📄 নবুওত ও রিসালাত চিরন্তন
নবি ও রাসুলের বৈশিষ্ট্য চিরন্তন। অর্থাৎ, নবির মৃত্যুর পরও তাঁর নবুওতের মর্যাদা অবশিষ্ট থাকে। রাসুলের ওফাতের পরও তাঁর রিসালাতের শ্রেষ্ঠত্ব বিদ্যমান থাকে। এগুলো কবর, হাশর এমনকি জান্নাতেও থাকবে। কারণ, এগুলো আল্লাহর চিরন্তন ও শাশ্বত অনুগ্রহ। এটা বোঝার জন্য গভীরে যাওয়া নিষ্প্রয়োজন। সাধারণ মুমিন ও ওলির বৈশিষ্ট্যও তো মৃত্যুর পরে অব্যাহত থাকে। আল্লাহর একজন ওলি কি মৃত্যুর পরে ফাসেক হয়ে যান? তার বেলায়াত ছিনিয়ে নেওয়া হয়? কখনোই নয়। তাহলে নবুওত ও রিসালাতের মর্যাদা কেন থাকবে না? বোঝা গেল, এটাও স্বাভাবিকভাবেই অব্যাহত থাকে। হ্যাঁ, দায়িত্ব থেকে তারা অব্যাহতি পান। এটা স্বাভাবিক। কারণ, দুনিয়া হচ্ছে কর্মস্থল, পরকাল সে কর্মের ফলাফল পাওয়ার জায়গা।
মুতাযিলারা বিশ্বাস করে, মৃত্যুর পরে নবি-রাসুলের বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব অবশিষ্ট থাকে না! এটা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য। একইভাবে একদল ভ্রান্ত সুফিরও ধারণা হলো, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নবুওত ও রিসালাত শেষ হয়ে যায়। এ কারণে তারা ওলিদের নবির চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে। এটাও চূড়ান্ত পর্যায়ের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য।৯৩০
টিকাঃ
৯৩০. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২২৯)।
📄 নারীরা কি নবি হতে পারে?
কোনো নারী নবি হতে পারেন কি না? এ ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই। সাহাবায়ে কেরাম এ ব্যাপারে কথা বলেননি। তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়িনও এটা নিয়ে কথা বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। ফলে এ ব্যাপারে ইমাম আজম রহ.-এর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। আকিদার গ্রন্থগুলো অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, খুব সম্ভবত আবুল হাসান আশআরি সর্বপ্রথম এ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি নারীদের নবি হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। পরবর্তীকালে একদল আলেম তাঁর অনুসরণ করেছেন। ৯৩১
এক্ষেত্রে তাদের দলিল হলো কুরআনের সেসব আয়াত, যেগুলোতে নারীদের কাছে ওহির আগমন এবং তাদের সঙ্গে ফেরেশতার কথোপকথন-সম্পর্কিত বয়ান পাওয়া যায়। যেমন—আল্লাহ তায়ালা মারইয়াম আলাইহিস সালামের কাছে জিবরিল আলাইহিস সালামকে মানুষের আকৃতিতে পাঠান। তিনি তাঁর সঙ্গে কথা বলেন [মারইয়াম : ১৬-২১]। আল্লাহ তায়ালা মুসা আলাইহিস সালামের মায়ের কাছে ওহি পাঠিয়েছেন [তহা : ৩৮]। ইসহাক আলাইহিস সালামের মাতা সারার কাছে ফেরেশতারা এসেছেন এবং কথা বলেছেন [হুদ : ৭১-৭৩]। এ ধরনের ঘটনা নবি ছাড়া অন্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘটে না। এ কারণৈ প্রথমোক্ত আলেমগণ পৃথিবীর প্রথম মানবী হাওয়া, মুসার মাতা, ঈসার মাতা মারইয়াম ও ফিরাউনের স্ত্রীকে নবি সাব্যস্ত করেছেন।
কিন্তু উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম উক্ত মতের বিরোধী। কারণ, কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা কোনো নারী নবি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় না। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে পঁচিশজন নবি-রাসুলের নাম উল্লেখ করলেও তাতে কোনো নারীর নাম নেই। ফেরেশতাদের সঙ্গে কথোপকথন কিংবা ওহি আগমনের কারণেও তাদের নিশ্চিতভাবে নবি বলা যায় না। এটা নারী জাতির ত্রুটি কিংবা তাদের প্রতি অবজ্ঞা নয়; বরং দাওয়াত ও তাবলিগের সঙ্গে নারীর প্রকৃতির একটা বড় রকমের অসামঞ্জস্যতা আছে, জিহাদ ও লড়াই-সংগ্রামের ক্ষেত্রে মাঠে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী প্রকৃতির একটা বৈপরীত্য আছে, ফলে আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহপূর্বক কোনো নারীর উপর এ ধরনের গুরুদায়িত্ব দেননি।
টিকাঃ
৯৩১. দেখুন: তালখিসুল আদিল্লাহ (১৬৬)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
এটা আলেমদের ইজতিহাদ। এ বিষয়ে প্রকৃত ও চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তায়ালার কাছে। যদিও কুরআনে কোনো নারীকে সরাসরি নবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, তথাপি ইসহাক আলাইহিস সালামের মাতা সারা, মুসা আলাইহিস সালামের মাতা [তাঁর নাম সুনিশ্চিতভাবে জানা যায় না], ঈসা আলাইহিস সালামের মাতা মারইয়াম প্রমুখ নারীকে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে যেভাবে উল্লেখ করেছেন, তাতে তারা পুরুষ হলে আলেমগণ নিশ্চিতভাবে তাদের নবি বলতেন। অর্থাৎ, যেসব আয়াতের মাধ্যমে একাধিক নবির নবুওত প্রমাণ করা হয়েছে, এসব আয়াতের ভাষ্য, বাকরীতি, সম্বোধনের তরিকা আর সেসব আয়াতের ভাষ্যের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। স্রেফ নারী হওয়ার কারণে এসব আয়াতকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা নিরপেক্ষ গবেষণার সামনে নড়বড়ে প্রমাণিত হয়। ফলে এসব নারী নবি হলেও হতে পারেন। জরুরি নয় যে, তাদের উপর পুরুষ নবিদের সমান দায়িত্ব থাকবে; বরং তাদের প্রকৃতির ভিন্নতার মতো তাদের দায়িত্বও পুরুষ নবিদের চেয়ে ভিন্ন হওয়া সম্ভব। তবে যেহেতু বিষয়টি মতভেদপূর্ণ এবং কুরআন-সুন্নাহতে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই, তাই এ বিষয়ের চূড়ান্ত জ্ঞান আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়াই উত্তম।
📄 হিন্দুধর্মের সঙ্গে ইবরাহিম আ.-এর কোনো সম্পর্ক নেই
হিন্দুরা কি ইসলামের কোনো নবিকে বিশ্বাস করে? আবুল ইউসর বাযদাবি লিখেন : “হিন্দুরা নুহ, ইবরাহিম ও ইদরিস আলাইহিমুস সালামের নবুওতে বিশ্বাস করে, অন্যান্য নবিকে অস্বীকার করে। ইবরাহিম আলাইহিস সালামের প্রতি বিশ্বাসের কারণে তাদের ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ’-এর অনুসারী বলা হয়।”৯৩২
বাযদাবির এই বক্তব্য দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং অনুমানভিত্তিক। শতাব্দের পর শতাব্দ কিছু মানুষ এমন ধারণা করে এসেছে। বর্তমানেও কিছু গবেষক এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু এটার কোনো ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সঙ্গে হিন্দুধর্মের কোনো প্রমাণিত ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। ব্রাহ্মণ্যবাদ আরবি (ابراها) থেকে উদ্গত। আর ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আরবি নিসবতি রূপ হচ্ছে (الإبراهيمي) ইবরাহিমি; ব্রাহ্মণ্য নয়। তা ছাড়া, ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জন্মস্থান ও বসবাসের স্থানের সঙ্গে ভারতের দূরতম সম্পর্ক নেই। তাঁর আনীত দ্বীনের সম্পর্ক তো মোটেই নেই। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাওহিদবাদীদের ইমাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ومَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَكِن كَانَ حَنِيفًا مُسْلِمًا وَمَا ﴿67 : 1321 ﴾art )كَানَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ অর্থ : ‘ইবরাহিম ইহুদি ছিলেন না, খ্রিষ্টানও ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ মুসলিম। তিনি কখনও মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।’ [আলে ইমরান : ৬৭] তাঁর আনীত শরিয়ত বিকৃত হয়ে যাওয়ার পরও মক্কার কাফেরদের মাঝে অনেককিছু অবশিষ্ট ছিল। নবুওতের আগে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ইবরাহিমি শরিয়ত মোতাবেক ইবাদত করতেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। বরং ইবরাহিমি শরিয়তের অনেক বিষয় পরবর্তীকালে ইসলামি শরিয়তেও অনুমোদিত হয়। এগুলো সব রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগের তথা ঈসায়ি ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দের চিত্র। অপরদিকে হিন্দুধর্ম শুরু থেকেই পৌত্তলিকতার ভাগাড়। খ্রিষ্টপূর্ব কয়েক হাজার বছর আগ থেকে ভারতের যে ভাঙাচোরা ইতিহাস পাওয়া যায়, সে সবকিছু পৌত্তলিকতা ও মূর্তিপূজায় ভরপুর। তাওহিদ ও মিল্লাতে ইবরাহিমির ছিটেফোঁটা নিদর্শন নেই সেখানে। ইবরাহিমি ধর্মের ন্যূনতম সাদৃশ্যও নেই তাতে।
হ্যাঁ, বেদসহ হিন্দুধর্মের বিভিন্ন প্রধান গ্রন্থে একত্ববাদের কিছু আভাস পাওয়া যায়, ইসলামের তাওহিদ ও নবি-রাসুলের বিশ্বাসের সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য পাওয়া যায়। এগুলো ভারতে আসা নবি-রাসুলের দাওয়াতের অবশিষ্ট ছটা। আল্লাহ তায়ালা যেহেতু পৃথিবীর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মাঝে নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন [নাহল : ৩৬; রাদ : ৭; ফাতির : ২৪] সুতরাং ভারতেও অবশ্যই নবি-রাসুল এসে থাকবেন। তারা ভারতবাসীকে আল্লাহর পথে, তাওহিদের দিকে ডেকে থাকবেন। পরবর্তীকালে তাওহিদের দাওয়াতে বিকৃতি এসেছে। ভারতবাসী তাওহিদ ভুলে পৌত্তলিকতার সাগরে তলিয়ে গিয়েছে। রয়ে গেছে পুরোনো তাওহিদের বিন্দু বিন্দু নিদর্শন, যেগুলো সেসব প্রাচীন নবি-রাসুলের দাওয়াত ও দীক্ষার ফল হয়ে থাকবে। কিন্তু ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সঙ্গে এগুলোর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ফলে ব্রাহ্মণ্যবাদের মূল দ্বীনে ইবরাহিম—এ ধারণার শরয়ি ও ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নেই। একই কথা প্রযোজ্য ভারতের অন্যান্য প্রসিদ্ধ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের ব্যাপারেও। ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে কিছু সাদৃশ্যের উপর ভর করে রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ প্রমুখকে নবি বলার সুযোগ নেই। তারা নবি হলেও হতে পারেন। কিন্তু আমাদের হাতে এর কোনো মজবুত দলিল নেই। ফলে আমরা তাদের নবি বলতে পারি না। ইসলামে কুরআন-সুন্নাহর বাইরে অন্য কারও জন্য নবুওত সাব্যস্ত করা বৈধ নয়।
শাহরাস্তানি সঠিক লিখেছেন, “একদল লোক মনে করেছে ‘ইবরাহিম’ আলাইহিস সালামের নামে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নাম হয়েছে। এটা ভুল ধারণা। এই সম্প্রদায় নবুওত ও রিসালাতে মোটেই বিশ্বাস করে না। ফলে ইবরাহিমকেও তারা নবি মনে না।”৯৩৩
টিকাঃ
৯৩২. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (৯৫)।
৯৩৩. আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, শাহরাস্তানি (৩/৯৫)।