📄 নবি-রাসূলদের সংখ্যা
আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে যত নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন, সবার উপর ঈমান আনতে হবে। নবি প্রমাণিত এমন কোনো একজনের নবুওত অস্বীকার করলে সে ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে। নবি ও রাসুলদের সংখ্যার ব্যাপারেও নানান বক্তব্য পাওয়া যায়। কারণ, কুরআন এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কিছু বলেননি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ﴾ وَরُسُلًا قَدْ قَصَصْنْهُمْ عَلَيْكَ مِنْ قَبْلُ وَরُসُلًا لَّمْ نَقْصُصْهُمْ عَلَيْكَ﴿ অর্থ : ‘আমি আপনার পূর্বে অনেক রাসুল পাঠিয়েছি যাদের কতক রাসুলের কথা আপনাকে বলেছি। অনেক রাসুলের কথা আপনাকে বলিনি।’ [নিসা : ১৬৪] নবি-রাসুলদের সংখ্যার ব্যাপারে যেসব হাদিস বর্ণিত আছে সেগুলো দুর্বল। তাই উত্তম হলো তাদের সংখ্যার ব্যাপারে নীরব থাকা।
বাযদাবি বলেন, “নবি-রাসুলদের ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বলা উচিত নয়। কারণ, এটা কুরআন-সুন্নাহতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয়। কুরআনে কেবল বলা হয়েছে, ﴾وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِّن قَبْلِكَ مِنْهُم মَّن قَصَصْنَا عَلَيْكَ وَمِنْهُم মَّن لَّمْ নَقْصُصْ ﴿অর্থ : ‘আমি আপনার পূর্বে অনেক রাসুল প্রেরণ করেছি। তাদের কারও কারও ঘটনা আপনার কাছে বিবৃত করেছি এবং কারও কারও ঘটনা আপনার কাছে বিবৃত করিনি।’ [গাফের : ৭৮] সুতরাং সকল নবি-রাসুলের উপর ঈমান আনাই যথেষ্ট; তাদের সংখ্যা জানা নিষ্প্রয়োজন।”৯২৮
নাসাফি লিখেন, (যেহেতু নবি-রাসুলের সংখ্যা চূড়ান্তরূপে জানা নেই) ‘সেহেতু নিরাপদ পন্থা হলো এভাবে বলা : আমি আল্লাহর উপর ঈমান রাখি, আল্লাহর পক্ষ থেকে যা-কিছু এসেছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যসহ তাতে বিশ্বাস করি। আমি আল্লাহর প্রেরিত সকল নবি-রাসুলের প্রতি ঈমান রাখি। এভাবে বললে যিনি নবি ছিলেন এমন কাউকে অবিশ্বাস করা হবে না; আবার যিনি নবি ছিলেন না এমন কাউকে নবি বানানো হবে না। ’৯২৯
টিকাঃ
৯২৮. উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২২৯)।
৯২৯. বাহরুল কালাম (২৮২)।
📄 নবুওত ও রিসালাত চিরন্তন
নবি ও রাসুলের বৈশিষ্ট্য চিরন্তন। অর্থাৎ, নবির মৃত্যুর পরও তাঁর নবুওতের মর্যাদা অবশিষ্ট থাকে। রাসুলের ওফাতের পরও তাঁর রিসালাতের শ্রেষ্ঠত্ব বিদ্যমান থাকে। এগুলো কবর, হাশর এমনকি জান্নাতেও থাকবে। কারণ, এগুলো আল্লাহর চিরন্তন ও শাশ্বত অনুগ্রহ। এটা বোঝার জন্য গভীরে যাওয়া নিষ্প্রয়োজন। সাধারণ মুমিন ও ওলির বৈশিষ্ট্যও তো মৃত্যুর পরে অব্যাহত থাকে। আল্লাহর একজন ওলি কি মৃত্যুর পরে ফাসেক হয়ে যান? তার বেলায়াত ছিনিয়ে নেওয়া হয়? কখনোই নয়। তাহলে নবুওত ও রিসালাতের মর্যাদা কেন থাকবে না? বোঝা গেল, এটাও স্বাভাবিকভাবেই অব্যাহত থাকে। হ্যাঁ, দায়িত্ব থেকে তারা অব্যাহতি পান। এটা স্বাভাবিক। কারণ, দুনিয়া হচ্ছে কর্মস্থল, পরকাল সে কর্মের ফলাফল পাওয়ার জায়গা।
মুতাযিলারা বিশ্বাস করে, মৃত্যুর পরে নবি-রাসুলের বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব অবশিষ্ট থাকে না! এটা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য। একইভাবে একদল ভ্রান্ত সুফিরও ধারণা হলো, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নবুওত ও রিসালাত শেষ হয়ে যায়। এ কারণে তারা ওলিদের নবির চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে। এটাও চূড়ান্ত পর্যায়ের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য।৯৩০
টিকাঃ
৯৩০. দেখুন: উসুলুদ্দিন, বাযদাবি (২২৯)।
📄 নারীরা কি নবি হতে পারে?
কোনো নারী নবি হতে পারেন কি না? এ ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই। সাহাবায়ে কেরাম এ ব্যাপারে কথা বলেননি। তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়িনও এটা নিয়ে কথা বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। ফলে এ ব্যাপারে ইমাম আজম রহ.-এর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। আকিদার গ্রন্থগুলো অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, খুব সম্ভবত আবুল হাসান আশআরি সর্বপ্রথম এ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি নারীদের নবি হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। পরবর্তীকালে একদল আলেম তাঁর অনুসরণ করেছেন। ৯৩১
এক্ষেত্রে তাদের দলিল হলো কুরআনের সেসব আয়াত, যেগুলোতে নারীদের কাছে ওহির আগমন এবং তাদের সঙ্গে ফেরেশতার কথোপকথন-সম্পর্কিত বয়ান পাওয়া যায়। যেমন—আল্লাহ তায়ালা মারইয়াম আলাইহিস সালামের কাছে জিবরিল আলাইহিস সালামকে মানুষের আকৃতিতে পাঠান। তিনি তাঁর সঙ্গে কথা বলেন [মারইয়াম : ১৬-২১]। আল্লাহ তায়ালা মুসা আলাইহিস সালামের মায়ের কাছে ওহি পাঠিয়েছেন [তহা : ৩৮]। ইসহাক আলাইহিস সালামের মাতা সারার কাছে ফেরেশতারা এসেছেন এবং কথা বলেছেন [হুদ : ৭১-৭৩]। এ ধরনের ঘটনা নবি ছাড়া অন্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘটে না। এ কারণৈ প্রথমোক্ত আলেমগণ পৃথিবীর প্রথম মানবী হাওয়া, মুসার মাতা, ঈসার মাতা মারইয়াম ও ফিরাউনের স্ত্রীকে নবি সাব্যস্ত করেছেন।
কিন্তু উম্মাহর সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম উক্ত মতের বিরোধী। কারণ, কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা কোনো নারী নবি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় না। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে পঁচিশজন নবি-রাসুলের নাম উল্লেখ করলেও তাতে কোনো নারীর নাম নেই। ফেরেশতাদের সঙ্গে কথোপকথন কিংবা ওহি আগমনের কারণেও তাদের নিশ্চিতভাবে নবি বলা যায় না। এটা নারী জাতির ত্রুটি কিংবা তাদের প্রতি অবজ্ঞা নয়; বরং দাওয়াত ও তাবলিগের সঙ্গে নারীর প্রকৃতির একটা বড় রকমের অসামঞ্জস্যতা আছে, জিহাদ ও লড়াই-সংগ্রামের ক্ষেত্রে মাঠে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী প্রকৃতির একটা বৈপরীত্য আছে, ফলে আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহপূর্বক কোনো নারীর উপর এ ধরনের গুরুদায়িত্ব দেননি।
টিকাঃ
৯৩১. দেখুন: তালখিসুল আদিল্লাহ (১৬৬)।
📄 অধমের পর্যবেক্ষণ
এটা আলেমদের ইজতিহাদ। এ বিষয়ে প্রকৃত ও চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তায়ালার কাছে। যদিও কুরআনে কোনো নারীকে সরাসরি নবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, তথাপি ইসহাক আলাইহিস সালামের মাতা সারা, মুসা আলাইহিস সালামের মাতা [তাঁর নাম সুনিশ্চিতভাবে জানা যায় না], ঈসা আলাইহিস সালামের মাতা মারইয়াম প্রমুখ নারীকে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে যেভাবে উল্লেখ করেছেন, তাতে তারা পুরুষ হলে আলেমগণ নিশ্চিতভাবে তাদের নবি বলতেন। অর্থাৎ, যেসব আয়াতের মাধ্যমে একাধিক নবির নবুওত প্রমাণ করা হয়েছে, এসব আয়াতের ভাষ্য, বাকরীতি, সম্বোধনের তরিকা আর সেসব আয়াতের ভাষ্যের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। স্রেফ নারী হওয়ার কারণে এসব আয়াতকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা নিরপেক্ষ গবেষণার সামনে নড়বড়ে প্রমাণিত হয়। ফলে এসব নারী নবি হলেও হতে পারেন। জরুরি নয় যে, তাদের উপর পুরুষ নবিদের সমান দায়িত্ব থাকবে; বরং তাদের প্রকৃতির ভিন্নতার মতো তাদের দায়িত্বও পুরুষ নবিদের চেয়ে ভিন্ন হওয়া সম্ভব। তবে যেহেতু বিষয়টি মতভেদপূর্ণ এবং কুরআন-সুন্নাহতে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই, তাই এ বিষয়ের চূড়ান্ত জ্ঞান আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়াই উত্তম।