমি আপনাকে সত্যসহ সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছি। বস্তুত প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মাঝেই সতর্ককারী গত হয়েছেন।’ [ফাতির : ২৪] অন্যত্র রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে লক্ষ্য করে বলেন, ۞ إِنَّمَا أَنْتَ مُنذِرٌ وَلِكُلِّ قَوْمٍ هَادٍ ۞ অর্থ : ‘আপনি তো একজন সতর্ককারী। আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য পথ-নির্দেশক রয়েছে।’ [রাদ : ৭]

ধারাবাহিক নবি পাঠানোর ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ۞ ثُمَّ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا تَتْرَىٰ ۖ كُلُّ مَا جَاءَ أُمَّةً رَّسُولُهَا كَذَّبُوهُ فَأَتْبَعْنَا بَعْضَهُم بَعْضًا وَجَعَلْنَاهُمْ أَحَادِيثَ ۚ فَبُعْدًا لِّقَوْمٍ لَّا يُؤْمِنُونَ ۞ অর্থ : ‘এরপর আমি একের পর এক আমার রাসুল প্রেরণ করেছি। যখনই কোনো জাতির নিকট রাসুল এসেছে, তখনই এরা তাকে মিথ্যাবাদী বলেছে। এরপর আমি এদের একের পর এককে ধ্বংস করলাম। আমি এদের কাহিনির বিষয় করেছি। সুতরাং ধ্বংস হোক অবিশ্বাসীরা।’ [মুমিনুন : ৪৪]

ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘সকল রাসুলের দ্বীন এক ও অভিন্ন। তাঁদের ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন ছিল না। কোনো নবি বা রাসুল তাঁর উম্মতকে পূর্বের রাসুলের দ্বীন পরিত্যাগের দাওয়াত দেননি। কারণ, তাঁদের সকলের দ্বীন এক। হ্যাঁ, শরিয়ত (শাখাগত বিধিবিধান) ভিন্ন ভিন্ন ছিল। তাই প্রত্যেক রাসুল তাঁর নিজস্ব শরিয়তের দিকে মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন, অন্য রাসুলদের শরিয়তের দিকে নয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেছেন, ۞ لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا ۚ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً ۞ অর্থ ‘আর আমি প্রত্যেকের জন্য শরিয়ত ও জীবন-বিধান তৈরি করেছি। আর তিনি যদি চাইতেন তবে সবাইকে একটি উম্মতে পরিণত করতেন।’ [মায়িদা : ৪৮] ফলে শরিয়তের ক্ষেত্রে নবি-রাসুলগণ এবং তাদের উম্মতরা ভিন্ন, কিন্তু তাওহিদের ক্ষেত্রে সবাই এক। আল্লাহ সবাইকে দ্বীন তথা তাওহিদের রজ্জুতে এক হতে বলেছেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন : ۞ شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ ۖ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ ۚ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ ۚ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ ۞ অর্থ : ‘তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সে পথই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নুহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহিম, মুসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না।’ [শুরা : ১৩] আল্লাহ আরও বলেন, ۞ فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا ۚ فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا ۚ لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّাসِ لَا يَعْلَمُونَ ۞ অর্থ : ‘তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো। এটাই আল্লাহর ফিতরত, যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই চিরন্তন সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।’ বোঝা গেল, নবিদের দ্বীন এক ও অভিন্ন। দ্বীনের মাঝে কখনোই কোনো পরিবর্তন আসেনি। কিন্তু শরিয়ত ভিন্ন ভিন্ন। ফলে শরিয়তের মাঝে পরিবর্তন এসেছে। এক শরিয়তে যেটা হালাল ছিল, অন্য শরিয়তে সেটা হারাম করা হয়েছে। এক উম্মতকে আল্লাহ একটি জিনিস করতে বলেছেন, আরেক উম্মতকে সেটা করতে নিষেধ করেছেন।’৯৩৭

ইমাম আজম বলেন, ‘ফলে দ্বীন হলো তাওহিদ। আল্লাহ সকল নবি-রাসুলকে অভিন্ন দ্বীন (তাওহিদ) দিয়ে পাঠিয়েছেন। এক্ষেত্রে মতভেদ করতে নিষেধ করেছেন। শরিয়ত হলো ফরয বিধিবিধান। আল্লাহ যেসব বিধিনিষেধ দান করেছেন, সেগুলোকে শরিয়ত বলা হবে; দ্বীন নয়। কারণ, সেগুলোকে যদি দ্বীন বলা হয়, তবে কেউ আল্লাহর কোনো ফরয বিধান (উদাহরণস্বরূপ নামায বা রোযা) ছেড়ে দিলেই বলা হতো যে, সে আল্লাহর দ্বীন পরিত্যাগ করেছে এবং সে কাফের গণ্য হতো। এতে বিবাহ, উত্তরাধিকার, জানাযা, যবেহ ইত্যাদি সবকিছু থেকে সে বঞ্চিত হতো। অথচ তেমন হয় না।’৯৩৮

টিকাঃ
৯৩৭. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১১-১২)।
৯৩৮. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১২)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 সকল নবির উপর ঈমান আনা আবশ্যক

📄 সকল নবির উপর ঈমান আনা আবশ্যক


যেহেতু সকল নবির ধর্ম ও দাওয়াতের মূল বিষয়বস্তু এক ও অভিন্ন, যেহেতু সকল নবি-রাসুল কেবল ইসলামের দিকেই দাওয়াত দিয়েছেন, ‘এ কারণে সকল নবির উপর ঈমান আনা জরুরি। কেউ যদি রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আনীত গোটা দ্বীনকে বিশ্বাস করে স্রেফ এটুকু বলে যে, মুসা ও ঈসা নবি ছিলেন কি না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই, তবে সে কাফের হয়ে যাবে।’৯৩৯

ইমাম তহাবি রহ. বলেন, ‘আমরা আল্লাহর প্রেরিত রাসুলগণের মাঝে কোনো পার্থক্য করি না। তাদের সবার আনীত পয়গামকে সত্য বলে মানি।’৯৪০

বাযদাবি লিখেন, ‘রাসুলদের মাঝে কোনো পার্থক্য করা যাবে না। কারও রিসালাত মেনে অন্যদের রিসালাত প্রত্যাখ্যান করা যাবে না, যেমনটা ব্রাহ্মণ, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা করেছে। কারণ, যে মানদণ্ডে একজনের রিসালাত মেনে নিতে হয়, সেই একই মানদণ্ডে অন্যদের রিসালাতও মেনে নিতে হবে। ফলে একজনকে অস্বীকার করা মানে সকল রাসুলকে অস্বীকার করা।’৯৪১ এ কারণেই ঈসা আলাইহিস সালাম ও মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে অস্বীকার করার কারণে ইহুদিরা কাফের। মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে অস্বীকার করার কারণে খ্রিষ্টানরা কাফের।

টিকাঃ
৯৩৯. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৭)।
৯৪০. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২২)।
৯৪১. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১০১)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 নবি-রাসূলগণের মর্যাদার তারতম্য

📄 নবি-রাসূলগণের মর্যাদার তারতম্য


নবি-রাসুলগণ সাধারণ মানুষের তুলনায় মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ। এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের প্রতিষ্ঠিত আকিদা। ইমাম আজম বলেন, ‘নবিগণ বিভিন্ন দিক থেকে আমাদের সাধারণ মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কারণ, তারা এমন কিছু বৈশিষ্ট্যেমণ্ডিত যা থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত। তন্মধ্যে সর্বপ্রথম হলো নবুওত ও রিসালাত। তারা এক্ষেত্রে সকল মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। দ্বিতীয়ত আল্লাহর ভয় এবং তাঁর প্রতি আশা। উত্তম চরিত্র-মাধুর্য। এগুলোর ক্ষেত্রেও তারা সকল মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তা ছাড়া, নবিগণ ফেরেশতা ও আল্লাহর বিস্ময়কর যেসব নিদর্শন দেখেছেন, সাধারণ মানুষ সেগুলো থেকেও বঞ্চিত। নবিগণ বিপদে-আপদে হতাশাগ্রস্ত হন না, ভেঙে পড়েন না। সাধারণ মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়, ভেঙে পড়ে। সবশেষে নবিগণ গুনাহের কারণে অন্যান্য সম্প্রদায়ের উপর আপতিত শাস্তির কথা জানেন। এটা গুনাহ এবং তাদের মাঝে প্রাচীর হিসেবে কাজ করে।’৯৪২

এভাবে নবিগণ পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষ, সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষ, সবচেয়ে মর্যাদাময় মানুষ, আল্লাহর সবচেয়ে কাছের মানুষ। তবে সকল নবির মর্যাদা সমান নয়। সকল নবি সম্মান এবং আল্লাহর নৈকট্যের ক্ষেত্রে সমন্তরে নন। কারণ, ওহি ও নবুওতপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এক হলেও দ্বীনের জন্য কুরবানি, মুজাহাদা, আল্লাহর ভালোবাসা, মনোনয়নসহ বিভিন্ন কারণে তাদের মাঝে মর্যাদার তারতম্য হয়ে থাকে। এটা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত এবং উম্মতের ইজমা তথা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। ফলে স্বাভাবিকভাবে সকল রাসুল সকল নবির চেয়ে উত্তম। কারণ, প্রত্যেক রাসুল নবি; কিন্তু প্রত্যেক নবি রাসুল নন। আবার রাসুলগণের মাঝ থেকেও সবার মর্যাদা সমান নয়। বরং কিছু রাসুল কিছু রাসুলের চেয়ে উত্তম। ইমাম তহাবি রহ. বলেন, ‘আমরা পূর্ণ বিশ্বাস, সত্যায়ন ও সমর্পণপূর্বক ঘোষণা করছি, আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে খলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। আমরা ফেরেশতা, নবিগণ, রাসুলদের উপর অবতীর্ণ সকল আসমানি গ্রন্থে ঈমান রাখি। আমরা সাক্ষ্য দিই যে, তারা সুস্পষ্ট সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।’৯৪৩ ইমাম তহাবির কথায় স্পষ্ট যে, সকল নবির মর্যাদা সমস্তরে নয়। বরং নবিদের মাঝ থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ), ইবরাহিম ও মুসা আলাইহিমাস সালামের মর্যাদা অন্যদের তুলনায় অনেক ঊর্ধ্বে। এ জন্য আল্লাহ তাদের যা দান করেছেন অন্যদের তা দান করেননি。

নবি-রাসুলের পারস্পরিক মর্যাদার পার্থক্য কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত ও বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ বলেন, ۞ تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ ۘ مِنْهُم مَّن كَلَّمَ اللَّهُ ۖ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ ۞ অর্থ : ‘এই রাসুলগণ আমি তাদের কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। তাদের কারও সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা কথা বলেছেন। তাদের কতককে তিনি উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন।’ [বাকারা : ২৫৩] অন্য আয়াতে বলেন, ۞ وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّينَ عَلَىٰ بَعْضٍ ۞ অর্থ : ‘আর আমি কতক নবিকে কতক নবির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’ [ইসরা : ৫৫]

টিকাঃ
৯৪২. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৫)।
৯৪৩. দেখুন: আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০)।

📘 ইমাম আজমের আকিদা > 📄 সর্বশ্রেষ্ঠ পাঁচজন রাসূল

📄 সর্বশ্রেষ্ঠ পাঁচজন রাসূল


রাসুলদের মাঝে মর্যাদাগত তারতম্য আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের প্রতিষ্ঠিত আকিদা। আহলে সুন্নাতের আরেকটি প্রতিষ্ঠিত আকিদা হলো, রাসুলদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল হচ্ছেন পাঁচজন, কুরআনে যাদের ‘উলুল আযমি মিনার রুসুল’ তথা ‘দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী রাসুল’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। তারা হলেন নুহ, ইবরাহিম, মুসা, ঈসা ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহিম ওয়া সাল্লাম)। তারা অন্যান্য রাসুলের চেয়ে আল্লাহর পথে বেশি মেহনত ও মুজাহাদা করেছেন। তা ছাড়া, অন্যদের তুলনায় পৃথিবীতে তাদের মুজাহাদার ফলাফল বেশি। আল্লাহর প্রতি তাদের নিষ্ঠা ও মহব্বতও বেশি। তাই আল্লাহ তাদের বেশি ভালোবেসেছেন, তাদের বেশি মর্যাদা দান করেছেন।

এটা কুরআনের একাধিক জায়গায় আল্লাহ তায়ালা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ۞ شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ ۖ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ ۗ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ ۚ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ ۞ অর্থ : ‘তিনি তোমাদের জন্য সেই দ্বীন নির্ধারণ করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নুহকে, আর যা আমি ওহি করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহিম, মুসা ও ঈসার প্রতি এ মর্মে যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করো এবং তাতে মতভেদ করো না।’ [শুরা : ১৩] আরেক আয়াতে বলেন, ۞ وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُّوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ۞ অর্থ : ‘যখন আমি নবিগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম, আপনার কাছ থেকে এবং নুহ, ইবরাহিম, মুসা ও মরিয়ম তনয় ঈসার কাছ থেকে।’ [আহযাব : ৭]

উক্ত পাঁচজন শ্রেষ্ঠ হওয়ার অর্থ তারা সবাই সমস্তরের নন, বরং অন্যদের চেয়ে যেমন তাদের মর্যাদা আলাদা, ঠিক তেমন তাদের মাঝ থেকে একেকজনের মর্যাদা অন্যদের তুলনায় বেশি। ফলে উক্ত পাঁচজনের মাঝে সর্বসম্মতিক্রমে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন মুহাম্মাদ (ﷺ)। স্বয়ং কুরআনের উপরের আয়াত থেকেও এটা প্রমাণিত। আল্লাহ বলেন, ۞ وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُّوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ۞ অর্থ : ‘যখন আমি নবিগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম, আপনার কাছ থেকে এবং নুহ, ইবরাহিম, মুসা ও মরিয়ম তনয় ঈসার কাছ থেকে।’ [আহযাব : ৭] এখানে দেখুন, চারজন রাসুলকে ঐতিহাসিক পালাক্রমে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু মুহাম্মাদ (ﷺ) সবার শেষে হওয়া সত্ত্বেও আগে উল্লেখ করেছেন। কারণ, তিনি শেষে এলেও মর্যাদার দিক থেকে বাকি চারজনের আগে।

তা ছাড়া, তিনি গোটা বিশ্বের কাছে রাসুল হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন, অথচ অন্যান্য নবি-রাসুলের দাওয়াত তাদের নিজস্ব সম্প্রদায়ের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। অন্যান্য নবি-রাসুলের দাওয়াত ছিল সাময়িক, পরবর্তী রাসুল আসার আগ পর্যন্ত। এভাবে স্থান ও কাল উভয় দিক থেকেই তাদের রিসালাত সীমাবদ্ধ ছিল। বিপরীতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রিসালাত গোটা বিশ্বজগৎ বিস্তৃত। কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। ফলে কাল ও স্থান সকল সীমার ঊর্ধ্বে তাঁর রিসালাত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا ۞ অর্থ : ‘বরকতময় সেই সত্তা (আল্লাহ তায়ালা) যিনি তাঁর বান্দার উপর সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি গোটা বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হন।’ [ফুরকান : ১] অন্য আয়াতে বলেন, ۞ وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ ۞ অর্থ : ‘আমি আপনাকে গোটা বিশ্ববাসীর জন্য কেবল রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি।’ [আম্বিয়া : ১০৭]

হাদিসে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘আমাকে ছয়টি জিনিসের মাধ্যমে সকল নবির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে—এক. আমাকে স্বল্প কথায় অধিক মর্ম পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে; দুই. দুশমনের অন্তরে ভয় ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে (ফলে দূর থেকে শত্রু তার আগমনের কথা শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ত); তিন. আমার জন্য গনিমত হালাল করা হয়েছে; চার. গোটা ভূপৃষ্ঠ আমার জন্য পবিত্রতার মাধ্যম এবং সিজদায় জায়গা বানানো হয়েছে; পাঁচ. আমাকে গোটা সৃষ্টির কাছে রাসুল হিসেবে পাঠানো হয়েছে; ছয়. আমার মাধ্যমে নবিদের ধারাবাহিকতা সমাপ্ত করা হয়েছে।’৯৪৪

আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘আমি কিয়ামতের দিন গোটা আদম সন্তানের নেতা হব। সর্বপ্রথম আমার কবর বিদীর্ণ হবে। আমি সর্বপ্রথম সুপারিশ করব। সর্বপ্রথম আমার সুপারিশ কবুল করা হবে।’৯৪৫ ইবনে আব্বাস সূত্রে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিমকে খলিল তথা পরম প্রিয় বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মুসাকে তিনি নাজি তথা তাঁর সঙ্গে কথোপকথনকারী হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ঈসা হচ্ছেন তাঁর দেওয়া রুহ এবং তাঁর নির্দেশ (কালিমা)। আদম তাঁর মুস্তফা তথা মনোনীত। আর আমি তাঁর হাবিব তথা প্রিয় বন্ধু; গর্ব নেই, গর্ব নেই। আমিই কিয়ামতের দিন আল্লাহর প্রশংসার ঝান্ডাধারী হবো। আমিই কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম শাফায়াত করব আর সর্বপ্রথম আমার শাফায়াতই গৃহীত হবে; গর্ব নেই। আমি সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজার কড়া নাড়ব এবং আমার জন্য আল্লাহ তা খুলে দেবেন। আমাকে সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করাবেন; গর্ব নেই। আমার সাথে থাকবে দরিদ্র মুমিনরা। আমিই ইহকাল ও পরকাল, প্রথম যুগ ও শেষ যুগ সকল মানুষের মাঝে শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত। এতে গর্ব নেই।’৯৪৬

দ্বিতীয় সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। এটা বিভিন্ন আয়াত ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন—কুরআনে আল্লাহ তায়ালা একাধিক জায়গায় ইবরাহিম আলাইহিস সালামের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا ۞ অর্থ : ‘আল্লাহ ইবরাহিমকে খলিল (পরম বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করেছেন। [নিসা : ১২৫] কুরআনে তাকে একাই এক উম্মাহ (জাতি) বলা হয়েছে, তাওহিদবাদীদের ইমাম বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ۞ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتًا لِّلَّهِ حَنِيفًا وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ۞ অর্থ : ‘ইবরাহিম ছিলেন একটি জাতি। আল্লাহর একনিষ্ঠ বন্দেগিকারী। তিনি মুশরিক ছিলেন না।’ [নাহল : ১২০] একব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে ডাক দেয়, হে সৃষ্টির সর্বোত্তম। তখন রাসুলুল্লাহ বলেন, ‘তিনি ইবরাহিম’।৯৪৭

মুহাম্মাদ (ﷺ) ও ইবরাহিম আলাইহিস সালামের পরে হচ্ছেন নুহ, মুসা ও ঈসা আলাইহিমাস সালাম। তবে শেষোক্ত তিনজনের মাঝে কে শ্রেষ্ঠ সে সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহতে সুস্পষ্ট বর্ণনা নেই। ফলে বিষয়টি মতভেদপূর্ণ থাকবে। এ ব্যাপারে নীরব-নিরপেক্ষ থাকা উচিত হবে। সাফারিনি লিখেন, ‘মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পরে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম সৃষ্টির সর্বোত্তম। এটা মুসলমানদের সর্বসম্মত মতামত। সুতরাং ইবরাহিম আলাইহিস সালাম মুসা আলাইহিস সালামের চেয়ে উত্তম। তবে শেষ তিন জনের মাঝে কে উত্তম সেটা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।’ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কোনো দলিল পাইনি। তবে আমার কাছে মনে হয়, প্রথমে মুসা আলাইহিস সালাম, অতঃপর ঈসা আলাইহিস সালাম এবং সর্বশেষ নুহ আলাইহিস সালাম। কোনো কোনো আলেমের মতে, মুসাকে নুহ ও ঈসার আগে আনার কারণ হচ্ছে, তিনি আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। তবে সুনিশ্চিত হওয়া যায় না এমন বিষয়ে নিরপেক্ষ থাকাই উত্তম।’৯৪৮

টিকাঃ
৯৪৪. মুসলিম (কিতাবুল মাসাজিদ: ৫২৩)। তিরমিযি (আবওয়াবুস সিয়ার: ১৫৫৩)।
৯৪৫. মুসলিম (কিতাবুল ফায়ায়েল: ২২৭৮)। আবু দাউদ (কিতাবুস সুন্নাহ: ৪৬৭৩)।
৯৪৬. তিরমিযি (আবওয়াবুল মানাকিব: ৩৬১৬)। মুসনাদে দারেমি (মুকাদ্দিমাতুল মুআল্লিফ: ৪৮)।
৯৪৭. মুসলিম (কিতাবুল ফাযায়েল: ২৩৬৯)। তিরমিযি (আবওয়াবু তাফসিরিল কুরআন : ৩৩৩২)।
৯৪৮. লাওয়ামিউল আনওয়ার, সাফারিনি (২/৩০০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00