📄 আদম আ. নবি ছিলেন, রাসূল নন
মুতাযিলাদের খণ্ডন করতে গিয়ে বাযদাবি লিখেন, ‘মুসলমানদের বিশ্বাস হলো—আদম আলাইহিস সালাম রাসুল ছিলেন। তিনি তার মতের পক্ষে কুরআনের এই আয়াত দিয়ে দলিল দেন : ۞ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَىٰ آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ ۞ অর্থ: ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ আদম, নুহ, ইবরাহিমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে সমস্ত জগতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।’ [আলে ইমরান: ৩৩] বাযদাবি বলেন, ‘রাসুল হচ্ছেন মনোনীত ব্যক্তি। এই মনোনয়ন সকল রাসুলের বৈশিষ্ট্য। আর এখানে তাকে নুহের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। নুহ রাসুল ছিলেন। সুতরাং আদমও রাসুল।’ তা ছাড়া, তিনি যুক্তি দেন, আদমের সঙ্গে হাওয়া ছিলেন, পরবর্তীকালে তাদের সন্তানগণ ছিলেন। তাদের প্রত্যেকের রিসালাত দরকার ছিল। বরং আদমের নিজেরও বিধিবিধান জানা জরুরি ছিল। ফলে তিনি রাসুল ছিলেন।’৯৩৪ প্রশ্ন হলো, এটা কতটুকু সঠিক বক্তব্য?
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা আদম আলাইহিস সালামের ব্যাপারে বিভিন্ন জায়গায় লম্বা আলোচনা করলেও তিনি তাঁর ব্যাপারে ‘নবি’ বা ‘রাসুল’ কোনো শব্দ ব্যবহার করেননি। তবে তাঁর শানে ‘ইস্তিফা’ (নির্বাচন, মনোনয়ন) সহ এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন যা তাঁর নবি হওয়ার প্রমাণ। বিভিন্ন জায়গায় তাঁকে বড় বড় নবি-রাসুলের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন [আলে ইমরান: ৩৩]। তাঁকে সরাসরি সম্বোধন করেছেন, নাম ধরে ডেকেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ ۞ অর্থ : ‘আর আমি বললাম, হে আদম, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো এবং যেথা ইচ্ছা স্বাচ্ছন্দ্যে আহার করো। কিন্তু এ বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না। হলে তোমরা অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ [বাকারা: ৩৫] ফলে আদম আলাইহিস সালাম যে নবি ছিলেন এটা অনেকটা শক্তিশালী হয়। একটি দুর্বল হাদিসেও সরাসরি তাঁকে নবি বলা হয়েছে।৯৩৫ কুরআনের সমর্থনে থাকার কারণে সেটা গ্রহণ করা যায়।
মোটকথা, আদম আলাইহিস সালাম নবি ছিলেন এটা একরকম সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। এ ব্যাপারে উম্মাহর সকল মুহাক্কিক একমত। তবে তাঁর রিসালাত প্রমাণিত নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম তাঁকে ‘রাসুল’ বলেননি। বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারাও তাঁর রাসুল না হওয়ার বিষয়টাই বোঝা যায়। যেমন-কিয়ামতের দিন শাফায়াতসংক্রান্ত লম্বা হাদিসে নুহ আলাইহিস সালামকে পৃথিবীর সর্বপ্রথম রাসুল সাব্যস্ত করা হয়েছে।৯৩৬ এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, আদম আলাইহিস সালাম নুহ আলাইহিস সালামের আগে ছিলেন। ফলে তিনি রাসুল হলে নুহকে সর্বপ্রথম রাসুল বলা ভুল। এতে প্রমাণিত হয়, আদম আলাইহিস সালাম কেবল নবি ছিলেন, আর নুহ আলাইহিস সালাম ছিলেন পৃথিবীর সর্বপ্রথম রাসুল।
তা ছাড়া, আদম আলাইহিস সালামের দাওয়াত ও তাবলিগের প্রকৃতিও তাঁর নবুওতের প্রমাণ; রিসালাতের প্রমাণ বহন করে না। কারণ, তিনি পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানব। তাঁর বংশধরদের মাঝেই তিনি দাওয়াত, তালিম ও তরবিয়তের কাজ করেছেন। বিরুদ্ধবাদী ও কাফের-মুশরিক সম্প্রদায়ের মোকাবিলা করতে হয়নি তাঁকে। উপরন্তু তাঁর সময়ে শিরকের প্রকাশই ঘটেনি। বরং সকল মানুষ বিশুদ্ধ তাওহিদের উপর ছিল। হাজার হাজার বছর পরে শিরকের সর্বপ্রথম প্রাদুর্ভাব ঘটে নুহ আলাইহিস সালামের সময়ে। ফলে দাওয়াতের জন্য রাসুলদের যে জিহাদ ও সংগ্রাম করতে হয়, কাফের ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে তাদের যে নানা ফ্রন্টে লড়াই করতে হয়, সেটা আদম আলাইহিস সালামকে করতে হয়নি। এর মাধ্যমেও প্রমাণিত হয় তিনি একজন নবি ছিলেন, রাসুল ছিলেন না。
টিকাঃ
৯৩৪. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৯৯-১০০)।
৯৩৫. মুসনাদে আহমদ (মুসনাদুল আনসার: ২১৯৪৭)। বাযযার (মুসনাদু আবি যর গিফারি : ৪০৩৪)।
৯৩৬. বুখারি (কিতাবু তাফসিরিল কুরআন: ৪৪৭৬)। মুসলিম (কিতাবুল ঈমান: ১৯৩)।
📄 নবি-রাসূলের দাওয়াতের অভিন্নতা
আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে অসংখ্য নবি-রাসুল প্রেরণ করেছেন। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছে নবি পাঠিয়েছেন। যদিও বিভিন্ন রাসুলের শরিয়ত ভিন্ন ভিন্ন ছিল, তথাপি সকলের ঈমান ও আকিদা ছিল এক ও অভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ۞ وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُونَ ۖ فَمِنْهُم مَّنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُم مَّنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَالَةُ ۖ فَسِيْرُوْا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ ۞ অর্থ : ‘আল্লাহর ইবাদত এবং তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসুল পাঠিয়েছি। অতঃপর তাদের কতককে আল্লাহ হেদায়াত দিয়েছেন, আর কতকের উপর গোমরাহি অবধারিত হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং দেখো মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের পরিণাম কী হয়েছে।’ [নাহল : ৩৬] আরও বলেন, ۞ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ بِالْحَقِّ بَشِيرًا وَنَذِيرًا ۚ وَإِن مِّنْ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٌ ۞ অর্থ : ‘আমি আপনাকে সত্যসহ সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছি। বস্তুত প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মাঝেই সতর্ককারী গত হয়েছেন।’ [ফাতির : ২৪] অন্যত্র রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে লক্ষ্য করে বলেন, ۞ إِنَّمَا أَنْتَ مُنذِرٌ وَلِكُلِّ قَوْمٍ هَادٍ ۞ অর্থ : ‘আপনি তো একজন সতর্ককারী। আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য পথ-নির্দেশক রয়েছে।’ [রাদ : ৭]
ধারাবাহিক নবি পাঠানোর ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ۞ ثُمَّ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا تَتْرَىٰ ۖ كُلُّ مَا جَاءَ أُمَّةً رَّسُولُهَا كَذَّبُوهُ فَأَتْبَعْنَا بَعْضَهُم بَعْضًا وَجَعَلْنَاهُمْ أَحَادِيثَ ۚ فَبُعْدًا لِّقَوْمٍ لَّا يُؤْمِنُونَ ۞ অর্থ : ‘এরপর আমি একের পর এক আমার রাসুল প্রেরণ করেছি। যখনই কোনো জাতির নিকট রাসুল এসেছে, তখনই এরা তাকে মিথ্যাবাদী বলেছে। এরপর আমি এদের একের পর এককে ধ্বংস করলাম। আমি এদের কাহিনির বিষয় করেছি। সুতরাং ধ্বংস হোক অবিশ্বাসীরা।’ [মুমিনুন : ৪৪]
ইমাম আজম রহ. বলেন, ‘সকল রাসুলের দ্বীন এক ও অভিন্ন। তাঁদের ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন ছিল না। কোনো নবি বা রাসুল তাঁর উম্মতকে পূর্বের রাসুলের দ্বীন পরিত্যাগের দাওয়াত দেননি। কারণ, তাঁদের সকলের দ্বীন এক। হ্যাঁ, শরিয়ত (শাখাগত বিধিবিধান) ভিন্ন ভিন্ন ছিল। তাই প্রত্যেক রাসুল তাঁর নিজস্ব শরিয়তের দিকে মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন, অন্য রাসুলদের শরিয়তের দিকে নয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেছেন, ۞ لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا ۚ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً ۞ অর্থ ‘আর আমি প্রত্যেকের জন্য শরিয়ত ও জীবন-বিধান তৈরি করেছি। আর তিনি যদি চাইতেন তবে সবাইকে একটি উম্মতে পরিণত করতেন।’ [মায়িদা : ৪৮] ফলে শরিয়তের ক্ষেত্রে নবি-রাসুলগণ এবং তাদের উম্মতরা ভিন্ন, কিন্তু তাওহিদের ক্ষেত্রে সবাই এক। আল্লাহ সবাইকে দ্বীন তথা তাওহিদের রজ্জুতে এক হতে বলেছেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন : ۞ شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ ۖ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ ۚ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ ۚ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ ۞ অর্থ : ‘তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সে পথই নির্ধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নুহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহিম, মুসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না।’ [শুরা : ১৩] আল্লাহ আরও বলেন, ۞ فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا ۚ فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا ۚ لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّাসِ لَا يَعْلَمُونَ ۞ অর্থ : ‘তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো। এটাই আল্লাহর ফিতরত, যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই চিরন্তন সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।’ বোঝা গেল, নবিদের দ্বীন এক ও অভিন্ন। দ্বীনের মাঝে কখনোই কোনো পরিবর্তন আসেনি। কিন্তু শরিয়ত ভিন্ন ভিন্ন। ফলে শরিয়তের মাঝে পরিবর্তন এসেছে। এক শরিয়তে যেটা হালাল ছিল, অন্য শরিয়তে সেটা হারাম করা হয়েছে। এক উম্মতকে আল্লাহ একটি জিনিস করতে বলেছেন, আরেক উম্মতকে সেটা করতে নিষেধ করেছেন।’৯৩৭
ইমাম আজম বলেন, ‘ফলে দ্বীন হলো তাওহিদ। আল্লাহ সকল নবি-রাসুলকে অভিন্ন দ্বীন (তাওহিদ) দিয়ে পাঠিয়েছেন। এক্ষেত্রে মতভেদ করতে নিষেধ করেছেন। শরিয়ত হলো ফরয বিধিবিধান। আল্লাহ যেসব বিধিনিষেধ দান করেছেন, সেগুলোকে শরিয়ত বলা হবে; দ্বীন নয়। কারণ, সেগুলোকে যদি দ্বীন বলা হয়, তবে কেউ আল্লাহর কোনো ফরয বিধান (উদাহরণস্বরূপ নামায বা রোযা) ছেড়ে দিলেই বলা হতো যে, সে আল্লাহর দ্বীন পরিত্যাগ করেছে এবং সে কাফের গণ্য হতো। এতে বিবাহ, উত্তরাধিকার, জানাযা, যবেহ ইত্যাদি সবকিছু থেকে সে বঞ্চিত হতো। অথচ তেমন হয় না।’৯৩৮
টিকাঃ
৯৩৭. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১১-১২)।
৯৩৮. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১২)।
📄 সকল নবির উপর ঈমান আনা আবশ্যক
যেহেতু সকল নবির ধর্ম ও দাওয়াতের মূল বিষয়বস্তু এক ও অভিন্ন, যেহেতু সকল নবি-রাসুল কেবল ইসলামের দিকেই দাওয়াত দিয়েছেন, ‘এ কারণে সকল নবির উপর ঈমান আনা জরুরি। কেউ যদি রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আনীত গোটা দ্বীনকে বিশ্বাস করে স্রেফ এটুকু বলে যে, মুসা ও ঈসা নবি ছিলেন কি না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই, তবে সে কাফের হয়ে যাবে।’৯৩৯
ইমাম তহাবি রহ. বলেন, ‘আমরা আল্লাহর প্রেরিত রাসুলগণের মাঝে কোনো পার্থক্য করি না। তাদের সবার আনীত পয়গামকে সত্য বলে মানি।’৯৪০
বাযদাবি লিখেন, ‘রাসুলদের মাঝে কোনো পার্থক্য করা যাবে না। কারও রিসালাত মেনে অন্যদের রিসালাত প্রত্যাখ্যান করা যাবে না, যেমনটা ব্রাহ্মণ, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা করেছে। কারণ, যে মানদণ্ডে একজনের রিসালাত মেনে নিতে হয়, সেই একই মানদণ্ডে অন্যদের রিসালাতও মেনে নিতে হবে। ফলে একজনকে অস্বীকার করা মানে সকল রাসুলকে অস্বীকার করা।’৯৪১ এ কারণেই ঈসা আলাইহিস সালাম ও মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে অস্বীকার করার কারণে ইহুদিরা কাফের। মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে অস্বীকার করার কারণে খ্রিষ্টানরা কাফের।
টিকাঃ
৯৩৯. আল-ফিকহুল আবসাত (৪৭)।
৯৪০. আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২২)।
৯৪১. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (১০১)।
📄 নবি-রাসূলগণের মর্যাদার তারতম্য
নবি-রাসুলগণ সাধারণ মানুষের তুলনায় মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ। এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের প্রতিষ্ঠিত আকিদা। ইমাম আজম বলেন, ‘নবিগণ বিভিন্ন দিক থেকে আমাদের সাধারণ মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কারণ, তারা এমন কিছু বৈশিষ্ট্যেমণ্ডিত যা থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত। তন্মধ্যে সর্বপ্রথম হলো নবুওত ও রিসালাত। তারা এক্ষেত্রে সকল মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। দ্বিতীয়ত আল্লাহর ভয় এবং তাঁর প্রতি আশা। উত্তম চরিত্র-মাধুর্য। এগুলোর ক্ষেত্রেও তারা সকল মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তা ছাড়া, নবিগণ ফেরেশতা ও আল্লাহর বিস্ময়কর যেসব নিদর্শন দেখেছেন, সাধারণ মানুষ সেগুলো থেকেও বঞ্চিত। নবিগণ বিপদে-আপদে হতাশাগ্রস্ত হন না, ভেঙে পড়েন না। সাধারণ মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়, ভেঙে পড়ে। সবশেষে নবিগণ গুনাহের কারণে অন্যান্য সম্প্রদায়ের উপর আপতিত শাস্তির কথা জানেন। এটা গুনাহ এবং তাদের মাঝে প্রাচীর হিসেবে কাজ করে।’৯৪২
এভাবে নবিগণ পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষ, সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষ, সবচেয়ে মর্যাদাময় মানুষ, আল্লাহর সবচেয়ে কাছের মানুষ। তবে সকল নবির মর্যাদা সমান নয়। সকল নবি সম্মান এবং আল্লাহর নৈকট্যের ক্ষেত্রে সমন্তরে নন। কারণ, ওহি ও নবুওতপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এক হলেও দ্বীনের জন্য কুরবানি, মুজাহাদা, আল্লাহর ভালোবাসা, মনোনয়নসহ বিভিন্ন কারণে তাদের মাঝে মর্যাদার তারতম্য হয়ে থাকে। এটা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত এবং উম্মতের ইজমা তথা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। ফলে স্বাভাবিকভাবে সকল রাসুল সকল নবির চেয়ে উত্তম। কারণ, প্রত্যেক রাসুল নবি; কিন্তু প্রত্যেক নবি রাসুল নন। আবার রাসুলগণের মাঝ থেকেও সবার মর্যাদা সমান নয়। বরং কিছু রাসুল কিছু রাসুলের চেয়ে উত্তম। ইমাম তহাবি রহ. বলেন, ‘আমরা পূর্ণ বিশ্বাস, সত্যায়ন ও সমর্পণপূর্বক ঘোষণা করছি, আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে খলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। আমরা ফেরেশতা, নবিগণ, রাসুলদের উপর অবতীর্ণ সকল আসমানি গ্রন্থে ঈমান রাখি। আমরা সাক্ষ্য দিই যে, তারা সুস্পষ্ট সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।’৯৪৩ ইমাম তহাবির কথায় স্পষ্ট যে, সকল নবির মর্যাদা সমস্তরে নয়। বরং নবিদের মাঝ থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ), ইবরাহিম ও মুসা আলাইহিমাস সালামের মর্যাদা অন্যদের তুলনায় অনেক ঊর্ধ্বে। এ জন্য আল্লাহ তাদের যা দান করেছেন অন্যদের তা দান করেননি。
নবি-রাসুলের পারস্পরিক মর্যাদার পার্থক্য কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত ও বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ বলেন, ۞ تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ ۘ مِنْهُم مَّن كَلَّمَ اللَّهُ ۖ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ ۞ অর্থ : ‘এই রাসুলগণ আমি তাদের কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। তাদের কারও সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা কথা বলেছেন। তাদের কতককে তিনি উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন।’ [বাকারা : ২৫৩] অন্য আয়াতে বলেন, ۞ وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّينَ عَلَىٰ بَعْضٍ ۞ অর্থ : ‘আর আমি কতক নবিকে কতক নবির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’ [ইসরা : ৫৫]
টিকাঃ
৯৪২. আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (১৫)।
৯৪৩. দেখুন: আকিদাহ তহাবিয়্যাহ (২০)।